Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ১২তম সংখ্যা চৈত্র ১৪১৬ •  9th  year  12th  issue  Mar - Apr  2010 পুরনো সংখ্যা
বড় এনজিও - একটি উদাহরণ Download PDF version
 

বাংলাদেশের এনজিও

বড় এনজিও - একটি উদাহরণ

কামাল চৌধুরী

 

প্রতিষ্ঠানটির কর্মী সংখ্যা ১ লক্ষ ২০ হাজার বার্ষিক খরচ ৫৩৫ মিলিয়ন ডলার বিভিন্ন মহাদেশের ১৪টি দেশে বিস্তৃত এর কর্মতৎপরতা বাংলাদেশের সবচে বড় তো বটেই, এমনকি বিশ্বের সর্ববৃহৎ এনজিও-র একটি বলতে পারেন প্রতিষ্ঠানটির নাম? গ্রামীন ব্যাংক? ভুল করলেন এর নাম ব্র্যাক প্রতিষ্ঠাতা জনাব ফজলে হোসেন আবেদ গত বছর পেয়েছেন ব্রিটেনের নাইটহুড, সম্মানজনক পদবী "স্যার"

আবেদের জন্ম ১৯৩৬ সালে, সিলেটের হবিগঞ্জে বহু ভূসম্পত্তির অধিকারী, ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান আবেদ ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে পাড়ি জমান স্কটল্যান্ডে। র্তি হন গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাভাল আর্কিটেকচার বিভাগে পরে মত বদল করে চার্টার্ড একাউন্টেন্সী পড়েন লন্ডনের ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট এন্ড চার্টার্ড একাউন্টেন্টস্-এ। ১৯৬২ সালে পাশ করে চাকরী শুরু করেন ইংল্যান্ড-এ এরি মধ্যে ব্রিটেনের নাগরিকত্ব পেলেও  ১৯৬৮ সালে দেশে ফিরে আসেন এবং যোগ দেন শেল কোম্পানীতে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে আবার পাড়ি জমান লন্ডনে একশন বাংলাদেশ-এর ব্যানারে গড়ে তোলেন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে প্রবাসী আন্দোলন।

ডিসেম্বরে দেশ ত্রুমুক্ত হলে আবেদ ফিরে আসেন দেশে লন্ডনের ফ্ল্যাট বিক্রীর টাকা দিয়ে শুরু করেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ তৎপরতা, শরণার্থী পুনর্বাসন এভাবেই জন্ম নেয় ব্র্যাক সেই ১৯৭২ সালে সিলেটের সুল্লা গ্রামে শুরু হয় যে কাজ, আজ ৩৮ বছর পর তার পরিধি বিস্তৃত দেশের ৬৪টি জেলার ৬৯ হাজার গ্রামে এবং বিশ্বের ১৪টি দেশে

আজ ব্র্যাক-এর সামগ্রিক কর্মকান্ড মূলতঃ ৩টি ধারায় বিভক্ত:

১. উন্নয়ন কর্মসূচী (অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজ উন্নয়ন, মানবাধিকার, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ইত্যাদি),

২. সমাজভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান (স্টোর যেমন আড়ং, ডেইরী, প্রিন্টার্স, চা বাগান, সৌর বিদ্যুত, বায়োগ্যাস, পোলট্রি, পশুপালন ইত্যাদি) এবং

৩. বিনিয়োগ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান (ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ব্যাংক, ইন্টারনেট সার্ভিস ইত্যাদি)

সবচে গৌরবের কথা, এই বিরাট কর্মকান্ডের যে বিশাল খরচ, তার একটা ছোট অংশ মাত্র আসে বিদেশী সাহায্য থেকে, বাকী প্রায় পুরোটাই আসে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে যেমন ১৯৮০ সালে ব্র্যাক-এর মোট খরচ ছিলো প্রায় ৮ লাখ ডলার যার প্রায় ১০০% ভাগই এসেছে বিদেশী সাহায্য থেকে সেখানে ২০০৮ সালের মোট খরচ ৫৩৫ মিলিয়ন ডলারের মাত্র ২৭% ভাগ ছিল বিদেশী সাহায্য  

ব্র্যাক-এর একটা মূল অথনৈতিক কর্মসূচী আমাদের সুপরিচিত মাইক্রোক্রেডিট ১৯৭৪ থেকে শুরু এই কর্মসূচীতে গত ৩৪ বছরে ঋণ ও সঞ্চয় সুবিধা পেয়েছে মোট ৪০ লক্ষ মানুষ যার শতকরা ৯৮ ভাগই মহিলা প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল ঋ পরিশোধের হারও অবিশ্বাস্য রকম বড় - ৯৯.২৯% ভাগ গত বছর প্রতিষ্ঠানটি ঋণ দিয়েছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার

ব্র্যাক-এর আরেকটা বড় কার্যক্রম সমাজের সুযোগবঞ্চিত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচী আজ ৬৬ হাজার শিক্ষকের তত্বাবধানে ৩৮ হাজারেরও বেশী প্রাথমিক স্কুলে (১ - ৫ম শ্রেণী) পড়ছে ১১ লক্ষ শিশু আর ২৭ হাজার প্রাক-প্রাথমিক স্কুলে পড়ছে আরো ৭ লক্ষ

১৯৭৯ সালে ব্র্যাক শুরু করে এর সবচে পরিচিত জনস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রকল্প - ডায়রিয়া প্রতিরোধক ওরাল থেরাপী কর্মসূচী (এক মুঠ গুড় ও তিন চিমটি লবনের কথা আজ কে না জানে?) দেশে শিশু মৃত্যুর সবচে বড় কারণ এই ডায়রিয়া প্রতিরোধে ব্র্যাক শুরু করে ১০ বছর মেয়াদী পরিকলপনা  প্রতিষ্ঠান-এর দেড় হাজার কর্মী ও প্রায় ১ লক্ষ স্বেচছাসেবক ঘরে ঘরে গিয়ে ১২ লক্ষ মা-কে শিখিয়ে দেন কি করে বানাতে হয় ঘরে তৈরী ওরাল স্যালাইন ফলে এই ১০ বছরে দেশে শিশু মৃত্যুর হার নেমে আসে প্রতি হাজারে ২৮৫ থেকে ৭৫-এ

আজ সাড়ে ৭ হাজার কর্মী ও প্রায় ৮০ হাজার স্বেচছাসেবকের মাধ্যমে ব্র্যাক-এর স্বাস্থ্যক্রম বিস্তৃত দেশের সব কটি জেলার প্রায় ৯ কোটি মানুষের মধ্যে

এই অসাধার সাফল্যের সূত্র ধরেই রচিত হয়েছে আরেকটি অধ্যায় - প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি সাড়ে ৩ হাজার কর্মীর তত্বাবধানে ব্র্যাক আজ আফগানিস্তানের সবচে বড় এনজিও আড়াই হাজার স্কুল থেকে সোয়া লক্ষ শিশু, যাদের প্রায় সবাই মেয়ে, শেষ করেছে তাদের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্র্যাক-আফগানিস্তানে আরো কাজ করছে ৪ হাজার স্বাস্থ্য ও দেড় হাজার পশুপালন কর্মী। উগান্ডা, সুদান, তানজানিয়াসহ মোট ১৪টি দেশে আজ সক্রিয় ব্র্যাক

সাফল্যের পাশাপাশি কিছু সমালোচনাও আছে ব্র্যাক-কে নিয়ে যেমন সদস্যদের ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে অনমনীয় কাঠিন্য - ব্র্যাকসহ সব মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে এই অভিযোগ চলে আসছে অনেকদিন ধরে অনেকে ইংগিত দেন ব্র্যাকের সুবিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার, চাকচিক্যময় বহির্কাঠামোর কথা কারো কারো অভিযোগ ব্র্যাক যেন দেশব্যাপী গড়ে তুলেছে পাল্টা সরকার, প্যারালাল গভর্নমেন্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী অধিকার, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়ে ফতোয়াবাজ মৌলানাদের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলনেই প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছে ব্র্যাক কর্মীরা এটাও উপলক্ষ্য অনেক সমালোচনার

আলোচনা-সমালোচনা যাই হোক না কেন, ব্র্যাক-এর কাজের পরিসর কিন্তু বেড়েই চলেছে দিনদিন, তাদের দৃষ্টি হয়েছে সুদূরপ্রসারী বর্তমানের সমস্যাই শুধু নয়, ব্র্যাক ভাবছে দূর ভবিষ্যতের কথাও পরিবেশ বিপর্যয় ব্র্যাক-এর একটা বড় প্রকল্প অদূর ভবিষ্যতে দেশের ৩৫% ভাগ অঞ্চল প্লাবিত হবে সমুদ্রের জলে  উচ্চ ফলনশীল নোনা পানির ধান উদ্ভাবন তাই ব্র্যাক-এর কৃষি গবেষণার একটা বড় বিষয় নেদারল্যান্ড-এর মত বেড়ি বাধ দিয়ে নীচু এলাকা কি করে রক্ষা করা যায়, সে বিষয়েও চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা

আবেদের বয়স এখন ৭৪ এখনো তিনি পরিকল্পনা করছেন ২০, ৩০ বা ৫০ বছর পর ব্র্যাকের কার্যক্রম নিয়ে, প্রস্তুত করে তুলছেন প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মীদের আবেদের এই অবিরাম পথচলায় সবসময় বাধা প্রতিবন্ধকতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল অনেক লোভনীয় হাতছানি কয়েক বছর আগের সামরিক ছায়া-শাসনকালে দেশের প্রসিডেন্ট হবার প্রস্তাব ছিল তার কাছে রাজী না হয়ে দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের সামনে একটি অসাধার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আবেদ তার নিজের ভাষায়, "আমার মূল প্রেরণা সবসময়ই ছিলো একদিন বাংলাদেশ দারিদ্র্যমুক্ত হবে, মানুষ বাস করবে মর্যাদা ও আত্মসম্মানের সাথে, শিক্ষার সুযোগ পাবে দেশের প্রতিটি শিশু আমি জানি আমার জীবতকাল সীমিত কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান, যে মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছি আমি আজ অব্দি, তা-ই চালু রাখবে সেই কার্যধারা" আবেদের জীবন দীর্ঘ হবে, এই হোক আমাদের সবার কামনা

 

লেখক পরিচিতি : কামাল চৌধুরী একজন আইটি বিশেষজ্ঞ।

 

ক্যালগারী, কানাডা

মার্চ ১৩, ২০১০

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.