Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ১০ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৭ •  10th  year  2nd  issue  May - Jun  2010 পুরনো সংখ্যা
আমার মায়ের বাঁধন Download PDF version
 

সাহিত্য

 

আমার মায়ের বাঁধন

আশরাফ আহমেদ

বাংলায় নতুন বছর শুরু হয় গ্রীষ্মকাল দিয়ে। এ বছরের প্রথম থেকেই দেশে প্রচন্ড গরমের খবর পাচ্ছিলাম প্রতিদিন। কোথায় পড়লাম বিগত তেতাল্লিশ বছরের মাঝে এত গরম আর পড়ে নাই। হিসাবে সেসময়ে আমি মা-বাবার স্নেহছায়াতেই বড় হচ্ছিলাম। বহুদিন বিদেশে বাস করে শততাপ নিয়ন্ত্রিত জীবনে অভ্যস্ত আমি গ্রীষ্মের দাবদহের অসহনীয় চিত্রটা কল্পনা করতে চেষ্টা করি। দেখতে পাই তৃষ্ণায় মুরগিগুলো মুখ খোলা রেখে উদ্ভ্রান্তের মত হাঁটছে। কুঁয়ার পাশে জমে থাকা খানিকটা পানিতে একটি দাঁড় কাক একবার ঠোঁট ডুবিয়ে আবার ঘাড় কাত করে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। রোদ মাথায় স্কুল থেকে ফিরে আম্মার কথামত একটু বিশ্রাম নিয়ে চলে যেতাম পুকুরে। কুড়িয়ে পাওয়া কোন কদম ফুল বা ছোট জাম্বুরা দূরে ছুড়ে মেরে আবার সাঁতরে গিয়ে নিয়ে আসতাম। রাতে বসার ঘরের আষ্চর্য রকম ঠান্ডা, মসৃণ লাল মেঝেতে শুধু বালিশ নিয়ে শুতে ভালবাসতাম। দরোজা ও জানালার ফ্রেমের উপরের রঙ্গিন কাঁচ দিয়ে আসা বিভিন্ন রঙের আলোর নাচন দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়েও পড়তাম। কোনভাবেই নিজেকে গরমের প্রচন্ডতার কষ্টের অনুভতিতে আনতে পারছি না। তবে এটা বেশ মনে আছে যে বাসার সমস্ত কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে আম্মা বিছানায় শুয়ে পড়ছেন, আর আমাদের থেকে থেকে বলছেন ঠান্ডা পানিতে কাপড় ভিজিয়ে তাঁর পায়ে জড়িয়ে দিতে। বিছানায় শোয়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়া তাঁর ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে এক অপরাধ বোধ পেয়ে বসতো। আর সবকিছু ছাপিয়ে বারবার যে চিত্রটি ফিরে আসছে তা হোল এক গ্রীষ্মে আমাকে বিদায় জানাতে রেলিং ধরে ঝুলে ঝুলে শিশুর মত সরবে আম্মার কান্না। এর মাসকয়েক পরই ইহলোক থেকে তাঁর তিরোধান। গ্রীষ্মের স্মৃতি তাই আমার বেদনাদায়ক। আজ মাতৃদিবসে আমার নিজের মায়ের ত্যাগকে স্মরণ করে প্রাণিজগতের সকল মাতৃজাতিকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাই। 

১৯১৪ সনে জন্মে তাঁর যগে যথেষ্ট বেশি, পনের ষোল বছর, বয়সে বিয়ে হওয়া আম্মা ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। অতি শুভ্র সুন্দর গায়ের রঙের জন্য তাঁর নাম ছিল মাখন। আমাদের কাছে আম্মার প্রথম জীবনের যে ছবিটি আছে সেটি বিয়ের পর আব্বা তুলেছিলেন ও কাঁচের নেগেটিভ থেকে বাড়িতে নিজেই ডেভেলাপ করেছিলেন। অনেক জায়গায় ঝাপ্সা হয়ে গেলেও নানা আলঙ্কারে সজ্জিত রূপসী এক মহিলাকে চিনতে কোন ভুল হয় না। সে আমলে বাংলা, উর্দ ও আরব শিক্ষায় তিনি ছিলেন বিদুষী, ইংরেজীতেও তাঁর জ্ঞান ছিল। পঞ্ছ ভাষা ওয়ার্ড বুক নামে তাঁর সংগ্রহে একটি বই ছিল, যাতে এ তিনটি ভাষা ও হিন্দি ও পার্শীতে কয়েকশ শব্দের সঙ্কলন ছোটকালে আমাদের শিখতে হত। ষাটের দশকে ব্রাম্মণবাড়িয়ার বড় মসজিদের ঈমাম, আম্মার র্দুতে লেখা চিঠি পেয়ে বলেছিলেন বহুদিন আমি এমন চমৎকার ভাষা ও বাক্যের সমন্বয় দেখি নাই। সুন্দর গলা ছিল তাঁর। গান, গযল ও কোরান তেলাওয়াতে ছিলেন পারদর্শী। স্কুলে পড়ার সময়ে হিন্দি-ঊর্দু সিনেমা দেখে এসে তাঁর কাছ থেকে সংলাপ ও গানের বাংলা তর্জমা করে গল্পটা বুঝে নিতাম। সেই ছোটকালে তাঁর কাছে শেখা হাসির একটি বাংলা গান এখনো গেয়ে শোনাই বন্ধুস্হানীয় লোকজনের আনুষ্ঠানে। পরিণত বয়সে আজো যখন মায়ের সান্নিধ্য পেতে মন উতলা হয়, তিরিশ বছর আগে তাঁর সুরেলা কন্ঠে গাওয়া গানটি ছেড়ে দেই, ললিত ঝঙ্কারে, কি গাহিব গান, গান তো গিয়াছি ভুলে...। পঞ্চাশের দশকে কুমিল্লায় প্রতি বছর মহিলা দিবস বা মাতৃদিবস পালন করত আপওয়া (অল পাকিস্তান উইমেনস এসোসিয়েশন) নামে একটি সংগঠন; প্রতিবার আম্মা তাতে মিলাদ পড়াতেন। ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক সাধনায় তিনি এতটাই অর্জন করেছিলেন যে অনেকেই মনে করতেন তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে যেতে পেরেছিলেন।

বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে তাঁর রূপ-গুণের অনেক কদর, দূর থেকে অনেক লোকজন আসে একনজর দেখতে। লেখাপড়া শিখাতে গিয়ে শিঘ্রই অনেকের ওস্তাদ-আম্মা বনে যান তিনি। কিন্তু মনে তাঁর বড় দুঃখ, বছরের পর বছর যায়, কোন সন্তান হয় না। অনেক সাধনার ফলে বিয়ের বার বছর পর যেন তাঁর ভাগ্য খুলে যায়, ক্রমে ক্রমে আটটি ছেলে-মেয়ের জননী হলেন তিনি। আম্মা মনে করতেন তাঁর সন্তান-ভাগ্য ছিল না। অনেক আরাধনা-প্রার্থনা-মানত করেও পীর-ফকিরের দোওয়া ও তাবিযের গুণে পাওয়া এই আটটি সন্তানকে সত্যিকার অর্থে মানুষ করতে না পারলে তা হবে আল্লাহর কাছে অমার্জনীয় অপরাধ ও তাঁর নিজের পরম পরাজয়। এই দ্বৈত দায়িত্ববোধ ও অপরাধবোধ তাঁকে সর্বদা আচ্ছন্ন করে রাখতো এবং কিভাবে আমাদের নৈতিক, শারীরিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও পার্থিব জ্ঞনে শিক্ষিত করে তোলা যায় সেই চিন্তায় দিন কাটতো। আমাদের প্রতিদিন কতগুলো কবিতা-ছড়া ভাবার্থ সহ মুখস্ত করতে হোত, যেমন যেজন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি..., কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে, দুঃখ বিনে সুখ লাভ হয় কি মোহিতে?...। স্কুলের হোমওয়ার্ক, হাতের লেখা, ধর্মীয় ও গল্পের বই কতটুকু পড়া হোল এসবই তিনি হিসাব নিতেন প্রতিদিন। মা দুর্গার মত দশ হাত দিয়ে যেন সব সন্তানকে আগলে রাখতেন স্নেহ দিয়ে, শাসন করে, ও বহিরাক্রমণ থেকে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় পূর্ব পাকিস্তানের আয়তন চুয়ান্ন হাযার পাঁচশত বর্গমাইল না পঞ্ছান্ন হাযার চারশত বর্গমাইল সেটা ঠিক বলতে না পারায় কাদের স্যার প্রচন্ড মেরেছিলেন। এর প্রতিকার করতে আম্মা সেদিনই আব্বাকে নালিশ করতে বলেছিলেন। রূপকথার বইয়ে মা-হারানো রাজপত্রকে সৎমার অবিচার থেকে বাঁচানোর জন্য পরি বা কচ্ছপ হয়ে আসল মা ফিরে আসতেন। আমার ভয় হোত যে আম্মা মরে গেলে স্কুলে ভুগোল স্যারের অত্যাচার থেকে আমাকে কে বাঁচাবে? এখন দুর্দিনে আমার স্মৃতিতে তিনি দেখা দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়ে যান, বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা...

এর মাঝে চাকুরি থেকে অবসর নিয়ে আব্বা সবাইকে নিয়ে কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফিরে এলেন। জমানো সব টাকা দিয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে সর্বঃশান্ত হয়ে যান। মড়ার ওপর খাড়ার ঘাএর মতন এজি অফিসের ঝামেলায় কয়েক বছর পেনসনের টাকা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। সংসারতো আর চলেনা, ধীরে ধীরে আঁধার ঘনিয়ে সবকিছু যেন এক অমানিষার অন্ধকারে ডুবে যেতে লাগলো। দীর্ঘ সাত-আট বছর প্রায় কপর্দকহীন বস্থার এই বৃহৎ পরিবারকে বলতে গেলে আম্মা একাই শুধুমাত্র প্রচন্ড মনোবলের জোরে এক বিশাল সাগর পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন।

আব্বার চাকুরী থাকাকালীন যেগুলো বিশেষ গুরুত্বের ছিল না, শুরু হল আব্বা ও আম্মার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া, সেই জমি বন্ধক এবং অচিরেই তা বিক্রি, ফলে ভাতের অভাব। তার ওপর আমাদের সবার স্কুলের বেতন, পরীক্ষার ফি, পরার কাপড়ের ব্যাপার তো ছিলই। কিছুই যেন অপচয় না হয় আম্মা জাউ রাধতেন, চুনের পানি মিশিয়ে, ভাতের মাড়টাও অপচয় হয় না। কাজের মানুষ থেকে জেনে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ও আশেপাশে বেড়ে উঠা অবহেলিত আগাছা ও গাছের কান্ড, (যেমন ঘিমাই, কাঁটাখুদুরি, গাছে ঝুলে থাকা পেস্তা আলু, উলটকমল, মোরগচন্ডি) আমাদের খাদ্য তালিকায় শাক-সব্জী হিসেবে যোগ হতে থাকে। ইদানিং এখানে গড়ে ওঠা কোরিয়ান-চাইনিজ গ্রোসারি দোকানগুলোতে যেতে বড় ভাল লাগে। এখানে অসংখ্য অজানা শাক-সবজি, আলু-মূল আমাকে কাছে ডাকে যাঁরা এগুলোকে সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে মানুষের খাবার তালিকায় স্থান করে দিয়েছে, নীরবে তাঁদের নমস্কার জানাই। জেনে আরো ভালো লাগে যে আধুনিক কালে ইউরোপ-আমেরিকার অনেকগুলো জনপ্রিয় খাবার, যেমন পিয্যা, বারবিকিউ, ও টরটিলা-ছালুপা অতীতে অতি দরিদ্র ও সাধার মানুষের খাবার ছিল। কালক্রমে বিভিন্ন আবস্থা পার হয়ে ও বিভিন্ন জিনিস যোগ হয়ে এগুলোর আজকে এই জনপ্রিয়তা। দেশ ছেড়ে প্রথম জাপানে গিয়ে অচিরেই বুঝতে পারলাম যে তাদের উন্নতির একটি প্রধান কারণ তাদের খাদ্যাভ্যাস। প্রাত্যহিক মেনুর বাইরে অতি ফর্ম্যাল পার্টিতেও সেখানে খাদ্য তালিকায় শামুক-ঝিনুক-কাকড়া-অক্টোপাস দেখে মনে হোত প্রকৃ্তিতো আমাদেরও এগুলো থেকে বঞ্ছিত করে নাই। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করে এগুলোর সদ্ব্যবহার করলে অন্ততঃ বিদেশের কাছে ভিক্ষা করে খেতে হোত না।

আর্থিক দারিদ্র্য বুঝতে পেরে কখনো সেসময়কার চার-পাঁচ ঘন্টা দূরে শাহবাযপুর থেকে নানীজান দুই মণ চার মণ চাউল, জিয়োল মাছ, ডিমওয়ালা মুরগি ও তরিতরকারী পাঠিয়ে দিতেন। এক ঈদে মেঝমামী এক থান কাপড় উপহার দিলেন, তা দিয়ে আম্মা আমাদের, কলেজ থেকে ক্লাশ ওয়ানে পড়ুয়া সাত ছেলে-মেয়ের, শার্ট, জামা, পায়জামা ও হাফপ্যান্ট বানিয়ে দিলেন। আমরা কত খুশি হয়েছিলাম। উপহার পাওয়া এই খাবার ও কাপড়ে তো আর সারা বছর চলে না। আম্মা তরিতরকারি ফলমূলের গাছ লাগান, কিছু ডিম আমাদের খাইয়ে বাকিগুলো মুরগিটাকে তা দিতে দেন। খাওয়া দাওয়া ভুলে মুরগিটা বেশ কদিন এক নাগাড়ে ডিমের উপর বসে থাকত। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি কখন বীজ থেকে চাড়া গজায়, ডিম ফোটে। একদিন ঠিকই হাল্কা হলুদ লোমের আট দশটি আদুরে ছানা বেরোয় ডিম থেকে, আমাদের সে কি উত্তেজনা, কি আনন্দ! গর্বিত ও আহ্লাদিত মা মুরগিটা ছানাগুলোকে নিয়ে ক্ষিধের তাড়নায় দুই এক দিন পর বেরোয় খাদ্যের সন্ধানে; আমরা কাছে গিয়ে আমাদের উচ্ছিষ্ট ও খুদ দিতে গেলে, দুই ডানা আধো বিস্তৃত করে ছানাগুলোর চারপাশে সন্ত্রস্ত হয়ে ঘুরে ঘুরে সামলে রাখতো। আর শরীরের সব পালকগুলো ফুলিয়ে নিচু স্বরে এক প্রকার বিশেষ শব্দ করতে থাকতো, যেন দারুণ আভিমানী এই মা বিনয়ের সাথে বলতে চাইছে এতদিন খোঁজ নাও নাই, এখন দেখতে চাও দেখো কিন্তু আমার বাছাদের যেন কোন ক্ষতি কোর না বাপু

স্কুল থেকে ফিরে এলে আমাদের না পেট ভরে ভেবে নিজে উপোস থেকে বলতেন আমার ক্ষিধে নেই, পীড়াপীড়ি করলে বলতেন আমি খেয়ে নিয়েছি, তোমরা খাও। বলতাম, আম্মা আপনি না বলেছেন মিথ্যা বলা ক্কবীরা গুনাহ? হেসে কৃ্ত্রিম রাগ দেখিয়ে একটু থেমে বলতেন তোমরা কি আমার তযবীহ পড়াটা বরবাদ করতে চাও? বলেই পনরায় নিঃশব্দে অতি দ্রুত ঠোট নাড়তে নাড়তে আমাদের কারো ছিঁড়ে যাওয়া শার্ট, জামা বা প্যান্ট রিপু করতে লাগতেন। প্রথম জীবনে শখের জন্য শেখা তাঁর হস্তশিল্প ও সূচীকাজ যে সুদর ভাবিষ্যতে ছেড়া কাপড় তালি দিতে কাজে লাগবে তা কি তাঁর মা-বাবা বা তিনি নিজে কখনো কল্পনা করতে পেরেছিলেন? যখন সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য ছিল, বড় মাছের বিশালাকৃ্তির আঁশ নানান রঙ্এ রাঙ্গিয়ে চমৎকার সব ফুল বানাতেন, আর আব্বা সেগুলো কাঁচের ত্রিমাত্রিক ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতেন। সেসব আমাদের জন্মের বহুদিন আগের কথা যদিও, বসার ঘরের দেয়ালে সেদিনও ঝুলানো ছিল। কালো কাপড়ে তখনকার জনপ্রিয় গানের কটি কথা, ওরে আয়, আমায় নিয়ে যাবি কে রে, দিনের শেষের শেষ খেয়ায় লিখে লাল, সাদা ও সোনালি ভেলভেটের সুতোয় অপূর্ব ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন অস্তায়মান সূর্যের আলোর চ্ছটার সামনে মাঝিবিহীন এক নৌকা এঁকে। আজ থেকে পনের বছর আগে তিনি শেষ খেয়ায় জীবন পাড়ি দিয়েছেন।

স্কুল-কলেজগামী আট ছেলেমেয়ের সংসার চালাতে গিয়ে প্রায় সব জমিজমা শেষ হোল। তারপর আম্মা তাঁর হাতের বালা, আঙ্গুলের আংটি, নাকফুল, গলার হার একে একে দিতে থাকলেন প্রথমে বন্ধক এবং পরে অবশ্যম্ভাবী বিক্রিতে। একদিন তাঁর শেষ সম্বল, অতি সখের সূর্যমুখি ফু্লাকৃ্তির, লাল রঙের অনেকগুলো রুবি পাথর বসানো কানফুল জোড়াও বিক্রি করতে হোল। ম্যট্রিকের পর মেঝভাই এর কলেজে ভর্তির কোন পথ ছিল না, নিজের অপারগতায় কেঁদে কেঁদে তাঁর করুণাময়ের কাছে প্রার্থনাও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। স্কুলের নির্দেশ অনুযায়ী দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র আদেল দুআনা দামের একটি বাঁধানো খাতা না পেয়ে কান্না জুড়েছিল, ওকে বকে বহুদিন নিজে নিজে কেঁদেছিলেন তা ও মনে আছে। আমরা বড় হতে থাকলাম, আর দেখতে থাকলাম সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে নামায-কোরাণ শেষে ঘড়ি ধরে সাতটার মধ্যে আব্বার নাতা বানাচ্ছেন, প্রচন্ড গরমে বাগান পরিচর্যার সাথে সাথে সবার খাবার জোগাড় করছেন, ফাঁকে ফাঁকে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ছেন, আর থেকে থেকে আমাদের বলছেন ঠান্ডা পানিতে কাপড় ভিজিয়ে তাঁর পায়ে জড়িয়ে দিতে। আমরা দেখতে লাগলাম দ্রুত আম্মার চুল পেকে যাচ্ছে, স্বাস্থ্যহীন, কুঁজো হয়ে যাচ্ছেন, কারণ তিনি হার মানতে রাজি নন; ভাগ্যে না থাকা সত্বেও আরাধনা করে পাওয়া সন্তান অমানুষ হলে সেটাই হবে তাঁর বড় বিঢ়ম্বনা। প্রজাপতি গোত্রের একটি স্ত্রীজাতীয় প্রাণী লালনপালন করার এক পর্যায়ে নিজের শরীরকে সন্তানের আহার হিসেবে বিলিয়ে দিয়ে এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রাণিজগতের শীর্ষে মানষ হয়ে জন্মেও মনে হয় আম্মা সন্তানের জন্য সেই পতঙ্গের মতই আত্মাহুতি দিয়ে চলেছিলেন।

জ্ঞনীজনেরা বলেন, ভালবাসা নিম্নগামী। কিন্তু সন্তানের জন্য আত্মত্যাগ কি শুধু মাতৃজাতিরই এক সহজাত পরিণতি? কই, আমাদের মানুষ করতে আব্বাওতো কম পরিশ্রম করেননি। তার পরও সেসব আম্মার স্নেহ, শাসন, ও ত্যাগের সাথেতো পাল্লায় কিছুতেই সমান ওজন পাইনা। মুষ্টিমেয় কয়েকটি ব্যাতিক্রম ছাড়া প্রাণীগতের সর্বত্র এই মায়েরা নিজের শরীর থেকেই ভ্রূণ ও সন্তান তৈরি করে। ডাক্তারি শাস্ত্রে মনে করা হয়, ব্যাথার পরিমাপে সন্তান প্রসব মায়েদের একটি প্রচন্ডতম বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। স্তনের মধ্যেই হোক বা পাকস্থলীর মধ্যেই হোক, মাই সন্তানের খাবার তৈরী করে, খাওয়ায়। আবার সে সন্তান পৃ্থিবীর বৈরী পরিবেশে বেঁচে থাকার সব বিদ্যা অর্জন করা পর্যন্ত সব সময় আগলে রাখে। এ যেন এক প্রাকৃ্তিক নিয়ম। বস্তুবাদী ভাবনায় সন্তানের বৃ্দ্ধিতে পিতার অবদান তো মনে হয় যৎসামান্য। আমাদের জন্য আম্মার স্নেহ, ভালবাসা ও আত্মত্যাগ সেও কি এক প্রাকৃ্তিক নিয়মের সূত্র অনুসারে হয়েছে? আমার বিশ্বাস, সব মাই সন্তানের মঙ্গলের জন্য কমবেশি এসব কছু করে থাকেন। এর পরও নিজের মায়ের অনুভব আমার কাছে এতই প্রবল, যে এই যুক্তি-চিন্তাও ভাবাবেগের কাছে হার মানতে বসেছে। আর সবার মতই আমি দ্বিতীয় কোন মায়ের গর্ভে জন্মাইনি, তাই তুলনা করতে পারব না। তবে নিজের সমস্ত সুখ, আরাম, আয়েশ ও জীবন বিসর্জন দিয়েছেন আমার মায়ের মতন সে বোধ হয় পৃথিবীতে আর নেই।

কতদিন তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু এখনো দেশে গেলেই তাঁর অনুগৃহীত জনেরা এসে ভিড় করে তাঁর স্মৃতিচারণ করতে। আসে আনু, আসে জীবনের মা, আসে সোহেলের নানী, আসে যোয়াদ্যা ভাই, আসে অনেকে। আম্মা, আপনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন জানিনা। তবে এব্যাপারে আমি নিশ্চিত যে বেহেশত্ নামক কাল্পনিক কিন্তু আপনার বিশ্বাসের সুখের স্থানের যদি কোন অস্তিত্ব থেকে থাকে, তবে সেই ঠিকানায় মুখে প্রশান্তির এক হাসি নিয়ে আপনি ঘুমিয়ে আছেন। কারণ আপনার উপস্থিতি ছাড়া সে স্থানের অস্তিত্বের কোন স্বার্থকতা থাকতে পারে না। 

পরিশিষ্ট-১  বছর কয়েক আগে আমি ও আদেল দুজনেরই পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেশে গিয়েছিলাম মেঝভাই এর মেয়ে নীতুর বিয়ে উপলক্ষে। তখন আদেলের ডাক্তার সহপাঠি-বন্ধুরা ওর জন্য এক জমকালো পার্টির আয়োজন করে। বহুক্ষণ সে দূর থেকে সুন্দরী এক সহপাঠিনীর দিকে তাকিয়ে থাকায় বন্ধুরা নিজেরা চোখের ঈশারায় কথা বলছিল। সবকিছু উপেক্ষা করে সে দৃঢ় পদক্ষেপে কাছে এগিয়ে বলে, তোমার কানফুল দুটো খুব সুন্দর, এগুলো আমায় দেবে? হাঁসির হুল্লোড় বয়ে গেলেও নির্বিকার ভাবে আদেল বলে চললো, যত টাকা লাগে আমি দেব। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে পরম মমতায় হাত দুটো আমার সামনে বিছিয়ে জিজ্ঞেস করলো, সেঝভাই দেখেনতো এগুলো চিনতে পারেন কিনা? চমকে আমি বলে উঠলাম, এ তুমি কোথায় পেলে, এযে আম্মার সেই অতি সখের কানফুল!

পরিশিষ্ট-২  পড়াশোনা, সংসার ও চাকুরির প্রয়োজনে আমরা সবাই দূরে। শেষ বয়সে আম্মা-আব্বার দেখাশোনা করতে হবে সেই জন্য তাঁদের সবচেয়ে ছোট ছেলে, আবেদ, বাড়ি থেকে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ব্রাম্মণবাড়িয়া কলেজের একটি বিএ ডিগ্রি দিয়ে সে এই পৃ্থিবীতে কি করে বেঁচে থাকবে, এই চিন্তায় দীর্ঘ নিঃশাস ফেলে বলতেন তোর জন্য শুধু দোওয়া ও আশীর্বাদই রেখে যাই। সেই আশীর্বাদে, আর হয়তো দীর্ঘ দিন তাঁদের সাহচর্যের ফলে সন্তানদের মাঝে সে শুধু সব চেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিতই নয়, আবেদই এখনও আম্মার সব সন্তানদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

মেরিল্যান্ড, আমেরিকা

১০ই মে, ২০০৯।

 

(লেখকের পুরো নাম সৈয়দ আশরাফউদ্দিন আহমেদ, বাস করেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড রাজ্যে।)

 

 

মন্তব্য:
Humayun   November 19, 2010

আশরাফ আহমেদ   June 20, 2010
ওয়াহেদ ভাই ও মজুমদার ভাই, নিজের মাকে দেখে আমার অনুভুতিগুলো প্রাণিজিগতের সব মায়েদের উদ্দেশ্যেই লেখা। আপনাদের সুভেচ্ছা ও সমমর্মীমিতার জন্যে অশেষ ধন্যবাদ।
শাহ আলম মজুমদার   June 5, 2010
আশরাফ শাহেব, আপনিই কেবল এমন সত্য কথা লিখতে পারেন। মায়ের জন্য এমন দরদ দিয়ে লেখা আমি আর কখনও পড়িনি । বাংলাদেশের মানুষ আমাদের ছাত্রগীবনে (৪০শের দিকে)আনেক গরীব ছিল। এটা অনেকে প্রকাশ করেনা। অতিতের স্রিতি আমাদেরকে কঁাদায়। তার উপর ভিত্তি করেই আমাদের আদশে্র জন্ম,তাই মাতৃভুমিকে এত ভালবাশি। ধন্যবাদ।
ওয়াহেদ হোসেনী   May 26, 2010
আশরাফ, শুভেচ্ছা ও দোয়া। তোমার আব্বা আম্মার জন্য দোয়া করি। তুমি আমায় কাদিয়েছ।
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.