Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ১২তম সংখ্যা চৈত্র ১৪১৬ •  9th  year  12th  issue  Mar - Apr  2010 পুরনো সংখ্যা
সকল বিশ্বের সেরা বিশ্ব আমাদেরই মহাবিশ্ব Download PDF version
 

সাহিত্য

 

সকল বিশ্বের সেরা বিশ্ব আমাদেরই মহাবিশ্ব

 

মীজান রহমান

 

.

  শিরোনামটি কারো কারো কাছে আপত্তিকর মনে হতে পারে, বিশেষ করে সাত আসমানের ওপরকার জান্নাতুল ফেরদৌসের ওপর যাদের অগাধ বিশ্বাস। হয়ত ভাবছেন সেই বিশ্বটির অস্তিত্ব অগ্রাহ্য করেই আমি বর্তমান বিশ্বটিকে সর্বোচ্চ স্থানে বসাতে চাইছি। না, সেরকম কোন অভিসন্ধি আমার নেই। আমার নিবন্ধে সেরা, বিশ্ব এ শব্দগুলো কোনো পরজাগতিক বা আধ্যাত্মিক অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে না, হচ্ছে গাণিতিক অর্থে। পরোক্ষভাবে দার্শনিক অর্থেও, এবং সেদিক থেকে দেখতে গেলে আধ্যাত্নিকতার সঙ্গে একটা আবছা সম্পর্ক আছে বইকি। কিন্তু সেসব প্রসঙ্গে নাহয় একটু পরেই যাই। প্রথমে চলুন বর্শি বর্শা নিয়ে মাছ ধরতে যাই নদীতে।

  ঠাট্টা করছি না। ছোটবেলায় গ্রামে থাকাকালে কাকাদের সঙ্গে মাছ মারতে যেতাম মাঝে মাঝে। দিনের বেলায় তো যেতামই, কখনো কখনো রাতেও। রাতের মৎস্য শিকারের কায়দাকানুনই আলাদা। বর্শিছিপে কাজ হয়না তেমন, কোঁচ লাগে। বড় মাছেরা তখন একেবারে তীরের কাছে এসে মনের আনন্দে ভেসে বেড়ায়। আমি দুএকবার কোঁচ ছুড়ে ধরবার চেষ্টা করেছিলাম। একবারও লাগেনি। কাকারা বুঝিয়ে দিতেন কেন লাগছে না। মাছটাকে যেদিকে দেখা যাচ্ছে ঠিক সেদিকে তাক করলে হবে না, সামান্য দূরে তাক করতে হবে। তার কারণ আমাদের চোখ পানির নিচে গিয়ে সরাসরি মাছটিকে দেখছে না, দেখছে একটু পেছনে। মহা রহস্য! মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতাম না তখন। এখন, এই এতগুলো বছর পর, যেটা বুঝি না সেটা হল এমন একটি জটিল ব্যাপার, যার সঙ্গে কিছুটা গণিত, কিছুটা পদার্থবিদ্যা মেশানো আছে, সেটা আমার অশিক্ষিত কাকারা জানতেন কি করে।

  আমার এই লেখাটির লক্ষ্য হবে গভীর রাতে নদীতীরে মাছ ধরতে যাওয়ার যে আনন্দ যে বিড়ম্বনা, তার সঙ্গে সকল পৃথিবীর সেরা পৃথিবীর একটা সূক্ষ সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা।

  স্কুলের দশ এগারো বছরের ছাত্রছাত্রীরাও জানে, পদার্থের তিনটি প্রধান রূপ- কঠিন, তরল ও বায়বীয়।ঘনত্বের বৈষম্যই তাদের ভিন্ন ভিন্ন রূপের জন্যে দায়ী। একই আয়তনের একই পদার্থের তিনরূপের তিন ওজন- বায়ু সবচেয়ে হালকা, কঠিন সবচেয়ে ভারি। যেমন, বায়ু, জল ও বরফ। আলোর গতি তিন মাধ্যমে তিনরকম। কোঁচ দিয়ে মাছ ধরার সমস্যাটিই সেখানে। চোখ দিয়েদেখার যে কাজটি, সেটি নির্ভর করে আলোকরশ্মির ওপর। বায়ু থেকে পানিতে প্রবেশ করবার পর আলোর রেখাটি খানিক বেঁকে যায়, কিন্তু আমাদের চোখ বাঁকে না, ধাঁধাটি হয় তখনই। আমরা যেখানে মাছটাকে দেখছি বলে ভাবছি, ওটা ঠিক সেখানে নয়। এটা দৃষ্টিভ্রম নয়, প্রাকৃতিক নিয়মেরই একটা বৈশিষ্ট্যমাত্র। দৃষ্টিভ্রম না বলে দৃষ্টিচ্যুতি বললে বোধ হয় বিজ্ঞানের সঙ্গে খাপ খায় ভাল। আলোকরশ্মির এই বেঁকে যাওয়ার ব্যাপারটিকে বলা হয় রিফ্র্যাকসন- প্রতিসরণ। আদিকাল থেকেই এ দৃশ্যটি মানুষের চোখে পড়েছে। এবং চোখে পড়ার পর এটা নিয়ে মানুষ চিন্তাভাবনা করেছে। ঠিক আছে, পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি আলো বেঁকে যাচ্ছে পানিতে ঢোকার পর, কিন্তু কেন? পানির মধ্যে এমন কি আছে যাতে আলোরেখাকে সোজা পথে না গিয়ে বাঁকা পথে যেতে হয়? প্রশ্নটা সহজ এবং স্বাভাবিক। জবাবটি সহজ নয়। বিজ্ঞানকে দেড় হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল এই কেন প্রশ্নের পুরোপুরি মীমাংসা পেতে। তবে একটা আনুসাঙ্গিক প্রশ্ন- আলোকরশ্মি ঠিক কতখানি বাঁকে এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে প্রবেশ করবার পর, তার সঠিক পরিমাপ বের করা কিন্তু অত শক্ত নয়।

 কথিত আছে যে খ্রীষ্টপূর্ব দুই শতকে মিসরের থেবাইড শহরের টলেমি নামক এক বিজ্ঞানী প্রতিসরণের একটা আনুমানিক পরিমাণ বের করেছিলেন। কিন্তু সেসময় জ্যামিতি ছাড়া গণিতশাস্ত্রের অন্য কোন শাখা বিকাশলাভ করেনি। ফলে তাঁর পক্ষে কোন গাণিতিক সূত্র রেখে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সে কাজটি করেছিলেন বাগদাদের ইবনে সাল নামক এক বিজ্ঞানী, ৯৮৪ খৃষ্টাব্দে। আজকে যেটাকে স্নেলস ল বলে পড়ানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের পদার্থ বিদ্যার ক্লাসে সেটির জনক আসলে এই ইরাকী ভদ্রলোক। সূত্রটি এরকমঃ

                           Sini =nsinr

 

বাতাস থেকে পানির দিকে আসতে আলোর রেখাটি লম্ব থেকে কতটা কোণে, তার মাপ নির্দেশ করে i। কতটা বেঁকে যাচ্ছে তা বোঝাচ্ছে r সংখ্যাটিতে। n হল একটি পদার্থগত গুণের মাপ, যাকে বলা হয় রিফ্র্যাকটিভ ইন্ডেক্স, বা প্রতিসরণসূচক। পদার্থের ঘনত্ব অনুযায়ী একেক মাধ্যমের একেক সূচক। পানির যে সূচক তেল, সিরা, ঘি, এগুলোর সূচক এক নয়।

 কৌতূহলী পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারেঃ তত্বটি আবিস্কার করলেন একজন, নাম হল আরেকজনের, এ আবার কেমনতরো বিচার। ন্যায্য প্রশ্ন, তবে বিজ্ঞানের সব শাখাতেই এধরণের আপাত-অবিচার ঘটে এসেছে যুগ যুগ ধরে। অনেক সময় দৃশ্যত অবিচার মনে হলেও আসলে হয়ত অবিচার নয়। কারণ যে-ব্যক্তিটি নাম পেলেন তিনি হয়ত প্রথম ব্যক্তিটির কাজ সম্বন্ধে একেবারেই সচেতন ছিলেন না, এবং হয়ত তাঁর কাজটিই ছিল বিজ্ঞানের বিচারে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আবার অনেক সময় পূর্বসূরীর কাজটি ভাল করে লিপিবদ্ধ হয়নি বলে উত্তরকালের গবেষকদের হাতে পৌঁছায়নি। অবশ্য দুচারবার যে অন্যায়ভাবে কারো কাজ সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়নি তা নয়। স্নেলের সূত্রের ব্যাপারে ঘটনাটি কি ছিল তা জোর দিয়ে বলা মুস্কিল। ইতিহাস থেকে শুধু এটুকু জানি যে ইবনে সালের আবিষ্কারের পরপরই যুদ্ধ লেগে যায় সারা ইউরোপ ব্যাপী। একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রায় পুরোটাই তো ক্রুসেডের অন্ধ আবেগে উন্মত্ত খৃষ্টান বাহিনী মুসলিম নিধন যজ্ঞে মেতে উঠেছিল স্পেন থেকে তুরস্কের সীমান্ত পর্যন্ত। ইতিহাসের সেই ঘোর বিপাকের সময় কত মুসলিম গবেষকের কত কাজ হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অন্ধকারে, কত বিশাল সৃষ্টি আর কত গূঢ় তত্ব চরম অবলীলায় পায়ের তলায় মাড়িয়ে দিয়েছে রক্তলুলোপ আগ্রাসীরা কে জানে।

 তারপর, ১৬২১ সালে উইলফ্রেড স্নেলিয়াস (১৫৮০-১৬৩০)নামক এক ওলন্দাজ বিজ্ঞানী তাঁর নিজস্ব গবেষণা দ্বারা সূত্রটি পুনরাবিষ্কার করেন প্রায় একই রূপে। কথিত আছে যে তাঁর আগেও, ১৬০১ খৃষ্টাব্দে ঠমাস হ্যারিয়েট নামক এক বৃটিশ জ্যোতির্বিদ ও গাণিতিক ঠিক একই কথা বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু হ্যারিয়েট বা স্নেল দুজনের কেউ তাঁদের কাজগুলো লিপিবদ্ধ করে যাওয়ার সুযোগ পাননি। শেষে ১৬৩৭ সালে, ফ্রান্সের কিংবদন্তীয় দার্শনিক-গাণিতিক-বিজ্ঞানী রেনে ডেকার্ট (১৫৯৬-১৬৫০), পুরোপুরি গণিতের সাহায্যে সূত্রটির প্রমাণ দেন। তাঁর লেখাতে সূত্রটি প্রকাশ পায় এভাবেঃ

      n=পানির ভেতর আলোর গতিবেগ/ বায়ুতে আলোর গতিবেগ

 

পানির বেলায় সূচক, অর্থাৎ n, এই সংখ্যাটির মান যে ১.৩৩ সেটা আগে থেকেই জানা ছিল। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে ডেকার্ট সাহেবের মতানুসারে বাতাসে আলোর যে গতি পানিতে তার চেয়ে বেশি। এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত তথ্য নয়। এটা ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস। এটা যে আসলে সত্য নয় তা প্রমাণ করেছিলেন লিওন ফুকো ও হিপোলাইট ফিজো নামক দুই পদার্থবিজ্ঞানী, ১৮৫০ সালে। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত আইজ্যাক নিউটন(১৬৪২-১৭২৭) সহ সেযুগের বড় বড় বিজ্ঞানী ও গাণিতিক সেই একই ধারণা পোষণ করতেন। মজার ব্যাপার যে ডেকার্ট সাহেবের পানিতে আলোর বেগ বিষয়ক ধারণাটি ভুল হলেও শেষ ফলাফলটিতে কিন্তু কোন ভুল ছিল না। তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কোন কোন পর্যবেক্ষক এমন মন্তব্য করেছেন যে মহামতি ডেকার্ট স্নেলের সূত্র প্রমাণ করতে গিয়ে ভুল একটা করেননি, করেছিলেন দুটি, যারা পরস্পরকে কাটাকুটি করে শেষমেষ শুদ্ধফল দিয়েছে। তাঁর মত বিশাল ব্যক্তির ধীশক্তির ওপর এধরণের কটাক্ষমূলক উক্তি খুবই দুঃখজনক, তবে ইতিহাসের উজ্জ্বলতম তারকাদের একজন হলেও তাঁর সময়কালের বিতর্কিত বিজ্ঞজনদের প্রথম সারিতেই বোধ হয় ছিল তাঁর স্থান। তাঁর ভক্তের যেমন অভাব ছিল না, শত্রুরও অভাব ছিল না। এবং বেশ শক্তিশালী শত্রু। ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন্স ছিলেন সেযুগের পদার্থবিদ্যা জগতে স্বনামধন্য পুরুষ। ডেকার্ট ছিলেন তাঁর বাবার বয়েসি, এবং কৈশোরের আদর্শব্যক্তি। আসলে হাইগেন্সের বাবা, কন্সটান্টিন হাইগেন্স নিজেও ছিলেন একজন কৃতী বিজ্ঞানী ও সঙ্গীতবিশারদ, এবং হল্যাণ্ডের নামকরা বুদ্ধিজীবিদের অন্যতম। বড় কথা, ডেকার্ট ছিলেন কন্সটান্টিনের ব্যক্তিগত বন্ধু এবং পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ। কিন্তু তা সত্বেও বড় হয়ে ক্রিশ্চিয়ান যখন নিজের পরিচয়েই বিজ্ঞানজগতে বৈশিষ্ট্য অর্জন করেন, এবং ডেকার্টের বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম ভাল করে পরীক্ষা করবার সুযোগ পান, তখন তিনি লিখলেনঃ আমি যখন ডেকার্ট সাহেবের লেখালেখির সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই, তখন বলতে গেলে একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম আমি, কোন দোষত্রুটি খুঁজে পাইনি কোথাও। অবশ্য আমার বয়সই বা কত ছিল তখন- পনেরো কি ষোল। মাঝে মাঝে হয়ত একটু খুঁতখুঁত করত মন, তখন ভাবতাম এটা নিশ্চয়ই আমারই দোষ, আমিই ভাল বুঝতে পারছি না। কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে টের পাই যে ওটা আমার বোঝার ভুল নয়, তাঁরই ভুল। প্রকৃত সত্যটি হল যে পদার্থবিজ্ঞানের বিষয়ে মহামতি ডেকার্টের প্রায় সব কাজই ত্রুটিপূর্ণ-ভ্রান্ত চিন্তাভাবনা দ্বারা লব্ধ।

   আলোর নিচে আঁধার, ডেকার্ট ছিলেন তারই এক আশ্চর্য উদাহরণ। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁরা ইতিহাস সৃষ্টি করেন, যাঁরা যুগের গতি ঘুরিয়ে দেন। অথচ তাঁর চরিত্রে আত্মবিশ্বাসের একটু অভাব হয়ত ছিল, যার কারণে তিনি অনেক সময় লোকের সঙ্গে অনর্থক ঝগড়া বাধাতেন, মিথ্যা সন্দেহে অনুগত ভক্ত ও বন্ধুদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন, কানকথায় বিশ্বাস করে কাছের মানুষকে দূরে সরিয়ে দিতেন। অসাধারণ মানুষের চরিত্রেও যে মাঝে মাঝে সাধারণ লোকেদের দুর্বলতা থাকতে পারে ডেকার্ট সাহেব ছিলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তবে তাঁর ঘোরতম শত্রুদেরও অস্বীকার করবার উপায় নেই যে সভ্যতার ইতিহাসে তাঁর মত করে চিরস্থায়ী নাম রেখে যাওয়া খুব কম লোকের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। মধ্যযুগের ইউরোপে একটা সময় ছিল যখন রেনে ডেকার্ট ছিলেন দর্শন ও গণিতশাস্ত্রের একচ্ছত্র সম্রাট। দর্শনশাস্ত্রের ছাত্রদের কারুরই অজানা নয় যে তাঁকে বলা হয় আধুনিক দর্শনের জনক, যেমন গ্রীক দার্শনিক থ্যালিসকে(খৃঃপূঃ ৬৪০-৫৪৬) বলা হয় প্রাচীন দর্শনের। উপরন্তু তিনিই প্রথম ব্যক্তি যাঁর হাতে গ্রীক জ্যামিতি আর আরব বীজগণিত হাতে হাত মেলাতে সক্ষম হয়। তিনিই শেখালেন কেমন করে জ্যামিতির চিহ্নকে গণিতের সংখ্যার মাধ্যমে দেখা ও বোঝা সম্ভব। আজকে যেটাকে আমরা কো-ওর্ডিনেট জিওমেট্রি বলি( বাংলায় আক্ষিক জ্যামিতি), ওটা তাঁরই আবিষ্কার। গণিতের প্রথমবর্ষের ছাত্রছাত্রীরা একবাক্যে বলতে পারবে কার্টেজিয়ান কো-ওর্ডিনেটস কাকে বলে। কার্টেজিয়ান শব্দটি ডেকার্ট থেকেই উদ্ভূত।

আলোকরশ্নি ও দর্শনের ওপর তাঁর যে চিন্তাধারা তার ওপর দীর্ঘ পাঁচ বছর খাটাখুটি করে একটা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন ডেকার্ট সাহেব The Treatise of the World, or of Light নামে, যা শেষ পর্যন্ত ছাপতে সাহস পাননি। সেসময় সারা ইউরোপ জুড়ে ছিল চার্চের দোর্দণ্ড প্রতাপ। ইঙ্কুইজেশনের শ্যনদৃষ্টি আর খড়গহস্ত করালমূর্তিতে উপস্থিত সর্বত্র। আধুনিক বিজ্ঞানের আদিগুরু বলে অভিহিত মহামহিম গ্যালিলিও গ্যালিলির (১৫৬৪-১৬৪২) মৃত্যুদণ্ড মকুব করে যাবজ্জীবন গৃহবন্দীত্বের দণ্ড দেওয়া হয় ১৬৩৩ সালের ২২শে জুন, রোমের ধর্মীয় আদালতের বিচারসভায়। (অনেকটা আফগানিস্তানের তালিবান শাসনকালের কথা মনে করিয়ে দেয় না কি?)গ্যালিলির অপরাধঃ Dialogue on the Two Greatest Systems of the World: the Ptolemic and the Copernican গ্রন্থটির প্রণয়ন ও প্রকাশ। গ্রন্থটিতে তিনি ক্লডিয়াস টলেমির( ৯০-১৬৮ খৃঃ) ভূকেন্দ্রিক নভোমণ্ডল তত্বকে বাতিল করে পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ধর্মযাজক নিকোলাস কপার্নিকাস( ১৪৭৩-১৫৪৩) সাহেবের সৌরকেন্দ্রিক বিশ্বের মতবাদকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তৎকালীন চার্চের নেতৃবৃন্দের দৃঢ়বিশ্বাস ছিল যে টলেমির তত্বই ঠিক, কারণ ওটা বাইবেলসম্মত। গ্যালিলি অত্যন্ত প্রভাবশীল ব্যক্তি ছিলেন তখনকার ইউরোপে। তিনি টেলিস্কোপের আবিষ্কারক। সেই টেলিস্কোপের সাহায্যে সুদূর গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করতে শিখিয়েছিলেন তিনি সহবিজ্ঞানীদের। বৃহস্পতির চারটে উপগ্রহ তাঁরই আবিষ্কার। শনিগ্রহও তাঁর চোখেই ধরা দেয় প্রথম। বলতে গেলে মহাকাশের পর্দা তিনিই উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন মানবজাতির জন্যে। গত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ দশজন বিজ্ঞানীর তালিকা প্রস্তুত করতে বলা হলে তাঁর নামটিই সর্বাগ্রে থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। ১৬২৩ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ Saggariatore এর এক জায়গাতে একটা মজার কথা লিখেছিলেন তিনিঃ দর্শন নামক যে মহান শাস্ত্রটির সঙ্গে আমরা মোটামুটি পরিচিত তা পরিস্কার অক্ষরে লেখা আছে একটি বিশাল পুস্তকে, যার আরেক নাম বিশ্বব্রম্মাণ্ড। কিন্তু সে অক্ষরের ভাষা যদি জানা না থাকে তাহলে কারো পক্ষে সে-পুস্তকের মর্ম উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। এই ভাষাটির নাম গণিত। এবং এর অক্ষরগুলো দেখতে কখনো ত্রিভুজের মত, কখনো বহুভুজ বা বৃত্ত। সেভাষা জানেনা যে অভাগা সে অন্ধ পথিকের মত হাতড়ে বেড়াবে চতুর্দিকে, কিন্তু সে কখনোই পারবে না সেই মহাগ্রন্থের রহস্য আবিষ্কার করতে। অঙ্কের সাঙ্কেতিক ভাষাতে প্রকৃতি নিজের পরিচয় রেখে গেছে, এটা হয়ত বর্তমান যুগের লেখকদের পক্ষে বলা সহজ, কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীর বিজ্ঞান তো একেবারেই শৈশব অবস্থায়। সেসময় কেমন করে একটা মানুষ এমন অসাধারণ কথা বলে গেলেন জানিনা। অথচ দেখুন গ্যালিলির মত যুগান্তকারী মহাপুরুষকেও ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাতে উদ্যত হয়েছিল তৎকালীন চার্চ। তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি শুধু দুটি কারণে। এক, তিনি হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছিলেন মূর্খ পাদ্রীদের কাছে। দুই, তাঁর অনেক ক্ষমতাশীল বন্ধু ছিল ইউরোপের সর্বত্র।

  গ্যালিলির এই মর্মান্তিক পরিণতিতে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন ডেকার্ট সাহেব। তাঁর Treatise of the World বাইরে জানাজানি হলে একই রকম বিপদে পড়তে হবে তাঁকেও সেবিষয়ে তাঁর কোন সন্দেহ ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক হলেও কপার্নিকাস তত্বের প্রতি তাঁরও সমর্থন ছিল। সুতরাং একটু ঘাবড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ডেকার্ট যেন একটু বেশিরকম ঘাবড়ে গেলেন। সোজা কথাগুলো ঘুরিয়ে বলতে শুরু করলেন। ছদ্মনামে লিখতে আরম্ভ করলেন। জন্মভূমি ফ্রান্সে বসবাস করা নিরাপদ নয় ভেবে নেদারল্যাণ্ডসে চলে গেলেন। সেসময় চার্চের দাপট সবচেয়ে বেশি ছিল ফ্রান্স, ইতালি আর স্পেনে। নেদারল্যাণ্ডসে প্রটেস্টান্টদের ঘাঁটি থাকাতে অপেক্ষাকৃত উদার আবহাওয়া সেখানে। তাছাড়া ডাচ বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা ডেকার্টকে খুব সম্মানের চোখে দেখতেন। বিপদে আপদে আশ্রয় দেবার অনেক মানুষই ছিল সেখানে।

  প্রতিসরণ তত্বের ওপর ডেকার্টের যে চিন্তাধারা, অর্থাৎ আলোর গতি বায়ুর চেয়ে পানিতে বেশি, এই মতবাদ সেকালে খুব জনপ্রিয় হলেও এর বিপক্ষে যাঁরা অবস্থান নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন পিয়ের দ্য ফার্মা ( ১৬০১-১৬৬৫) নামক এক বুদ্ধিজীবি। ফার্মা সাহেব ছিলেন এক মজার চরিত্র। তাঁর পেশা ছিল আইন, গণিত বা বিজ্ঞান করার কল্পনা নিয়ে তিনি বড় হননি। শুধু ওকালতিই করতেন না তিনি, ফ্রান্সের পার্লামেন্টেরও নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ওকালতি ও পার্লামেন্টীয় রাজনীতি করে যেটুকু সময় পেতেন সেটুকু তিনি ব্যয় করতেন গণিত আর বিজ্ঞানচর্চায়। এ দুটি ছিল তাঁর শখের বিষয়-আমাদের অনেকের যেমন থাকে বাগানের শখ বা ছবি আঁকার শখ। কিন্তু পিয়ের ফার্মা ছিলেন এক অবিশ্বাস্যরকম মেধাবী পুরুষ। শখের অঙ্ক করে করেই অঙ্কের জগতে অমর হয়ে আছেন তিনি। গণিতের বেশ কটি শাখাতেই তাঁর ছাপ। তাঁর গল্প বলতে গেলে আলাদা করে লিখতে হয়। এখানে শুধু ডেকার্ট সাহেবের সঙ্গে  তাঁর ঠোকাঠুকির গল্পটাই বলব সংক্ষেপে।

  ফার্মা স্কুলকলেজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর সাধারণ বুদ্ধিতেই মনে হয়েছিল যে আলোর গতি বায়ুর চেয়ে পানিতে বেশি হবে সেটা কেমন অদ্ভুত মনে হয়। সবাই জানে যে পানির ঘনত্ব বায়ুর চেয়ে বেশি। একটা ঘনতর মাধ্যম দিয়ে ভ্রমণ করতে আলোকরশ্নি বেশি বাধা পাবে, এবং তাতে তার গতি কমে যাবে সেটাই তো স্বাভাবিক। তবে স্বাভাবিক মনে হওয়াটাই প্রমাণ নয়। বায়ুতে যে আলো পানির চেয়ে বেগবান হবে তার কোন প্রমাণ ছিল না সেসময়। তার ওপর রেনে ডেকার্টের মত একজন দেশবরেণ্য মানুষ ঠিক উলটো মতবাদের ওপর ভিত্তি করে স্নেল সূত্রের সঠিক প্রমাণ পেয়েছেন। সুতরাং ওটা ভুল হয় কি করে। সারা ইউরোপ জুড়ে ছিল রেনে ডেকার্টের বিশাল ভক্তবাহিনী। ১৬৫০ সালে তাদের গুরুদেব ইহলোক থেকে বিদায় নিলেও তাঁর পক্ষ নিয়ে যে-কোন তর্কযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পিছপা ছিলেন না তাদের কেউই। ফার্মাবিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন ক্লার্সেলিয়ে নামক এক অন্ধ ডেকার্টভক্ত বিজ্ঞানী-দার্শনিক যিনি নিজের উদ্যোগে গুরুর অপ্রকাশিত গ্রন্থ Treatise of the World প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু পিয়ের ফার্মাও সহজে হার মানবার পাত্র ছিলেন না। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে আলোর গতি সম্বন্ধে তিনি যা ভাবছেন তাই ঠিক, ডেকার্টের ধারণা ভুল। ডেকার্টপন্থী বিরোধীতার মুখে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে দিনরাত খাটাখুটি করে একটি বিকল্প প্রমাণ দাঁড় করালেন স্নেল সূত্রের, যার ভিত্তি ছিল বায়ুতে আলোর গতি বেশি-মূলক বিশ্বাস। ডেকার্টের মত তাঁর প্রমানটিও ছিল পুরোপুরি গাণিতিক। মজার ব্যাপার, তাই না? বিপরীত বিশ্বাস, অনুরূপ পদ্ধতি, এবং অবিকল একই ফলাফল। বিজ্ঞান আর গণিতের জগতেও কত বিচিত্র রহস্য! যাই হোক, ফার্মা সাহেব পরম উল্লাসে সেই প্রমানসহ তাঁর খাতাপত্র পাঠিয়ে দিলেন ক্লার্সেলিয়ে সাহেবের ঠিকানায়। তাতে ক্লার্সেলিয়ে দমে যাবেন ভাবছেন? মোটেও না। তিনি লক্ষ্য করলেন যে ফার্মার প্রমাণ দুটি মূল ধারণার ওপর নির্ভরশীল। এক, পানিতে আলোর গতি বায়ুর চেয়ে কম (ডেকার্টের ঠিক উলটো)। দুই, আলোর চলাপথটি এমন যে একবিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে যেতে সবচেয়ে কম সময় লাগে সেরকম পথই বেছে নেয়। অপরদিকে ডেকার্ট সাহেব বিশ্বাস করতেন যে আলো সবচেয়ে  কম সময় খোঁজে না, খোঁজে সবচেয়ে সরল রাস্তা, অর্থাৎ সরলরেখা। সরল পথই হল প্রকৃতির পছন্দের পথ, এটাই ছিল ডেকার্টপন্থীদের বদ্ধমূল বিশ্বাস। এ-বিশ্বাসের আরো একটা কারণ ছিল। তাঁরা ভাবতেন, আলো চলে অনেকটা ছোট ছোট বলের মত। যতক্ষণ তার সামনে কোন বাধা নেই ততক্ষণ সে সোজা রাস্তায় চলবে ( অন্তত এটাই ছিল গ্যালিলির জাড্যনীতি), বাধা পড়লেই তার পথ ঘুরে যাবে। ফার্মার প্রমাণকে ঘায়েল করার জন্যে ক্লার্সেলিয়ে সাহেব দুদিক থেকে আক্রমণ চালালেন। তাঁর প্রথম যুক্তিঃ বায়ু থেকে পানিতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আলোর ঝিমোনি ধরে তার কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই (সেসময় আসলেই ছিল না)। দ্বিতীয়ত, সময় কমানো মানে প্রকৃতিকে আগে থেকে চিন্তাভাবনা করে বের করতে হয় কোন রাস্তায় সময় বাঁচানো যায়। তার জন্যে সোজা রাস্তায় না গিয়ে বাঁকা পথে যেতে হলেও প্রকৃতি তাই করবে। এটা কেমন অদ্ভুত মনে হয়না কি? সবাই জানে যে প্রকৃতির ধারাই এমন যে সাক্ষাৎ পরিস্থিতি অনুযায়ীই সে তার গতিবিধি নির্ধারণ করে- আগে থেকে ভেবেচিন্তে কর্মপন্থা বাছাই করে না। সেসময় নিউটন তত্ব জানা না থাকলেও মূলত এটাই ছিল নিউটনবাদী বিশ্বাস-দুটি বস্তু একেবারে মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত একে অন্যের উপস্থিতি বুঝতে পারবে না, এবং তার কোন প্রতিক্রিয়ার আভাস থাকবে না তাদের গতিধারায়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়ঃ টু-বডি থিওরি।

  পিয়ের ফার্মা দুর্দান্ত গাণিতিক ছিলেন, কিন্তু পদার্থবিদ্যায় তাঁর ব্যুত্‌পত্তি ছিল না। কাঁচা না হলেও পাণ্ডিত্যের অভাব। সুতরাং পদার্থবিদ্যার ময়দানে গিয়ে খ্যাতিমান পেশাবীদের মোকাবেলা করা, একটু অতিরিক্ত শেয়ানাপনা হয়ে যায় বইকি। ভদ্রলোক একটু দমে গেলেন ক্লার্সেলিয়ের ক্ষমাহীন আক্রমণের মুখে, যদিও পানিতে যে আলোর গতি বায়ুর চেয়ে কম সে বিশ্বাস থেকে একপাও নড়লেন না। দুশ বছর পর অবশ্য তাঁর বিশ্বাসই সঠিক প্রমানিত হয়েছিল। কিন্তু বিতর্কের মাঝে ক্লার্সেলিয়ে সাহেব  একটি তৃতীয়মাত্রা নিয়ে এলেন দর্শনশাস্ত্রের, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Determinism-নির্দিষ্টতাবাদ। এই তত্ব অনুযায়ী গতির কোন বাছবাছাই নেই-সম্মুখে তার একটা দরজাই খোলা, এবং সেটাই তার অভীষ্ট পথ। নিউটনের গতিবিজ্ঞানের সঙ্গে হুবহু খাপ খেয়ে যায় এ-বিশ্বাস-আগামীতে কি ঘটবে তা বর্তমান অবস্থা থেকেই জ্ঞাতব্য। বর্তমান বদলালেই ভবিষ্যত বদলাবে, নতুবা নয়। এ-বিশ্বাস আসলে স্বয়ং আইনস্টাইন সাহেবও আকঁড়ে রেখাছিলেন। প্রকৃতির খেয়ালখুশির ওপর তার চালচলন ছেড়ে দেওয়া, সেটা গ্যালিলি, নিউটন, আইন্সটাইন, কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে একদল তরুন পদার্থবিদ আর গাণিতিক এসে প্রমাণ দাঁড় করালেন যে অনেকসময় প্রকৃতিও ছককাটা পথে না গিয়ে নিজেরই খেয়ালখুশিমত একটা পথ বাছাই করে  নেয়। অর্থাৎ তার চলার পথে একটা অনির্দিষ্টতার মাত্রা যোগ দেয়, নিশ্চয়তার পরিবর্তে একটা অনিশ্চয়তা ঢোকে, একটা সুনিশ্চিত পথের বদলে একটা সম্ভাব্য পথ সূচিত হয়। এই বৃহত্তর দৃষ্টিভিঙ্গী থেকে বিচার করতে গেলে ফার্মার ন্যূনতম কালক্ষেপণের একটা যৌক্তিকতা অনুভব করা যায় বইকি। তবে বিজ্ঞান আর গণিত কখনো স্থবির নয়। সময়ের সাথে তারা চলতে থাকে, পরিবর্তিত হয়, পরিশীলিত হয়, পরিমার্জিত হয়। কিছুকালের মধ্যেই দেখা গেল যে ফার্মার ন্যূনতম কালাতিপাতের ধারণাটিও পুরোপুরি সত্য নয়।

 

আগামী সংখ্যায় সমাপ্য

 

ফ্রিমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া,

 ১৭ই ডিসেম্বর, ০৯

 

সূত্রঃ

১। “ The Best of all Possible Worlds: Mathematics and Destiny,” by Ivar Ekeland, The University of Chicago Press, Chicago and London, 2006

      ২। “ Descartes: the life and times of a genius”, by A.C. Grayling, published by Walker Publishing Company, New York, 2005.

 

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.