Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাম্প্রতিক  ||  ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা আষাঢ় ১৪১৭ •  10th  year  3rd  issue  Jun - Jul  2010 পুরনো সংখ্যা
কোথাও একটা বড় ভুল হচ্ছে... Download PDF version
 

সাম্প্রতিক

কোথাও একটা বড় ভুল হচ্ছে...

শুভ কিবরিয়া

১৯.১ : সকল প্রকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রবাহের চলাচল সুনিশ্চিত ও সংরক্ষণ করা হবে।

[নির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ]

এবারের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে,যাকে দিনবদলের সনদ হিসেবে তারা অভিহিত করে,সেই সনদের ১৯ অনুচ্ছেদে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে এই অঙ্গীকার করা হয়েছিল।

সরকারের বয়স এখন মাত্র দেড় বছর। ইতোমধ্যে প্রকাশিতব্য যমুনা টিভির পরীক্ষামূলক সম্প্রচার তারা বন্ধ করেছে। চালু টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করেছে। প্রিন্ট মিডিয়ার ওপর সম্প্রতি চড়াও হলো তারা দৈনিক আমার দেশ বন্ধ করে। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ফেসবুক বন্ধ হয়েছে বাংলাদেশে।

অতীতে শেখ হাসিনা তার শাসনামলে সাপ্তাহিক বিচিত্রা,দৈনিক বাংলা এবং টাইমস সংবাদপত্র বন্ধ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে চারটি নির্দিষ্ট সংবাদপত্র ছাড়া বাকি সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করা হয়,তৎকালীন আওয়ামী শাসনামলে।

দেশের সবচাইতে ঐতিহ্যবাহী,পুরনো গণসংগঠন,তৃণমূলে যাদের শেকড় ছড়ানো সেই জনসংগঠন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সংবাদমাধ্যমের ওপর চড়াও হওয়ার পুরনো রেকর্ড আবার বাজাতে শুরু করেছে।

কিন্তু কেন?

এই প্রশ্নটির উত্তরের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের জাতিরাষ্ট্রের গঠনের সবলতা ও দুর্বলতা লক্ষণীয়।

২.

গণমাধ্যমের অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত হলে কখনো কখনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধতা শুনতে হয়। কখনো কখনো তার শক্তি বাড়লে নিজের সহিষ্ণুতা বাড়াতে হয়। নইলে বিবাদ বিসম্বাদ বেড়ে যায়। ধরা যাক দেশে একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম থাকল। এমনই তার শক্তি যে ইচ্ছে করলেই বা চাইলেই সরকার কিংবা তার আজ্ঞাবহ কোনো উজির,নাজির,আমাত্যবর্গ গণমাধ্যমের প্রকাশনা বন্ধ করতে পারবে না।

ধরা যাক,দেশে এমন একটি বিচার বিভাগ গড়ে উঠল যে সত্যি সত্যিই স্বাধীন। সরকারের যে কোনো অন্যায়কে আইনি ভাষায় সে রুখে দেবে।

কিংবা ধরা যাক,এমন একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন থাকল,কোনো প্রভাব খাটিয়েই তাকে দমানো যাবে না।

এ রকম স্বাধীন,সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন গণমাধ্যম,নির্বাচন কমিশন এবং বিচার বিভাগ থাকলে,সরকার কি তার স্বাভাবিক কাজ চালাতে পারবে? নাকি সরকারের কাজে এসব প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপ বাড়বে? সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে?

তৃতীয় বিশ্বের দুর্বল দেশগুলোর সরকার এই ভয়টাই পায়। ভয় পায় কেননা এখানে সরকারগুলো নিজেরাও দুর্বল। দুর্বল বলে শক্তিমান কাউকে দেখলেই প্রতিপক্ষ ভাবে। অন্যদের শক্তিমত্তায় তার ভিত কেঁপে ওঠে। সে অসহায় বোধ করে। উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। কাকে কোন সময়,কোন জায়গায় আঘাত করতে হয় তা বুঝতে পারে না। এ সময় তার পরামর্শক হিসেবে আসে অরাজনৈতিক শক্তি। তারাই তথ্য জোগাড় করে,উত্তেজনায় শক্তি যোগায় এবং আক্রমণ করতে সাহায্য করে। ফলে,সরকারের রাজনৈতিক শক্তিমত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে,তার যুদ্ধংদেহী আক্রমণের চেহারা বের হয়ে পড়ে। জনগণের ওপর নির্যাতন বাড়ে। এক সময় এই উদ্যত,আক্রমণমুখী চেহারার কার্যত দুর্বল সরকার বেসামাল হয়ে পড়ে। ফলে যে জনগণ বিপুল ভরসায় তাদের সমর্থন জানিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল,তারাই বিরাগভাজন হয়ে পড়ে।

ফলে,শক্তিমান সরকারের অস্তিত্ব খর্ব হতে থাকে।

সুতরাং,তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর রাজনৈতিক সরকারে অরাজনৈতিক পক্ষের কর্তৃত্ব বাড়তে থাকে।

৩.

এই সব ঘটনা হরহামেশাই ঘটে দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তানে,বাংলাদেশে। ব্যতিক্রম কেবল ভারত। কেননা সেখানে গণমাধ্যম,বিচার বিভাগ,নির্বাচন কমিশন এতটাই স্বাধীন যে এখানে সরকারের হস্তক্ষেপের কোনো ক্ষমতা নাই। সুযোগ নাই। ফলে সেখানে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর নিজেরও শক্তি বাড়ে। সরকারগুলোর শক্তি বাড়ে বলে,জনগণ স্বাধীনভাবেই মতামত দিতে পারে। সরকারগুলো জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিতে থাকে সর্বক্ষণ।

বাংলাদেশ এই ধারায় যেতে চায়, এই আশা আমাদের এখানে সর্বক্ষণ থাকলেও এই আশা বাস্তবায়নের জন্য যে রাজনৈতিক দলগুলো গড়ে ওঠা দরকার তার অভাব রয়েছে। এই অভাবের মধ্যেও জনগণের আশা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের সেই লক্ষ্য,অনর্জিত স্বপ্ন পূরণ করবে। কেননা এই সংগঠনটির জন্ম জনঅধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। এর বেড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এর গতিবিধি নানা জনগণতান্ত্রিক লড়াইয়ের গতিধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ,সরকার হিসেবে আওয়ামী লীগের ভুলত্রুটি মানেই জনগণের প্রত্যাশার বেলুন চুপসে আসা!

বর্তমান মেয়াদে এই দলটির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পেছনেও জনগণের এই প্রত্যাশা কাজ করেছে। জনগণ চেয়েছে গণতান্ত্রিক ধারাটা দাঁড়াক। প্রতিষ্ঠানগুলো সচল থাকুক। সরকার শক্তিশালী হয়ে উঠুক।

কিন্তু মাত্র দেড় বছর বয়সেই এই সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তিকে শারীরিক শক্তি ভাবতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টাগুলোতে,ফাঁদগুলোতে পা দিতে শুরু করেছে।

ফেসবুক বন্ধ,টিভি চ্যানেল বন্ধ,প্রিন্ট মিডিয়া বন্ধের মধ্য দিয়ে সরকার সেই বহুচর্চিত অতীত ভুলের পথেই পা রেখেছে।

এ রকম ভুল অতীতে পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খান করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার করেছে। সামরিক শাসকেরা করেছে। অগণতান্ত্রিক সরকারগুলো করেছে। বর্তমান সরকারও করছে। যদি সরকার এই ভুলগুলো থেকে সরে না আসে,তবে অতীতের রেকর্ড অনুসারে এই কার্যক্রমের নির্ধারিত ফলাফল পাওয়াটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

৪.

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তার মাথায় বর্তেছে। অনেক চ্যালেঞ্জ তার আছে। সুতরাং,তার ব্যর্থতা দেশের অনেক প্রত্যাশার মৃত্যু ঘটাবে। জাতিরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবার সকল সুযোগের অগ্রসর যাত্রাপথকে বিলম্বিত করবে। এখন দরকার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। সরকার যদি রাজনীতিকে অবহেলা করে উজির-নাজির-গুপ্তচরের তথ্যে-উপাত্তে বিশ্বাস করে এগুতে থাকে তবে তার ভুল বাড়বে। তাকে আরো অনেক আত্মধ্বংসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পর পর ফেসবুক,যমুনা টিভি, চ্যানেল ওয়ান,আমার দেশ বন্ধ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্যমন্ত্রীকে প্রায় জোর করেই অবিশ্বাসী কণ্ঠেই সংসদে বলতে হবে,বর্তমানে পৃথিবীর কোথাও প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া বাংলাদেশের মতো এত স্বাধীন নয়।

যদিও জনগণ দেখছে অন্যকিছু। তবুও এই মিথ্যাচার বড় গলায় চালাতে হবে।

এখন সরকারের দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের খেয়াল দরকার এই বড় ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে। অন্ধ হয়ে থাকলে প্রলয় বন্ধ হবে না। বরং ভেতরের দুর্বলতা বাড়বে। ক্ষতি হবে জাতিরাষ্ট্র গঠনের সুষ্ঠু অগ্রসর হওয়ার পথ।

লেখাটি শেষ করতে চাই জাতিরাষ্ট্র নিয়ে ভাবুক মনস্বী চিন্তাশীল লেখক আহমদ ছফা-এর একটি লেখার কিছু অংশ দিয়ে

যে দেশটির শতকরা আশি ভাগ মানুষ মুসলমান এবং যে দেশের মুসলমানরা অধিকাংশই ধর্মপ্রাণ ও মধ্যযুগীয় চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন,সেই বিশাল জনগোষ্ঠীকে একটি সেক্যুলার সমাজ গঠন করার দিকে আকর্ষণ করতে গেলে যে ধরনের প্রজ্ঞা এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের প্রয়োজন,দুর্ভাগ্যবশত আমাদের রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের ভেতর সে রকম মেধা এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলীসম্পন্ন একজন মানুষের দেখাও পাওয়া যাচ্ছে না। এখানেই আমাদের আসল দুঃখ।

[বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র ॥ আমহদ ছফা]

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.