Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  নিয়মিত কলাম  ||  ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা আষাঢ় ১৪১৭ •  10th  year  3rd  issue  Jun - Jul  2010 পুরনো সংখ্যা
রিক্যালকুলেটিং Download PDF version
 

 নিয়মিত কলাম

 

ওয়াশিংটনের জানালা

 

রিক্যালকুলেটিং

ওয়াহেদ হোসেনী

 

   ভরা দুপুর। লাঞ্চ হোয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। দোল চেয়ারে বসে বসে দোল খাচ্ছি। মাঝে মাঝে বাইরে কড়া রোদের দিকে তাকিয়ে ভাবছি, বাপরে বাপ, কি তাপ। তাপ অবশ্য তেমন কিছু নয়, ঘড়ি, ক্যালেন্ডার ও তাপমাত্রা যন্ত্রে দেখাচ্ছে মাত্র ৯৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট! ভাবতে চেষ্টা করছি, রহস্যঘন মহান স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ কত না বিচিত্র। যা ঘটবে না বলে মনে হয়, তাই ঘটায়। অভাবনীয়কে কোরে তোলে অতি স্বাভাবিক, নৈমিত্তিক ঘটনা। সেই অভাবনিয় ঘটনাকে কপচিয়ে কপচিয়ে দলে মলে থেতলে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বলিনি? বলিনি? এটা হবেই। ভাবছিলাম আল গোর আর টিপার গোরের কথা। রাজনৈতিক দম্পতি হিসাবে এদের চাইতে আদর্শ দম্পতি আর হয় না। হাই স্কুলের প্রেম থেকে প্রেম, প্রেম থেকে পরিণয়, উত্তাল পাথাল পথ বেয়ে বেয়ে বিশ্বজয়। আর এখন যখন যুগল প্রেমের স্বর্ণযুগের দুয়ারে দাঁড়িয়ে তখন কিনা একলা চলরে? রাজনৈতিক রঙমঞ্চে তাদের প্রধান অভিনেতা অভিনেত্রী হিসাবে উপস্থাপনাকারী বীল ক্লিন্টনের এত রাজনৈতিক মেধা স্বত্তেও তাঁর নারী ঘটিত চারিত্রিক কালোমেঘ তাকে কোন দিন ছেড়ে যায়নি। নারী ঘটিত ঘটনায় কতনা উজ্জ্বল তারকা, কত বৃদ্ধ, বিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে টাইডেল বেসিনের জলে তলিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু আল গোর সে পাঁকে পা দেবেন? কি জানি বাপু, কোন ঘন কালো ক্লযেটএ কি লুকিয়ে আছে? উর্দু ভাষার কাবাব মে হাড্ডীর মত, দুই ব্যক্তির মাঝে অবাঞ্ছিত তৃতীয় ব্যক্তির সন্ধানে মরিয়া হোয়ে উঠলো সবাই। কিন্তু না, এতদিন পরেও কোন কালো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। যাযাবরের ভাষায়, ইন্সুরেন্স এজেন্ট, কাশীর পান্ডার চাইতেও নাছোড় বান্দা সাংবাদিকরা যখন একলা চলরের পেছনে কোন দুর্গন্ধও খুঁজে পেলেন না তখন ভাবনার কথাই বৈকি।

   রহস্যঘন স্রষ্টা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এমনি বিচিত্র করেই সৃষ্টি করেছেন, এই সব কথা ভাবছি তখন টেলিফোনটা বেজে উঠলো সাধারণত এই সময়টা আমার ভাতিজী, লিলি, কাজের জায়গা থেকে ফোন করে আমি রেস্ট করছি কি না জেনে নিয়ে, রেস্ট করার পরামর্শ দিয়ে টেলিফোন রেখে দেয়। TV ID-তে দেখি, না ভাতিজী লিলি নয়, পোটম্যাকের মিসেস আসফা হোসেন। ওয়াশিংটন অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি মোশাররাফ সাহেবের পত্নী, আসফা, সামাজিক স্কুপ সংবাদের জন্য আমার নির্ভর যোগ্য সূত্র। ফোনটা তুলে হ্যালো বলতেই বুঝলাম, সংবাদ যাই হোক, সেটা দুঃখের মোড়কে মোড়া। বললেন, এই মাত্র শুনলাম পপুর বাবা ইন্তেকাল করেছেন। ৮৪ বছর বয়স্ক আবুল বাশার মঝহারুল হক সাহেব তিরোধান অপ্রত্যাশিত না হলেও দুঃখের ছায়ায় মন ভরে গেল। ছোটখাটো সাধারণ বাঙ্গালী চেহারা। গায়ের রঙ সাহেবের গায়ের রংকে টেক্কা দেয়। ঢাকার খুলনা হাউসের মঝহারুল হক সাহেব আমেরিকায় ব্যবসা করে বিত্ত অর্জন করেছেন প্রচুর। আমেরিকায় ভাই বেরাদার, ছেলে মেয়ে নাতী নাতনীর বিরাট পরিবার। পরে জেনেছি, তাঁর এক ছোট ভাই, আমেরিকায় বসবাসাকারী বাবর, ৫০ দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিল। এখন একজন বিত্তবান ব্যবসায়ী ও মোসাল্লী।  মঝহারুল হক সাহেব সে কারণে আমার প্রিয় হোয়ে ওঠেননি, প্রিয় হোয়েছিলেন অন্য আর এক কারণে। বিরাট বিরাট কবিতা তাঁর মুখস্ত ছিল, গড়গড় করে আবৃত্তি করে যেতে পারতেন। পৃথিবী, দুই বিঘা জমি, কবর, বিদ্রোহী, হিন্দু মুসলমান যুদ্ধ, বই না দেখে গড়গড় করে আবৃত্তি করে যেতেন। বছর দুয়েক আগে স্ত্রী সুলতানা বেগমের তিরোধান থেকে বোঝা যচ্ছিল, মাঝহার সাহেবেরও সময় বেশী নেই। প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। হাসপাতাল আর বাড়ী। শেষে একদিন তাঁকে রিহ্যাবে নিয়ে যাওয়া হোল। সেখানে একদিন গেছি তাঁকে দেখতে। শুনেছিলাম তাঁর নাকি স্মৃতি ভ্রম হচ্ছে, পরিবারের দু একজনকে ছাড়া মানুষজন চিনতে অসুবিধা হচ্ছে। আমার ভাগ্য, চিনলেন আমাকে। অনেক কথা বললেন। কিছু অসামঞ্জস্যকর কথাও বলেছিলেন।  মেয়ে জামাই একটু অস্বস্তি বোধ করছিলেন। তারা বললেন, একে চিনতে পারছেন তো? হ্যাঁ হ্যাঁ, ওতো হাসানের (ঢাকার শিল্পী সৈয়দ হাসান ইমাম) ভাগনা। বললেন, কাউকে সাহায্য করতে হোলে বলবে ব্যবসা কর। কাঁঠাল গাছ লাগাও। দেখবে কবছর পর কত কাঁঠাল বিক্রী করতে পারবে।  কবিতাও শুনিয়ে দিলেন কয়েক ছড়া। এবার বোঝা গেল লাইন বাদ যাচ্ছে, মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছেন। বললাম, ভালো হোয়ে উঠুন, আমার বাড়ীতে পার্টি করবো, কবিতা পড়া হবে। চোখ উজ্জ্বল হোয়ে উঠলো হক সাহেবের। নিশ্চয় যাব, নিশ্চয় যাব। আমি কবিতা আবৃত্তি করবো। সেদিন রাতে ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে বাড়ী ফিরলাম, হক সাহেবের মঙ্গল কামনা করে করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করলাম। আর দেখা হয়নি হক সাহেবের সঙ্গে।  শুনেছি তিনি নাকি কয়েকবারই তাঁর মেয়েদের বলেছিলেন, আমার স্যুট ধুইয়ে আনিস। হোসেনী বলেছে, ওর বাড়ীতে পার্টি করবে, আমি কবিতা পড়বো। ওনার আত্মীয়রা জানতো, আমি জানতাম, উনি আর কোনদিন আসতে পারবেন না। আসফা সেটাই সত্যায়িত করলেন। চলে গেলেন দুবছর আগে ওপারে চলে যাওয়া প্রিয় স্ত্রী সুলাতানা বেগমের কাছে। শুনেছি, স্ত্রীর মৃত্যুর অনেক পরেও মেয়েদের বলতেন, কইরে তোর মা কোথায় গেল, ডাক না ওকে। চলে গেলেন, ওপর তলার পার্টিতে কবিতা পড়তে হবে তাকে।

   পরের দিন শুক্রবার।  ইসলামিক সোসাইটি অব বল্টিমোর মসজিদে জুম্মার নামজের পর জানাজা। তার পর স্ত্রী সুলতানা বেগমের পাশেই কবর দেওয়া হবে। ভার্জিনিয়ার স্প্রীংফিল্ড থেকে অনেকটা পথ। ডঃ সুলতান আহমদ ও তার স্ত্রী সুফিয়া ভাবীকে বললাম, চলেন এক সঙ্গে যাই। আমার প্রতিবেশী ডঃ বসিরের স্ত্রী পারভীন আব্দার করলো, আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলেন, প্লিজ। ওদিকে মিসেস জাহানারা আলী সুলতান ভাইকে বললেন, আমিও যাব আপনাদের সঙ্গে। সুলতান ভাইকে বললাম, আমার লিংকন সাহেব একটু অসুস্থ। মাঝে মাঝে একটা সিলিন্ডার মিস ফায়ার করছে। আপনার লেক্সাস বিবীকে নিয়েই যাই।  সানন্দে ডঃ সুলতান লেক্সাস বিবীর লাগাম ধরে বললেন, একটা লেক্সাস কিনে ফেলুন। বললাম, এহসানের কথা মত মনতো কত কিছু খাইবার চায়, কিন্তু মিশু (আমার স্ত্রী) বলে সুলতান ভাইয়ের সঙ্গে তোমার অনেক মিল, শুধু দুটো জিনিষ ছাড়া। ও না বললে কি হবে, আমি বুঝি। ডঃ সুলতান বিদ্যান, আমি মুর্খ, সুলতান ভাই বিত্তবান আমি ফকির। লেক্সাস কিনবো কি করে? বললাম তবে আমার জি পি এস-টা নেব। আমারটা নতুন মডেলের, অধিকতর নির্ভরযোগ্য।  সুলতান ভাই বললেন, আমারটা পুরন মডেল বটে, মাঝে মধ্যে এদিক ওদিক করলেও মোটামুটি নির্ভরযোগ্য। দুটোই নেওয়া যাক। দেখি কোথায় নিয়ে যায়।

 

   দুজনার দুটো জি পি এস, একই GARMIN কোম্পানীর তৈরী। ওনার মডেলটা StreetPilot 2720, আর আমারটা Nuvi. সুলতান ভাইয়েরটা একটু স্বাস্থ্যবতী, আমারটা ক্ষীনাঙ্গী ফ্লাট স্কৃন। সুলতান ভাইয়েরটার মহিলা কন্ঠ একটু ভারিক্কী, মোটা ও প্রভুত্ত ব্যাঞ্জক। আমারটার মহিলা কন্ঠ চিকন, নবীনার মত, ইংরেজীতে বললে বলা যায় sexy voice. আমারটা কম ভোল্টেজেও চলে, সুলতান ভাইয়েরটা পুরা বারো ভোল্ট না হলে বেকে বসে, সাড়া দেয় না।

   দুই জি পি এস-এ গন্তব্য স্থল, ইসলামিক সোসাইটি অব বল্টিমোর- ৬৬৩১ জনিকেক রোড ঢুকিয়ে দিলাম। বেল্টওয়ে দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু। নবীনা ও ভারী কন্ঠ ধারী দুই মহিলাই আমাদের সোজা চলতে বললেন। মাত্র মাইল দুয়েক যাওয়ার পর, নবীনা বলে উঠলো, সামনে আসছে কোলসভিল রোড, বায়ে দিয়ে নেমে গিয়ে কোলসভিল দিয়ে সোজা চলতে থাকবে। গুরু গম্ভীর কন্ঠ তাকে গ্রাহ্যই করলো না, আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে চললো সামনের দিকে। কোলসভিলে না নেমে সামনে এগিয়ে যেতেই নবীনা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, রিক্যালকুলাটিং  কয়েক মুহুর্তের মধ্যে বলে উঠলো, সামনে ইউনিভার্সিটি বুলেভার্ড, ডান দিক দিয়ে নেমে গিয়ে বায়ে ঘেসে এগিয়ে যেও।  গম্ভীর কন্ঠী যেন এরই অপেক্ষায় ছিলেন। বলে উঠলেন, এক মাইল গিয়ে সামনে ডাইনে পড়বে নাইন্টিফাইভ নর্থ। ঐ পথ ধরে এগিয়ে যাও। একজন যদি বলে জেসাপ দিয়ে যাও, সঙ্গে সঙ্গে অন্যজন রিক্যালকুলেট করে কলম্বিয়া পাইক দিয়ে যেতে বলে। কাজিয়া তাদের চরমে উঠলো যখন বল্টিমোর বেল্টওয়েতে এসে পৌঁছালাম। একজনে বলে পুবে যাও, অন্যাজন বলে পশ্চিমে। লেক্সাসের লাগাম সুলতান ভাইয়ের হাতে। উনি গম্ভীর কন্ঠীর কথা মত পুবে চললেন। নবীনা তখন বসে গেল রিক্যালকুলেটিং করতে। আমরা এতক্ষনে, আমাদের দিশারীদের মতভেদে, অস্থির হোয়ে উঠেছি। একজন বলছে এ্যডমস দিয়ে যাও অন্যজন বলছে এপোলো দিয়ে যাও। এক সময় শুনি মহিলা কন্ঠী দুই যন্ত্র একসঙ্গে বলে উঠলো, ২৫ ফিট সামনে বায়ে তোমার গন্তব্য স্থল। সুলতান ভাই আর আমি মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। তাইতো, ইসলামিক সোসাইটি অব বল্টিমোরের পার্কিং লটে এসে গেছি।

জুম্মার নামাজের বেশ আগেই এসে পোউছে গেছি। গাড়ী থেকে নামতে নামতে ভাবছি আর এক কথা। এক দেশ, দুই মহান নেতার দুই উত্তরাধিকারিনী রিক্যালকুলেট করেই চলেছেন। শেষ পর্য্যন্ত গন্ত্যব্যে পৌঁছে দিতে পারবেনতো?     

ওয়াশিংটন ডিসি

জুন ৬, ২০১০।

ElderHossaini@gmail.com   
 

মন্তব্য:
রত্না সরকার   July 8, 2010
চমৎকার, ওয়াহিদ ভাই ! পড়ে খুবি আনন্দ পেলাম। এবার একটা টেলি-মার্কেটারদের বিষয় লিখুন। নানান ত আইন হয়েছে তবুও কেনো চলছে? আ্মার সাথে প্রায় হাতাহাতি হল দুদিন আগে।
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.