Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ১২তম সংখ্যা চৈত্র ১৪১৬ •  9th  year  12th  issue  Mar - Apr  2010 পুরনো সংখ্যা
বাংলাদেশে এনজিও কার্যক্রম বিষয়ে একটি আলাপের সূত্রমুখ Download PDF version
 

বাংলাদেশের এনজিও

 

বাংলাদেশে এনজিও কার্যক্রম   বিষয়ে একটি আলাপের সূত্রমুখ

 

জ্যোতি চট্টোপাধ্যায়

 

স্বাধীনতাপূর্বকালে সামাজিক-অর্থনৈতিক সহায়তার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে চ্যারিটি সংগঠন হিসেবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করত। অতীতকাল থেকে চলে আসা জনউদ্যোগে সামাজিক সহায়তা পদ্ধতির বাইরে উনিশ-বিশ শতকে ইউরোপিয় চ্যারিটির আদলে কিন্তু দেশি গন্ধ নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানগুলি গড়ে ওঠে। তবে তাদের কাজের দৃশ্যমানতার মাত্রা সে সময়ের সমাজের তুলনায় বেশ অপ্রতুল ছিল। তৎকালীন সমাজ বাস্তবতায় তার প্রয়োজনও অবশ্য তেমনভাবে ছিল না। তখনো সমাজে অতীতের ধারাবাহিকতায় পারস্পরিক সামাজিক সহায়তা চলমান ছিল। ষাটের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত পুরানো সমাজ কাঠামো ও সামাজিক নিয়মকানুন অনেকাংশে সচল ছিল। উৎপাদন পদ্ধতি, চেতনার স্তর ও সমাজ কাঠামোতে তখন সবেমাত্র ভাঙন শুরু হয়েছে।

পোশাক শিল্পে কর্মরত বাংলাদেশী মহিলারা

 
এর আগে বিশ শতকের শুরু থেকে বেশ কয়েকটি সামাজিক সংগঠন ও সংস্থা স্থানীয় দরিদ্র ও অধস্তনদের চিকিৎসা ও সৎকারসেবা, কুটিরশিল্প ও শিক্ষা সহায়তা এবং জরুরি ত্রাণের ক্ষেত্রে কাজ শুরু করে। এসব সংস্থা স্থানীয় সমাজ থেকেই নগদ টাকা ও ফসল উঠলে শস্যে অনুদান গ্রহণ করত। সেবাই ছিল সেসব সংস্থার সংগঠকদের ব্রত। তখনকার সমাজে সেবাদানের ব্রতধারীদের সামাজিকভাবে মর্যাদা দেয়া হতো বলে এই ব্রত গ্রহণ করা অনেকের কাছে আরাধ্যও ছিল। স্বচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের অনেকেই তখন এ ব্রত গ্রহণ করতেন।

যুদ্ধ চলাকালেই কয়েকজন বিদেশে শিক্ষিত উদ্যোগী মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন কাজ ও সহায়তার উদ্যোগ নেন। তার মধ্যে একটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা, অন্যটি ছিল দেশত্যাগে বাধ্য নারী-পুরুষ-শিশু শরণার্থীর দেখভাল ও সহায়তা করা। এ কাজে তাদের আনন্দ ও কাজের ফলে সহায়ক চিন্তা ও দয়া বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তাদের মনে নাগরিকদের নিয়মিত সহায়তা দানের একটি চিন্তা ও ইচ্ছা কালে কালে গড়ে উঠলেও উঠতে পারে। তবে এ সময়েও এসব সামাজিক সহায়কদের মধ্যে পুরানো দিনের সেবাব্রতের ধারণা অবিকৃত ছিল। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বিশ শতকের অন্যতম মানবিক বিপর্যয়ের পর দেশের মানুষের উঠে দাঁড়ানোর জন্য এ সেবার ধারণা ও কাজ সে কালে চিন্তা ও তার বাস্তবায়নে প্রচুর প্রেরণা জুগিয়েছিল। সাথে সাথে বৈদেশিক সাহায্য ও সহায়তা নাগরিকদের পুনর্বাসনে যথাযথ ভূমিকা পালন করেছিল।

স্বাধীনতার পরপর ভারত থেকে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য ত্রাণ প্রদান ও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে বিভিন্ন সেক্টর পুনর্গঠনের জন্য কয়েকটি দেশ থেকে সাহায্য আসে। সে সাহায্য বণ্ট ও ব্যবস্থাপনার জন্য মূলত আমাদের দেশে এনজিওর উদ্ভব ঘটে। স্বাধীন দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্থাগুলো কাজ শুরু করে। এর মধ্যে ছিল প্রধানত ভারত থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে প্রত্যাগত নাগরিকদের পুনর্বাসন। তারা সবহারানো মানুষদের জন্য ঘরের টিন, নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার সরঞ্জাম, পোশাক, কম্বল, খাবার, শিশুখাদ্য ইত্যাদি প্রদান করে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবার দিকেও তারা মনোযোগ দেয়।

Cultural show on sanitation at Para levelকিছুদিন পর প্রদানকৃত সহায়তার ফলাফল দেখতে গিয়ে দেখা গেল, ত্রাণের টিন, গৃহস্থালি দ্রব্য, কম্বল, পোশাকআশাক ইত্যাদি ত্রাণ যেসব শরণার্থীদের দেয়া হয়েছিল, তা তাদের কাছে নেই। জানা গেল, দারিদ্র্যের কারণে ও প্রয়োজনে তারা তা বিক্রি করে সংসার চালিয়েছে। সমাজের ধনীরা তার মালিক হয়েছে। এ অবস্থার মধ্যে বিভিন্ন কারণে সদ্যস্বাধীন দেশে ১৯৭৪ সালে বড়ো রকমের একটা দুর্ভিক্ষ হয়। এ দুর্ভিক্ষে অনেক মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সরকারও নানা প্রতিকূলতার কারণে তা মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়। সমাজেও অনেক পরিবর্তন আসে। তখন প্রাসঙ্গিকভাবে দরিদ্র নাগরিকদের স্থায়ী উন্নয়নের জন্য করণীয় নির্ধারণের চিন্তা সামনে চলে আসে। আর এ চিন্তার ফলে অবধারিতভাবে দরিদ্র মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করে পরিবর্তনের সুফল ধরে রাখবার চেষ্টা প্রাধান্য পায়। এ লক্ষ্যে তখন অনেক সংস্থা সংগঠিত হয়ে কাজ শুরু করে। এ কাজ করতে করতেই উপলদ্ধি হয় যে, কাজটা একই সাথে সামাজিক ও রাজনৈতিক। 

ইতোমধ্যে দারিদ্র্য দূরীকরণ, নিপীড়ন অপনোদন, উৎপাদন-বণ্টন, দেশপরিচালনা, সামগ্রিক উন্নয়ন এবং তাতে সহায়তার ক্ষেত্র ও পদ্ধতি নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অনেক শিক্ষক-গবেষক-অর্থনীতিবিদ কাজ শুরু করেন। সমাজের দরিদ্র নাগরিকদের উন্নয়নে দেশ ও চিন্তা-কর্মভিত্তিক কাজগুলো তাঁরা বিশ্লেষণ করেন। বিশেষ করে রাশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর পরিবর্তনের জন্য সংগ্রামের সফলতা-ব্যর্থতাগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে তাঁরা পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে নাগরিকদের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ ও কৌশল বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেন। সাথে সাথে দুটো পদ্ধতির বাস্তবতা সমাজবিজ্ঞানের আলোকে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী দেখার চেষ্টা করেন। তবে কখনো কখনো তাঁরা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়াই তৎকালীন পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামোর মধ্যেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতা দূর করতে মধ্যপন্থী ধারণার প্রচার শুরু করেন। যাতে দেশ ও সমাজের বড় রকমের পরিবর্তন সাধন ছাড়াই নিয়মিত স্বাভাবিক কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়। এ পরিবর্তনের জন্য তাঁরা চিন্তা ও কাজের অভ্যাসে পরিবর্তন আনয়ন, সেবার মনোভাব তৈরি ও দেশের পরিচালকদের সহায়তা আদান-প্রদানের কথা বলেন। এসব চিন্তা ও কাজ সমাজের উচ্চ স্তরের পণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেক প্রভাব ফেলেছে। সেসব গবেষণালব্ধ তত্ত্ব, তথ্য-উপাত্ত, প্রয়োগ কৌশল ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য অনেকেই এগিয়ে আসেন ও কাজ শুরু করেন। ফলে এ ধরনের কাজ সম্পর্কে দেশের সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক, সামাজিক সক্রিয়জনেরা ধীরে ধীরে আগ্রহান্বিত হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন অংশ, বিশেষ করে প্রগতিশীল ও মার্কসবাদী দলসমূহ এ পরিবর্তনকামীদের প্রতি সন্দেহের তীর উঁচু করে ধরেন। কারণ, তাঁদের মনে হয় এ ধরনের কাজের ফলে প্রগতিশীল রাজনীতি ধাক্কা খেতে পারে।

সমাজের পরিবর্তন আকাঙ্খায় উদ্যোগী ব্যক্তিবর্গ তখন দেশের সমাজকে বুঝতে, বিশ্লেষণ করতে ও তাকে পরিবর্তন করতে কী করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা ও তদানুযায়ী কাজ শুরু করেন। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা মনোনিবেশ করেন গ্রামোন্নয়নে। গ্রামের সমাজ ও মানুষ, মানুষের শ্রেণী ও স্তর, দারিদ্র্য ও ক্ষমতা তাঁদের নৈমিত্তিক আলোচনা ও কাজের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। এ যাবৎকাল এ সকল আলোচনায় একচ্ছত্র দায়িত্ব পালন করেছেন রাজনীতিবিদরা; বিশেষ করে বাম ঘরানার তাত্ত্বিক, তথা মার্কসবাদী রাজনীতিবিদ, সংগঠক ও পণ্ডিতগণ। উদ্যোগী ব্যক্তি ও সংস্থাগুলো, এতদিন যারা গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা সৃষ্টি, দল ও সংগঠন তৈরির কাজ করত, তারা পণ্ডিতবর্গে সাথে আলোচনা, মতবিনিময় ও কর্মকৌশল বিনিময় করতে শুরু করে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা এ কাজকে সুনজরে না দেখলেও তাঁদের অনেক রাজনৈতিক সহকর্মীকে এ ধরনের উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেন।

এদেশে এনজিও বা উন্নয়ন সংস্থাগুলো কাজ শুরু করে বিকল্প ধারণার চর্চ্চা ও বিকল্প উপায়ে বিকল্প কাজ সম্পাদন করতে। প্রচলিত চিন্তা ও কর্ম কাঠামোর বিপরীতে মানুষের শহরমুখীনতাকে নিরুৎসাহিত করে গ্রামমুখী করা, উন্নয়ন কাজকে কেন্দ্রমুখী করার বদলে পরিধিমূখী করা, নেতৃত্ব উচ্চস্তরমূখী থেকে নিম্নস্তরমূখী করা, আলোচনা একপক্ষের বদলে বহুপাক্ষিক করা, পরিকল্পনা ওপর থেকে চাপিয়ে দেবার বদলে নিচে থেকে উঠিয়ে আনা, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবার বদলে অংশগ্রহণমূলক করা এসব ছিল কথিত সেই বিকল্প ধারণা ও কাজের সংক্ষিপ্ত ফর্দ। এর ফলে সরকার ও দেশ পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্তগ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে সংস্কৃতি লালিত ও চর্চ্চিত হচ্ছিল, তাতে আমূল পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে নানাদিক দিয়ে গ্রামকে জানা-বোঝা, গ্রামের সমাজ কাঠামো বিশ্লেষণ, ক্ষমতার স্তর জানা ও বিশ্লেষণ করা, দরিদ্র নাগরিকদের সংগঠিত করা, তাদের জন্য বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি এবং তাদের নিজস্ব উদ্যোগ তৈরির জন্য সক্রিয় করার কাজ করা হয়। ইতোমধ্যে কয়েকটি সংস্থা পদ্ধতিগতভাবে কাজ করার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। তাদের মনোযোগের কেন্দ্র হয় স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্কশিক্ষা ও সংগঠন। এসব সংস্থা মনে করে যে, উল্লিখিত ক্ষেত্রে কাজ করলে গ্রামসমাজে একটা প্রভাব পড়বে ও দরিদ্ররা সংশ্লিষ্ট সমাজে সক্রিয় নাগরিক হিসেবে একটা ভূমিকা রাখতে পারবে। এ সময় সরকারের উদ্যোগে গড়ে ওঠে শিক্ষা আন্দোলন। ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে গড়ে ওঠে ‘টিপসই ছি ছি!’ আন্দোলন। এ সময় বিভিন্ন সংস্থা একটি উল্লেখযোগ্য আন্দোলন শুরু করে; তা হচ্ছে ওরস্যালাইন আন্দোলন। শতশত নারী-পুরুষ কর্মী হরেকরকম সামাজিক বাধা মোকাবিলা করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে, না খেয়ে বা কম খেয়ে, স্কুলঘরে বা দরিদ্রের বাড়িতে থেকে এ সচেতনতা আন্দোলনে কাজ করেন। ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে এ আন্দোলন এ দেশে অভূতপূর্ব সাড়া জাগায় ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। এগুলো হলো - এক. শিক্ষিত নারী-পুরুষ যুবদের সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজে নামানো যায়; দুই. সমাজে দরিদ্রের নিজেদের সংগঠন তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে; এবং তিন. সাহায্যের বদলে উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করে গণমানুষকে সচেতন করা গেলে তারা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই মোকাবিলা করতে সক্ষম।

উনআশি-আশি সালের দিকে উন্নয়নকর্মীদের নানাভাবে প্রশিক্ষিত করার প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি হয়। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে তারা পাওলো ফ্রেইরির আদর্শে মানুষের সমতা সম্পর্কে নতুন ধারণা পায়, সমাজ পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ হয় ও নির্বাক সমাজসদস্যদের সবাক করার কাজে নেমে পড়ে। সে সময় ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষা, সংগঠন ও সংস্কৃতি আন্দোলন এবং সে আন্দোলনে জনসাধারণের অংশগ্রহণ সম্পর্কে ধারণা বিস্তৃতি পায়। অনেক সংস্থার উন্নয়নকর্মী সে সময় ওইসব দেশ ভ্রমণ করেন ও হাতেকলমে কাজের সুযোগ পান। এর ভিতর দিয়ে অর্জিত শিক্ষা কাজে লাগানোর জন্য সমাজে সংগঠন তৈরি, বয়স্ক শিক্ষা প্রদান ও সচেতনতা তৈরি, সামাজিক আন্দোলন তৈরি, গ্রামসমাজের ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন আনয়নের কাজ বেগপ্রাপ্ত হয়। বগুড়া, আটপাড়া ও শাল্লাসহ অনেক জায়গায় বড়ো বড়ো সামাজিক আন্দোলন সংগঠিত হয় ও তা বৃহত্তর সমাজে প্রভাব ফেলে। সে সময় দরিদ্রের আর্থিক উন্নয়নের উপযোগী কোনো কাজের ধারণা উন্নয়ন সংগঠকদের জানা ছিল না। তখন নানাভাবে বিষয়টি আলোচনায় আসে ও উন্নয়নকর্মীদের চিন্তা ও কাজের সুযোগ তৈরি হয়।

সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাজের ধারণায় সত্তরের দশকের শেষে ও আশির দশকের শুরুতে একটি বড়ো পরিবর্তন আসে। দরিদ্র ও নারীকে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করে তাদের উৎপাদনমূলক ও অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত করার চেষ্টা সফল হয়। দেখা যায়, নারী ও দরিদ্র সংগঠিত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে অল্প পরিমাণ টাকা ঋণ নিলে সঠিক সময়ে তা শোধ করে। এ কর্মসূচি সারা দেশে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।

আশির দশকের মাঝামাঝি বেশ কিছু উন্নয়ন সংস্থা গ্রামে দরিদ্র দিনমজুর শ্রমজীবীদের সংগঠিত ও তাদের নিজস্ব সংগঠন গড়ে তুলে সামাজিক ও ন্যুনতম মজুরির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করে। এ কাজে সফলতাও আসে। এ আন্দোলনের ফলে সরকারও সাড়ে তিন সের চালের সমান ন্যূনতম মজুরি ও ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ করে আইন করে।

১৯৮৮ সালের দেশ ডোবানো বন্যায় উন্নয়ন সংস্থাগুলো দেশের মানুষ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। উন্নয়ন সংস্থাগুলো ছাত্র-যুবদের অংশগ্রহণে এ অবস্থা থেকে দেশের মানুষকে উদ্ধারে সহায়তা করে। এসময় কাজের মধ্যে দিয়ে তারা পরিবেশ ও দেশের জমিতে দরিদ্রের অধিকার সম্পর্কে চিন্তা করবার সুযোগ পায়। আশির দশকের শেষে ও নব্বই দশকের শুরুতে দেশের খাসজমিতে দরিদ্রের অধিকার নিশ্চিত করতে আন্দোলন হয়। অনেক সংস্থা এসময় দরিদ্র ও গ্রামীণ শ্রমজীবী ভূমিহীনদের খাসজমিতে অধিকারের আন্দোলন সংগঠিত করে। সাথে সাথে তারা আরো কয়েকটি সেক্টরে কাজ শুরু করে। যেমন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সংগঠিত দরিদ্রের অংশগ্রহণ। ১৯৮৮ সালের উপজেলা নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলায় দরিদ্র শ্রমজীবীরা উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী দিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। ১৯৯২ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এনজিও সংগঠিত দরিদ্র শ্রমজীবীরা অংশ নেয় ও অনেক জায়গার জয়লাভ করে। নীলফামারি জেলার ডোমার উপজেলার পাঙ্গামটুকপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও ৯টির মধ্যে ৮ সদস্য পদে সংগঠিত দরিদ্র শ্রমজীবীরা জয়লাভ করে বিস্ময় সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপর গ্রামের ধনীরা দরিদ্র শ্রমজীবীদের নির্বাচনে জয়লাভ করে গ্রামীণ নেতৃত্বে আসার অপরাধে সে রাতেই তাদের অনেককে মারধোর করে গ্রামছাড়া করে। এ বিজয় হয়ত শ্রমজীবীদের উন্নয়নে বেশ বড়ো কিছু করে নি, তবে এটি প্রমাণ করে যে দরিদ্র জনগণের সংগঠিত শক্তি ইচ্ছা করলে গ্রামের স্থানীয় সরকার কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

গত শতকে নব্বই দশকের প্রথমভাগে উন্নয়নের ক্ষেত্র হিসেবে দুটো সেক্টর মনোযোগ কাড়ে। প্রথমত, শিশুশিক্ষা এবং দ্বিতীয়ত, জেন্ডার। সমাজ থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এনজিওরা মনে করে, বয়স্ক শিক্ষা সমাজের সচেতনতার ক্ষেত্রে কাজ করলেও শিক্ষার হার বাড়াতে যথাযথ ভূমিকা রাখেনি। তাই তারা পদ্ধতিগতভাবে শিশুকেন্দ্রিক প্রাক ও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য কাজ শুরু করে। কয়েকটি এনজিও কমখরচে উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষায় মনোযোগ দেয়। এ সময় অনেক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। সরকারও সেসময় এ সেক্টরে সহযোগিতা করে।

সমাজের শ্রেণী ও স্তরগত বৈষম্যের পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিকতা আমাদের সমাজে অনেক বৈষম্য তৈরি করে রেখেছে। নারী-পুরুষের অসমতা ও বৈষম্য আমাদের সমাজ কাঠামোতে তেমন একটি বড়ো সংকট। এর ফলে আমাদের প্রায় ৫০ ভাগ জনশক্তি এখনো নিপীড়িত এবং কাজের অধিকার, কথাবলার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্য অধিকার, দেশপরিচালনার অধিকার, সম্পত্তির অধিকারসহ বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাই এনজিওরা এসময় জেন্ডার সচেতনতার কাজ শুরু করে। সমাজে পুরুষতন্ত্রের শিকড় বহুদূর বিস্তৃত। তাই এ কাজে এখনো অনেক কর্মকাণ্ড দরকার।

তাদের কাজের ফলে দরিদ্র, শ্রমজীবী, নারী, প্রতিবন্ধী, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, দলিত, দুর্গম এলাকার মানুষের নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে মূলস্রোতের জনগোষ্ঠীর মনোভাবের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। স্বাধীন দেশে সংবিধান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদ ও অঙ্গীকার অনুযায়ী সকল মানুষের অধিকার সমান - একথাটি জানা বোঝা ও চর্চ্চায় এনজিওরা একটা বড়ো ভূমিকা রেখেছে। সর্বোপরি বিভিন্ন ইস্যুতে দেশের মানুষের মনোগঠন পরিবর্তনে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে এনজিওরা কাজ করে না এমন কোনো ক্ষেত্র প্রায় নেই। তারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ, মানবাধিকার, পরিবেশ-প্রতিবেশ, নারী অধিকার ও মতায়ন, আইন সহায়তা, গণতন্ত্র ও সুশাসন, ভূমি ও ভূমিহীনদের অধিকার, লোক ও গণসংস্কৃতি, গবেষণা ও গণগবেষণা, শিশু অধিকার, দুর্যোগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা, নাটক ও গণনাটক, বিজ্ঞান ও  প্রযুক্তি, এইডস ও যৌনকর্মী, মাদকাসক্তি ও পুনর্বাসন, প্রতিবন্ধী, কুটির শিল্প, কৃষি ও উন্নয়ন, হাইব্রিড বীজ, সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও দলিত, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, যুব, কিশোর-কিশোরী, আর্সেনিক, বনসংরক্ষণ, নার্সারি উন্নয়ন ও বনায়ন, দিনমজুর, সংগঠন নির্মাণ, নিরাপদ মাতৃত্ব, বিশ্বায়নবিরোধী আন্দোলন, মৎস্যজীবী, হাওর-উন্নয়ন, বস্তিবাসী ও বস্তি উন্নয়ন, প্রবীণ, স্থানীয় সরকার, এমডিজি, দুর্নীতি, জলবায়ূ, আইন, লোকজ্ঞান, উপকরণ উন্নয়ন, জেন্ডার ও উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ, পলিসি অ্যাডভোকেসি, মাদক ও ধূমপানবিরোধী আন্দোলন, তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি, শ্রম অধিকার, অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু করে। এ সকল কাজ বাস্তবায়নের সকল ক্ষেত্রে তাদের অর্জন সমান না হলেও বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের সক্রিয় দেখা যায়। 

noneবিভিন্ন সময়ে এনজিওর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও ব্যবস্থাপনার ধর নিয়ে নানা চিন্তাভাবনা হয়েছে। তাদের কাজ, ব্যবস্থাপনার ধর ও পরিচালনা কাঠামো কী হবে? তাদের দায়বদ্ধতা কার কাছে থাকবে? ইত্যাদি। কথাগুলো অনেকদিন ধরেই আলোচিত হয়ে আসছিল। এ সময় এনজিওসংশ্লিষ্টরা অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার কথা বলেন। যাতে চার ধরনের স্টেকহোল্ডারের কথা বলা হয়। যথা, অভীষ্টজন, সংস্থার কর্মী ও ব্যবস্থাপক, দাতাসংস্থা এবং সরকার। সকলে মিলে ঠিক করবে কেমনভাবে কাজগুলি পরিচালিত হবে। তবে সব ক্ষেত্রে এখনো তা মেনে চলা হয় না বা মানলেও তা কেবল কাগজপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর সংস্থা বা উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ কমিটি ও নির্বাহী কমিটি কী নিয়মে তৈরি হবে, কী নিয়মে সিদ্ধান্ত হবে, কীভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন ও আলোচনা প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী তা পরিচালিত হলেও কয়েকটি সংস্থার পরিচালনা পদ্ধতি পর্যবেক্ষণে নানা অনিয়ম পরিলতি হচ্ছে। এসবের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে কর্মী অসন্তোষ। অভিযোগ উঠছে এককেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি প্রভৃতির। কয়েকটি ক্ষেত্রে এনজিও ব্যুরো তদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছে, যাতে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিতও হয়েছে। ফলে কোনো কোনো দাতাসংস্থা তাদের সহায়তার হাত গুটিয়ে নিয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে বিভিন্ন সংস্থায় দেখা দিয়েছে বিভক্তি, হয়েছে ও হচ্ছে মামলা ও হামলা। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করে সংস্থা পরিচালনায় নির্বাহী কমিটির সকল সদস্যের সমান অংশগ্রহণ থাকলে এরকম অভিযোগ ওঠার সুযোগ কমতে পারে। তাছাড়া এনজিওদের যেসব সংগঠন/ফোরাম/ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম রয়েছে, তারাও এ সকল বিষয়ে কখনো মনোযোগ দেয়নি। এনজিওদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা তারা অনেক সময় উপেক্ষা করেছে অথবা তাদের কাজের আওতায় পড়েনি। যেটা মন্দ ফল বয়ে এনেছে বলে আমার ধারণা। সকল স্টেকহোল্ডারের সমান অংশগ্রহণ এ ধরনের সীমাবদ্ধতা থেকে এনজিও কার্যক্রমকে রক্ষা করতে পারে। এটি এনজিওদের সংগঠন তৈরি, পরিচালনা পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা, আর্থিক স্বচ্ছতা সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত ধোঁয়াশাপূর্ণ ধারণাকেও দূরীভূত করতে সহায়ক হবে। 

নানা সময়ে, নানাভাবে ও কৌশলে সরকারের পাশাপাশি এনজিওরা নানা কাজ করছে প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে। তাদের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া সবসময় এক নয়, তা বলাই বাহুল্য। প্রতি মুহূর্তে প্রতি কাজে নতুনের আহ্বান তাদের বৈশিষ্ট্য। ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ও দেশীয়ভাবে যোগাযোগে প্রায় নীরব এক বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে এনজিওদের কাজেও। দেশে গণতন্ত্র এসেছে, তার চর্চ্চা হচ্ছে। এর মধ্যে কোনো কোনো কাজে এনজিওর কাজ সরকারকে পরিপূরকভাবে সহায়তা দিচ্ছে, কোনো কাজ দিচ্ছে কর্মবাস্তবায়নে সহায়তা। সরকার-এনজিও যৌথভাবে কর্মবাস্তবায়ন তো বড়ো জায়গা জুড়েই হচ্ছে। এর ভিতর দিয়ে সরকার ও এনজিওর মধ্যকার সম্পর্কে গ্রহণযোগ্যতার কিছু ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যেটি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নযাত্রায় আবশ্যিক সুফল দেবে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকার ও এনজিওর মধ্যকার সম্পর্ক অবিশ্বাসের বাতাবরণে মোড়া থাকতেও দেখা যায়। সরকার দেশে বাস্তবায়িত এনজিও কার্যক্রমের দেখভাল করার অধিকারপ্রাপ্ত। এ দায়িত্ব পালনে সরকার যদি রাজনৈতিক বিবেচনা সামনে না এনে সবসময় দেশের উন্নয়নের স্বার্থে নিরপেক্ষ থাকার চর্চ্চা করতে পারে, তবে তা সর্বার্থেই ইতিবাচক হতে পারে।

এত এত সাফল্যের পরও দেশের এনজিও খাতে সর্বক্ষেত্রে প্রত্যাশানুগ পরিবর্তন সূচিত হয়েছে, একথাটি উপসংহারে জোর দিয়ে বলা যাবে না। এনজিওসমূহের এত বছরের কাজের ফলেও দেশে ভূমিহীনের সংখ্যা কমেনি, শিক্ষার হার ব্যাপকভাবে বাড়েনি, দরিদ্র, নারী ও শ্রমজীবীরা বড়োরকমের কোনো সংগঠিত ভূমিকা রাখতে পারেনি কিংবা হয়নি নারী ও দরিদ্রের ব্যাপক মতায়ন। এর কারণ অনুসন্ধান করা এখন দরকারি বলে প্রতিভাত হয়। আগামী সময়ের এনজিওর রূপকাররা এসব ভাবনা সামনে নিয়ে এগোলে কিছু সুফল ফলতেও পারে। 

 

ঢাকা, বাংলাদেশ

মার্চ ৭, ২০১০

 

 

মন্তব্য:
মুজিব মেহদী   April 8, 2010
লেখাটি বাংলাদেশের এনজিও কার্যক্রমের একটি বিশ্বস্ত ছবি সামনে আনতে পেরেছে। লেখককে ধন্যবাদ। ভবিষ্যতে অন্য কোনো লেখায় আপনি যদি ব্যর্থতার কারণগুলো সামগ্রিক বিশ্লেষণসহ তুলে ধরেন তাহলে ভালো হয়।
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.