Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাম্প্রতিক  ||  ৯ম বর্ষ ১২তম সংখ্যা চৈত্র ১৪১৬ •  9th  year  12th  issue  Mar - Apr  2010 পুরনো সংখ্যা
ভিক্ষুক,চাটুকার ও রাষ্ট্র Download PDF version
 

ভিক্ষুক, চাটুকার ও রাষ্ট্র

শুভ কিবরিয়া

ভিক্ষুক কে? প্রতিদিন বাসে, ট্রেনে, রাস্তায় যে অসহায় অজস্র মানুষ নানা অজুহাতে হাত পেতে জীবিকা নির্বাহ করে তাদের আমরা ভিক্ষুক বলি। পেশাজীবী হিসেবে এই শ্রেণীটি চিরকালই মানুষের দৃষ্টিতে করুণাকামী। অন্যের করুণাই এদের জীবিকার আশ্রয়। ভিক্ষাবৃত্তি করে হয়ত জীবন চলে, বেঁচে থাকা যায় কিন্তু শ্রীমান মানুষ কি হওয়া যায়? একজন ভিক্ষুক মানুষকে কি আমরা শ্রদ্ধা করি, সম্মান দেই?

যার গায়ে গতরে জোর আছে, যে কাজ করে আয় উপার্জন করতে পারে, ভিন্ন উপায় সত্ত্বেও স্বভাবে যে করুণা প্রার্থী হয়ে বাঁচতে চায়, সেই ভিক্ষুক কি কখনো বিত্তবান কিংবা মর্যাদাবান মানুষ হতে পারে?

স্বাভাবিক বিবেচনায় তা কখনই সম্ভব নয়।

অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এখন এই ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ছে। এরা শিক্ষিত, এরা বুদ্ধিমান, এরা বিত্তবান কিন্তু এরা হৃদয়হীন বর্বর, আত্মপর, স্বার্থান্ধ এবং ক্ষমতাবানের করুণাপ্রার্থী। এদের জীবনে অর্থ আছে, নষ্ট ক্ষমতা আছে, শুধু নেই সম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ। যদিও এই ভিক্ষুক শ্রেণী ক্রমশই বাংলাদেশে অতিক্ষমতাধর হয়ে উঠছে। এদের গলায় শোভা পাচ্ছে রাষ্ট্রীয় পদক। এরা বড় বড় পুরস্কার বাগিয়ে নিচ্ছে। বড় বড় পদ বগলে করে বাড়ি ফিরছে। পৌত্র-পৌত্রি, বংশ পরম্পরায় নানাবিধ আর্থিক ও বৈষয়িক সুবিধা জুটছে এদের কপালে শুধু ভিক্ষাবৃত্তির কল্যাণেই।

২.

এরা কর্মে যতটা পারঙ্গম তেল মর্দনে তার চাইতে ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন। এদের দলে আমলা, শিক্ষক, লেখক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, ডাক্তার সব পেশার মানুষ আছেন। সামরিক শাসনের স্বর্ণযুগে আত্মমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করে স্বৈরাচারী শাসক হু. মু. এরশাদ দেখিয়েছিলেন এই ব্যবহারজীবীরা ভিক্ষুকের থলি হাতে কেমন করে রাস্তায় নামে। সেই সময় ভিক্ষুকরা রাষ্ট্রের পদ, পদবি, পুরস্কার পেতে হন্যে হয়ে এরশাদের পদতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এরশাদ এদের মধ্যবিত্তের মুখোশ ছিড়ে কাউকে ওপরে উঠিয়েছেন আবার কাউকে ওপর থেকে নর্দমায় ছুড়েছেন। কৃতী এরশাদ বুঝেছিলেন এরা ভিক্ষুকের চাইতেও নিকৃষ্ট। তাই আতাউর রহমান খান, মিজানুর রহমান চৌধুরী, মওদুদ আহমদ, চিনি জাফরদের মতো কত জনকে যে তিনি কতবার কতভাবে নাকানিচুবানি খাইয়েছেন, কতজনকে উঁচু পদে তুলে নিচুপদে বসিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই।

এবার গণতান্ত্রিক শাসনামলে সেই ভিক্ষুকবৃত্তির আবার দেখা মিলছে। এবার তা নিকৃষ্টতায় বড় সংখ্যাধিক্যে বৃহত্তম। এদের পুঁজি আত্মা বিক্রি করে নির্লজ্জ চাটুকারিতা আর বিবেকের প্রশ্নে নির্বোধ গর্দভের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষের মুষ্টি বাড়ানো। এরা বেগম জিয়ার শাসনামলে হাওয়া ভবনের পূজক ছিল। এখন এদের দেখা মিলছে রাষ্ট্রক্ষমতার নানা গলি ঘুপচিতে।

৩.

বর্তমান সরকারের একজন ক্ষমতাধর বড় ব্যক্তি গিন্নির স্মরণে পত্রিকায় শোক প্রকাশ করতে গিয়ে দেয়া বড় ে লিখছেন, ... জানলে কত না খুশি হতে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যে স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়েছিলেন আমাকে, আমাদের পরিবারকে, ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধু কন্যা, বাংলার অবিসংবাদিত জননেত্রী আমায় তার সান্নিধ্যে রেখেছেন। সেও হয়ত তোমার দোয়াতেই। সবচাইতে বড় কষ্ট তুমি দেখে যেতে পারলে না। কত দূরে তুমি আজ। ....

আহারে, বেচারার স্ত্রী শোক বড় না চাটুকার ভাবাবেগ বড়!

পরপারে যেয়ে সত্যিই কি সেই পুণ্যবান স্ত্রী এমন মেরুদণ্ডহীন, তৈলমর্দনকারী স্বামীর কাছ থেকে দূরত্ব অনুভব করছেন?

৪.

সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে এলজিইডির (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর)-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নাম ফলকে নিজের নাম ঢুকিয়েছেন রাষ্ট্রের এক ক্ষমতাধর মন্ত্রী। বেচারার দাবি, এলজিইডির তিনিই প্রতিষ্ঠাতা। আহারে, বেচারা প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী। ভদ্রলোকের বেহেশত নসিব হোক। পুরো কর্মজীবনে এই প্রতিষ্ঠানটির পেছনে সময় দিয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে একনায়ক বা স্বৈরতান্ত্রিকতার অভিযোগ ছিল হয়ত কিন্তু তার চরম শত্রুরাও বলবেন না এলজিইডি তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান নয়। মন্ত্রী বাহাদুরের জন্য কষ্ট হয়। বেচারা একটা প্রস্তর ফলকে নিজের নামটাই তো তুলতে চেয়েছেন। সাংবাদিকরা পারেও বটে! কোথাও একটু ছিদ্র পেলেই, তার অন্বেষনেই হাঁটতে থাকবেন।

আমাদের বইমেলায় দেখা মেলে আরেক দল ভিক্ষুকের। ের বাহার দেখে বোঝা যায় অন্তরজুড়ে এদের কি নিরাশ্য। দেশের জনবহুল জনপ্রিয় লেখক আর নবীন লেখকের মধ্যে এই ভিক্ষাবৃত্তিতে কোনো পার্থক্য নেই। সবাই যেন অন্তরজুড়ে ভিক্ষাবৃত্তিকে নমস্য বলে জেনেছে। ের ভাষ্য, ছবি, আর নিজেকে পণ্য করে তোলার কি প্রাণান্ত চেষ্টা!

এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স-এর অক্টোবর-ডিসেম্বর ০৯ সংখ্যা ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ ম্যাগাজিনটি হাতে এলো। এটি দেশের শিক্ষিত গ্রাজুয়েট প্রকৌশলীদের সংগঠন আইইবির প্রকাশনা। আইইবির স্লোগান উন্নত জগত গঠন করুন। এই পেশাজীবী সংগঠনের প্রেসিডেন্ট একজন গুণী প্রকৌশলী। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি। আইইবির সাধারণ সম্পাদকও একজন গুণী পেশাজীবী। মাসিক প্রকাশনাটি ৬৪ পৃষ্ঠার। এই সংখ্যায় সর্বমোট ৮৯টি ছবি ছাপা হয়েছে। এই ছবিগুলোর মধ্যে ৫২ জায়গায় প্রেসিডেন্ট এবং ৩১ জায়গায় সাধারণ সম্পাদকের ছবি আছে। প্রিয় পাঠক, চিন্তা করুন কি অসামান্য দৈন্যতা এই শিক্ষিত পেশাজীবীদের অন্তর জুড়ে। কতটা ভিক্ষুক হলে এ রকম আত্মপ্রচার আর আত্মবিকৃতিতে নামতে পারে এরা!

৫.

আমি কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম। এই একই চিত্র মিলবে চারপাশ জুড়ে। তৈল মর্দন আর নিজেকে বিক্রি করার এই ঘৃণ্য উৎসব এখন দেশজুড়ে। মানুষ আরো ছোট হয়ে উঠছে। বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এ দৈন্যতা আর নিকৃষ্টভাবে দৃশ্যমান। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু অসন্তুষ্ট হবে বলে মানবাধিকারজীবী, সংস্কৃতিজীবী, বিবেকজীবী সবারই মুখে রা! হত্যা, ক্রসফায়ার, লাঞ্ছনা-লুণ্ঠন যাই চলুক না কেন রাষ্ট্রজুড়ে এরা মুখে ঠুলি পরেছে।

অবাক লাগে, একজন মহাশ্বেতা দেবী, একজন মেধা পাটকার, একজন অরুন্ধতীর কি দেখা মিলবে না বাংলাদেশে!

এই ভিক্ষুক সমষ্টির ভেতর থেকে লোভ-লালসা, পুরস্কার-তিরস্কারের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে একটা-দুটো মানুষও কি মিলবে না?

নিদেনপক্ষে মিলবে না কি একজন আহমদ ছফা অথবা একজন হুমায়ুন আজাদ!

৬.

মানুষ ছোট হবে আর জাতি বড় হবে এই আশা করা মূর্খতা। ভিক্ষুক, চাটুকার দিয়ে ধরা যাবে দেশ আর রাষ্ট্র সুশাসন পাবে এ আশায় বাতি জ্বলবে না কখনোই। তাই মানুষ দরকার। বিবেকমান, স্বার্থবুদ্ধিহীন, বোকা মানুষ, জনপ্রেমী-দেশপ্রেমী মানুষ চাই। নুরুলদীনের কণ্ঠ মিলিয়ে তাই বলতে চাই, জাগো বাহে কোনঠে সবাই

 

পুনশ্চ : একটা গল্প বলি। ইরানের কবি শেখ সাদি একটা মাটির ঢেলা কুড়িয়ে পেয়েছেন। নাকের কাছে নিয়ে দেখেন মাটির ঢেলায় গোলাপের অপূর্ব গন্ধ।

অবাক হয়ে কবি ভাবছেন, মাটির ঢেলায় থাকবে সোঁদা, পচা গন্ধ। কিন্তু একি! এই অপূর্ব গন্ধ এলো কোত্থেকে! কবি মাটির ঢেলাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এত অপরূপ গন্ধ পেলে কই? মাটির ঢেলা কবিকে অবাক করে দিয়ে বলল, কবি, আমি যেখানে জন্মেছিলাম, তার ওপরে ছিল ইরানী বসরাই এক গোলাপের গাছ। প্রতিদিন বসরাই সুগন্ধী গোলাপ দিনে ফুটত, রাতে ঝরে পড়ত আমার ওপর। দিনের পর দিন সেই গোলাপের গন্ধ আমাকে বদলে দিয়েছে।

প্রিয় পাঠক, সেই বসরাই ইরানী গোলাপ ছাড়া দেশজুড়ে কি ভিক্ষুক আর চাটুকার হবার এই অন্ধ প্রবণতা বন্ধ হবে!

বি. দ্র. : দেশে এসেছেন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। শোনা যাচ্ছে মূল ধারার রাজনীতিতে তিনি আসন নেবেন। অন্যদিকে তারেক জিয়াকে দ্রুত দেশে আনার পথ খুঁজছে বিএনপি। আর চারপাশজুড়ে তাই শুরু হয়েছে জয় এবং তারেক বন্দনা। রাজনৈতিক ভিক্ষুকরা ছুটছে দুজনের পানেই।

ঢাকা।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.