Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ১ম সংখ্যা বৈশাখ ১৪১৬ •  9th  year  1st  issue  Apr-May  2009 পুরনো সংখ্যা
ছোটগল্প : অস্পষ্ট Download PDF version
 

সাহিত্য

ছোটগল্প : অস্পষ্ট

হামিদ কায়সার

 

এ্যাই ঘুমিয়েছো? সাড়া পায় না মৌটুসী। খুররম মুখ বালিশে চেপে স্থানুর মত শুয়ে আছে। ও আবার ডাকলো, এ্যাই শুন্ ছ? খুররম মাথাটা একটু তুললো। তাকালো না।

তোমাকে নিয়ে একটা ফিসফাস হচ্ছে। বলবো না বলবো না করেও কথাটা বলেই ফেললো মৌটুসী। খুররম এবার মাথা তুলে তাকালো, হুঁ!

বলে ফেলার আফসোসে মৌটুসী তখন থরো থরো; একটু এগিয়ে এসে খুররমের মাথাটা বালিশ থেকে নিজের কোলের উপর তুলে নিল, আমি জানি মন খারাপ হবে। কিন্তু তোমার ভালোর জন্যেই কথাটা এখনই বলা দরকার!

খুররম জিজ্ঞাসু চোখে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে রইলো।

খসরুর চলে যাওয়ায় তুমি নাকি মনে মনে খুশি হয়েছো!

একটু যেন চমকালো খুররম। মৌটুসীর কোলে মাথা রেখে তেমনই উদাস ভঙ্গিতে শুয়ে রইলো। গলাটা আশ্চর্য ঠাণ্ডা, কে বললো?

অনেকেই। মৌটুসী বললো।

তোমার কি মনে হয়? হঠাৎই প্রশ্ন খুররমের।

খুশি হবে কেন? আপন ভাই! বলতে গিয়ে মৌটুসীর গলাটা কেমন আড়ষ্ট হয়ে এলো। আজ সারাটা দিন ওর নিজের কাছেও খুররমকে মনে হয়েছে আশ্চর্য প্রশান্ত। সকালে যখন খলপায় বাঁধা খসরুর লাশটা এলো, কান্না দূরের কথা। ও কাছে যায় নি। শেষবারের মত মুখটা পর্যন্ত দেখলো না। ও জোর না করলে জানাজাটাও পড়তো কীনা কে জানে! ওর নিজের কাছেও খুররমের আচরণগুলোকে বড় বেশি অদ্ভুত ঠেকছিল। ওর হঠাৎ গাম্ভীর্যে খুররমের কৌতহল, এটা কি তোমার মনের কথা?

মৌটুসী সহসা জবাব দিতে পারলো না।

তুমি তো একটা জিনিস ঠিকই জানো, ওর প্রতি আমার কোন ফিলিংস ছিল না। তাই ভাবতেই পারো ওর মৃত্যুতে আমি-

থাক। এসব কথা!

তুমিই তো উঠালে!

দেখো তোমার কষ্টটা আমি বুঝি। তুমি খসরুকে কতটা ভালবাসো, মনে করো আমি তা টের পাইনি।

না। পাও নি। তুমি আমাদের সংসারে আসার অনেক আগেই ও আমার মন থেকে উঠে গেছে।

হ্যা। তোমার খসরু তোমার কাছে অনেক আগেই মরে গেছে। ওর জন্যে কান্নাগুলো তুমি আগেই শেষ করে ফেলেছো। তাই আজ তোমার চোখ দিয়ে এক ফোঁটাও পানি পড়েনি।

বিশ্বাস করো ওর জন্যে আমার একটুও ফিলিংস নেই। ফিলিংসগুলো ও নিজেই একটু একটু করে মুছে ফেলেছে।

এসব কথা এখন বলার দরকার নেই। এমনিতেই কানাকানি হচ্ছে-

কি?

খসরুর মৃত্যুতে তুমি কষ্ট পাও নি। খুশি হয়েছো। এখন বাপের সম্পত্তি একা একা ভোগ করবে!

মৌ! এসব কি বলছো?

আমি বলছি? তোমার বাড়ির মানুষগুলোই তো বলাবলি করছে।

কে?

সেটা আর জানতে চেয়ো না। সহ্য হবে না।

বলো মৌ। আমার জানা দরকার।

বলবো আর মাথা গরম করবে। না শোনাই ভালো।

মৌটুসীর হাতটা ধরে খুররমের আকুতি, বলো মৌ। প্লীজ! কেউ জানবে না।

কতক্ষণ চুপ করে রইলো মৌটুসী। তারপর যেন দম ফেললো, মা বলছিল। তোমার একমাত্র বোন শায়লা, ও-ও বলছিল। বাদ আছে কে?

কিন্তু মৌ কথাটাতো ঠিক, খসরুর জন্যে আমার মধ্যে একেবারেই কোন ফিলিংস হচ্ছে না। এই যে ও জবাই হলো। ওর লাশকে চার টুকরো করে কাটা হলো। আমার বুকটা একটুকুও কাঁপলো না। যখন খলপায় বেঁধে ওর লাশটাকে আনা হলো, আমার তো উচিত ছিল ওর কাছে ছুটে যাওয়া। আমার চোখের সামনে ও ধীরে ধীরে মাটির ঘরে আড়াল হয়ে গেল আমার চোখে সামান্য পানিও এলো না!

হতেও তো পারে এটা অতি শোক!

আমিতো পাথর হইনি মৌ। স্বাভাবিকই তো রয়েছি! বলতে বলতে খুররম শোয়া থেকে হন্তদন্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। অস্থির ভঙ্গিতে দরোজার দিকে ছুটলো। ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল মৌটুসী, কোথায় যাচ্ছো?

মা কি ভাবছে বলো তো?

যা বলবার সকালে বলবে। এখন কটা বাজে জানো?

খুররম ছেলেমানুষের মত মাথা নাড়ালো, জানে না। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মৌটুসী বললো, আড়াইটা। এবার একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো। খুররমকে বিছানায় শুইয়ে লাইটটা বন্ধ করে দিল ও। স্বামীর পাশে শুয়ে ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললো, সারাদিন কম ধকল যায় নি, রাতেও যদি না ঘুমাও অসুস্থ হয়ে পড়বে।

মাতো যা ইচ্ছে ভাবতেই পারে, কি বলো! প্রায় চার চারটা বছর হলো ওর সাথে আমার স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই। কথা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। আজকে ওর জন্যে একটুও কাঁদি নি।

ধুর! আমি যে কি! তোমাকে বলার আর সময় পেলাম না!

ভালোই করেছো মৌ। ওদের ভুল ধারণাটা ভাঙিয়ে দিতে পারবো।

আমিও চাই না কেউ ভাবতে পারুক বাপ মার সম্পত্তির লোভে তুমি ভাইয়ের মৃত্যুতে খুশি হয়েছো। সেজন্যেই তোমাকে জানিয়েছি।

জানো মৌ। ছোটবেলায় ও আমার পিছে জোঁকের মত লেগে থাকতো। ওকে রেখে কোথ্থাও যেতে পারতাম না। সঙ্গে সঙ্গে বেজে থাকতো। লাইটটা জ্বালাবে মৌ, অন্ধকারে কেমন ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে ও জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

ঘুমাও। ঘুমালেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

প্লীজ! লাইটটা দাও।

শোয়া থেকে আবারও উঠে লাইটটা অন করলো মৌটুসী। এক ঘরে বেড়ে উঠেছি আমরা এক বিছানায়। ও আমাকে ঘুমের মধ্যে আঁকড়ে ধরে ঘুমাতো। এসব আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। কিভাবে মনে থাকবে বলো! বড় হওয়ার সাথে সাথে ও কিভাবে যেন দূরে সরে গেল! শেষের দিকে কথা বলতে দুজনেরই কি রকম সংকোচ হতো। জানো ও কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারতো না। কিভাবে পারবে? ওকে ঘিরে যে আমার অনেক প্রত্যাশা ছিল। আমি যা পারি নি, ও পারবে। অনেক দূর পর্যন্ত পড়বে। ভালো রেজাল্ট করবে। আমাদের সংসারটাকে সমাজের অনেক উঁচু জায়গায় নিয়ে যাবে। কিন্তু যখন প্রত্যাশাগুলো একে একে মার খেতে লাগলো, আপসেই মাথাটা নিচু হয়ে গেল ওর। অনেক অনেকদিন ভালো করে ও কারোর দিকে তাকাতে পারতো না। তারপর কিভাবে কিভাবে যে একদিন ওর সমস্ত দ্বিধা সংকোচ লজ্জা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল! ওহ্! কী ভয়নাক! রাতারাতি কেমন বেয়াড়া হয়ে উঠলো ও। ঠিক যেন একটা পাগলা ঘোড়া!

কোনদিন তো পাগলা ঘোড়াটাকে বাগ মানাতে চাও নি!

পারি নি। আমার বাবা-মা, তুমি তো জানোই, আমাকে মনে করে একটা কাওয়ার্ড। আমি কাপুরুষ। সত্যিই আমি একটা কাপুরুষ।

নিজেকে নিয়ে এভাবে ভাবতে হয় না!

আর খসরু আমার সততা আমার অনেসটি নিয়ে ঠাট্টা করতো। বিদ্রুপ করতো। বলতো, যারা আজকের সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না তারাই সোকল্ড ভালো মানুষ সাজে। বাঁচার জন্য ভং করে, ভং। ওর এসব কথা সহ্য হতো না। ওকে তাই এড়িয়ে চলতাম। ও-ও আমাকে এড়িয়ে চলতো। আমাদের মধ্যে দূরত্বটা দিনকে দিন বাড়তে লাগলো।

এসব কথা থাক খুররম। লক্ষী ছেলের মত এবার চোখ দুটো বন্ধ করো দেখি!

আচ্ছা, মা আমাকে আজকে এভাবে ব্লেইম করছে! অথচ... আচ্ছা.. না না। আমার এখনই মার ভুলটা ভাঙিয়ে দেয়া দরকার। মা নিশ্চয়ই আমার আচরণে কষ্ট পাচ্ছে। হ্যা হ্যা। ওকে আমি পছন্দ করতাম না। তাই বলে বাবা-মার সম্পত্তির লোভে... ছি...ছি... আবারও দরজার দিকে ছুটলো খুররম।

এবার ওকে আর আটকাতে পারলো না মৌটুসী। হুঁট হাট দরোজা খুলে অন্ধকারের ভিতরে ও হারিয়ে গেল। দরোজা পেরিয়ে মৌটুসী সোজা মার রুমের দিকে ছুটলো। খুররম দরোজায় টোকা দেবার আগেই ওর পথ আটকে দাঁড়ালো। তোমার কি মাথাটা খারাপ হয়ে গেল? দুপুর রাতে বুড়ো মানুষটাকে ঘুম থেকে জাগাবে?

শার্ট ধরে টানতে টানতে খুররমকে ঘরের ভিতর টেনে নিয়ে এলো ও। ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে লাইটটা নিভিয়ে দিল। খুররমের পাশে শুতে শুতে বললো, ঘুমাও। দেখবে মাথাটা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

শুনছো? পাঁচ কি দশ মিনিটও যায় নি, ডেকে ওঠলো খুররম। চোখে ঘুম লাগতে শুরু করেছিল মৌটুসীর। গলায় অবসাদ, হু! বলো।

আচ্ছা মা ঠিক কি বলেছে?

ইস্! তোমার মাথায় একটা কিছু ঢুকলে আর রক্ষা নেই। মা কি বলেছে তাতো তোমাকে বলেছিই!

না, মানে!

দেখো তোমার ভাই নিজের দোষেই মরেছে। এত অস্থির হবার কি আছে!

স্টুপিড! হঠাৎই ধমকে ওঠলো খুররম। আমার ভাই কেন মরেছে সেটা কি তোমার কাছে জানতে চেয়েছি?

রাত দুপুরে ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছো কেনো?

তোমার কথা শুনে। তুমি একটা হোপলেস। একটা কাণ্ডজ্ঞানহীন মহিলা।

হঠাৎ কি হলো শুনি? টেম্পারেচার বেড়ে গেল ক্যানো?

তোমার আচরণে মৌ। এই যে খসরুর সঙ্গে আমার সম্পর্কের একটা টানাপোড়েন চলছিল, তুমি কিন্তু একটা ভালো ভমিকা রাখতে পারতে। তুমি ওর সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলতে না।

আজ সবকিছু ভুলে বসে আছো? এ বাড়িতে আসার পর তুমিই কিন্তু বলেছিলে, আমার ভাইটা মদখোর, চাঁদাবাজ। ওকে পারলে এড়িয়ে চলো।

হ্যাঁ। বলেছিলামই তো। তখন ওর সঙ্গে আমার একটা রাগ-অভিমানের পালা চলছিল। কিন্তু তাই বলে তুমি, তুমি তো আমাদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কের যে গ্যাপটা আছে তা পূরণ করতে পারতে!

খুররম বকেই চললো। অন্যপাশ তখন শীতল। উত্তর না পেয়ে উল্টো ক্ষেপে উঠলো খুররম, কথা বলছো না যে! বলার মত কিছু থাকলে তো! তুমি একজন ভাবী। তুমি একজন মেয়ে। তোমরা ভালোবাসা মায়া-মমতা দিয়ে অনেক কিছুই করতে পারো!

সেটা করার সুযোগ তুমি দিয়েছ? হঠাৎই জ্বলে উঠলো মৌটুসী। বাসর রাতের কথা মনে নেই তোমার? মনে নেই আমার বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ওঠার কথা!

চুপ হয়ে যায় খুররম। বুকের ভিতর কেমন একটা ধাক্কা লাগলো। এ রকম ছিল না ওর সময়, এই মৌটুসী জীবনে আসার আগের দিনগুলো! যেন কী রকম ছিল! বড়ো একা লাগতো। নিজেকে ভীষণ অপাংক্তেয় মনে হতো। তখন এম এ পাশ করে বসে আছে। চাকরি পাচ্ছে না। এদিকে নিজেরই ছোটভাই লেখাপড়া ছেড়ে ছুঁড়ে উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। ও চাইতো খসরুর শার্প ব্রেন, কলেজ শেষ করে মেডিক্যাল অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কোন একটা লাইন ধরুক। অথচ খসরু তখন কলেজের পাট চুকাতেই চাইছে না। পুরোপুরি ছাত্র রাজনীতি নিয়ে মেতে ওঠলো। কোথা থেকে হোন্ডা পেয়েছে। পিস্তল ক্যারি করছে। খুররমের কাছে তখন এটাকে মনে হয়েছিল খসরুর পতন। কিন্তু খসরু নিজে তা মনে করতো না। ওর তখন কলেজের জিএস হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের রং ছড়িয়েছিল বাবার মনেও। খসরুকে লোকজন ভয় পায়, সমীহ করে - এসব দেখে দেখে বাবার বুকটা গর্বে কেমন চওড়া হয়ে যেত। কদিন পর যখন খসরুর গুণে তিনি শেষ বয়সে কনট্রাকটরির কাজ পেতে লাগলেন, সংসারটাতে ধীরে ধীরে প্রাচুর্যের ছোঁয়া লাগলো, বাড়ির চেহারা বদলে গেল রাতারাতি, টিনের ঘরের বদলে ঝটপট দালান উঠলো। শুধু কি সংসারের উন্নতি! খসরুর বদৌলতে বাবা পুরো মফস্বল শহরটা দাপিয়ে বেড়ান, তখন ওর বিরুদ্ধে কথা বলার আর সাহস হয় কার? বাবাতো বাবা, মা পর্যন্ত খসরু পাগল। ওর বিরুদ্ধে কিছু বললেই ভেবে বসতো এসবই খুররমের ঈর্ষা। যে ছেলে এমএ পাশ করেও বেকার বসে থাকে, নির্লজ্জের মত বাবা-মার অন্ন গ্রাস করে, হতাশা ছাড়া আর কিইবা দেয়ার আছে তার?

অথচ ওর চোখে তখন এক একটা আশংকা উঁকি দিয়ে যেত। যাদের সঙ্গে পলিটিক্সের নামে চাঁদাবাজি আর টেন্ডারবাজির ভয়ংকর আগুনে খেলায় মেতে ওঠেছে খসরু, তাতে যে ও নিজেই একদিন জ্বলে পুড়ে খাক হতে পারে এমন আশংকা কতবার হয়েছে। ওরা স্বার্থের জন্যে সব পারে! শেষপর্যন্ত সেটাই সত্যি হলো! চোখের সামনে একটা উন্মত্ত পাগলা ঘোড়াকে দেখলো সংসারটাকে পুরো লন্ডভন্ড করে দিতে, অথচ তাকে বাগ মানাতে পারলো না! কিভাবে পারবে? উঁচু গলায় কথা বলার জোর থাকলে তো! বেকারত্ব যাও বা ঘুচলো কিন্তু মফস্বল শহরের একটি বেসরকারি কলেজে পড়িয়ে যা বেতন পেত, তা দিয়ে এই শহরতলীতে নিজেরই চলতে চাইতো না। বাবা-মাকে দেবে কি? এমন কি বিয়ে করাটাও ওর হয়ে উঠতো না, যদি না বাবা-মা এগিয়ে আসতেন। সেটার ক্রেডিটও অবশ্য খসরুর। মা সেটা ইঙ্গিতে বোঝাতে ছাড়ে নি। এসব  নিয়ে তখন, হ্যা, সেটা ছিল ওর জীবনের এক চরম রুদ্রকাল, হয়তো বিয়ের পর ও মৌটুসীর কাছে এক ধরনের আশ্রয়ই চেয়ে থাকবে। হয়তো ভেতরের নিঃসঙ্গ মানুষটা ওকে পেয়ে হঠাৎই বাঁধভাঙ্গা আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মৌটুসী পারে নি, যে নির্ভরতা ওর কাছে চেয়েছিল খুররম, তা দিতে পারে নি। মৌটুসীতো পারতো বাবা-মা, শায়লা, খসরুর সঙ্গে ওর যে দূরত্ব আছে সম্পর্কের, সেটাকে জোড়া লাগাতে।

ওদিকে মৌটুসীও ভেতরে ভেতরে ফুঁসছিল। ও-ও ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়, এ বাড়িতে আসার পর তুমি কি আমাকে স্বাভাবিক থাকতে দিয়েছো? আমার কি ইচ্ছে করে নি খসরুর সঙ্গে কথা বলতে? একটা মাত্র দেওর। আমি কি কখনো তোমার ভয়ে ওর সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে পেরেছি? একবার ও আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দামের শাড়ি কিনে দিয়েছিল বলে তুমি কি শুনিয়েছিলে মনে আছে?

মনে আছে খুররমের। সবই মনে আছে। আসলে সেদিন একটা অপমান বোধ একটা গ্লানিকর যন্ত্রণা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। বিয়ের এক কি দেড় বছর পরের কথা সেটা। ঈদের আগের দিন লাল সোনালী রংয়ের সিল্কের একটা শাড়ি নিয়ে এলো খসরু মৌটুসীর জন্যে। বাড়ির সবার জন্যেই এনেছিল সেদিন - মার জন্যে, বোনের জন্যে, ওর জন্যে। কাউকে বলে দেয়ার দরকার হয় নি, মৌটুসীকে যে শাড়িটা দিয়েছিল, ওটা ছিল খুবই দামি শাড়ি। খুররম যখন দামটা জানলো, ওর মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল। কোনদিন মৌটুসীকে ও এত দামি শাড়ি পরাতে পারে নি। ওর দৌড় দেড় কি দু হাজার পর্যন্ত! তাও সেটা একবার কি দু বার পেরেছে। ও কখনো এক হাজার টাকার উপরে যায় নি। তাই সেদিন গ্লানিবোধে ওর কথাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঈদের দিন অবশ্য মৌটুসী খুররমের দেয়া শাড়িটাই পরেছিল প্রথম। সকাল বেলা গোসল করেই পরেছিল ওটা। শাড়ি পরে বাড়ির রেওয়াজ অনুযায়ী খুররমকে সালামও করেছিল। বিকেলে যখন এক আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাবে,  তখন কি মনে করে ওটা পাল্টে খসরুর  দেয়া শাড়িটা পরে নিয়েছিল ঝটপট। ব্যাপারটা ভালোভাবে নেয় নি খুররম, নিতে পারে নি। মুখ ফস্কে বেরিয়ে পড়েছিল কথাটা, খসরুর সঙ্গেই তোমাকে ভালো মানাতো! টাকা আছে ক্ষমতা আছে! তখন তখনই শাড়িটা এক ঝট্কায় খুলে ফেলেছিল মৌটুসী। সেদিন বেড়াতেও বের হয় নি। ও শাড়িটা কোনদিনও ও পরে দেখে নি। তোমার মনটা যে কত ছোট, সেদিনই টের পেয়েছি। বিড় বিড় করে উঠলো মৌটুসী।

ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো খুররম। আমার একটা নীতি আছে একটা আইডোলজি আছে। কারো অবৈধ উপার্জনের জিনিস তুমি পরবে এটা আমি চাই নি। সেটা চাইলে তো আমি নিজেই অবৈধ পয়সা রোজগার করতে পারতাম।

পারতে না। সেটার জন্যে মুরোদ লাগে। তোমার নেই।

কি বলছো মৌ!

তোমার আবার আইডোলজি? বলো ঈর্ষা!

হ্যা। আমি জানি সমাজে এখন নীতি আদর্শের কোন মূল্য নেই।

অত নীতি আদর্শের কথা বলছো! এই যে এখন এত বড় বাড়িতে থাকছো, ঘুমাচ্ছো এসব কার পয়সায় করা শুনি?

চুপ হয়ে যায় খুররম। একেবারেই চুপ। কিন্তু ভেতরে ভেতরে বুঝি এই পরাজয়কে ও মেনেও নিতে পারছে না। অনেক অনেকক্ষণ পর ওর ঠাণ্ডা গলা, স্বগতোক্তির মতই, আমি আসলে ফ্যামিলি থেকে কখনোই বিচ্ছিন্ন হতে চাই নি। মৌটুসীর গলায় তখনও ঝাঁজ, বিচ্ছিন্ন হতে না চাও, এত বড় বড় কথা বলো, ফ্যামিলির দায়িত্বটা নিয়ে নিতে! খসরুকে ভুল পথ থেকে ফেরাতে!

তাহলে আমাকে আর আইডোলজি নিয়ে বাঁচতে হতো না!

মনে হয় এখন খুব বেঁচে আছো!

বেঁচে নেই?

সংসারে, সংসারের বাইরে কোথাও তোমার গুরুত্ব আছে? তুমি খসরুকে ফেরাতে পারো নি। খসরুকে যারা মেরেছে তাদেরকেও কিছু করার ক্ষমতা তোমার নেই। তুমি আসলে একটা কাপুরুষ। এখন আইডোলজি আইডোলজি বলে চেঁচাচ্ছো।

তুমি থামবে! থামবে মৌ? চিৎকার দিয়ে ওঠলো খুররম।

আমি না হয় থামলাম, অন্যদের মুখ বন্ধ থাকবে? যে তোমাকে পেটে ধরেছে সে মা পর্যন্ত আজ বলছিল খসরুর মৃত্যুতে তুমি খুশি হয়েছো। সে পর্যন্ত জানতে পারলো না ভেতরে ভেতরে তুমি একটা নিজের মত আইডোলজি নিয়ে বসে আছো!

মা কেন বললো? এত বড় ভুলটা কেন বুঝলো মা? বলতে বলতে আবারও বিছানা ছাড়লো খুররম। দুদ্দাড় দরোজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে। এবার মৌটুসী বাঁধা দিল না। উল্টো, লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লো।

 

অস্থির ভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতে মার রুমের দরোজার সামনে থমকে দাঁড়াল খুররম। দরোজায় কড়া নাড়তে গিয়েও নাড়লো না। এত রাতে হঠাৎ বুড়ো মানুষটার ঘুম ভাঙিয়ে দিতে মন সায় দিল না। বারান্দা থেকে নেমে এসে উঠোনে দাঁড়াল। পূব আকাশের দিকে তাকিয়ে খুঁজলো ভোরের আভাস। সূর্যতো সূর্য! কোন রক্তিম রেখাও জেগে ওঠে নি। আকাশটা অস্পষ্ট।

ঢাকা।

 

মন্তব্য:
   April 27, 2009
Besh Bhalo Laglo.
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.