Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ১ম সংখ্যা বৈশাখ ১৪১৬ •  9th  year  1st  issue  Apr-May  2009 পুরনো সংখ্যা
নিবন্ধ : নতুন দিনের সম্মুখে Download PDF version
 

সাহিত্য

নিবন্ধ : নতুন দিনের সম্মুখে

মীজান রহমান

মাসতিনেক আগে একবার মনে হয়েছিল লেখালেখিটা ছেড়েই দিই। কি হবে লিখে। আঠারো বছর ধরে লিখছি, সংসারে কারো কোন উপকার হয়েছে তাতে? হয়নি। বড় কথা, এমন কিছু কি লিখেছি আমি যা আর কেউ বলেনি আগে? অবশ্যই না। এক রবীন্দ্রনাথই তো সব বাঙালির সব মনের কথা বলে গেছেন কোন না কোন ভাবে। তার সাথে যোগ করুন পৃথিবীর অন্যান্য কথাসাহিত্যিকদের। সর্বনাশ! তার পরেও কি কারো লেখার সাধ থাকে।

লেখালেখি ছেড়ে দিতে চাওয়ার পেছনে আরো একটা কারণ আছে অবশ্য। হয়ত সেটাই বড় কারণ। আসলে আমার বর্তমান সমস্যা শুধু লেখা উচিত কি উচিত না নিয়ে নয়, কোথায় লিখব। অর্থাৎ কোথায় আমার লেখা ছাপা হবে। দেশের কেউ ছাপাবে না কারণ সেখানে আমাকে চেনেনা কেউ। সুতরাং, ছাপতে হলে উত্তর আমেরিকার বাংলা পত্রপত্রিকাগুলো ছাড়া অন্য কোথাও জায়গা নেই। কিন্তু এখানেও তো ছাপার জায়গা একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।  লেখালেখি শুরু করেছিলাম অটোয়ার ‘মাসিক বাংলাদেশ’ পত্রিকায়। পাঁচ বছর পর সেটা বন্ধ হয়ে গেল। একই সময় নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক ‘প্রবাসীতে’ লেখা ছাপা হচ্ছিল। কিছুদিন পর সেটাও উঠে গেল। তার বদলে এল ‘নতুন প্রবাসী’। লিখলাম সেখানেও। কয়েক বছর চলল, তারপর ওতেও লালবাতি। ক্যানাডার ‘দেশে বিদেশে’ পত্রিকাতে লিখলাম একটানা ১১ বছর। এখন সেটাও ‘অধুনালুপ্ত’। ভাবলাম আর কিছু না থাক ‘পড়শী’ তো আছে। নিউইর্য়কের ‘বাঙালী’ও আছে। সাত বছর চলার পর হঠাৎ খবর এল ‘পড়শী’ আর ছাপা হবে না। বুঝতে পারছেন তো কেন লেখার উদ্যমটা হারিয়ে ফেলছি। আমি যাতে লিখি তারই যেন আয়ু ফুরিয়ে যায়। আশা করি ‘বাঙালী’র কোন অমঙ্গল ঘটবে না আমার লেখা ছাপিয়ে, অন্যদের যেমন ঘটেছে। ব্যাপারটা প্রায় মানসিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

প্রবাসের বাংলাদেশী সমাজে পত্রিকা শুরু হওয়া এবং বন্ধ হওয়া, দুটোরই অঢেল কারণ। আজকে সে আলোচনায় যাব না। আজকে আমার আলোচ্য বিষয় অর্থনৈতিক, সামাজিক বা চারিত্রিক না, প্রযৌক্তিক। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে সভ্যতার ওপর মুদ্রনশিল্পের প্রভাব ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। সেটাই আমার মূল প্রস্তাবনা। আগে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে দৈনিক পত্রিকার গ্রাহক না হওয়াটা ছিল ব্যতিক্রম। এখন হয়েছে তার উল্টো। অটোয়াতে যেসব বাংলাদেশী পরিবারের সঙ্গে আমার উঠাবসা, তাদের মধ্যে একমাত্র আমিই এখনো পত্রিকায় চোখ বুলাতে না পারলে অস্বস্তি বোধ করি। দোষটা ওদের না, আমার। আমি আধুনিক নই। আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে পারছি না আমি। এযুগের নতুন প্রজন্মের তুলনায় আমি প্রস্তরযুগের মানুষ। তাই কোন বাড়িতে পত্রিকার অভাব আমার চোখে পড়ে। দেশীবিদেশী সাময়িকীর অভাব আমাকে পীড়া দেয়। আগে বাড়ি বাড়ি এনসাইক্লোপিডিয়া থাকত। এখন তার দরকার হয়না কারো। কিছু জানার দরকার হলে লাইব্রেরীতে না গিয়ে মানুষ এখন গুগল্ সার্চ করে। আজকে ওদের সময় কোথায় লাইব্রেরীতে যাওয়ার, পত্রিকা পড়ার, ম্যাগাজিন পড়ার। আমাদের যুগে সময় ছিল, কারণ আমাদের কাজের জীবন ছিল ৯টা ৫টার মধ্যে আবদ্ধ। আজকের জীবন হল ২৪/৭। ওরা কাজ নিয়ে কাজে যায়। কাজ নিয়ে খায়, বিছানায় যায়। এই বিরামবিরতিহীন কাজের যুগে কাগজে ছাপা অক্ষরের দাম কমে যাবে সেটা তো খুবই স্বাভাবিক।

ছোটবেলা থেকেই আমার পত্রিকা পড়ার অভ্যাস। বাবা বলতেন, ‘ষ্টেটসম্যান’ পড়। পড়লে শুধু খবরই জানবেনা সাথে সাথে ইংরেজীটাও রপ্ত হবে। তাই আমাকে ‘ষ্টেটস্ ম্যান’ পড়তে হত লাইব্রেরীতে গিয়ে। স্কুলের মাস্টাররাও একই কথা বলতেন। ইংরেজী পত্রিকা পড়। চোখ খুলবে, মন খুলবে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকা ব্যবহার করতে শেখ। আমি বাধ্য ছাত্র ছিলাম সবসময়, তাই শিখতাম। শিক্ষকরা বলতেন ক্লাসের শিক্ষা যথেষ্ট না, যদি বড় হতে চাও। বড় হতে চাইলে লাইব্রেরীতে যেতে হবে নিয়মিত। দেশবিদেশের জ্ঞান আহরণ করতে হবে, শুধু পাঠ্যসূচীর জ্ঞান দিয়ে হবে না। বড় হওয়া কাকে বলে ঠিক বুঝতাম না তখন। তবু যেতাম কারণ বাবামা বলতেন আমাকে বড় হতে হবে। আজকের ছেলেমেয়েরাও বড় হতে চায়, হয়ত আমাদের চেয়েও বড়, কিন্তু তার জন্যে ওদের ‘ষ্টেটসম্যান’ পড়তে হয়না, লাইব্রেরীতে যেতে হয়না, এনসাইক্লোপিডিয়ার মত জবরদস্ত বই টানাটানি করতে হয় না। ওদের ‘ষ্টেটসম্যান’, লাইব্রেরী আর এনসাইক্লোপিডিয়া, সবই এখন ছোট একটা যন্ত্রের ভেতর। ওপরতলায় গিয়ে টেবিলে বসে গুটিকয়েক বোতাম টিপলেই সারা দুনিয়ার জ্ঞানবিজ্ঞান চলে আসে চোখের সামনে। কি জানতে চান আপনি? প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার কথা? নাকি চীন সভ্যতা? কিংবা হয়ত জানতে চান ডেড সি স্ক্রলের রহস্য। বা তানজানিয়ার বনে জঙ্গলে হাতির সংখ্যা কত। ভারত-বিভাগের সময় কত লক্ষ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। এসব জানার জন্য এখন বই পড়তে হয় না, মাষ্টারমশাইকে জিজ্ঞেস করতে হয়না। ঘরে বসে বোতাম টিপলে সব খবর পেয়ে যাবেন। সেযুগের ছেলেমেয়েরা পাঠশালায় গিয়ে নামতা মুখস্ত করত, মানসাংক করত। এখন সেসবের প্রয়োজন হয় না। যন্ত্র যেটা চোখের পলকে করে দেয় সেটার জন্য মাথা খাটিয়ে সময় নষ্ট করার কোন মানে আছে? স্কুলকলেজ বাদ দিন। সর্বোচ্চ ডিগ্রির গবেষণা কার্যের জন্যও আজকাল অনেকে গুগল্ আর উইকিপিডিয়ার শরণাপন্ন হয়। এটা গুগল্ প্রজন্মের যুগ। এযুগের ছেলেমেয়েরা সবই জানে। তারা সবজান্তা। সুতরাং তারা কেন ছাপাখানার মত একটা উদ্ভট সেকেলে জিনিষের তোয়াক্কা করবে?

কিন্তু আমি ভাই এযুগের মানুষ নই, সে যুগের। তাই সে যুগের স্মৃতি আমাকে ভাবকুল করে, আলোড়িত করে। আমি ভুলতে পারিনা আধুনিক সভ্যতাতে ছাপাখানার কতখানি অবদান, বা কি তার আদি ইতিহাস। আজ থেকে বহু বহু বছর আগে, মিশরীয়, গ্রীক এবং রোমান সভ্যতার আমলে, ছাপার কৌশল জানা ছিলনা মানুষের। তখন লোকে হাতে লিখে কাজ চালাতো। কাগজ আবিষ্কার হয়নি বলে তাদের ব্যবহার করতে হত পাথর, কাঠ বা জীবজন্তুর চামড়া। তা দিয়ে রোমানরা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর হাজার হাজার বই প্রকাশ করতো। হাতে লেখার শক্ত কাজটি অবশ্য রোমান ভদ্রলোকরা নিজেরা করতেন না, ক্রীতদাসদের দিয়ে করাতেন। খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় দু’শ বছর পর চাইনিজরা একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন যাকে আধুনিক মুদ্রনশিল্পের পূর্বসুরী বলে আখ্যায়িত করেন অনেকে। কোন কোন পন্ডিতের ধারনা, প্রায় একই সময় ইউরোপ আর মধ্যএশিয়ার জায়গায় জায়গায় কাঠের ওপর অক্ষরের ছাপ বসাবার পদ্ধতিটা আয়ত্ব হয়ে যায়। তবে যে বিষয়ে কোন মতানৈক্য নেই সেটা হল কাগজের আবিষ্কার। সেটা ঘটে চীনদেশে, ১০৫ খ্রীষ্টাব্দে। তাতে করে ছাপার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়, যদিও চীনাভাষার বিবিধ জটিলতার জন্য কাগজের ওপর চাপ দিয়ে ছাপার প্রচলনটা ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করতে পারেনি সেখানে। যাই হোক, উভয়বিশ্বে জ্ঞানের বিকাশ যেমন ঘটতে থাকে আস্তে আস্তে, তেমনি পাশাপাশি ক্রমোন্নতি লাভ করতে থাকে মুদ্রনকৌশল। ৯৭২ খ্রীষ্টাব্দে বৌদ্ধধর্মের পবিত্র গ্রন্থ ত্রিপিটাক (১ লক্ষ ৩০ হাজার পৃষ্ঠা!) সর্বপ্রথম মুদ্রিত হয় কাঠের ফলকে তৈরি কাগজের ওপর। কিন্তু মুদ্রনশিল্পের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার এবং আধুনিকীকরণ শুরু হতে আরো প্রায় ৫০০ বছর লেগে যায়। এবং তার প্রথম চমকপ্রদ প্রকাশ ঘটে পশ্চিম বিশ্বে। পশ্চিমে তখন রেনেসাঁর হাওয়া লেগেছে। মার্টিন লুথারের বিপ্লবী ধ্যান-ধারণাতে উদ্ধুদ্ধ হয়ে সারা ইউরোপে শুরু হয়ে গিয়েছিল জ্ঞানবিজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধি মুক্তচিন্তার ব্যাপক আন্দোলন। তারই ফলশ্রুতিতে ১৪৫০ সালে আবিষ্কৃত হয় পশ্চিমের প্রথম ছাপাখানা। এবং তার আবিষ্কারক হিসেবে ঐতিহাসিকরা যাঁকে চিহ্নিত করেন সচরাচর, তাঁর নাম ইউহান গুটেনবার্গ। গুটেনবার্গ বাইবেল নামে পরিচিত খ্রীষ্ট ধর্মের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে ইউরোপে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে উপনিবেশসমূহতে, খ্রীষ্টধর্মের অব্যাহত প্রচার ও প্রসারের পেছনে এই গ্রন্থখানির বিশাল অবদান ছিল সেবিষয়ে বিশেষজ্ঞদের দ্বিমত নেই। পঞ্চদশ খ্রীষ্টাব্দে এই আবিষ্কারটি ছিল সেযুগের সবচেয়ে যুগান্তকারী ঘটনা। জ্ঞানবিজ্ঞানের জগতে তুমুল এক বিষ্ফোরণ সৃস্টি করে দেয় এই যন্ত্রটি। পরবর্তী পাঁচ শতাব্দী ধরে জ্ঞানের বিকাশে পশ্চিমের যে প্রায় একচেটিয়া প্রভাব প্রতিপত্তি, তাদের চিন্তাচেতনার যে বিপুল অগ্রসরতা, তার পেছনে মুদ্রিত অক্ষরের অবদান যে কতখানি তার সঠিক পরিমাপ নিরূপণ করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। আধুনিক সভ্যতা, আমি বলব, ছাপাখানার সবচেয়ে সফল সন্তান।

কিন্তু সন্তান এখন বড় হয়ে গেছে। গৃহত্যাগ করে বিশ্ববিজয়ে বেরিয়ে পড়ার বয়স তার। পৃথিবী কখনো থেমে থাকেনা কোথাও। প্রগতির ধারাই এই - আজকে যা আধুনিক কালকে তা সেকেলে, অচল। আজকে যা চটকদার কালকে তা কদাকার। বর্তমান  কখনোই অতীতের জন্য অপেক্ষা করে না। প্রায়শঃ বরং অতীতের শবের ওপর দৃপ্ত পদে এগিয়ে যায়। পাঁচশ বছর আগেকার গুটেনবার্গ সাহেবের সেই ছাপাখানারও হয়েছে প্রায় সেই দশা - তার শবদেহের ওপর দিয়েই যেন স্পর্ধিত পদক্ষেপে ধেয়ে চলেছে নতুন দিনের প্রযুক্তি। এই অগ্রযাত্রার চক্রতলে পিষ্ট হচ্ছে ক্ষুদে ক্ষুদে চুনোপুটিরাই নয়, বড় বড় রাঘববোয়ালরাও। কল্পনা করতে পারেন নিউইর্য়ক টাইমসের মত জাঁদরেল পত্রিকা প্রায় মৃত্যুদশায় এসে গিয়েছে? শিকাগো ট্রিবিউন তো বন্ধই হয়ে গেল।  কলরেডোর রকি মাউন্টেন নিউজও নাকি লালবাতি জ্বালিয়েছে। নামীদামী সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোর অবস্থাও তেমন সুবিধের না। ‘টাইম’ পত্রিকাটি আমি খুব আগ্রহের সাথে পড়ি। গত ত্রিশ বছর ধরে আমি এর নিয়মিত গ্রাহক। সেদিন চিঠি পেলাম যে এখন থেকে ‘টাইমের’ ক্যানাডা সংস্করণ বন্ধ হয়ে গেল। একটা পারিবারিক মৃত্যুরই মত মনে হল খবরটা। একটা অপূরণীয় ক্ষতি। যেন একটা ঘনিষ্ট বন্ধু হারালাম আমি।

একে একে আরো কত পত্রিকা সাময়িকী ধরাশায়ী হয় এভাবে কে জানে। অটোয়ার একমাত্র দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য সিটিজেন’। শুনছি সেটারও স্বাস্থ্য খুব ভাল নয়। ‘সান’ নামে আরেকটি ট্যাব্লয়েট পত্রিকা এখানে আছে অবশ্য, তবে সস্তা চুটকি জিনিষের প্রতি কোনদিনই তেমন আকৃষ্ট বোধ করিনি আমি। বিড়ম্বনা কি জানেন? বিড়ম্বনা হল যে শেষ পর্যন্ত হয়ত ‘সান’ই টিকে থাকবে, ‘সিটিজেন’ থাকবে না। সস্তা, সেজন্যে না, চুটকি সে জন্যে। জাঙ্ক ফুড আর কালচারের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট আজকের প্রজন্ম। তেমনি পত্রপত্রিকাও সম্ভবতঃ জনপ্রিয় থেকে যাবে তাদের কাছে। যৌনপত্রিকাগুলোর ব্যবসাতে মন্দা পড়বে কখনো? পড়বে না। কিম্বা খেলার পত্রিকা? ভুল বুঝবেন না আমাকে। খেলা জিনিষটাকে খেলো করছিনা আমি, ‘টাইম’ পত্রিকার পাশে ‘ষ্পোর্টর্স ইলাষ্ট্রেটেড’কে দাঁড় করিয়ে মেলাবার চেষ্টা করছি, আর বিগতদিনের বৃদ্ধের মত দীর্ঘশ্বাস ফেলছি।

‘পড়শী’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘অনলাইনে’ বের করবে পত্রিকা। কিছুদিন আগে ‘দেশে বিদেশে’ থেকে খবর এল তারাও অনলাইনের কথা ভাবছে। ‘অনলাইন’ শব্দটি আপনি ডিকশনারিতে পাবেন না। অক্সফোর্ডের সর্বাধুনিক সংস্করণে থাকলে থাকতেও পারে। গত পাঁচশ বছর ধরে রাজত্ব করে এল মুদ্রিত অক্ষর। সেই রাজদন্ড এবার চলে যাচ্ছে অনলাইনের হাতে। আজকে এমন কাজ নেই সংসারে যা আপনি অনলাইনে করতে পারবেন না। ব্যাংকে যাবেন বিল শোধ করতে? তার জন্যে ব্যাংকে যেতে হবে কেন? বোতাম টিপুন। ইনকাম ট্যাক্সের রির্টান নিয়ে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? কেন, অনলাইনে গেলেই তো ল্যাঠা চুকে গেল। দেশে যেতে মন চাইছে? সস্তা টিকিট খুঁজছেন? অনলাইনে যান। মেয়ের বিয়ের জন্য হল ভাড়া করতে হবে? তার জন্যে আপনার হলে যাওয়ার দরকার হবে না। বোতাম টিপলেই পর্দায় দেখতে পাবেন হলের ভেতর-বাইরের ছবিসহ পুংখানুপুংখ খবরাদি। জামাইকাতে যাবার ইচ্ছে হয়েছে ছুটি কাটাতে? বোতাম টিপুন। গোটা জামাইকা চলে আসবে আপনার বসার ঘরে। কিছুদিন আগে ক্যালির্ফোনিয়াতে গিয়েছিলাম। ছেলের বাড়িতে আরাম করে থাকলাম দু’মাস। একদিন বৌমাকে বললাম, তোমরা যেদিন বাজারে যাবে আমাকে নিয়ে যেয়ো। ও কাঁচুমাচু করে বলল, আমরা সাধারণত বাজারে যাইনা। অনলাইনে অর্ডার দিই। বাজার চলে আসে বাড়িতে। তাইতো। ভুলেই গিয়েছিলাম। আজকাল বাজার করার জন্য বাজারে যায় শুধু আমার মত বোকারা। মনে পড়ল বাবার কথা। রোজ সকালবেলা একটা বেতের ঝুড়ি হাতে করে বাজারে যেতেন। ফিরতেন একগাদা সদাই নিয়ে। মাঝেমাঝে দেখতাম জিয়ল মাছগুলো লাফালাফি করছে তাতে। আমরা ভাই বোনেরা দারুন  মজা পেতাম সেটা দেখতে। সাথে সাথে একটু ভয়ও করত। আজকালকার ছেলেমেয়েরা কি জিয়ল মাছ কাকে বলে জানে? কোনদিন দেখেছে তাদের বাবামাকে বাজারে যেতে?

জানি, সমস্যাটি আধুনিক জগতে না, আমার নিজেরই মধ্যে। তাই অনলাইনে লিখবার কথা শুনে আমি উত্তেজিত হতে পারছিনা। আমার জীবনে অনলাইন এখনো এক অচেনা আগন্তুক। এক অনাহুত অতিথি যে আমার পথ আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। অনলাইনে আমি একেবারে লিখিনি তা নয়। আমার নিজের লাইন, গণিত, তাতে তো নিয়মিতই লিখতে হয়। বিদেশী জার্নালগুলোর বেশিরভাগই এখন অনলাইন সংস্করণ বের করছে। প্রথমে পেপার পাঠাতে হয় অনলাইনে, তার রিপোর্ট আসে অনলাইনে, প্রুফ আসে অনলাইনে, ভুলত্রুটির সংশোধন হয় অনলাইনে, শেষে সেটা প্রকাশ হয় অনলাইনে। আগে আমার পেপারের ধরণ ছিল এরকমঃ M. Hoare and M. Rahman, Cumulative Bernoulli Trials and Krawlchouk Processes, Stochastic Process. Appl. 16 (1983), 113-139; সেই একই বিষয়ের ওপর নতুন যে পেপারটি লিখেছি তার বিবরণ হল:  M. Hoare and M. Rahman, A probabilistic origin for a new class of bivariate polynomials, SIGMA 4(2008), 089, arXiv: 0812.3879. আরেকটি সাম্প্রতিক পেপারের রেফারেন্স আরো শোচনীয়:   http://dx.doi.org/10.1016/J.jat.2008.09.008  এবার বুঝুন! কিন্তু আমাকে মানিয়ে নিতে হয়েছে। বিজ্ঞান, গণিত, মৌলিক গবেষণা, সবখানে আজকাল সংকট, নিদারুন সংকট। প্রধানতঃ সেটা আর্থিক, যদিও তারা স্বীকার করবে না সহজে। বলবে, যুগধর্মিতা, দক্ষতাবর্ধন, দ্রুতপ্রকাশ, দ্রুতপ্রচারণা ইত্যাদি। বাংলাতে বোধ হয় সংকটটা একেবারেই সাদামাটা আর্থিক, দক্ষতা বা আধুনিকতা নয়।

অংকের জগতের সাথে তাল রেখে চলতে বাধ্য হয়েছি বলে বাংলার সঙ্গে আমি পারব কিনা জানিনা। মন সায় দিচ্ছে না। বেশ কটা তো লিখলাম এখানে ওখানে। ঢাকার মারুফ রায়হান সম্পাদিত ‘বাংলামাটিতে’, নিউ জার্সির সমীর ভট্টাচার্যের ‘পরবাস’এ। কেন জানি তৃপ্তি হল না তাতে। কোথায় যেন একটা অভাব থেকে গেল। ওরা যখন পত্রিকার লিংকগুলো পাঠাতো আমার কাছে, আমি একরকম নিরুদ্যম ভাব নিয়ে খুলতাম সেগুলো, প্রথম পৃষ্ঠার চটকদার বিজ্ঞাপনগুলোতে চোখ বুলাতাম, কিন্তু আসল লেখাগুলোতে আঙ্গুল টিপে ঢোকার উৎসাহ পেতাম না। উত্তর আমেরিকার আরো দুয়েকটা অনলাইন পত্রিকা আসে আমার কাছে। তার অধিকাংশই আমি ডিলিট করে দিই না পড়েই। আমার কি মনে হয় জানেন? আমার লেখাও মানুষ এমনি করে ডিলিট করে দেবে পড়ার আগে। এমনিতেই তো আমার পাঠক সংখ্যা অন্যান্য লেখকদের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। দেশে কেউই না, বিদেশেও গুটিকয়েক শহরে গুটিকয়েক লোক হয়ত আগ্রহের সাথেই পড়ে আমার লেখা। কিন্তু তারা কারা? আমি যতদুর জানি, বেশিরভাগই দেশ থেকে আসা মায়েরা, শাশুড়িরা, যারা পুরনো দিনের মানুষ। তারা পড়ে কারণ তাদের সময় কাটে না, তাদের কিছু করার নেই, এবং আমার লেখা কখনো কখনো তাদের নিজেদের অতীত জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। বড় কথা তাদের হাতের কাছে রয়েছে পুরো কাগজটি- যখন ইচ্ছে তখনই খুলে দেখতে পারেন, এবং যেখানে ইচ্ছে সেখানে। এই মা-শাশুড়িরা সাধারণত কম্পিউটারের ধারে কাছে যেতে চান না। কিছুটা নিজের ভয়ে, কিছুটা ছেলেমেয়ে নাতি নাতনিদের ভয়ে। আমার লেখা অনলাইনে চলে গেলে আমি কেমন করে তাঁদের কাছে যেতে পারব। কে আমাকে নিয়ে যাবে তাঁদের কাছে।

আমি বইপত্র পড়ি কিভাবে জানেন? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। পত্রিকা পড়ি শুধু যেগুলো প্রথম ও শেষের পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা হয় সেগুলো না, ছোট অক্ষরের আপাততুচ্ছ খবরগুলোও। নানাধরনের লেখা থাকে পত্রিকায়- দেশবিদেশের বিবিধ খবরের বাইরেও থাকে মতামত, বিশ্লেষণ, বির্তক, গবেষণাজাত নিবন্ধ। হয়ত নাম-না-জানা লেখক, কিন্তু লেখার মান ভাল। অনেক নতুন বিষয় জানতে পারি। ভেতরের পাতার ছোট খবরগুলোতে অনেক কথা, ছোট ছোট গল্প থাকে, মানবিক গল্প। মানুষের হীনতার গল্প, মানুষের মহত্বের গল্প, ত্যাগের গল্প, ভোগের গল্প, বীরত্বের গল্প। এগুলো পড়ি আমি পত্রিকার পাতা উল্টাতে উল্টাতে, চা খেতে খেতে, নেপথ্যে রবীন্দ্রনাথের গান বা মোৎসার্টের সোনাটা শুনতে শুনতে। বই পড়ি আমি বারান্দার আরামচেয়ারে বসে, পার্কের বেঞ্চিতে, এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে, প্লেনে, বাসে, জাহাজে, বা বাথরুমের টয়লেটে বসে। বিছানার নরম কম্বলের নিচে। আজকের অনলাইন আমাকে সে-সুখটা দিতে পারছে না। আমি কম্পিউটার বগলে নিয়ে কম্বলের নিচে যেতে পারছি না। বালিশের নিচে তাকে গুঁজে রাখতে পারছিনা যখন আর চোখ খুলে রাখতে পারব না ঘুমের ঘোরে। বই আর পত্রিকা আমার পাঠ্যবস্তু শুধু না, তারা আমার সুহৃদ বন্ধু। আমার সখা। আমরা দুয়ে মিলে এমন একটা নিবিড়তা গড়ে তুলতে পারি যেখানে আমরা ছাড়া সংসারে আর কোনকিছুরই অস্তিত্ত্ব অনুভব করতে পারি না। সেই নিবিড়তাটি কি যন্ত্রের ভেতরে পাব?

অটোয়া, কানাডা

মার্চ ৭, ২০০৯।

 

মন্তব্য:
erewre   May 27, 2016
Ralph Lauren offers tasteful customers the very best in men’s and women’s apparel and accessories, children’s wear Ralph Lauren Polo , home furnishings and fine fragrances. Whether I’m looking for sporty weekend wear, a classic suit, or a timeless bag, I can find it in their exclusive collections. What I love most though is that Ralph Lauren MEN exceptional service lets me shop at home without sacrificing the special touches that make a wardrobe extraordinary. Here’s what makes Ralph Lauren so exceptional: Personal Shopping From the Comfort of Home: Ralph Lauren’s customer service is Ralph Lauren WOMEN on call by phone or email to assist you in selecting just the right thing for yourself or as a gift. Whether you have questions about fit, fabric or just want to explore all your choices with their knowledgeable staff, Ralph Lauren’s personal Ralph Lauren CHILDREN will help you make the perfect selection. The Perfect Fit, For Free: Build a wardrobe to last a lifetime with made-to-measure menswear, complimentary alterations on many suits and Collection apparel Ralph Lauren ACCESSORIES , and the personalized color and style of create-your-own Collection monograms.
saud chowdhury   April 21, 2009
Chacha - likhe jaan. Ekhono aamra boi-er pata ultatey bhalobashee!
Wahed Hossaini   15-04-2009
Although I cannot express the feelings, not in English, not in Bangla but I understand your feelings. You and me already are fossils of the past. Believe me or not, I saw the other day a patient visiting a doctor's office had his lap top opened. I too enjoy reading the hard copy. I frankly admit, recently I have heard more books in my car than actually reading them. When I wanted to qoute a line or expression, I could not find it. Let me share with you one of my recent experience. I went to a village in Midnapur, West Bengal, my grand parents home. Reasonably well dressed 70 year old me, living in very comfortable house in the current day's wealthiest nation on earth, stood in front of ruins of breaks and iron beam which was built in early 1900. No glory at all. But did not have it once, during its time? Let us give the best we can, and then stand aside giving room to the new generation. They will greatfully acknowledge.
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.