Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  নিয়মিত কলাম  ||  ৯ম বর্ষ ৮ম সংখ্যা অগ্রহায়ণ ১৪১৬ •  9th  year  8th  issue  Nov-Dec  2009 পুরনো সংখ্যা
সক্রিয় সরকারের প্রত্যাশায় Download PDF version
 

নিয়মিত কলাম

দূরের জানালা, কাছের মানুষ

সক্রিয় সরকারের প্রত্যাশায়

অনিরুদ্ধ আহমেদ

 

এক.

     সম্প্রতি এক ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মানবাধিকারের বিষয়ে যাঁর  নিবিষ্টতা প্রশ্নাতীত তিনি আশংকা প্রকাশ করেছেন যে শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুর মতোই স্বাধীনতা বিরোধীদের দ্বারা আবর্তিত হয়ে প্রশাসন চালাচ্ছেন। তাঁর এই উক্তির মধ্যে আশংকার ইঙ্গিত ও ছিল স্পষ্ট। বস্তুত সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির একটা বৈশিষ্ট হচ্ছে এই যে মন্ত্রী সভা প্রায়শই অনেকখানি নির্ভরশীল থাকে এবং মাঝে মাঝে এক আশ্চর্য অসহায়ত্বের সম্মুখীন হয়। ব্রিটিশ ছবি ইয়াস মিনিস্টার এবং ইয়াস প্রাইম মিনিস্টার যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের মতো ওমন যাঁদরেল রাজনীতিকরাও বিপর্যস্ত হন, আরো অভিজ্ঞ পরিপক্ব কথিত "সিভিল সার্ভেন্টদের" কাছে। এঁরা ঠিক কতখানি জনগণের সেবক সে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়। আমি অবশ্য কেবল মাত্র রাজনীতিকদের পক্ষাবলম্বন করে, আমলাদের সমালোচনা করতে চাই না কারণ প্রশাসনের আঁটঘাট যাঁদের জানা, তাঁরা যে ইচ্ছে করলে রাজনীতিকদের নির্ভূল পরামর্শ দিতে পারেন সে প্রত্যয় আমার আছে। প্রশাসনের রাজনীতিকরণের পক্ষের লোক আমি নই, কিন্তু এ কথাও সত্যি যে রাজনৈতিক মেনিফ্যাস্টোর আদর্শিক ও আক্ষরিক বাস্তবায়নের জন্যে আমাদের প্রয়োজন রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অনুগত সরকারী কর্মকর্তা, বিশেষত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তো বটেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থা অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর পরই আমলাদের মধ্যে একটা বিরাট পরিবর্তন সাধন করা হয়। একে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের রাজনীতিকরণ বলে নেতিবাচক ভাবে দেখা হয় না, দেখা হয় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পুরণের প্রশাসনিক অবকাঠামো হিসেবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে আমলা পরিবর্তনের তেমন কোন রেওয়াজ নেই। বরঞ্চ আমলাদের সামগ্রিকভাবে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত থাকতে বলা হয়। তাদের দায়িত্ব সরকারের নীতিমালার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। ঠিক এই জায়গাতেই আমলাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের সম্পর্কের এক ধরণের ভারসাম্যের প্রয়োজন আছে। আমলা নির্ভর কোন সরকার যেমন সফল হতে পারে না, তেমনি এটাও সত্যি যে রাজনীতিকরা নির্বাচনে জয়লাভ করেই যে সরকার পরিচালনায় কৃতিত্বের পরিচয় দিতে পারবেন তেমন কোন নিশ্চয়তা নেই। এই ভারসাম্যের বিষয়টি খুবই সুক্ষ অথচ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে জনান্তিকে জানতে পেরেছি যে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক আমলা, যাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বিরোধী এক ধরণের  আদর্শ অবলম্বনের অভিযোগ আছে এবং যিনি সেই অভিযোগে চাকরি হারাতে বসেছিলেন প্রায়ই, তিনিই এখন প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রধান আমলা। শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নীতি নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্ট থাকার কথা স্বভাবতই কিন্তু তিনি যদি ভিন্ন মেরুর লোক হন এবং আমলা হয়েও বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদের প্রতি সঙ্কল্পবদ্ধ হন, তা হলে শেখ হাসিনা যে তাঁর প্রভাবে এবং পরামর্শে  ভুল পথে পরিচালিত হবেন না, সে নিশ্চয়তাই বা কোথায়। অন্যদিকে এটাও সত্যি যে ব্রিটিশ পদ্ধতির সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রশাসন পরিচালনায় ডাকসাঁইটে আমলারা প্রায়শই সহায়ক। রাজনীতিক এবং আমলার মধ্যে সহায়ক সম্পর্ক প্রশাসনকে অনেক বেশি গতিশীল করে। অনেকেই বলছেন যে এই সম্মিলন আদর্শিক ভাবে ঘটছে না বলে সরকারের কাজ কর্মে অপেক্ষাকৃত স্থবিরতা লক্ষ্যণীয়।

দুই.

     আওয়ামি লীগ নেতৃত্বাধীন মহজোট সরকার যে বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছে, তার ফলে তাদের প্রতিশ্রুত দিন বদল করার সমূহ সম্ভাবনা তাদের ছিল প্রথম থেকেই। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য কারণে সেই সম্ভাবনার সর্বাত্মক ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না এবং এখনও পর্যন্ত দিনবদলের খুব পরিস্কার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচারের কাজ যদি বা শুরু হয়েছে, জেল হত্যা, এবং সর্বোপরি যুদ্ধপরাধীদের বিচারের বিষয়টি সম্ভবত খুবই ধীরগতিতে এগুচ্ছে। কোন কোন মামলা, যেমন একুশে অগাস্টের গ্রেনেড আক্রমণের মামলাটি প্রথম থেকেই শুরু করতে হচ্ছে। একটা ধারণা এমন তৈরি হচ্ছে মানুষের মনে যে এই সরকার বিরোধী বিএনপি -জামায়াত জোট এবং ফ্রিডম পার্টির তরফের কিছু হামলা ও মামলা নিয়ে এতই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে দিনবদলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে। কিন্তু পাশাপাশি এটাও ঠিক যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে বিচার কাজের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ যে অপরাধের বোঝা বহন করছে, এ সব বিচার কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে দেশের পাপের বোঝা লাঘব হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত দুধরণের পরস্পরবিরোধী মন্তব্য পাওয়া গেছে। এক পক্ষ বলছেন যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিলম্ব সরকারের এক ধরণের কৌশল মাত্র এবং বিচার কাজ যদিই বা বিলম্বে শুরু হয়, সরকারের বর্তমান মেয়াদকালে তা শেষ হবে না এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত জোট আবারও এই ইস্যুকে পূঁজি করে নির্বাচন লড়বে। দ্বিতীয় একটি সহনশীল মতামত হচ্ছে আটত্রিশ বছর আগেকার যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচার করার ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই ধীর ও সাবধানী পদ্ধতিতে এগুতে হবে কারণ আইনের ফাঁক গলে যদি কোন অপরাধী বেরিয়ে যায় তা হলে দুষ্টক্ষতের চিকিৎসা ব্যাহত হবে। এই দ্বিতীয় মতামতটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিচারকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে এর খুঁটিনাটি সব দিকে নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে। সম্প্রতি নিউ জার্সির কীন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়ে একটি সারাদিনব্যাপী সম্মেলন ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হলো। ঐ সম্মেলনে আইন বিশেষজ্ঞরাও এই মত প্রকাশ করলেন যে বাংলাদেশ সরকারকে বিচারের সমস্ত প্রক্রিয়া ও আইন কানুন সম্বন্ধে যথেষ্ট স্বচ্ছ হতে হবে যাতে করে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেউ রাজনৈতিক ভাবে ব্যাখ্যা না করেন। তা ছাড়া তারা এ ব্যাপারে ও সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই বিচারকে অর্থবহ করে তুলতে হলে প্রয়োজনীয় স্ট্যাটুয়েট বা সংবিধি রচনা করতে হবে। এই সব বিষয় বিবেচনায় নিলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত। তবে অন্য আরেকটি যে কারণ অনেকের মনে এ ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করেছে তা হলো কিছু দেশের পক্ষ থেকে বিচার না করার ব্যাপারে কুটনৈতিক চাপ। বাজারে জোর গুজব যে সৌদি আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ ক'টি দেশের তরফ থেকে এ ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে। তা ছাড়া পাকিস্তানতো এ প্রসঙ্গে প্রকাশ্য আপত্তি জানিয়েছে বর্তমান সরকার ক্ষমতাগ্রহণের পরপরই। অবশ্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোনক্রমেই কারও চাপের কাছে নতি স্বীকার করে এমন একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করবে না। কূটনৈতিক মহল থেকে চাপ অবশ্যই থাকবে এ ধরণের বিচারকে স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ করে তোলার জন্য। একটা আশঙ্কা অনেকেই প্রকাশ করেন যে এই যুদ্ধাপরাধীর বিচার যেন রাজনৈতিক হিংসা প্রতিহিংসার বিষয় হয়ে না দাঁড়ায়। ইঙ্গিতটা স্পষ্টতঃ জামায়াতে ইসলামির প্রতি। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জামায়াতে ইসলামি নিজেদের এমন একটা ভাবমূর্তি গঠনের চেষ্টা করছে যে এটি হচ্ছে একটি গণতান্ত্রিক দল, মধ্যপন্থি ইসলামি দল। পশ্চিমের অনেকেই ভয় পান যে জামায়াত যদি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয় তা হলে দলের অনেক নেতা কর্মিই জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়বে। এই আশংকা সম্ভবত খুব একটা অমূলক নয় তবে এ কথাও সত্যি যে জামায়াত তার গণতান্ত্রিক বহির্কাঠামোর মধ্যেও যে জঙ্গি মৌলবাদিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে এই অভিযোগ উঠেছে শাহরিয়ার কবিরের সাম্প্রতিকতম ছবি Portrait of Jihad এ। তবে পাশাপাশি এ কথাও মনে রাখার প্রয়োজন আছে যে যুদ্ধাপরাধীএবং জঙ্গিবাদ দুটোকে গুলিয়ে ফেলার কোন কারণ নেই। জঙ্গিবাদে সংশ্লিষ্টতার কারণে জামায়াতে ইসলামি নিষিদ্ধ হবে কী না সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে এমন বিচক্ষতার সঙ্গে যাতে করে কোন দল বা যুদ্ধাপরাধীই এটিকে রাজনৈতিক নিপীড়ন বলে চিহ্নিত না করে। জামায়াতে ইসলামির কেবলমাত্র ৫০ ঊর্ধ্ব সদস্যরাই, তদন্ত সাপেক্ষে যুদ্ধাপরাধী হতে পারেন এর চেয়ে কম বয়সী কাউকেই অন্তত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাটা ঠিক হবে না। এই বিচক্ষণতাই সরকারকে তার এই কাজের আন্তর্জাতিক বৈধতা দেবে।

তিন.

     তবে এই সব মামলার নিস্পত্তি হওয়ার প্রয়োজনীয়তা যেমন অনস্বীকার্য তেমনি সরকারকে তার দিনবদলের সনদ বাস্তবায়নে আরো অনেক বেশি সক্রিয় হতে হবে। আমরা শুনেছি যে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কয়েকবারই বিভিন্ন কার্যসূচি তরান্বিত করার জন্যে তাগাদা দিয়েছেন কিন্তু তারপরও নানান দীর্ঘ সুত্রিতায় সে সব কাজ সম্পন্ন হতে পারেনি। বাংলাদেশের মানুষ সাফল্যের বাস্তব চিত্রটা দেখতে চায়, কেবল কথা, কেবল প্রতিশ্রুতি, কেবল সমালোচনা নয় এর ঊর্ধ্বে উঠে অর্জন করতে হবে কাঙ্খিত সাফল্য। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার অনেকখানিই সফল হয়েছে কিন্তু আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ছাত্রসংগঠনের মধ্যে অন্তর্কলহ- এগুলো সময়ে অপচয়। বাংলাদেশের মানুষ দুটি ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধান চায়। একটি হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন আর অপরটি হলো ঢাকার যানজট নিরসনে, পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা। ১৯৯৬ সালে আওয়ামি লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা মাটির ওপরেই সার্কুলার ট্রেন ব্যবস্থা চালুর একটি খসড়া পরিকল্পনা করেছিল।  সময় এসছে সেই সব  পরিকল্পনা বাস্তবায়নের । তা না হলে মানুষের আস্থায় চিড় ধরবে। আর গোড়াতে যে কথা বলছিলাম, শেখ হাসিনা যদি সত্যিই সত্যিই স্বাধীনতা বিরোধীদের দ্বারা আবর্তিত থাকেন বঙ্গবন্ধুর মতো, তা হলে তো আমাদের শঙ্কিত হবার, সন্ত্রস্ত হবার যথেষ্ট কারণ থেকে যায়।

অনিরুদ্ধ আহমেদ:  যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক ও নিবন্ধকার
aauniruddho@gmail.com

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.