Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ১২তম সংখ্যা চৈত্র ১৪১৬ •  9th  year  12th  issue  Mar - Apr  2010 পুরনো সংখ্যা
ম্যাডেলেন Download PDF version
 

সাহিত্য

ম্যাডেলেন
মনীষা রায়

এক বুধবার সকালে আমার বান্ধবী জ্যাকলীন টেলিফোন করে জিজ্ঞাসা করল আমি সেই রাত্তিরটা ওদের মেয়ে ম্যাডেলেনের কাছে থাকতে পারব কিনা। ওদের দেড় বছরের ছোট ছেলে, অর্থাৎ ম্যাডেলেনের ছোট ভাই রিকি হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে; একশ চার ডিগ্রির ওপর জ্বর, ডাক্তাররা সন্দেহ করছেন ম্যানেনজাইটিস। ওকে হাসপাতালে থাকতে হবে অন্তত প্রথম রাতটা। ওর স্বামী আফিসের কাজে শিকাগো গেছে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুর এই বিপদে তাদের অনুরোধ ফেলার প্রশ্নই ওঠে না, যদিও ওদের পাঁচ বছরের মেয়েটার পাকামো আমার খুব একটা ভালো লাগে না। মাত্র ত' একটা রাতের ব্যাপার। ও ঘুমোবে ওর ঘরে, আমি গেষ্ট রুমে।

'ম্যাডেলেনকে সব বুঝিয়ে বলেছি। ও খুব এক্সাইটেড তোমার সঙ্গে রাত কাটাবে বলে। আমার জিজ্ঞেস করেছে, 'মাম্, ডুয়ু থিন্ক শী'ল টেল মি স্টোরিস ওব দ্য গড ওইথ দ্য এলিফ্যান্ট হ্যাড?' একটু থেমে, 'কুড্ য়ু প্লীজ?' বলে দুয়েকটি জরুরি বিষয় বুঝিয়ে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে টেলিফোন রেখে দিল জ্যাকলীন।

বিকেল পাঁচটায় ওদের বাড়ি গিয়ে দেখি জ্যাকলীন তাড়াহুড়ো করে গাড়ি বার করছে। আমাকে বাড়ির চাবি দিয়ে ও বেরিয়ে গেল। ম্যাডেলেনের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখি ও নিজের বিছানায় উবু হয়ে টিভিতে কার্টুন দেখছে। আমার দেখে বলল, 'মাম্ ওয়ান্টস আস্ টু ঈট ম্যাকরনি এ্যান্ড চীজ। ডুয়ু নীড এনি হেল্প টু মেক ইট? যাষ্ট হলার ইফ য়ু নীড মি'। বলেই তার টেডি বেয়ার জড়িয়ে টিভিতে মন দিল। রান্না ঘরে ঢুকে স্তুপীকৃত নোংরা বাসন কোসন ধুয়ে গুছিয়ে ম্যাকরনি য়্যান্ড চীজ রান্না করে ম্যাডেলেনকে ডাকার আগেই সে এসে হাজির।

'খাবার পরে আমরা কী করবো, আমি সব প্ল্যান করে রেখেছি। তুমি আমাকে তোমাদের দেব-দেবীদের সব গল্প শোনাবে। তারপর আমরা দুজন গেষ্ট রুমের বিছানায় ঘুমোব। ভাগ্যিস বিছানাটা কুইন-সাইজ। আমি আবার ঘুমের মধ্যে খুব হাত পা নাড়ি কিনা।' বলে গ্যাঁট হয়ে সে খাবার টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসল।

'খাবার পরে আমরা কী করবো, আমিও তার প্ল্যান করে রেখেছি। আমরা দুজনে রান্না ঘরের সব কিছু ধুয়ে গুছিয়ে রাখব, তারপর তুমি স্নান করবে। এক কাপ গরম দুধ খেয়ে শুতে যাবে আর আমি তোমার বিছানার পাশে রাখা বই থেকে পড়ে শোনাব আর তুমি তোমার নিজের বিছানায় ঘুমোবে। আমি কারো সঙ্গে শুতে পারি না' আমি বললাম।

ম্যাডেলেন আমার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ গোঁজ হয়ে বসে রইল। তারপর নিজের মনে বলে উঠল, 'আই উইশ আই ওয়াজ ইন দ্য হস্পিটাল। হোয়াই কান্টয়ু টেল মি অ্যা স্টোরি? যাস্ট ওয়ান প্লী-জ।' বলে এমন করুণভাবে তাকাল যে আমার মন গলে গেল। ওর কথা বার্তায় আর ভাব ভংগিতে ওর বয়সটা মনে রাখা কঠিন।

'ওকে, আমি তোমার একটা গল্প বলব, তোমার স্নান হয়ে গেলে। তারপর কিন্তু ঘুমোতে হবে।'

'ডীল্' বলে ও হাত বাড়াল 'হাই ফাই' করার জন্য।
স্নান সেরে ম্যাডেলেন তার রাত্রিবাস পরে আমার ঘরে এসে হাজির। 'এই ঘরটা খুব কোজি, ডোন্টয়ু্য থিন্ক? আমরা বেশ কম্বলের তলায় শুয়ে গল্প করব। তারপর আমার যখন ঘুম পাবে তখন তুমি আমাকে আমার ঘরে শুইয়ে দিও। লিভিং রুমে কখনও ঘুমিয়ে পড়লে আমার বাবা তাই করেন।' আমি আর কিছু বললাম না। আহারে, ছোট ভাইটার বড় অসুখ, বাবা- মা কাছে নেই। ওর সর্দারি আর পাকামো ভুলে গেলাম। তাকিয়ে দেখি মাথার ঢেউখেলা গুচ্ছ পিংগল চুলের প্রান্ত ভেজা। একটা তোয়ালে এনে মাথাটা মুছে চুল আঁচড়ে দিলাম। দুজনে বিছানায় অর্ধ-শায়িত অবস্থায় আমার গল্প বলার জন্য তৈরী হচ্ছি তখন টেলিফোন বেজে উঠল। ম্যাডেলেন ঝাঁপিয়ে উঠে আমার আগেই রিসিভারটা তুলে ফেলল। কথা বার্তায় বুঝলাম ওর মা ফোন করেছে। একটু বাদে অনিচ্ছা সত্বেও রিসিভারটা আমার দিকে এগিয়ে দিল।

জ্যাকলীন জানাল যে রিকির জ্বর কমের দিকে, রক্ত পরীক্ষা করে মারাত্নক কিছু পাওয়া যায়নি। ও সকালে বাড়ি ফিরে আসবে। আমাকে ম্যাডেলেনের সংগে থাকার জন্য আবার ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে দিল। খুশি মনে আমি ম্যাডেলেনকে খবরটা জানালাম আর গণেশের গল্প শুরু করলাম। দু-তিন লাইন বলার পরই ম্যাডেলেন হঠাৎ বলে উঠল, 'আচ্ছা অমার মা কি তোমার কখনও বলেছে যে আমার ভাই একদিন বাথ-টাবে ডুবে মরে গিয়েছিল? প্যারামেডিক এসে অনেক যন্ত্রপাতি দিয়েও বাঁচাতে পারেনি। অনেক দিন লেগেছিল ওকে স্বর্গ থেকে ফিরিয়ে আনতে। আমার মা কেঁদে কেঁদে ভগবানকে অনেক প্রার্থনা করার পর এক মাস পর ওকে পিরিয়ে দিয়েছেন।' বলে ওর টেডি বেয়ারের দিকে তাকিয়ে রইল।
'সত্যি? না, আমি শুনিনি ত'।' বলে আমি চুপ করে রইলাম। বুঝতে পারলাম এখন গণেশের গল্প ঠিক জমবে না। তার চেয়েও অন্য জরুরী কথা ওর মাথায় ঘুরছে। ছোট ভাইয়ের প্রাণের সংকট কেটে যাবার খবর পাবার সঙ্গে সঙ্গে ওর কল্পনায় তার মৃতু্যর সম্ভবনা বেঁচে উঠল। তিন বছরের ওপর তার একাধিপত্য ছিল বাবা-মার স্নেহের জগতে। সেখানে ছোট ভায়ের প্রবেশ একটা মারাত্নক ঘটনা বৈকি। ম্যেডেলেনের দিকে তাকিয়ে দেখি সে গম্ভীর মুখে কী যেন চিন্তা করছে। একটু পর আমার গা গেঁষে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করে বলল,
'জান, ওর ফিউনারেলে কারা এসেছিল?
মাথা নেড়ে জানালাম, জানি না।

'পাশের বাড়ির কালো বেড়ালটা আরও পাঁচটা কালো বেড়ালকে নিয়ে এসে হাজির। তারা ছ'জন মিলে একটা সোনার তৈরী বা্ক্ম; এনে রিকির মৃতুদেহ তার ভেতর ঢুকিয়ে ঘাড়ে করে নিয়ে গেল স্বর্গে। আমার বাবা তখন অফিসে, মা কেঁদে কেঁদে একশেষ।'
'আর তুমি? তুমি কাঁদনি?'

'না, একদম না। আমি জানতাম রিকি বাঁচবে না। ও ত' জন্ম থেকেই ভীষণ রোগা কিনা।' বলে ও কম্বলের আরও ভেতর ঢুকে চোখ বন্ধ করল। টেডি বেয়ার এখনও তার বাহু বন্ধনে আবদ্ধ। আমি সেই নিস্পাপ শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে রইলাম অনেকক্ষন- শিশু মনের অলি গলির চেহারা আমরা বয়স্করা কতটুকুইবা জানি বা বুঝি! ওর কথা মত ওর নিজের ঘরের বিছানায় রাখতে পারলাম না। রাত্রে ঘুমের মধ্যে ম্যাডেলেনের নড়াচড়ার ফলে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল কয়েকবার।
পরদিন সকালে জ্যাকলীন বাড়ি এল, তখনও ম্যাডেলেন আমার বিছানায় অঘোরে ঘুমোচ্ছে।

আমি কোনও দিন ওর মাকে আমাদের ভেতর কী কথা হয়েছে বলিনি। সেই রাতের পর থেকে ম্যাডেলেনের সঙ্গে আমার একটা গোপন সম্পর্ক তৈরী হয়েছিল যা প্রায় পনেরো বছর পর আজও অটুট আছে।

ক্যাম্ব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.