Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  নিয়মিত কলাম  ||  ৯ম বর্ষ ১ম সংখ্যা বৈশাখ ১৪১৬ •  9th  year  1st  issue  Apr-May  2009 পুরনো সংখ্যা
শুভ-অশুভের উদ্ভট সমন্বয়ের সময় Download PDF version
 

নিয়মিত কলাম

দূরের জানালা, কাছের মানুষ

শুভ-অশুভের উদ্ভট সমন্বয়ের সময়

অনিরুদ্ধ আহমেদ

এক.

এক আশ্চর্য বৈচিত্রের এবং অতি অবশ্যই বৈপরীত্যের বছর পেরিয়ে এলাম আমরা, সংশয় থেকে আশা এবং আশা থেকে আশঙ্কার  সময় অতিক্রম করেছি আমরা। (বাংলা) ১৪১৫ সালের সূচনায় বাংলাদেশের মানুষের মনে তখনও একটা সংশয় কাজ করেছে, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন নির্বিঘ্নে হবে কী না সেই সংশয়। সামরিক বাহিনী সমর্থিত তদানীন্তন অন্তঃবর্তী সরকারের উপর্যুপরি আশ্বাস সত্বেও ঘরপোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দেখে আশঙ্কার মতোই বাংলাদেশের মানুষ একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনকে তখনও অবিশ্বাস্যই মনে করেছে এবং চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের একটা দুঃস্বপ্ন বাঙালিকে তাড়া করেছে বারবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী সমর্থিত সরকারই, অসামরিক ও নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি পূরণ করলো, প্রতিশ্রুত সেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে। একথা সত্যি যে তত্বাবধায়ক সরকারের সব পদক্ষেপই সফল হয়নি, বিশেষতঃ সেই সব পদক্ষেপ স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছে যেখানে কৃত্রিমভাবে রাজনীতির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের একটা ইচ্ছে ছিল সেই সরকারের। অনেক জল্পনা-কণ্পনা, অজস্র সব জিজ্ঞাসা শেষে নির্বাচন যখন হয়ে গেল, তখনই পরিস্কার হলো বস্তুতঃ বাংলাদেশের জনগণ কী চায়। নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষের রায় ছিল স্পষ্ট, তাতে কোন দ্ব্যর্থবোধক বিষয় ছিল না। বাংলাদেশের মানুষ বস্তুতঃ ইতিহাসের কাছে তাদের দীর্ঘ দিনের ঋণ পরিশোধ করে, সামনের দিকে এগিয়ে যাবার পক্ষে পরিস্কার রায় দেয়। ইতিহাসের দায়টা হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, যারা বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও সংজ্ঞায় বিশ্বাস করেনি কখনও এবং অতএব চিরদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে থেকেছে তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন করা আর সেই সঙ্গে ১৯৭৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত যে সব রাজনৈতিক হত্যাকান্ডে অসংখ্য প্রাণ আমরা হারিয়েছি, সেই সব ঘাতকদের বিচার সম্পাদন করা। আর সেই সঙ্গে ইতিহাসের কাছে আমাদের ঋণ পরিশোধ করে, সামনের দিকে এগিয়ে যাবার প্রত্যয়ও, তরুণ প্রজন্মকে বিশেষ করে প্রণোদনা যুগিয়েছে একটি আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের প্রত্যয় ও প্রতিশ্রুতি ।  এই রকম এক স্বপ্ননির্মাণের একেবারে প্রথম ধাপেই বাংলাদেশ এক প্রচন্ড চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হল। এই ক্ষয়, এই ক্ষত উপশমে কতদিন সময় নেবে সে কথা বলা মুস্কিল তবে এতে বাংলাদেশের নব নির্বাচিত গণতান্ত্রিক  সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বেশ শল্থ করা হল।

দুই.

এই নৃশংস হত্যাকান্ড, এই বর্বরতা এবং মানুষের তৈরি কৃত্রিম এই বিপর্যয় সম্পর্কে এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যায় যে এটি ছিল একটি পূর্ব পরিকল্পিত বিদ্রোহ এবং এই বিদ্রোহের কারণে যে সব মৃত্যু ঘটল এবং যে সব পরিবারের ওপর দিয়ে বিপর্যয়ের ঝড় বয়ে গেল তাদের অন্তঃস্থিত বেদনার সঙ্গে গোটা জাতির সমবেদনা একাকার হয়ে গেছে। বেদনার এই বর্ধিত জোয়ারে বাংলাদেশ ভুলতে বসেছে বিডিআর এর সাধারণ এবং সম্ভবতঃ নিরপরাধ জোয়ানদের, যাদের ছা-পোষা পরিবার এখন অর্ধভুক্ত থাকছে, যারা অনেকেই মুষ্টিমেয় বিপথগামি জোয়ানদের কারণে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের প্রাপ্য সুযোগ সুবিধে থেকে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতেও অতীতে প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটেছে, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে; সেই সময়ে পাইকারি হারে সাধারণ সৈন্যদের বেতন প্রদানে কি বিলম্ব হয়েছিল? সৈন্যদের পরিবারের সদস্যরা কি তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেনি? এই বিষয়গুলোও বিবেচনায় আনতে হবে। যদিও বিডিআর এর বিদ্রোহী গোষ্ঠি তাদের অভাব অভিযোগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কার্যতঃ সরকার পতনের এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল কিন্তু এ কথাও সত্যি যে বিডিআর এর সাধারণ জোয়ানদের সুযোগ সুবিধে অনেক কম। সম্প্রতি এই উপলব্ধিতে সরকার যে দ্রুত পুলিশদের জন্যে রেশনিং বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা প্রশংসনীয় এবং এতে প্রমাণিত হয় যে বিডিআরদের সব অভিযোগই একেবারে মিথ্যে ছিল না। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে যে এই সব অভিযোগ উপস্থাপন করতে গিয়ে তারা যে হিংস্র পদক্ষেপ গ্রহণ করলো, তাতে তাদের ঐ অভিযোগ নিজে থেকেই নস্যাৎ হয়ে গেল। কোন অভিযোগই কোন রকম হত্যা, নির্যাতন ও লুঠতরাজকে ন্যায্যতা দিতে পারে না। তবে পাশাপাশি দুঃখ ও ক্ষোভ প্রশমনের পর এটাও মনে রাখা দরকার যে, বাংলাদেশের সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সব ধরণের বাস্তব ও কল্পিত বঞ্চনার ধারণার অবসান ঘটাতে হবে, যাতে করে এ ধরণের বাহিনীর অন্তর্গত সব দুর্বলতার অবসান ঘটে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের  বিএসএফ-এর মতো বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের পুলিশের মতো, সেনাবাহিনীর পরিবর্তে সম্পূর্ণ পৃথক কমান্ডের অধীনে নিয়ে আসা উচিৎ কী না- নীতি নির্ধারকদের এ সম্পর্কে একটি প্রয়োগবাদি দৃষ্টিভঙ্গি নিতে হবে। বস্তুতঃ বিডিআর এর পক্ষ থেকে এই বিদ্রোহের আগে যে প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে, সেখানে বিডিআর এর কমান্ডে এ ধরণের পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। তবে এতগুলো সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করার পর বিষয়টি এখন এত বেশিই স্পর্শকাতর হয়ে পড়েছে যে নতুন করে ঢেলে সাজানো সীমান্তরক্ষিদের জন্যে সরকার কি সদর্থক ভূমিকা নেবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে, সরকারের প্রতি বাংলাদেশের সেনাকমান্ডের সার্বিক আনুগত্যের ওপর। এ কথা বললে অত্যুক্তি করা হবে না যে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সত্ত্বেও, শেখ হাসিনার সরকারকে সরু দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এতে সরকারের গতি যে অনেকটাই ধীর স্থির হয়ে পড়েছে, সেটা বলাই বাহুল্য।

তিন.

বিডিআর জোয়ানদের এই বঞ্চনার প্রসঙ্গটাকে যে সরকার উৎখাতের একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। নইলে জোয়ানরা এ রকম একটি নৃশংস ঘটনা ঘটাতে পারত না। এই ঘটনার পেছনে কাদের হাত ছিল সেটা, এই কলাম লেখা পর্যন্ত স্পষ্ট নয় এবং বোধ করি তদন্ত রিপোর্টেও এই ঘটনার জন্যে প্রকৃত পরিকল্পকদের বের করা কঠিন হবে। তবে এই ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটা পরিস্কার ধারণা  থাকলে, এর  পরিকল্পকদের চিহ্নিত করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। প্রায় সকলেই একমত যে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করাই ছিল এর লক্ষ্য। আর বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার একটা খুব সহজ উপায় হচ্ছে সরকারের পতন ঘটানো। বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট যে নিরঙ্কুশ সংখ্যগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, সেটাই সম্ভবতঃ ঘরে বাইরে তার জন্যে একটা বড় কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে গতবারের আওয়ামী লীগ সরকার ব্যর্থ হয়েছিল, প্রান্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কারণে। কিন্তু এবার এ বিষয়টিকে সরকার তাদের পক্ষে একটি গণভোট হিসেবেই দেখছে। পিলখানার ঘটনা তাদের প্রত্যয়ে চিড় ধরানোর একটি অপচেষ্টা ছিল এই সব যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমর্থকদের কাছ থেকে। সবচেয়ে বড় কথা হলো সামরিক বাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি অপ্রত্যাশিত সংঘাত সৃষ্টি করে এমন এক ধরণের অচলাবস্থা সৃষ্টি করা যার ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করা যায় এবং অতএব বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ বাকি সব কার্যক্রম বাতিল করানো যায়। এই লক্ষ্যটা অত্যন্ত পরিস্কার। এমনিতে যেহেতু বর্তমান গণসমর্থিত সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব নয়, সেহেতু বিডিআর জোয়ানাদের সাধারণ ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে, দেশে এক ধরণের অরাজকতা ও কৃত্রিমভাবে নিরাপত্তা সঙ্কট তৈরি করে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পথকে সুগম করা। সৌভাগ্যবশতঃ সেই সঙ্কট আপাতদৃষ্টিতে এড়ানো গেছে। কিন্তু এর ফলে সরকারকে অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। যে উচ্ছলতা ও গতিশীলতার সঙ্গে সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল তাতে একটি স্থবিরতা এসেছে। শুধু যে সরকারের নির্ধারিত কর্মসূচির অগ্রাধিকারগুলো ব্যাহত হয়েছে তাই-ই নয়, এর ফলে সরকারকে অনেকখানি সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে। এই বিষয়টি যে কোন সভ্য ও সুশীল সরকারের ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্খিত এক পরিণতি।

চার.

বস্তুতঃপক্ষে এই ১৪১৫ সালের প্রায় শেষ ভাগে এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতি এক বড় রকমের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলো। যা ছিল সম্ভাবনা, সেটিই এখন যেন সঙ্কটে রূপান্তরিত হলো। আসলে পিলখানার ঐ ঘটনার কতগুলো নেতিবাচক প্রভাব পড়লো সরকারের ওপর। প্রথমতঃ, অসামরিক সরকার এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে একধরণের অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী পরিস্কার সহানুভূতি পাওয়ার কারণে,  অসামরিক সরকারের অবস্থান অনেকখানি দুর্বল হয়েছে এবং দরকষাকষিতে সামরিক বাহিনী আবারও এক সুবিধাজনক অবস্থানে চলে এসছে। দ্বিতীয়তঃ সেই একই কারণে সামগ্রিকভাবে রাজনীতিকদের অবস্থান আপাতত দুর্বল হয়ে পড়লো। তৃতীয়তঃ এই দুর্বলতাকে আবারও নিজ স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, প্রাতিষ্ঠানিক অগণতান্ত্রিক শক্তি অথবা জঙ্গি শক্তিও। আমরা এরই মধ্যে শুনেছি জঙ্গি শক্তির কিছু তৎপরতার কথা। এমন কী পিলখানা হত্যাকান্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসছে। বাংলাদেশে জঙ্গিরা যে শণৈ শণৈ তাদের শক্তি বৃদ্ধি করছে সে সংবাদ নতুন কিছু নয়। কিন্তু নতুন এই সরকারের কাছ থেকে যে প্রতিরোধ তারা পাচ্ছে, তাতে তাদের আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠার কথা। সব মিলিয়ে আপাতত ১৪১৫ সাল শুভ ও অশুভের এক উদ্ভট সমন্বয়ের মধ্যেই কাটলো।

এখন কেবল নতুন প্রত্যাশা ও উদ্বেগ ১৪১৬কে নিয়ে। বিগত বসন্তে গণতন্ত্র মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন না হলে সহজেই বলা যেত আসন্ন ১৪১৬ কেবলই প্রত্যাশা পুরণের সন, কেবলই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সন। কিন্তু এখন এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ১৪১৬ সালের বাংলাদেশকে নিয়ে আমাদের ভাবনা অপরিসীম।

অনিরুদ্ধ আহমেদ:  যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক ও নিবন্ধকার
aauniruddho@gmail.com

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.