Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  নিয়মিত কলাম  ||  ১০ম বর্ষ ২য় সংখ্যা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৭ •  10th  year  2nd  issue  May - Jun  2010 পুরনো সংখ্যা
আমার শিক্ষককে জানাই শ্রদ্ধা Download PDF version
 

নিয়মিত কলাম

 

 

ওয়াশিংটনের জানালা

 

আমার শিক্ষককে জানাই শ্রদ্ধা

 

ওয়াহেদ হোসেনী

 

সকাল প্রায় গড়িয়ে গেছে। ঘরে ঢুকে সোজা কিচেনে গিয়ে হাত ধুয়ে নিয়ে সাদা মাটা পশ্চিমী ব্রেকফাষ্ট বানিয়ে নিয়ে কিচেন টেবিলে বসতে গিয়ে নজরে পড়লো বাইরে ডেকে সুন্দর রোদ। মে মাসের সকাল, গাছের মাথার ওপর সবুজ পাতাগুলো একটু একটু দুলছে। তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঝকঝকে পরিস্কার নীল আকাশ, মাঝে মাঝে এক টুকরা দু টুকরা সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে ঠিক করলাম, না ঘরে নয়, বাইরে বসেই নাস্তা করবো। টোষ্ট, ডিম ভাজা, আর চা নিয়ে ডেকের চেয়ার টেবিলে বসতে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসলো - আঃ। এত সুন্দর সকালের তারিফ না করে পারা যায় না। কড়া টোষ্টটা মুখে দিয়ে দেখি শতকরা এক শ ভাগ যৌবনে ভরপুর লাল নীল বেগুনি রংগের আইরিশগুলো লাল নীল বেগুনি টিউলিপগুলোর পাশেপশে দুলছে। টিউলিপ গুলো দেখে মনে হচ্ছে তাদের যৌবনের শতকরা ষাট ভাগ পার হয়ে গেছে। শতকরা ষাট ভাগ কথাটা মনে হতেই হেসে উঠলাম। এই কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার আমাকে সিক্সটি পারসেন্ট, শতকরা ষাট ভাগ, গ্যারান্টি দিয়ে বললেন, ...। চারিদিকে একবার দেখে নিলাম, কেউ দেখছে নাতো, দেখলে ভাববে পাগল নাকি, একলা একলা হাসছে।

সকালে উঠে গিন্নী গেলেন কাজে, আমি গেলাম ডাক্তারের অপিসে। কাল রাত থেকে খাওয়া নিষেধ ছিল, আজ সকালে আমার Nuclear Cardiology Exercise Stress Test করার কথা। আমার হৃদপিন্ডের সামনে কিছু শিরা/ধমনী জট পাকিয়ে আছে। হয়তো জন্ম থেকেই আছে, তবে আমি জানতে পেরেছি এই বছর পনের/বিশেক আগে। তাই আজকাল ডাক্তাররা যখন আমার বুকের ছবি তোলে, তখন আগে ভাগেই বলে দেই, ডাক্তাররা একটু আস্বস্ত হন। ওয়াশিংটন এলাকার একজন গন্যমান্য হৃদপিন্ড বিশেষজ্ঞ এসব কথা জেনেও সেদিন বললেন, এবার তোমার Nuclear Stress Test করে দেখবো যে তোমার ধমনীতে মেদের কোন নুড়ি বসে নেই, রক্ত চলাচলে কোন বাধা পড়ছে না। আমি যতই বলি, আমি ঠিক আছি, গিন্নী তত জোরে ঠেলে ঠুলে আমাকে পাঠালেন টেষ্ট করাতে। সঙ্গে গেল ভাগনা, পাছে গাড়ী চালিয়ে ফিরে আসতে না পারি! ডাক্তারের অপিসে পৌছাতেই ওজন নেওয়া, রক্তচাপ দেখা, খোলা বুকের ছবি তুললো পনের মিনিট ধরে। তারপর কত সব তার লাগানো দশ বারোটা চাকতি বসিয়ে দিলো বুকে পিঠে। নি:শব্দে GE কোম্পানীর মেসিন চললো কতক্ষণ। তারপর আমাকে তুলে দিল ট্রেড মিল মেসিনে। কখন মেসিনের গতি বাড়িয়ে দিল, কখন মেসিনটা উঁচু করে দিল। ডাক্তার মহিলা সারাক্ষণ কথা বলে গেলেন আর চেয়ে থাকলেন মনিটারের দিকে। মিনিট পনের পর দৌড় বন্ধ করিয়ে ডাক্তার বললেন, বাহ, ভালোই করেছ। গায়ে জামা কাপড় চড়িয়ে, বাইরে কিছু স্ন্যাক আছে, খেয়ে আমার অপিসে আস। ততক্ষণে আমি তোমার বুকের ছবি, গ্রাফ গুলো পরীক্ষা করে দেখেনি।

ডাক্তার মোয়ালামীর অপিসঘরে ঢুকতেই উনি হাসি মুখে আমাকে তাঁর পাশে বসিয়ে ল্যাপটপে পাতলা পাতলা লাইনের গ্রাফ রেখা দেখিয়ে (আমি যেন কত সমঝদার!) বললেন, আমি সিক্সটি পার্সেন্ট গ্যারেন্টি দিয়ে বলতে পারি তোমার হৃদপিন্ডে যাওয়া শিরা/ধমনী পরিস্কার। সিক্সটি পার্সেন্ট? ইচ্ছা হলো, মহিলার হাত দুটো ধরে বলি, নাগো না, শিরা-ধমনী তো আছেই, আমার হৃদপিন্ডটাও শতকরা একশ ভাগ পরিস্কার। সে আচরণটা যৌন উৎপীড়ন হিসাবে গণ্য হতে পারে ভেবে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বললাম, মাত্র সিক্সটি পার্সেন্ট? মহিলা চোখ বড় বড় করে বললেন, হাঁ সিক্সটি পার্সেন্ট। তোমার হৃদপিন্ডের সামনে শিরা/ধমনীর যে জটলা, তাতে পুরাটা দেখা যায়না। যতটুকু দেখলাম, পরিস্কার। হায়রে কপাল! এত চাকতি লাগিয়ে, শরীরে পরমানু রশ্মি ঢুকিয়ে, এত ছবি তুলে, গ্রাফ কষে শেষে বলে কিনা মাত্র সিক্সটি পার্সেন্ট গ্যারান্টি। চা শেষ করে, কিছুক্ষণ বসে বসে রোদ পোহালাম। আবার ঐ শতকরা ষাট কথাটা এসে মাথায় ঢুকলো। অনেকটা হঠাৎ করেই শতকরা ষাটকে দাবিয়ে মাথার মধ্যে জেগে উঠলো শতকরা নিরানব্বই।

এই কদিন আগে বিশ্ব সম্মানীয় এক বাংলাদেশী হেসে হেসে বললেন, হ্যাঁ শতকরা নিরানব্বই ভাগ ক্ষেত্রেই সুদ শুদ্ধ পুরা পয়সাটা ফেরত পেয়ে যাই। ভদ্রলোকের নাম সবার জানা। ড. মোহাম্মদ ইউনুস। বর্তমানে ওয়াশিংটনবাসী, বাংলাদেশেতো বটেই, এক ডাকে বিশ্ব পরিচিত, অর্থনিতীবিদ, অধ্যাপক নুরুল ইসলামের ছাত্র। আমি তাঁর সরাসরি ছাত্র না হোয়েও, কেউ কেটা না হয়েও কেবলমাত্র ভাগ্যগুনেই অধ্যাপক সাহেবের স্নেহ পেয়েছি। সে স্নেহটা যে কত অকৃত্রিম ও গভীর তা টের পেলাম সেদিন যেদিন অধ্যাপক সাহেব ফোন করে বললেন, রবিবারদিন ডঃ ইউনুস আসবে ডিনারে, তুমি আর তোমার স্ত্রী এসো, রাত আটটায়। যেহেতু ওয়াশিংটনে আমার বয়সের মানুষদের উনি হয় সরাসরি শিক্ষক, না হয় শিক্ষকের শিক্ষক, সবাই তাঁকে স্যার বলে ডাকে। আমি ডাকি ভাইয়া বলে। রবিবারদিন ঠিক আটটা বেজে পাঁচ মিনিটে গিয়ে দেখি, খালি ডক্টর ইউনুসই নন, যাদের যাদের আসার কথা, প্রায় সবাই এসে গেছেন। অর্থাৎ ইচ্ছা করলে বাঙ্গালীর বাড়ীতেও আমরা সময় মত আসতে পারি!

হাল্কা রঙের পায়জামা পাঞ্জাবী আর খয়রী রঙের ফতুয়াধারী নোবেল লুরেট ছাত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন অধ্যাপক সাহেব। হাসিমুখে ইউনুস এমনভাবে আমার স্ত্রীর দিকে তাকালেন, আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন যেন কত দিনের জানা শোনা, কত আন্তরিকতা। অথচ তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয় মাত্র একবার, বছর দশেক আগে। পাঁচ মিনিট দেরী করে পৌছানোর ফায়দা হোল এই, অন্যান্য সব অতিথিরা সামনা সামনি সব আসনে বসে, খালি শুধু ইউনুস সাহেবের পাশের চেয়ার। তাই আলাপ করার সুযোগটা একটু বেশীই পালাম। একবার বললাম, আপনার গ্রামীনতো ওয়াশিংটনে শাখা খুলতে যাচ্ছে। খুব উৎসাহিত হয়ে উত্তর দিলেন, হ্যাঁ খুব শীঘ্রই খুলবো। আরো কিছু টাকা যোগাড় করতে হবে, আর বাকি আছে কিছু দপ্তরি কাজ। তারপর ইনশাল্লা আমেরিকান গ্রামীনের ওয়াশিংটন শাখা চালু হয়ে যাবে। তারপর আরো অনেক কথা হোল। চীনে সব চাইতে কঠিন জায়গায় কেন গ্রামীন খুলতে চান, চীনেরা জানতে চাইলে উনি বলেন, কঠিনটাতে যদি সফল হই, তাহলে পরের গুলো আরো সহজ হোয়ে যাবে। কোষ্টারিকার কথা বলতে গিয়ে বলেন, গ্রামীনের লোকেরা ঋণ গ্রহিতাকে টাকা দেওয়ার জন্য ব্যঙ্ক থেকে টাকা তুলে নিয়ে যাওয়ার সময়ে প্রায়ই পড়েন দস্যুর কবলে।

উপস্থিত কার এক কথার খেই ধরে ইউনুস বললেন, পড়া শোনার জন্য ছাত্রছাত্রীদেরও আমরা ঋণ দেই। তারপর ঋণ শোধ হওয়ার কি নিয়ম? বললেন একই নিয়ম। পাশ করার কিছুদিন পর থেকে ঋণ শোধ শুরু হওয়ার কথা। অনেক সময় ওরা এসে বলে, এখনও চাকরী পাইনি। সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এভাব দুচারবার হওয়ার পর বলি, বাবা, চাকরী পাওয়ার ওপর ভরসা করলেতো চলবে না। ওরা বলে তাহলে কি করবো? আমরা বলি, তোমার মা যা করেছে তাই কর। উনার, শিক্ষা ছিল না, জ্ঞান ছিল না। উনি শুর করেন দশটা মুরগী, দুটা গরু দিয়ে। তোমার শিক্ষা আছে, জ্ঞান আছে, তুমি বড় করে শুরু কর। কাচুমাচু করে বলে শুরু করার টাকা পাব কোথায়? ওকে আবার ধার দি। ইউনুস খুব গর্বের সঙ্গে বলেন, জানেন এরা সবাই সুদ শুদ্ধ পয়সা ফেরৎ দিয়ে নবীন উদ্যোক্তা (new entrepreneur) হয়ে  সমাজে একজন আদর্শ ব্যক্তি হোয়ে ওঠে। উৎসুক হোয়ে প্রশ্ন করলাম এদের মধ্যে ফেরত দেওয়ার সংখ্যা কেমন?  দাঁত বার করে তৃপ্তির হাসি হেসে অত্যন্ত প্রশ্বস্তির সাথে ইউনুস বললেন, শতকরা ৯৯ জন

নাস্তা শেষ করতে করতে  মনে মনে ভাবলাম, শতকরা ৯৯ কোন আধুনিক যন্ত্র নয়, বুকে পিঠে তার লাগানো চাকতি নয়, পুলিশ কাছারী নয়, বাংলাদেশের মত দেশে বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে শতকরা নিরানব্বই ভাগ গ্যারান্টি দিয়ে কাজ হসিল! আর বিশ্বের একমাত্র super power দেশে একজন গন্যমান্য cardiologist শিরা/ধমনীতে পরমানু রশ্মি ঠুকিয়ে বুকে পিঠে তার লাগানো চাকতি লাগিয়ে, দৌড় করিয়ে গ্যারান্টি দিলেন মাত্র সিক্সটি পারসেন্ট! বাংলাদেশ, যার চাল নেই, চুলো নেই, যেখানে সারা দিন রাতে বাতি দশ ঘন্টাও থাকে না,  কলেজে কলেজে ছেলেরা হাতে রাম দা নিয়ে যুদ্ধ করে বেড়ায়, গিন্নীরা বসে থাকেন কখন গ্যাস আসলে রান্না করবেন, সেই দেশের শ্যামলা রঙের, সাধারণ এক মানুষ। কি আছে তার হৃদপিন্ডে?

কি আছে তা টের পাই বেশ কিছুদিন আগে।

মাত্র কদিন হোয়েছে ডক্টর ইউনুস নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। যেই তাঁকে সম্মান দিতে পারে, সম্ভর্ধনা দিতে পারে সেই নিজেকে সম্মানিত মনে করে। সেই সময় তিনি এলেন ওয়াশিংটনে। দলাদলি ভুলে গিয়ে ওয়াশিংটনের সব প্রতিষ্ঠান এক হোয়ে সম্ভর্ধনা দিল। বিপুল সমাগমের কারণে আগত অর্ধেক লোককে ফিরে যেতে হোল হলে ঢুকতে না পেরে। সেই অনুষ্ঠানে নোবেল পুরস্কার পাওয়া প্রথম বাংলাদেশীর যখন বক্তৃতা দেওয়ার সময় এলো, তখন উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, উপস্থিত শুধীবৃন্দের মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি আমার শিক্ষক ডক্টর নুরুল ইসলামকে। তাকে আমি জানাই আমার গভীর শ্রদ্ধা।

প্রশংসা আর সম্মানের ফানুষে যে মানুষ যখন আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে তার মুখ দিয়ে যখন এই কথা বেরয়, তাহলে সে লোক শতকরা ৯৯ ভাগের গ্যারান্টি দেবে নাতো কে দেবে?  

ওয়াশিংটন ডিসি

মে ১০ই, ২০১০।

ElderHossaini@gmail.com

 

মন্তব্য:
albelee from MA   May 29, 2010
Thank you to Wahid Hossaini and appreciate the efforts of Porshi and Sabir bhai (the Editor)for such beautiful, illuminating, ghoroa bangla article. Dr. Sabir Majumder is a great entrepreneur!!!!
Dr. Rafiqul Khan   May 27, 2010
Great narration, I enjoyed reading it. Rafiq, Houston, Texas
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.