Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ৮ম সংখ্যা অগ্রহায়ণ ১৪১৬ •  9th  year  8th  issue  Nov-Dec  2009 পুরনো সংখ্যা
পথকে পেলাম সাথী Download PDF version
 

সাহিত্য

নিবন্ধ

পথকে পেলাম সাথী

মীজান রহমান

(শেষ পর্ব)

৩.

       কনফারেন্স শেষ হল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ছটায়। শেষ পর্যন্ত অবশ্য থাকা হয়নি আমার। কেম্ব্রিজ থেকে ট্রেনে করে স্ট্যান্সটেড বিমানবন্দর যাওয়ার কথা বিকেলবেলা। তারপর বিমানে করে আমস্টারডাম। আমার ভ্রমসাথী তরুণ অধ্যাপক ডাচ বন্ধু এরিক কুলিংক। আসলে ওর আমন্ত্রণেই আমার নেদেরল্যান্ডসে যাওয়ার উদ্যোগ। কেম্ব্রিজ থেকে এবারের মত বিদায়। এবার বলা কি ঠিক হল? হয়ত বলা উচিত শেষবারের মত। কেম্ব্রিজ আমাকে অনেক দিয়েছে। শুধু পঞ্চাশ বছর আগে নয়, এবারও। কেম্ব্রিজে আমি নিজেকে আবিস্কার করেছিলাম একবার। এবার সেই মানুষটিকে নতুন করে জানা হল। কিম্বা তাকে হারিয়ে এলাম।

     জানতাম এরিকের বয়স অনেক কম, কিন্তু কত কম তা ঠিক জানা ছিল না। জিজ্ঞেস করলাম একদিন। বলল ৪৫! অর্থাৎ আমার বড় ছেলের চেয়ে মাত্র ২ বছরের বড়। বলতে গেলে সমবয়সী। নেদারল্যান্ডসের নাইমেহেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুল প্রফেসার । আমাদের লাইনে বিস্তর নামধাম তার। পিএইচডি পাওয়ার পর গোটা ষাটেক পেপার লিখে ফেলেছে সে। এবং ভালো ভালো পেপার । দেশ বিদেশের বড় বড় সম্মেলনে প্লেনারি লেকচার দেওয়ার জন্য নিমন্ত্রণ পায় নিয়মিত। দুটি নামকরা জার্নালের সহসম্পাদক। এই বয়সে ওর যা অর্জন তার একাংশও সারাজীবনে অর্জন করতে পারবে না অধিকাংশ গবেষক। আমার পরম ভাগ্য যে শেষ বয়সে এরিকের মত একজন তীক্ষ্ণধী গণিতজ্ঞের সঙ্গে কাজ করবার সুযোগ পেয়েছি। কাজটা এমন বিরাট কিছু নয়- একটি অঙ্কের  বইতে দুজনে মিলে দুটো অধ্যায় রচনা করা। বইটি একটা বড়সড় আন্তর্জাতিক প্রকল্পের সাঙ্গে জড়িত, সে কারণেই এর এত গুরুত্ব। এরিকের চেষ্টায় ওর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার জন্য একটা ভদ্রমত গ্র্যান্টের ব্যাবস্থা হয়েছে, যার বদৌলতে নাইমেহেনের ষোল দিন থাকা খাওয়া সবই ফ্রি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্টহাউসে আলাদা ফ্ল্যাট ঠিক করা হয়েছে। আমার কাজের সুবিধার জন্য আলাদা অফিস, খাতা, কলম, কম্পিউটার, এমনকি আলাদা কফির মগ পর্যন্ত। এতটা সম্মান আমি আশা করিনি। আমি বিগত দিনের মানুষ, এমনিতেও আহামরি কোন গাণিতিক ছিলাম না কোনদিনই। আমার মত বুড়িয়ে যাওয়া সাদামাটা গণিতজ্ঞকে কেই বা এত খাতির করবে। আমাদের দেশে বয়সের সম্মান মোটামুটি আছে, মেধার সম্মান হয়ত ততটা নেই। এদেশে মেধার সম্মান দিতে কার্পণ্য করে না কেও কিন্তু বয়সের কারণে সম্মান, সেটা খুব প্রচলিত নয়। এরিকের বেলাতে তার ব্যতিক্রম দেখে অভিভূত হলাম।

     স্ট্যান্সটেড থেকে প্রায় ঘন্টা দুয়েক লাগল আমস্টারডামে পৌঁছুতে। আমস্টারডামে আমি একবারই গিয়েছিলাম জীবনে, সে কবেকার কথা মনেও নেই, আশির দশকের প্রথম দিকে, ভারতের এক সম্মেলনে যাওয়ার পথে প্লেন সেখানে থেমেছিল কয়েক ঘন্টা। ব্যস, ঐ পর্যন্ত। কর্মজীবনে দেশবিদেশে ঘোরার অনেক সুযোগ ছিল আমার, কিন্তু উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের প্রায় কোন দেশেই যাওয়া হয়ে ওঠেনি। স্ক্যান্ডেনেভিয়ার দেশগুলো দেখবার খুব ইচ্ছে, কিন্তু সে ইচ্ছে বোধ হয় অর্পূর্ণই থেকে যাবে । নেদারল্যান্ডস আর তার পার্শ্ববর্তী দেশ বেলজিয়াম, সেখানেও যাইনি আগে। এরিকের সৌজন্যে এবার দুজায়গাতেই যাবার সুযোগ হল।

     নেদারল্যান্ডস খুব ছোট দেশ জানতাম, কিন্তু কত ছোট তার কোন ধারনাই ছিল না আমার। এবার গিয়ে কিছু কিছু তথ্য জানা গেল। দেশটির আয়তন ১২,৮৮৩ বর্গমাইল। উত্তর থেকে দক্ষিণ সীমানার দূরত্ব ১৯০ মাইলের মত। পশ্চিম থেকে পূর্ব সীমানা মাত্র ১০৫ মাইল । লোকসংখ্যা এই মুহূর্তে এক কোটি ষাট লক্ষ। আমাদের দেশের মতই নদীমাতৃক। এবং আমাদের দেশের মত তার ২৫ ভাগ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ট থেকে কিঞ্চিত নিচে। তবে জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এতই উন্নত যে বছর বছর বন্যা হয়ে সারাদেশ ডুবে যাবে পানির নিচে সে দূর্ভোগ তাদের কখনো সইতে হয় না । আমস্টারডাম শহরের নামকরণ হয়েছে আমস্টার নদী আর নিকটবর্তী ডাম হ্রদের নামকে একত্র করে ।

     নাইমেহেন নেদারল্যান্ডসের পূর্ব সীমানায় জার্মানীর গা-ঘেঁষা ছোট্ট একটি শহর । ১৯২৩ সালে রোমান ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এ শহরে, অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে দুবছরের ছোট। এ অঞ্চলে ক্যাথলিকদের  খুব প্রভাব ছিল একসময় । এক মহা বিত্তবান বিশপ ছিলেন এখানে যার অনুদান দ্বারাই স্থাপিত হয় এই শিক্ষায়তন। নামে ক্যাথলিক হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকেই ক্যাথলিক হতে হবে তেমন কোন নিয়ম নেই । আমার বন্ধু এরিক, সে ক্যাথলিক নয়, এবং বলতে গেলে কোন ধর্মের প্রতিই দারুন কোন আকর্ষণ নেই তার । তবু এখানে চাকরি পেতে তেমন কোন অসুবিধে হয়নি তার। চাকরি হয় যোগ্যতার বিচারে, ধর্মবিশ্বাসের বিচারে নয়। একটাই শর্ত শুধু, ক্যাখলিক না হলেও ক্যাথলিক মতবাদের বিরুদ্ধে কেও কোন সক্রিয় ভূমিকা যেন গ্রহণ না করে সেরকম একটা অঙ্গিকার তাদের দিতে হয় নিয়োগপ্রাপ্তির সময়।

     নাইমেহেনে দুটি ট্রেন ষ্টেশন- নাইমেহেন সেন্ট্রাল যেখানে বেশির ভাগ ট্রেন যাওয়া-আসা করে, আর প্রাদেশিক লাইনের ছোট ষ্টেশন নাইমেহেন হেয়েনডাল। বিশ্ববিদ্যালয়টি ঠিক হেয়েনডালের ধারে। আমস্টারডাম থেকে ট্রেন হেয়েনডালে যায় না, তাই আমাদের নামতে হল সেন্ট্রাল ষ্টেশনে। এরিকের স্ত্রী রিটা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্যে। গাড়িতে বসে এদিকওদিক তাকাবার পর প্রথমেই যে জিনিসটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল সেটা হল ডাচ পুরুষদের উচ্চতা- ইয়া লম্বা লম্বা মানুষ একেকজন। গড় উচ্চতা ছয় ফুটের কম হবে না । এরিককে ঠাট্টা করে বললাম, তোমাদের এখানে দুসপ্তাহ থাকার পর আমি লম্বা না হলেও আমার গলার হাড় একটু লম্বা হয়ে যাবে। প্রথমে বুঝতে পারেনি কি বলতে চাইছি। ব্যাখ্যা করে বলার পর হাসল । হেসে বলল, কথাটা যে অতিরঞ্জিত তা নয়, ডাচ জাতি সত্যি সত্যি বেশ লম্বা হয়। এরিকের উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি । রিটা তার ইঞ্চি খানেক খাটো অর্থাৎ তুলনামূলভাবে বেঁটেই বলা যায় । আমার অবস্থাটা ভেবে দেখুন একবার। ভাগ্যিস এ দেশে অভিবাস নিইনি ।তাহলে শরীরের কোন ব্যাধি না হলেও হয়ত মনোরোগেই মরে যেতাম।

     গেস্টহাউসের আপ্যার্টমেন্ট মোটামুটি ভালই মনে হল। বেডরুম, লিভিংরুম, টেলিভিশন, ছোট একটা কিচেন, কাঁটা চামচ, প্লেটপেয়ালা, সামান্য হাড়ি পাতিল সবই ছিল। নিজস্ব বাথরুম, লন্ড্রির জন্য ওয়াসার ড্রায়ার, এমনকি কাপড় ইস্ত্রি করবার সরঞ্জাম, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, তাও। একটা ছোটখাট মানুষের জন্য আর কি চাই। একটা জিনিসের অভাব ছিল সেখানে- টেলিফোন। পরে বুঝলাম কেন টেলিফোন রাখা হয় নি। প্রথমত খরচ বাঁচানোর ব্যাপার আছে, দ্বিতীয়ত নেদারল্যান্ডস দেশটা দারুণভাবে যন্ত্র নির্ভর হয়ে পড়েছে, ক্যানাডা আমেরিকার চেয়েও বাড়া। ধরেই নেওয়া হয় যে শিক্ষিত মানুষদের সবারই নিজস্ব ল্যাপটপ আছে। স্কাইপের সাহায্যে যোগাযোগ স্থাপন করা যায় পৃথিবীর যে কোনখানে, টেলিফোনের কি প্রয়োজন। ওদের তো জানবার কথা নয় যে আটলান্টিকের ওপার হতে আগত এই খর্বকায় ব্যক্তিটি সেই মান্ধাতার আমলেরই মানুষ, এবং তার ল্যপটপ নেই, স্কাইপ শব্দের অর্থ সে বোঝে না।

     এপার্টমেন্টে আমাকে একা ফেলে যেতে হল বলে খুব দু:খ প্রকাশ করল ওরা দুজনই। সেদিনই এরিকের বাবার জন্মদিন ছিল। সে উপলক্ষে গোটা পরিবারেরই যাওয়ার কথা মাইল পঞ্চাশ যেখানে তার বাবা মা একটি ট্রেইলারে জীবন যাপন করেন। যাওয়ার আগে একটা উপকার করে গেল তারা। সকাল বেলার নাস্তার সরঞ্জাম কিছু বাজার থেকে কিনে রেখে গেল আমার জন্যে। টাকা দিতে চাইলাম নিল না, পশ্চিমে যা দেখা যায় না সচরাচর।

     সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই করছে। মালপত্র গুছিয়ে গোসল টোসল সেরে ডিনার খেতে বেরুলাম। একা একা বিদেশি রেস্টুরেন্টে গিয়ে রাতের খাবার খাওয়া অনেকদিন সে অভিজ্ঞতা হয়নি। কেম্ব্রিজ ছিল ইংরেজিভাষী জগৎ, তাছাড়া উলফসন হলের ক্যাফেটেরিয়াতে মেনু দেখে অর্ডার দেবার কোন প্রয়োজন ছিল না, খাবার সাজিয়ে রাখা হত চোখের সামনে, নিজের ইচ্ছামত সেখান থেকে তুলে তুলে খাওয়া মাত্র। কিন্তু নাইমেহেন সে সুখটা নেই। এদের খাবার দাবার অন্যরকম, এদের ভাষা আলাদা। তার ওপর দিনটা ছিল শনিবার, দোকান পাট সবই বন্ধ, সেপাড়ায় একটি কি দুটি রেস্টুরেন্ট, তাও মাইল খানিক হাঁটা পথ। সৌভাগ্যবশত নেদারল্যান্ডসের বেশির ভাগ লোকই কম বেশি ইংরেজি বলতে পারে, বিশেষ করে যাদের বয়স কম। উপরন্তু প্রায় সব রেস্টুরেন্টেই আজকাল দুরকম মেনু থাকে, একটি ডাচ ভাষায়, আরেকটি ইংরেজিতে। ইংরেজি ভাষার যে কতখানি প্রভাব বিশ্বজোড়া, সেটা দেশবিদেশ না ঘুরলে বোঝা যায় না। আগে ইউরোপে ছিল না তেমন, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন আর আমেরিকার প্রভাবে হয়েছে। ওই রেস্টুরেন্টে যদি ইংরেজি বোঝার মত কেও না থাকত এবং ইংরেজি মেনু না পেতাম তাহলে হয় না খেয়েই ফিরে আসতে হত আমাকে,  নয়ত আন্দাজে অর্ডার দিয়ে আজেবাজে কিছু খেয়ে খুশি থাকতে হত। মনে পড়ল সেই ফরাসি না জানা লোকটির ফরাসি রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফরাসি মেনু দেখে অর্ডার দেবার গল্প । প্রথম ও দ্বিতীয় পৃষ্ঠা থেকে আন্দাজে অর্ডার দিয়ে প্রতিবারই এপেটাইজার পাবার পর বিরক্ত হয়ে একেবারে শেষ পাতা থেকে অর্ডার দিয়ে ভাবলেন, এবার নিশ্চয়ই আসল খাবার আসবে। তা না এসে এল দাঁত খিলি করবার সরঞ্জাম। ভাষা না জানলে এহেন বিভ্রাট ঘটতে পারে বইকি।

     ভেবেছিলাম এক টেলিফোনের অভাব ছাড়া আমার এপার্টমেন্ট একেবারে নিখুঁত। ভুল ভাঙ্গল সকাল বেলা শেভ করতে গিয়ে। বাথরুমের সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে দেখি মুখ দেখি না আয়নায়। পায়ের আঙ্গুলের ওপর ভর করে দাঁড়িয়েও কোন লাভ হচ্ছে না। এ কি বিপদ রে বাবা। অর্ধেক মুখ দেখতে পাই, বাকিটা ঢাকা । নিজের গাল না দেখে কি শেভ করা যায় বলুন। গালের দাড়ি কাটতে গিয়ে হয়ত ঠোঁটের ডগাই কেটে ফেলব। কি করব কি করব ভেবে খেয়াল হল টেলিভিশনের নিচে দুটো সাইড টেবিল আছে। তাই তো। তার একটাকে টেনে নিয়ে এলাম আয়নার কাছে। সেখানে দাঁড়াবার পর শান্তি, মুখগাল ভাল করে দেখে ক্ষৌরকর্ম সারা গেল। ভাগ্যিস কোন রুমমেটের সঙ্গে শেয়ার করতে হয়নি এপার্টমেন্ট। তাহলে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে করে তাঁর পেটে খিল ধরে যেত।

সেদিন রোববার। বিকালবেলা এরিক গাড়ি করে আমাকে তুলে নিয়ে গেল তার বাড়িতে। ওদের ছোট ছেলে লুকাসের জন্মদিন। চৌদ্দ বছর বয়স ছেলের, ঠিক আমার নাতির বয়সী। মজার ব্যাপার তো, বললাম এরিককে। গতকাল ছিল তোমার বাবার জন্মদিন, আজকে তোমার ছেলের। ও হেসে বলল, শুধু তাই নয়, আমার বাবারও একই নাম- লুকাস। আসলে রিটা আর আমি, দুজনেরই শখ ছিল বাবার জন্মদিনই যেন ছেলে জন্মায়। একটুর জন্য মিস করেছি। বুঝলাম বাপেছেলেতে গভীর সর্ম্পক। রিটারও খুব টান শ্বশুরের জন্যে। পরে এরিক আমাকে তার জীবনকাহিনী বলল কিছুটা। ওর বাবা খুব শিক্ষিত মানুষ নন, সামান্য লেখাপড়া করেই জীবিকার পথে নামতে হয়েছিল তাঁর। বলতে গেলে শ্রমিকশ্রেনীর মানুষ। এরিকরা দুই ভাই এক বোন। বোনটি সবচেয়ে বড়, সে মেঝো। বোনটির বিয়ে হয়েছিল এক স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে- গণিতের শিক্ষক। দুটি বড় বড় ছেলে আছে তাদের ১৯ আর ১৭। ছোট ভাইটি ব্যবসাবাণিজ্য করে। লেখাপড়ার দিক থেকে পরিবারের একমাত্র উজ্জ্বল তারকা এরিক। কিন্তু বাবামায়ের জীবনের যে সংগ্রাম, এবং সে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ওকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করে তোলা, সে ঋণ কোনদিন ভোলেনি এরিক। বাবামায়ের প্রতি এতটা ভক্তি খুব বেশি দেখা যায়না আজকাল, সেটা প্রতীচ্যেই হোক আর প্রাচ্যেই হোক। তবে একটা ব্যাপারে সে কিন্তু পুরোপুরিই পশ্চিমের। ও যেভাবে গড়গড় করে বলে গেল তার পারিবারিক জীবনের বিবিধ সংগ্রামময় ইতিহাস সেটা আমাদের উপমহাদেশের কেও বলত কিনা সন্দেহ। দারিদ্র্যর মধ্যে মানুষ হয়নি এমন মানুষ কজন আছে আমাদের দেশে। কিন্তু বড় হয়ে সে দারিদ্র্যকে চেপে রাখারও একটা প্রবণতা আছে অনেকেরই। যুক্তি হল, গরিব ছিলাম একসময়, এখন তো নই, সুতরাং গায়ে পড়ে সেটা বলতে হবে কেন। এরিকের মত সবকিছু খোলখুলি বলে ফেলার মত ছেলে আমি আরো দেখেছি পশ্চিমে। আমরা যারা পূর্বাঞ্চল থেকে এদেশে এসে বসবাস স্থাপন করি তাদের অনেকেই বোধ হয় পশ্চিমের এদিকটা দেখবার চেষ্টা করিনা খুব।

     এরিকের বাড়িতে গিয়ে দেখি ব্যাকইয়ার্ডের বাগানে গোল করে বসেছে পারিবারের সবাই-  ওর বাবামা, ছোটভাই স্টিফেন আর তার স্ত্রী হেলেন, রিটার বোন ও তার স্বামী, ওদের বড় ছেলে মারিস, একমাত্র মেয়ে স্টেলা বাবামা যাকে এখনো দুধের শিশু বলে গণ্য করে, বয়স দশ হওয়া সত্বেও। আর ছিল এরিকের বোনের স্বামী। পশ্চিমে সাধারণত জন্মদিন পালন করা হয় এভাবেই- হয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নয়ত যার জন্মদিন তার বন্ধুবান্ধবের মধ্যে। আমাদের  দেশে অনেকেই তাদের সঠিক জন্মদিন  হযতো  জানেনা, সুবিধামত একটা বানিযে নেওয়া হয় স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময, কিন্তু জন্মদিন পালনের ব্যাপারে আজকালকার নব্যধনী পরিবারদের কোনরকম কার্পণ্য দেখা যায়না। এবং বাচ্চার জন্মদিনে বাচ্চার বন্ধুবান্ধব ছাড়া পাড়ার সবাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়।

     লক্ষ্য না করে পারা গেল না যে লুকাসের জন্মদিনে এরিকের ভগ্নীপতি ছিল কিন্তু ভগ্নী অনুপস্থিত। কৌতুহলী হয়ে সরল মনেই বললাম, এরিক তোমার বোন বুঝি এখানে নেই? প্রশ্নটা যেন শোনেনি এমন করে পাশ কাটিয়ে গেল। বুঝলাম যে একটা ঘটনা আছে। পরে একলা পেয়ে সে খুলে বলল সব কাহিনী। বোনটির মাথায় কি ঢুকেছে, পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়স, কেমন করে এক পরপুরুষের সঙ্গে প্রেমে পড়ে গেছে। এমনই  পড়া যে স্বামীপুত্র ঘরসংসার সব ছেড়ে ছুড়ে সেই লোকটির সঙ্গে একত্রে বসবাস শুরু করে দিয়েছে। আমাদের দেশে হলে ছি ছি রি রি পড়ে যেত। কিন্তু এসব দেশে সেটা এমন কোন বিচিত্র ঘটনা নয়। এগুলো ব্যক্তিগত ব্যাপার, অন্য কারুরই এ নিয়ে মাথা ঘামাবার অধিকার নেই। আমাদের দেশের ঠিক বিপরীত। সেখানে যে জিনিস যত ব্যক্তিগত ততই তা সর্বজনমুখে আলোচ্য বিষয়। এরিকের এসব পারিবারিক গল্প বলার কোন প্রয়োজন ছিল না আমার কাছে। আমি হলে বলতাম কিনা সন্দেহ। এই হল কালচারের পার্থক্য। আমাদের দেশের রাখাঢাকার কালচারের পাশে পশ্চিমের কালচারকে দাঁড় করিয়ে কি বলা যাবে, বা বলার চেষ্টা করা উচিত, যে একটি আরেকটির চেয়ে ভাল বা মন্দ? প্রথম প্রথম পশ্চিমে এসে ভাবতাম এদের লাজশরম বলে কিছু নেই। তখন পশ্চিমের সমাজ মানুষ সম্বন্ধে আসলে কিছুই জানতাম না আমি। একটা ভাসা ভাসা জ্ঞান থেকেই ঢালাও মন্তব্য করে বসতাম, যা সাধারণত করি আমরা। এখন করি না। এখন বুঝি যে পৃথক হওয়া মানেই নয় একজন আরেকজন থেকে ভাল বা মন্দ হওয়া। এর মানে নিতান্তই অন্যরকম হওয়া। কালের বিচারে হয়ত একটিকে আরেকটির চাইতে ভিন্ন স্তরে দাঁড় করানো হবে, কিন্তু তার বিচার আমার-আপনার নয় ।  

     নাইমেহেন শহরটি নেডারল্যান্ডস দেশটির ক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র। এই ক্ষুদ্র অংশটিতে আমার মত একজন বয়োজ্যষ্ঠ বিজাতীয় পুরুষ একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাজানো গোছানো পরিবেশে অবস্থিত গেস্টহাউসে দুটি সপ্তাহ মোটামুটি আরাম-আয়েশে কাটানোর পর ডাচ জাতি বা সমাজ সম্বন্ধে কোন পরিস্কার ধারনায় পৌছানো একেবারেই সম্ভব নয়। ক্যানাডার সমাজ সম্বন্ধে কিছুটা জ্ঞান হয়ত আমার হয়েছে এদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করার ফলে, কিন্তু ডাচদের সম্বন্ধে সামান্য ভাসা ভাসা জ্ঞান যা হয়েছে তার ওপর ভরসা করে নিবন্ধ রচনা করার অধিকার আমি অর্জন করিনি। তবে বাহ্যিক দূষ্টিতে যে দুচারটে জিনিস আমার চোখে পড়েছে তার ওপর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করা হয়ত অসঙ্গত হবে না।

     আমাদের দেশে খর্বাকৃতি মানুষদের চোখে সবচেয়ে আগে পড়বে ডাচদের উচ্চতা, তার কথা তো আগেই বললাম। তার পরপরই হয়ত উল্লেখ করা উচিত এজাতের অসম্ভব সাইকেলপ্রিয়তা। প্রতিটি রাস্তার দুধারে, সে- রাস্তা যত বড় আর যত ছোটই হোক, বাইকপাথ আছে, এবং সেগুলোর প্রস্থ সাধারণ রাস্তাগুলোর প্রায় সমান। দুই রাস্তার দুই রঙ, বাইকপাথগুলো লাল পাথর-সুরকি দিয়ে বাঁধানো, গাড়িপথগুলো ছাইরঙের পীচঢালা রাস্তা। অনেক সময় দেখা যায় অর্ধেক লোক গাড়িতে, অর্ধেক সাইকেলে। ছোট বাচ্চা থাকলে তাকে সাইকেলের পেছনে ক্যারেজে বেঁধে টানা হয়। ক্যানাডা-আমেরিকায় যেমন রাস্তায় রাস্তায় গাড়ি রাখার জন্য পার্কিং গ্যারেজের ব্যবস্থা থাকে, নেদারল্যান্ডসে তেমনি সাইকেলের গ্যারাজ থাকে। নেদারল্যান্ডসের প্রতিটি শপিং মলে, ট্রেন ষ্টেশনে, এয়ারপোর্টে, দোকানে, অফিসে, হাজার হাজার পার্ক করা সাইকেল। ছোট শহর নাইমেহেন, সেখানেও অসংখ্য সাইকেল দেখেছি আমি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য, অধ্যাপক, সাধারণ কর্মচারি সবাই সাইকেলে। ফলে নেদারল্যান্ডসে গাড়ির সংখ্যা তুলনামুলকভাবে কম। যার ফলে বায়ু দূষণের সমস্যাটিও তেমন গুরুতর নয়, ফলে নেদারল্যান্ডসের জনসাধারণের স্বাস্থ্যও মনে হয় অপেক্ষাকৃত ভাল।

     আমি যে ফ্ল্যাটে থাকতাম, বড় দশতলা দালান ঠিকই, কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের বালাই ছিল না কোন ফ্ল্যাটে। প্রথম তিনদিন প্রচন্ড গরম ছিল নাইমেহেনে। রাতের বেলা ঘুমাতে কষ্ট হচ্ছিল। জানালা পুরোপুরি খুলে রেখেও লাভ হচ্ছিল না। পরের দিন যখন এরিক জানতে চাইল কেমন কাটল রাতটা, বললাম, নালিস তো তেমন কিছুই নেই, তবে যদি এসি থাকত সেখানে অনিদ্রায় কাটাতে হতো না রাতটা। ও হেসে বলল, আমাদের দেশটাই তাই। খুব কম দালানে এসি আছে। আনকোরা নতুন হাইগেন্স বিল্ডিং, যেখানে অংকের বিভাগ, লাইব্রেরি ও অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট, কোথাও এসি নেই। এসিহীন জীবনে তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এরিকের বাড়িতে এসি দূরে থাক, ইলেক্ট্রিক ফ্যানও দেখিনি। জ্বালানি শক্তি সংরক্ষণের ব্যাপারে উত্তর আমেরিকার চেয়ে অনেক অগ্রসর ইউরোপ। একই ব্যাপার আমি দেখেছি কেম্ব্রিজে। ফ্ল্যাটে তো বটেই, ইন্সটিটিউটেও ছিল না। কর্মশালার সেশন চলাকালে আমরা সবাই সেদ্ধ হচ্ছিলাম। ভারতের আজহার সাহেব বেশ সুটকোট পরে বসে বসে ঘামছিলেন, আর আমার গায়ে যেন শার্ট রাখাও অসহ্য হয়ে উঠছিল। পরে যখন বেলজিয়ামে গেলাম সেথানেও দেখি একই অবস্থা। ইউরোপের লোকেরা নির্বিকার, কেবল আমরা যারা উত্তর আমেরিকা থেকে গেছিলাম তাদেরই যত অস্বস্তি।

     আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি ক্যানাডা-আমেরিকার নতুন প্রজন্মেও যে প্রচন্ড আসক্তি তার ওপর মাঝেমধ্যেই আমি মন্তব্য করে থাকি। এবার ইউরোপের চেহারা দেখে বুঝলাম ওদের তুলনায় উত্তর আমেরিকা এখনো বেশ পিছিয়ে আছে। নেদারল্যান্ডসের যেখানে গিয়েছি সেখানেই আমাকে যন্ত্রের সাহায্য নিতে হয়েছে। এমনকি লন্ডনেও প্রায় একই অবস্থা । হিথ্রো বিমানবন্দরে নেমে বোনের স্বামীকে ফোন করার দরকার হয়েছিল। পকেটে সবসময় সেলফোন নিয়ে ঘোরা, দেশেই হোক আর বিদেশেই, সেটা আমার ধাতে নেই। তাছাড়া ক্যানাডার ফোন লন্ডনে চলবে কেন। কিন্তু টেলিফোন কোথায়। আগে লন্ডন শহর বিখ্যাত ছিল ফোনবুথের জন্য। এখন এয়ারপোর্টের মত ব্যস্তসমস্ত জায়গাতেও ফোনবুথ খুঁজে খুঁজে আমি হয়রান। ট্রেনস্টেশনগুলোর অবস্থা যেন আরো শোচনীয়। কিংস্ক্রস একটা মস্ত বড় স্টেশন লন্ডনে। হাজার হাজার ট্রেন যেখানে আসা-যাওয়া করে রোজ। ইউরোপ থেকে ফেরার সময় ইউরোস্টারে করে ব্রাসেলস থেকে সোজা কিংস্ক্রস এসে নেমেছিলাম। ভাবলাম স্টেশনে এসে বোনকে ফোন করব। কমপক্ষে আধঘন্টা ঘুরলাম ফোনের খোঁজে। একটা সিকিউরিটি গার্ডকে পেয়ে ভাবলাম নিশ্চয়ই জানবে ফোন কোথায়। কি জানেন? মাথা চুলকে বলল মনে হয় আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে আছে একটা। মনে হয়! সিকিউরিটি গার্ড,  ঠিক বলতে পারেনা ফোনবুথ কোথায়। এই চেহারা হয়েছে আজকের লন্ডনের।

     নেদারল্যান্ডসের অবস্থা তার চেয়েও খারাপ। সেদেশে দূরপাল্লার চলাচলের প্রধান পন্থা ট্রেন। অথচ একটা ছোটখাটো প্রাদেশিক স্টেশনে গিয়ে একটি জনপ্রাণী চোখে পড়বে না আপনার। টিকেট কেনার জন্য যে টিকেট অফিসে যাবেন আপনি তার উপায় নেই। সবই মেশিনে। ডিজিটাল। ইলেক্ট্রনিক। মেশিনের গায়ে সম্পূর্ণ ডাচ ভাষাতে লেখা নির্দেশমালা। আমার অবস্থাটা চিন্তা করুন। না জানি ভাষা, না জানি যন্ত্রের বিষয়াদি। একটা কি দুটি বোতাম থাকলে না হয় আন্দাজে একটা বা আরেকটা লেগে যেত, কিন্তু বোতাম যে অসংখ্য। ওয়ানওয়ে না টুওয়ে, দৈনিক না সাপ্তাহিক, ছাত্র না প্রাপ্তবয়স্ক, নাকি ষাটোর্ধ প্রবীণ, মাসিক পাস আছে কি নেই। একেক শ্রেনীর একেক ভাড়া। মানে মাথা ঘুরে যাবার অবন্থা। গেস্টহাউস হতে দুতিনবার নাইমেহেনের ডাউনটাউনে যেতে হয়েছিল আমার। এবং একা। বাসে যেতে পারতাম হয়ত, কিন্তু তাতে আরো সমস্যা হতে পারে ভাষা নিয়ে, তাই ভাবলাম ট্রেনে যাওয়াই মন্দের ভাল। ষ্টেশনে গিয়ে মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম যতক্ষণ না কোন তরুণ ছেলে বা মেয়ের দেখা পাই। বয়স্কদের অনেকেই ইংরেজি জানে না, কিস্তু নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের প্রায় সবাই জানে এবং ভাল বলতে পারে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বহুবিধ সুফলের মধ্যে ভাষাজ্ঞানের বিস্তার অন্যতম। উত্তর আমেরিকাতে বহু ভাষী লোকের সংখ্যা খুব বেশী নয়। অন্য কারো ভাষা না শিখলেও চলে, তাই শিখবার খুব একটা গরজও নেই কারুর। ক্যানাডায় যাদের বসবাস, তাদের জন্ম যেখানেই হোক, তাদের উচিত ইংরেজি আর ফরাসী এই দুটি ভাষাতে একটা চলনসই দক্ষতা অর্জন করে ফেলা। কিস্তু ফরাসি দুরে থাক আমরা কজন ইংরেজি শেখার চেষ্টা করছি ভেবে দেখার মত।

     যাই হোক ট্রেনষ্টেশনের স্লটমেশিনের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই ইংরেজি জানা কাউকে না কাউকে পাওয়া যেত। জিজ্ঞেস করতাম, ইংরেজি বলতে পারো তুমি? হ্যাঁ বললেই অনুরোধ করতাম টিকেট কেনাতে সাহায্য করার জন্য। ওরা নি:সংকোচে এবং সানন্দে আমার টিকেট কিনে দিত। ডাউনটাউনে যাবার উদ্দেশ্য ছিল সন্ধ্যার খাবার খোঁজা। শনি-রোববার দিন এছাড়া উপায়ও ছিল না। এপাড়ায় সেই রদ্দিমার্কা রেস্টুরেন্টে দুবার খেয়ে আর রুচি হচ্ছিল না। তাই আমার ডাউনটাউনে যাওয়া। একবার আবিষ্কার করেছিলাম চাইনীজ রেস্টুরেন্ট। চাইনীজ খাবার আমি খুব একটা পছন্দ করি তা নয়, তবে ডাচ খাবারের প্রতি অভক্তি আরো বেশি।

     বিশ্বের যে কটি দেশকে সত্যি সত্যি উদার এবং ধর্মনিরপেক্ষ বলা যায়, এক হাতের দশটা আঙ্গুলেই গুনে শেষ করা যায় তাদের। তার মধ্যে নেদারল্যান্ডসকে অনায়াসেই গন্য করা যায় বলে আমি মনে করি। গত দুতিন দশক ধরে উত্তর আফ্রিকা থেকে বিপুলসংথ্যক অর্ধশিক্ষিত গোঁড়া মুসলমান সেখানে অভিবাস নেওয়ার ফলে বেশ কিছু সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হলেও ডাচ নাগরিকদের মৌলিক চিন্তাধারাতে খুব একটা চিড় ধরেছে বলে মনে হয়নি আমার। তারা অত্যন্ত সহনশীল জাতি। তাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক শাসন কাঠামো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিক আর্থিকভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় সংরক্ষিত। সেজন্য তাদের কর্মজীবনে উঁচু হারে কর দিতে হয় ঠিক, কিন্তু তাতে প্রতিবাদ করে না কেও। কর আদায় না হলে সমাজকল্যাণ সম্ভব নয়, ঐটুকু বুদ্ধি তাদের আছে। এদিক খেকে ইউরোপ হল আমেরিকার ঠিক বিপরীত- আমেরিকাতে সমাজকল্যাণে কারো তেমন আপত্তি নেই, আপত্তি শুধু ট্যাক্স দেওয়াতে। নেদারল্যান্ডস একটি সত্যিকার প্রগতিশীল জাতি। এদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে আমাদের।

     কেবল একটি ব্যাপারে নেদারল্যান্ডসকে ক্যানাডা-আমেরিকার পেছনে মনে হল- প্রতিবন্ধিদের জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা। যেমন পঙ্গু, কুব্জ, বৃদ্ধ, ক্লাচ বা হুইলচেয়ারবন্দী। উত্তর আমেরিকার যেখানে যান সেখানেই দেখবেন এই অভাগাদের  জন্যে সবরকম সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের প্রায় কোথাও তা দেখলাম না আমি। সেখানে যেন কেও হুইলচেয়ারে করে না যায়।

     নাইমেহেনে থাকাকালে মাঝের শুক্রবারটিতে আমস্টার্ডাম গিয়েছিলাম আমি। আগেই ঠিক করা ছিল। আমস্টার্ডামের এক বিশিষ্ট রিসার্চ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল আমার গণিতজ্ঞ ডাচ বন্ধু টম কোর্নউইন্ডার। আমার লাইনে ভীষণ নামকরা লোক সে। আমার চেয়ে বয়সে খানিক ছোট হলেও আমি এ লাইনে ঢুকবার আগেই গুটিকয় উঁচু মানের পেপার লিখে সে সুনাম অর্জন করেছিল। টমের পরিচালনায় অনেক মেধাবি ছাত্রছাত্রী পিএইচডি করেছে, তার মধ্যে এরিক অন্যতম।

     স্টেশনে টম অপেক্ষা করছিল আমার  জন্যে। ভয়ানক বিশ্রি দিন ছিল সেটা। বৃষ্টি বৃষ্টি আর বৃষ্টি। কনকনে ঠান্ডা বাতাস। ভাগ্যিস গরম টুপি আর রেইনকোট নিয়ে গিয়েছিলাম অটোয়া থেকে। সেই বৃষ্টির মধ্যেই টম আমাকে আমস্টারডামের জনপ্রিয় ক্যানাল রাইডের নৌকাতে নিয়ে চড়ালো। এক ঘন্টার বোট রাইড। আইজ নদীর মোহনা খেকে বের হয়ে শহরের বড় বড় রাস্তার পাশ দিয়ে এঁকে বেঁকে প্রমোদতরণী আমস্টারডামের উপকূল  অঞ্চলের অনেকটা অংশই দেখবার সুযোগ ছিল। দেখলাম, ষোড়শ শতাব্দীর শক্ত ইটপাথরের তৈরি দালানকোঠা এখনো অটুট, সগর্বে দন্ডায়মান। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপের দুটি দেশ ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রতাপশালী- স্পেন ও নেদারল্যান্ডস (তখন এর নাম ছিল হল্যান্ড)। দুয়েরই বিস্তর উপনিবেশ এশিয়া-আফ্রিকাতে। স্পেনের প্রধান ধনসম্পদের প্রধান উৎস ছিল দক্ষিণ আমেরিকা। জাহাজ বোঝাই করে স্বর্ণ-রৌপ্য নিয়ে আসত তারা। আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যেতে পারে স্রেফ ডাকাতি, লুঠতরাজ। কিন্তু ওই যুগটাই ছিল চুরি-ডাকাতির যুগ, উপনিবেশের যুগ। তারই সুস্পস্ট ছাপ লক্ষ্য করা যায় ইউরোপের সর্বত্র। বিশেষ করে বিলেতে। নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি আর পর্টুগালেও।

     আমাদের ক্যানালসফরের রাস্তাতে এক জায়গায় ছিল ডায়মন্ড হাউস- বাংলায় কি হয় জানিনা। হীরকভবন? টম জানতে চাইল বোট থেকে নেমে হীরার কারখানা দেখার ইচ্ছা আছে কিনা আমার। নেদারল্যান্ডসের হীরা ব্যবসার খবর আগেই জানতাম একটু আধটু। আফ্রিকার খনি থেকে অশীলিত হীরা এনে কাটাকুটি করে অতি উচ্চমূল্যের জাঁকালো অলংকারে পরিণত করা হয় এই সব ডায়মন্ড হাউসে। বোটের পর্যটকদের অধিকাংশই ছিল বিত্তশীল চাইনীজ ও জাপানি ব্যবসায়ী। তারা দলে দলে নেমে গেল হীরা দেখার জন্যে। আমি টমকে বললাম: ওসব দেখে কি হবে। মনিমুক্তা হীরাজহরতের প্রতি কোন মোহ আমার  নেই। আমি বরং তোমাদের নদীনালা আর দালানকোঠা দেখেই সময় কাটাই।

     এক জায়গায় এসে দেখলাম একটা তিনতলা দালানের সামনে খুব ভিড়। টম বলল এই দালানের ওপরতলাতে, চিলেকোঠার এক গোপন কক্ষে, জার্মানির নাৎসি বাহিনীর চরম দাপটের সময় ইহুদী কিশোরী এন ফ্র্যাঙ্ক আশ্রয় নিয়েছিল প্রাণের ভয়ে। কিন্তু রক্ষা পায়নি বেচারি এত সাবধানতা সত্তেও। চিলেকোঠার গুপ্তস্থান থেকে ধরে নিয়ে পাষন্ডরা ওকে গ্যাস চেম্বারে নিয়ে গিয়েছিল। এন ফ্র্যাঙ্কের সেই বিপদসঙ্কুল দিনগুলোতে লেখা ডায়রি আজকের বিশ্বের সকলেরই জানা। এন ফ্র্যাঙ্কের ডায়রি এযুগের একটি অবশ্যপাঠ্য ক্লাসিক হয়ে উঠেছে। আজকে সেই হতভাগ্য মেয়ের করুণ কাহিনী দেশবিদেশের কৌতুহলী দর্শকদের আকর্ষণীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছে, এবং সেই সুবাদে প্রচুর বিদেশি মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে নেদারল্যান্ডসের কোষাগারে । ইতিহাসের চরম বর্বরতা ও অকথ্য নৃশংসতা কালে কালে পণ্যদ্রব্যে পরিণত হয়,ধনকুবের হয় মানুষ।

     খুব ভাল লাগল আমস্টারডামের নৌকাবিহার। নৌকো করে না দেখতে পেলে হয়ত কিছুই দেখা হত না শহরটার। বোট থেকে নেমে টম বললঃ লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে। কোথায় যেতে চাও? ইন্ডিয়ান ফুড? ইন্ডিয়ান ফুড রোজই খাই। তাছারা দুপুরে এমনিতেই আমি বেশি খাই না, তেল মশলাযুক্ত ভাত তো একেবারেই না। আমি হল্যান্ডে এসেছি, চল তোমাদের ডাচ খাবার খাই। তথাস্তু বলে এপথ ওপথ অলিগলিতে অনেক হাঁটার পর আমাকে নিয়ে ও গেল একটা সেকেলে রেস্টুরেন্টে। এলাকাটি আমস্টারডাম শহরের একাট পুরাতন ঐতিহ্যবাহী জায়গা সেটা বোঝা গেল দর্শকদের ভিড় দেখে। রেস্টুরেন্টের পাশে একটা জীর্নকায় তিনতলা বাড়ির দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে টম বললঃ এই দালানটির নাম অশ্রুভবন- হাউস অফ টিয়ার্স। অস্বাভাবিক নাম একটা দালানের, নিশ্চয়ই কোন ঘটনা আছে। তোমাদের দেশে কি দালানও কাঁদে? হেসে বললঃ ঠিক তা নয়। পুরাকালে যখন বাণিজ্যজাহাজে করে নাবিকরা দীর্ঘ সময়ের জন্যে সমুদ্রযাত্রায় বের হয়ে যেত তখন তাদের পরিবার বাড়িতে বসে দিন গুণত কবে ফিরে আসবে তাদের প্রিয়জন । সে যুগের সমুদ্রভ্রমণ এমনই বিপদসংকুল ছিল যে জাহাজ থেকে কেউ ফিরে আসবে কি আসবে না তারও কোন নিশ্চয়তা ছিল না। একবার একটি নববিবাহিত মেয়ে স্বামীর সমুদ্র যাত্রার পর ওই বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে বিলাপ করে কাঁদত- সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকত কবে তার প্রেমিক ফিরে আসবে বন্দরে। তখন থেকে এই বাড়িটির নাম হয়ে গেছে কান্না বাড়ি। কষ্টের গল্প সন্দেহ নেই। মনে মনে ভাবলাম, আমার সেই অভাগা দেশটিতে যদি কোনদিন যেতে বন্ধু তাহলে বুঝতে পল্লীগ্রামের প্রতিটি কুটিরকেই বলা যায় একেকটি অশ্রুভবন । বাড়ির বউদের নীরব কান্নায় তৈরি। তফাৎ এইটুকু যে আমাদের বউগুলো স্বামীর বিরহে যতনা কাঁদে তার চেয়ে ঢের বেশি কাঁদে স্বামী আর শাশুরির অত্যাচারে।

     বিকেলে টম আমাকে নিয়ে গেল তার ইনস্টিটিউটে। গবেষণাগার স্থাপনের ইতিহাসটি বহুযুগ থেকেই গড়ে উঠেছে ইউরোপে, যার সুচনা বোধ হয় জার্মানীতে। জার্মানীর ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইন্সটিটিউট বিজ্ঞান চর্চায় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ না হলেও অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণাগার হিসেবে স্বীকৃত। উঁচুমানের গবেষণাকেন্দ্র যে দেশে নেই বা যে দেশের সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হয় না সেদেশে বিশ্বমানের সৃজনশীল গবেষণা বোধ হয় একেবারেই সম্ভব নয়। ইন্সটিটিউট বলতে সত্যি সত্যি কি বোঝায় তার কোন ধারণাই হয়ত নেই আমাদের দেশের নেতানেত্রীদের। যার ফলে এমন কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি আজ পর্যন্ত যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি, যাকে আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কাছে সদম্ভে দাঁড় করাতে পারি। ভারতে আছে টাটা ইন্সটিটিউট, আছে আইআইটি, যার বদৌলতে আজকে ভারতের অভ্যন্তরে অনেক সমস্যা থাকলেও বাইরেরটা সবারই দৃস্টি আকর্ষণ করছে।

     ইন্সটিটিউট দেখার পর আমরা গেলাম টমের বাড়িতে, প্রায় পঁচিশ মাইল দূরে। ওর স্ত্রী মারিটার পায়ে একটা অস্ত্রোপচার হয়েছিল সম্প্রতি। সেই আধসারা পায়ের ওপর ভর করে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেচারি অনেক কিছু রান্না করে রেখেছিল। আমি মাছ পছন্দ করি জানার পর স্যামনের ফিলে রেঁধেছিল বেশ মশলা টসলা দিয়ে। এমনকি ভাতও ছিল টেবিলে। একটা ডাচ পরিবারের কাছ থেকে এতটা আতিথেয়তা আশা করিনি আমি। খাওয়াদাওয়ার পর টম তার লাইব্রেরি দেখালো আমাকে- শুধু  অঙ্কের বই নয়, মধ্যযুগের আর্ট, মিউজিক, ভাস্কর্য এসবের ওপরও। সবচেয়ে চমৎকৃত হলাম যখন মারিটা তার ওপরতলায় নিজস্ব লাইব্রেরি দেখাতে নিয়ে গেল। ওরা দুজনই এখন অবসরপ্রাপ্ত। কর্মজীবনে টম গণিতের বিশিষ্ট অধ্যাপক- গবেষক, মারিটা হাই স্কুলের ইতিহাস শিক্ষক। মজার ব্যাপার যে ওর বিশেষত্ব ইসলামিক ইতিহাস। মধ্যযুগিয় ইসলামের ওপর তার অগাধ পড়াশুনা। তাকবোঝাই বই তার ইসলামের ওপর, বড় বড় পন্ডিতদের লেখা বই। আরো আশ্চর্য হলাম যখন জানলাম আরবি ভাষাটিও শিখে ফেলেছিল মারিটা। কোরান তো অবশ্যই, টি হাদিসও দেখালো আমাকে। ওর লাইব্রেরি দেখে আমি লজ্জায়ই পড়ে গেলাম। ওর তুলনায় আমি কিছুই জানিনা আমার নিজের পৈতৃক ধর্ম সন্বন্ধে। একটি সত্যিকার জ্ঞানপিপাসু সাধক পরিবারের সঙ্গ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করে পরম তৃপ্তিতে আমি ফিরে এলাম সন্ধ্যানাগাদ।

     উইকেন্ডে এরিক আমাকে নিয়ে গেল পঁচিশ মাইল দূরের এক মিউজিয়ামে। একটু ভিন্নরকমের মিউজিয়াম ওটি। শিল্পকলা বা বিজ্ঞানবিষয়ক নয়, পুরনোদিনের নেদারল্যান্ডসের মানুষ কিভাবে জীবনযাপন করত তার ওপর। দুশ তিনশ বছর আগেকার বাড়িঘর, তৈজসপত্র, তাদের পালিতপশু ইত্যাদি। বিরক্তিকর যে সেদিনও ছিল ঝিরঝিরে বৃষ্টি সারাদিনব্যাপি। তবুও খুব উপভোগ করলাম আমি। সঙ্গে ছিল ওর মেয়েটি। তিনজনে মিলে আমরা হল্যান্ডের পুরাকালের গ্রামজীবন দেখলাম ঘুরে ঘুরে । ওদের অবশ্য আগেই দেখা ছিল ওসব, কিন্তু আমার চোখে সে এক অভিনব অভিজ্ঞতা। পুরনো ডাচ বাড়িঘর দেখে কি মনে হল জানেন? ছোটবেলায় গ্রামে গিয়ে যেমন ঘরবাড়ি দেখতাম আমাদের দেশে ঠিক তেমনটিই যেন। তেমনই শনের ঘর। মাটির দেওয়াল, মাটির চুলা, বসতবাড়িসংলগ্ন খামারঘর, গোসলঘর, হাঁসমুরগির খাঁচা, অদূরে প্রস্রাব পায়খানার গর্ত। আমাদের দেশে ঘোড়া ছিল না, ওদের ছিল এবং এখনো আছে। আমরা শূকর পালি না, ওরা পালে। ওদের শোবার ঘর কবুতরের খুপরির মত। সেকালে তাপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র ছিল না, শীতকালে বাইরের তাপমাত্রা আর ভিতরের তাপমাত্রায় খুব তফাৎ ছিল না। কয়েক প্রস্থ লেপ কাঁথার ওপরই ছিল একমাত্র ভরসা, আর ছিল বনজঙ্গল থেকে কাঠ কেটে বাড়িতে জমা করে সারা শীত সে কাঠ জ্বালিয়ে ঘর গরম রাখার চেষ্টা। আমার বাপদাদা খালাফুফুরা এক ঘর হতে আরেক ঘরে যেতেন খড়ম পায়ে দিয়ে, এদেশে ছিল কাঠের জুতো। সেই ইউরোপ এখন কোথায়, আর আমরা কোথায়। আমাদের গ্রামেগঞ্জে তো এখনো প্রায় সেরকমই জীবন ধারা। এ অন্ধকার থেকে কবে আমরা বের হতে পারব?

      নেদারল্যান্ডসের পাট চুকিয়ে এরিক আর আমি ট্রেনে করে রওয়ানা দিলাম বেলজিয়ামের প্রাচীন শহর লিওভেনের উদ্দেশ্যে, ১৯শে জুলাই বিকেল দুটোয়।

     বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস দুটি ভিন্ন রাষ্ট্র- তাদের নির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। ভেবেছিলাম সীমানা পার হবার সময় কোন না কোন ষ্টেশনে বর্ডার প্রহরী উঠে সবার পাসপোর্ট বা অন্যান্য কাগজপত্র পরীক্ষা করতে চাইবে। দুটি দেশ ইউরোপীয়ান ইউনিয়ানের অর্ন্তভুক্ত হওয়াতে ওদের নাগরিকদের পাসপোর্ট দেখানোর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আমি? আমি ডাচ বা বেজিয়াম নই। আমার জন্ম বাংলাদেশে। সর্বনাশ, বাংলাদেশ? নামে রহমান যুক্ত মুসলমান। মুসলমান? রহমান? তাহলে তো তারা কোন উপায়েই ছাড়তে পারে না আমাকে। তবুও কেও এলনা পাসপোর্ট দেখতে। পরীক্ষা দূরে থাক বর্ডার পাহারা দেবার মত কোন সরকারি প্রহরদপ্তর সেখানে আছে বলেই মনে হল না। বাহ বেশ তো। চাইলে আদম পাচার করতে পারতাম অনায়াসে। ইউরোপের প্রতি সবসময়ই একটা শ্রদ্ধা ছিল আমার, এবার কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি পেল সেটা। এমন মুক্তদুয়ার, মুত্তপ্রাণ মহাদেশ বিশ্বপৃষ্ট থেকে সম্পূর্ণ লোপ পেয়ে যায়নি জানতে পেরে ভবিষ্যত সম্পর্কে খানিক আস্থাবান হওয়া গেল। বাকি জগতটা যদি ঠিক এমনই হত।

বিকেল চারটে নাগাদ নেদারল্যান্ডসের ট্রেন এসে পৌছালো ব্রাসেলসের অনতিদূরে ছোট্ট স্টেশন লিওভেনে। এরিক আর আমার জন্যে আগেই হোটেল ঠিক করে রেখেছিল সম্মেলনের প্রধান কর্মকর্তা, আমাদের সকলেরই প্রিয় বন্ধু ওয়াল্টার ভ্যান এশে। হোটেলটা ঠিক কতদূর স্টেশন থেকে জানা ছিল না। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে গিয়ে এক ড্রাইভারকে পেয়ে বললাম আমাদের হোটেলে নিয়ে যেতে। ড্রাইভার হোটেলের নাম শুনে কি বলল জানেন? বলল আপনারা ট্যাক্সি ভাড়া করতে চাছেন কেন?এই হোটেল তো বলতে গেলে এখান থেকেই দেখা যায়, অনায়াসে আপনাদের হাটা পথের মধ্যে। অবাক হয়ে গেলাম লোকটার সততার পরিচয় পেয়ে। আমাদের দেশে দূরে থাক ক্যানাডা আমেরিকাতেও কোন ট্যাক্সিওয়ালা ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ ছেড়ে যাত্রীকে খরচ বাঁচানোর পথ বাতলে দেবে বলে মনে হয় না। আসলে শুধু এই ট্যাক্সিওয়ালা নয়, নেদারল্যান্ডস-বেলজিয়াম দুজায়গাতেই মানুষের এই স্বাভাবিক ও সহজাত সততাবোধের পরিচয় পেয়েছি আমি। নাইমেহেনে ট্রেনে করে যতবার যাওয়া-আসা করেছি ততবারই কোন টিকিট দেখতে চাইবার মত উর্দিপরা লোক দেখিনি কোথাও। অর্থাৎ চাইলে আমি টিকিট ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারতাম। সেদেশের কেও তা করে না। একেই আমি বলি নিজের প্রহরী নিজেকেই হওয়া। প্রতিটি নাগরিকের যদি এইটুকু সামাজিক দায়িত্ববোধ না সৃষ্টি হয় নিজের বিবেকের মধ্যে তাহলে হাজার পুলিশ পাহারা মোতায়েন করেও মানুষের চরিত্র শুধরানো যাবে না। সভ্য দেশ আমি তাকেই বলি যেখানে প্রতিটি নাগরিকের চিন্তা- চেতনার মধ্যে অটুটভাবে গাঁথা থাকবে সেই অমুল্য বোধটি।

     সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের সকলেরই বাসস্থানের ব্যবস্থা ছিল বিভিন্ন হোটেলে। গ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের ব্যবস্থা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডর্মগুলোতে। আমাদের হোটেলটি সবচেয়ে দামি, সম্ভবত রুমের আয়তন, বাথরুমের সুবিধাদি, এসব খুচরো জিনিসগুলোর জন্যে। ওদিকে সম্মেলনের মূল অকুস্থান যেখানে, যেখানে রোজ সকালে-বিকালে যেতে হত আমাদের, তার দূরত্ব আমাদের হোটেল থেকেই সবচেয়ে বেশি। ট্যাক্সি বা বাস ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিলনা সাড়ে আটটায় ব্রেকফাষ্ট শেষ করে নটার মধ্যে সেখানে গিয়ে পৌঁছানো। আমরা দুজন ছাড়া আমাদের হোটেলে আরো কিছু গাণিতিক ছিলেন দূর দূর দেশ থেকে আসা। প্রায় সবাই আমরা বাসে করে যেতাম, কেবল একজন ছাড়া। কেম্ব্রিজের সেই নবলব্ধ বন্ধু পিটার ক্লার্কসন। যার উদ্যোগ আয়োজনে আমার কেম্ব্রিজে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই আশ্চর্য মানুষটি সম্বন্ধে কিছু বলার লোভ আমি সংবরণ করতে পারছি না ।

     ওর ডিগ্রি অক্সফোর্ড থেকে- আন্ডারগ্র্যাজুয়েটের প্রথম বর্ষ হতে একেবারে সর্বোচ্চ ডিগ্রি পর্যন্ত একটানা সাতবছর। এই সাতটি বছরই ছিল পিটারের জীবনের স্বর্ণযুগ- যাতে হাত দেওয়া তাকেই আলোকিত করে তোলার এক অপূর্ব মরশুম তার । যেমন পড়াশনায় তুখোড়, তেমনি বিতর্কপ্রতিযোগিতায়, তেমনি খেলাধুলায়। দৌড়ঝাঁপে তাকে হারাবে এমন ছাত্র তখন ছিল না সারা অক্সফোর্ডে। অক্সফোর্ডে ও ট্র্যাক-এন্ড-ফিল্ড টিমের ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হয় এক সময়। তারা অক্সফোর্ডের হয়ে দেশবিদেশের নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। একবার ওদের টিম জাপান থেকে অনেক মেডেল নিয়ে এসেছিল। চেহারা- নমুনাতেও সবাইকে ঈর্ষান্বিত করে তোলার মত আকর্ষণীয় পুরুষ ছিল পিটার। এতই জনপ্রিয়তা ছিল তার সারা বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী যে মেয়েরা ওর সঙ্গ পাবার চেষ্টায় অহরহ ঘুর ঘুর করত চারপাশে। এবং সেভাবেই তার পরিচয় হয় ভরিষ্যতের জীবনসাথীর সঙ্গে। তারই সহপাঠী। দুজনেরই অনার্স গণিতে, দুজনই অসামান্য প্রতিভার অধিকারী, এবং দুজনই পি এইচ ডি ডিগ্রি শেষ করে সেখানে। মজার ব্যাপার যে কর্মজীবনেও তাদের বিচ্ছিন্ন হতে হয়না। ডিগ্রি নিয়ে বেরুবার পর দুজন একই বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্টের গণিতবিভাগে নিয়োগলাভ করে । ব্রিটেনের অন্যতম গবেষণাভিত্তিক বিদ্যায়তনগুলোর মধ্যে এর স্থান আছে। সুন্দর সফল প্রসন্ন জীবন তাদের। ওপরে মহাকাশ ব্যতিরেকে আর কোন প্রতিবন্ধকতা নেই তাদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে।

     এমন সময় একদিন শয্যাঘরে বজ্রপাত । সকাবেলা ঘুম থেকে উঠে কেমন জানি মনে হল পা চলতে চাইছেনা, অবশ অবশ লাগছে। ও কিছু না বলে উড়িয়ে দিতে চাইল সে। কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হল না যখন বুঝতে পারল যে কিছুতেই পা বাড়াতে পারছে না সিড়ির দিকে। জোর করে বাড়াবার চেষ্টা করে ফল হল বিপরীত। টাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড় করে পড়ে গেল সিড়ি দিয়ে একেবারে নিচের তলায় । শব্দ শুনে ওর স্ত্রী এক দৌড়ে ছুটে এসে দেখে পিটার মাটিতে শুয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছে।

     সেই থেকে শুরু ক্লার্কসন পরিবারের দীর্ঘ অমাবস্যার রাত। অন্তহীন সংগ্রাম আর আশা-নিরাশার কুয়াশাচ্ছন্ন ঘোরের মধ্যে। যে মানুষের পাদুটি ছিল তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু, তার প্রতিযোগিদের প্রাণে ভীতিসৃষ্টির প্রধান অস্ত্র, তার আলমিরাতে সার করে সাজিয়ে রাখা শিরোপাগুলোর মুখ্য বাহক, সেই পরম অনুগত সুহ্নদ সখা তার, সহসা বৃদ্ধ আহত যোদ্ধার মত যেন কাত হয়ে শুয়ে পড়ল মাটিতে। যেন আর পারছেনা সে বোঝা বইতে। প্রথমে ভেবেছিল ওরা দুজনেই যে এটা সাময়িক, এটা কিছু না , এটা সেরে যাবে। কিন্তু এটা সারেনি। কত ডাক্তার , কত ওষুধ , কত পথ্য আর সাধ্যসাধনা করেছে সে এর চিকিৎসাতে। কিছুতেই কাজ হয়নি। আজকে পিটার পঙ্গু। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অতুলনীয় ক্রীড়াপরিচালক, যে ছিল খেলার মাঠের অদ্বিতীয় চ্যাম্পিয়ান, সে পিটার আজকে একদলা অসহায় মাংসপিন্ডে পরিণত হয়েছে। কোন- না- কোনকিছুর সাহায্য ছাড়া সে চলাফেরা করতে পারেনা । হুইলচেয়ারে সম্পূর্ণ বন্দী সে হয়নি এখনো, কিন্তু পায়ের পেশীশক্তি দিনদিনই কমে যাচ্ছে। তার অর্থ লক্ষণ ভাল নয়। সময় খুব দূরে নয় যখন হুইলচেয়ার ছাড়া সে হয়ত টয়লেটেও বসতে পারবেনা। সে যে কি ভয়াবহ ভাবনা সেটা সুস্থ মানুষদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।

     কিন্তু দেখুন ওর মুখে কখনো কোন নালিশ শোনেনি কেও। কখনো আক্ষেপ করে বলেনি, অমি কেন। কি দোষ করেছিলাম আমি। যা কিছু অভিযোগ অভিমান তার সব তার সহ মানুষদের প্রতি। সুদিনের বন্ধু আর দুর্দিনের বন্ধুর কি তফাৎ সেটা দুর্দিন এলেই কেবল বোঝা সম্ভব। সে জ্ঞানটুকু তার এরি মধ্যে হয়ে গেছে। আমাকেও সে কিছুই বলেনি প্রথমে। বলবেই বা কেন। আমাকে সে ভাল করে চিনতই না। তবে কি জানেন। হঠাৎ হঠাৎ জীবনের চলার পথে এমন এমন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় পথপার্শ্বে যে তার কেও নয়, কোন সম্পর্ক নেই তার সঙ্গে, হয়ত আর দেখাও হবেনা কোনদিন, তবুও কেন জানি মন থেকে জীবনের সেইসব গোপন কথা, সেই সব না বলা কথা বের হয়ে আসে বুকের পাঁজর ভেদ করে। হয়ত আমি ঠিক তেমনি এক গোধুলি মুহূর্তে তার সঙ্গে এক টেবিলে বসে সেই বলবার মত মানুষটিতে পরিণত হয়েছিলাম। এক নাগারে বলে গেল তার পূর্ণ জীবনকাহিনী। আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে তন্ময় হয় শুনলাম তার গল্প।

     পিটার ঠিক আমারই মত সকাল সকাল বিছানায় যায়, সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মুখহাত ধুয়ে নান্তা করে। হোটেলের খাবার ঘরে রোজ সকালে ওর সঙ্গে দেখা হত এভাবেই, আমরা একই টেবিলে বসতাম, এবং বসে বসে এভাবেই অলক্ষ্যে মনের দরজা খুলে দিল সে একটু একটু করে, হয়ত তারই মনের আড়ালে, অজ্ঞাতে, অনিচ্ছায়। ব্যক্তিগত গল্প ছাড়া আরো নানাবিধ বিষয় নিয়ে আমরা আলাপ করতাম। আধুনিক সভ্যতা, ইতিহাস, দর্শন শাস্ত্র, সাহিত্য, বিজ্ঞান, গণিত। আমাদের মতের মিল অনেক কিছুতেই। ভবিষ্যতের ভাবনাতে আমরা দুজনই সমান চিন্তিত। মানুষ যে একাধারে কত কুৎসিত কত সুন্দর হতে পারে, কত নিষ্ঠুর কত উদার হতে পারে, একই মানুষ, একই সময়কার, যেন সে এই যুগটারই এক বিকল্প প্রতিচ্ছবি, সে দৃশ্য আমাদের দুজনকেই সমান আশ্বান্বিত করে, সমান আতংকিত করে। পিটার আর আমি অবশ্য ঠিক একই সমতলে দাঁড়িয়ে দেখছিনা পৃথিবীকে- আমার পৃথিবীতে লিফটের প্রয়োজন হয়না এক তলা থেকে আরেক তলাতে যেতে, ওর হয়। ওর পা ওকে অক্ষম করেছে দেহে কিন্তু তার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে একটি তৃতীয় চক্ষু যা আমার নেই এবং কামনা করি যেন না হয়। এই তৃতীয় চোখ দিয়ে সে মানুষের গভীরতম প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করে সবকিছু দেখতে পায়। সে দেখে মানুষের এক কদর্য কুৎসিত মুখ। সেই মুখ জান্তব মুখ। সেই মুখে মনুষ্যত্ব নেই। সেই মুখ করুণাহীন, মায়াহীন, কঠিন এক প্রাণহীন প্রেতাত্মার মুখ। যার চোখ আছে বলে সে বুঝতে চায়না অন্ধের কষ্ট। যার পা আছে সে বুঝতে চায় না পা-হারাদের দুঃখ। প্রতিবন্ধির পৃথিবী এক বিষন্ন, নিঃসঙ্গ বন্দীশালা। সেখানে যাকে ঢুকতে হয়নি সে জানেনা কতটা ভাগ্যবান সে, তাই তার ভাগ্যকে তার প্রাপ্য বলেই গণ্য করে। কিন্তু পিটার ক্লার্কসনের অভিজ্ঞতা হয়েছে জীবনের উভয়তীরে বসবাস করবার। সে জানে জীবজগতে কারো পাওনা বা স্বত্ব বলতে কিছু নেই। সবই এক অন্ধ নির্বিকার প্রকৃতির অলক্ষ্য স্বৈরাচারি নিয়মের বশবর্তী হয়ে আবর্তিত হয়। মানুষ তার ভাগ্যের নিয়ন্তা নয়, নিয়ন্ত্রিত ক্রীড়নকমাত্র।

     লিওভেনের ছটি দিন বেশ আনন্দে কাটানো গেল। কত দেশের কত গুনী মানুষ, কত সুন্দর মানুষ, কত মুক্তমনা মুক্তবুদ্ধি, কত মুক্তপ্রাণ মানুষের সঙ্গ পেয়ে ধন্য হলাম আমি। আর্ন্তজাতিক সম্মেলন এক মহা মিলনক্ষেত্র, যেখানে সীমানা মুছে যায়, জাতিধর্মের ভেদাভেদ মুছে যায়, থাকে শুধু একাগ্র জ্ঞানপিপাসা, জানবার শিখবার উদগ্র কামনা। জানিনা কেন আমাদের দেশের মানুষ এমন করে মিলন মেলার আয়োজন করে প্রতিবার পৃথিবীর প্রতিটি জাতিকে নিজেদের কাছে টেনে আনবার চেষ্টা করছেনা। এ নাহলে কেমন করে ঘুচবে আমাদের হাজার বছরের দীনতা হীনতা আর জীর্নতার জঞ্জাল। বাইরের পৃথিবীকে যে জাতি সাদরে সম্ভাষণ জানাতে কার্পণ্য করে, যে জাতি তার দুয়ার খোলা রাখে কেবল নিজেরই স্বজনদের জন্যে সে জাতি কখনো বিশ্বদরবারে স্থান পাবার যোগ্য নয়। আমরা কি সেই কোনঠাসা সংকীর্ণ গুহার ভেতরেই আবদ্ধ হয়ে থাকব চিরকাল?

     সারা জীবনব্যাপী এমনি করে পৃথিবীর নগরে নগরে বন্দরে বন্দরে ভ্রমণ করে বিবিধ স্বর্ণরৌপ্য মনিকাঞ্চন সংগ্রহ করে আসবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সৌভাগ্য হয়েছে অচেনা মানুষের, দূরের মানুষের প্রাণের কাছে কান পেতে তাদের বুকের শব্দ শোনার, তাদের হাসি কান্নার খবর নেবার, তাদের পথের সঙ্গে নিজের পথের ছন্দ খুঁজে পাওয়ার। সৌভাগ্য হয়েছে তাদের জ্ঞানের ভুবন থেকে সংগৃহিত আলোকশিখার পুন্যধারাতে নিজের জীবনকে আলোকিত করে তোলার। এবারের যে ভ্রমণটি সাঙ্গ করে এলাম, হয়ত এরপর আর যাওয়া হবে এত দীর্ঘ সফরে, এ যেন এক অবিশ্বাস্য পাওয়া আমার। এত ধনধান্যে পুর্ণ পণ্যবোঝাই তরী আমি ভেড়াতে পারব আপন বন্দরে আশা করিনি। মনে হল যেন আমার চিরকালের আরাধ্য সেই প্রহেলিকাময় স্বর্ণদ্বীপ, যার সন্ধানে নাবিকের বেশে ঘুরেছি আমি দূর দূরসমুদ্রে, তারই সাক্ষাৎ পেয়ে এলাম এবার। জানতে চাইছেন কোথায় সেই রহস্যময় স্বর্ণদ্বীপ? কি করে বলি বলুন। ভাববেন আমি কথা এড়িয়ে যাচ্ছি। না ভাই, এড়াচ্ছি না। বলতে চাইছি যে বললেও তাতে কোন লাভ হবে না কারো। এ স্বর্ণদ্বীপের সন্ধান প্রতিটি মানুষ, তার নিজেকেই খুঁজতে বেরুতে হয়। অনেক অনেক দিন পর সে বুঝতে পারে কোথায় সে জায়গাটি। সে তো নিজেরই ভিতরে। তার অন্তরেরই অন্তরালে।

অটোয়া, কানাডা।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.