Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৮ম সংখ্যা অগ্রহায়ণ ১৪১৬ •  9th  year  8th  issue  Nov-Dec  2009 পুরনো সংখ্যা
মন্দিরে নারীর স্থান Download PDF version
 

প্রবাসে মন্দির

 

 

মন্দিরে নারীর স্থান

 

দীপিকা ঘোষ

 

সনাতন হিন্দুধর্মে সুপ্রাচীনকাল থেকে ধ্যাত্ম সাধনার জন্য যে বিভিন্ন পথ উন্মোচিত হয়েছিলো তার সবগুলোতেই ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির,কার্য-কারণের তত্ত্বগত ব্যাখ্যায় ঈশ্বরের ট্রিনিটি বা ত্রয়ী অবস্থাকে গ্রহ করা হয়েছিলো। তিনি যখন সৃষ্টি করেন তখন তিনি ব্রহ্মা (সৃষ্টিকর্তা), যখন সৃষ্টি বজায় রাখেন তখন তিনি বিষ্ণু (পালনকর্তা), যখন নতুন সৃষ্টির মানসে জগৎ ধ্বংস করেন ঈশ্বর তখন মহেশ্বর (প্রলয়কর্তা)। বিশ্বেশ্বরের এই সৃষ্টি, পালন ও প্রলয়কার্যে যে এনার্জি (শক্তি) বা কনসাসনেস (চেতনা) অন্তসলিলার মতো বিশ্বজগতের সর্বত্র নিয়ত প্রবাহমান তাকে সনাতনধর্ম নারীসুলভ প্রকৃতি হিসাবে ব্যাখ্যা করেছে। কার জগতে যে কোনো প্রকাশিত সৃষ্টিরই বস্তুগত রুপলাভ, নারীর মাধ্যমেই সম্ভব হয়। এই জন্যই প্রকৃতিকে বলা হয় মাদার নেচার, পৃথিবীকে মাদার আর্থ্ কিংবা বসুন্ধরা জননী। আর এ কারণেই স্রষ্টা ব্রহ্মার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার অবস্থার নাম মহামায়া। পালনকর্তা বিষ্ণুর সঙ্গিনী মহালক্ষী এবং প্রলয়কর্তা শিবের এনার্জির নাম কালী। শিব তাই অপ্রকাশিতরূপে ভূতলে শায়িত। কালী তাঁর বক্ষ ভেদ করে প্রকাশিত। হিন্দু মন্দিরে নানা দেবতার সঙ্গে বহু দেবীরাও তাই আরাধ্য নিয়মিত। ঈশ্বর নারী পুরুষ দুই রূপেই সেখানে বর্তমান।

তাহলে দেখা যাচ্ছে তত্ত্বগত দিক থেকে নারীপুরুষের কোনো বস্তুগত ভেদাভেদ সনাতনধর্মে স্বীকৃত নয়।জগতের সব কিছুই ঈশ্বর থেকে উদ্ভ, বিশ্বব্রহ্মান্ড নিরাকার বিশ্বেশ্বরের প্রকাশিত রূ, সনাতন ধর্মের এটাই মূল কথা এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় এই সত্যকে উপলব্ধি করাই সেলফ রিয়ালাইজেশন, গড রিয়ালাইজেশন কিংবা আত্মোপলব্ধি হিন্দুর পূজোর্চনা, সন্ধ্যা আহ্নিক, প্রার্থনা যে কোন সাধনারই আত্মোপলব্ধিই শেষ কথা। অর্থাৎ ভগবানই সর্বরূপে বিজারিত এই সত্যকে জানা। অতএব মন্দিরে নারীর অবস্থানের বিষয়টির সঙ্গে শাস্ত্রীয় ভাবনার কোন সম্পর্ক নেই। শাস্ত্রে আত্মোপলব্ধির অধিকার ও প্রয়োজন সর্বস্তরের সামাজিক মানুষের ।

তবে প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত মন্দিরে মেয়েদের ভূমিকা ব্যাপারে সামাজিক,লোকজ, অর্থনৈতিক এবং কিছু ঐতিহাসিক কার অবশ্যই রয়েছে। যেগুলোর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সারা ভারতবর্ষ জুড়ে শতাব্দীর পরে শতাব্দী অতিক্রম করেও আজও বিশেষভাবে বিশেষিত। সেই ঐতিহাসিক, অর্থনেতিক, সামাজিক আর লোকজ কারগুলো এখানে অতি সংক্ষেপে বলবো।

প্রাচীনকালে সামাজিক সুশৃঙ্খলা এবং কর্মনৈপুণ্য বজায় রাখার জন্য কর্তব্যকর্ম অনুসারে সমাজে চারটি বর্ণের সৃষ্টি হয়। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র। শাস্ত্রপাঠ আর পূজার্চনার দায়িত্ব দেয়া হয় ব্রাহ্মণদের। ব্রাহ্মণ মানে যিনি বিবিধ জ্ঞানচর্চা ও ধ্যান ধারণার মাধ্যমে শান্ত, সংযত, ক্ষমাশীল, ধৈর্যশীল,সত্যবাদী, ধীমান, এবং ব্রহ্মবিদ। যিনি শাস্ত্রের যথার্থ ব্যাখ্যা দানে পারঙ্গম। এই জন্যই প্রাচীনকালে ব্রাহ্মণকুলে জন্মালেই ব্রাহ্মণত্ব লাভ করা যেতো না। ব্রাহ্মণত্ব অর্জনের জন্য উচ্চশিক্ষায় এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় কৃতকার্য হতে হতো। কিন্তু ভারতবর্ষের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষদেরই যেহেতু সংসার নির্বাহের দায়ভার ছিলো, মেয়েরা বিয়ের পরে স্বামীর সংসারে প্রধানত গৃহকর্মই পালন করতেন, তাই অর্থ রোজগারের জন্য পুরুষেরাই শাস্ত্রপাঠ করে ব্রহ্মবিদ হয়ে মন্দিরে পূজার্চনার দায়িত্ব গ্রহণ করতেন। অবশ্য প্রাচীন ভারতে নারীর স্বাধীনতা যথেষ্টই ছিলো। নারীরাও নিজ যোগ্যতাবলে বিদ্যা অর্জন করে খ্যাতি অর্জন করতেন। পঞ্চায়েত কাউন্সিলের মেম্বার হতেন। রাজসভার বিশাল পন্ডিতমহলে পুরুষদের সঙ্গে তর্কে লড়তেন। মৈত্রেয়, গার্গী এবং উপনিষদের নারী রচয়িতারা তার প্রমা। প্রাচীন ভারতে গণিতশাস্ত্রের বিখ্যাত তিন পন্ডিত ব্যক্তিদের একজন নারী, গণিত সুপন্ডিত ভাস্করাচার্যের কন্যা লীলাবতী।

মন্দিরে নারীর অবস্থান প্রাচীনকালে প্রধানত দুই ভাবে প্রাধান্য লাভ করেছিলো সেবাদাসী আর নর্তকী। স্বয়ং নটরাজ শিব নৃত্যশিল্পের উদগাতা। প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রথমভাগে মন্দিরে নৃত্য রোজকার উপাসনার একটি অঙ্গ ছিলো। নর্তকী কুমারী মেয়েরা সব রকম পরিশুদ্ধতা বজায় রেখে থাকতেন সাংসারিক জীবনের বাইরে। সেবদাসীর কর্তব্য ছিলো মন্দির এবং তার প্রাঙ্গন নিত্যদিন ধুয়ে মুছে পরিচ্ছন্ন করে রাখা।মন্দিরের সব রকম আচার অনুষ্ঠানে রান্নাবাড়া করার কাজটি তাদেরই ছিল একচেটিয়া। নতর্কীরা আরাধ্য দেবতার সামনে নৃত্য ও আরতির মাধ্যমে তাদের মনোরঞ্জন করতেন সুন্দরের ধ্যানমগ্নতায়। লোকজ আচরণে পরবর্তীকালে একটি বিধিনিষেধ আরোপিত হয় ঋতুমতী মেয়েদের মন্দিরে প্রবেশের ক্ষেত্রে। প্রাকৃতিক নিয়মে প্রাপ্ত মেয়েদের এই শারীরিক অবস্থাকে মনে করা হয় অশৌচ। আজ পর্যন্ত  এই ক্ষেত্রে অনেক গ্রাম্য পরিবেশে বিধিনিষেধ অটুট। তবে কুসংস্কারে পরিণত হলেও একটা বৈজ্ঞানিক যুক্তিও কাজ করেছিলো এই বিধিনিষেধের পেছনে। ঋতুচলাকালীন সময়ে মেয়েদের সবদিক থেকে সংযত থাকা আবশ্যিক এটা একটা বৈজ্ঞানিক কারণ। সন্তানসম্ভবা নারীদে ব্যাপারেও পূজো-চারের ক্ষেত্রে যে বিধিনিষেধ রয়েছে, সেটার পেছনে আজও বৈজ্ঞানিক যুক্তিই প্রধান। তবে গৃহের নিত্য পূজো মেয়েরা বিশেষত বাঙালী মেয়েরা নিয়মিতই করে থাকেন কিছু কিছু শারীরিক বিধিনিষেধ মেনে। বাঙালির শারদীয় উৎসবে মন্ত্রপাঠ এবং রিচ্যুয়াল দু একটি বিষয় পুরুষ পুরোহিত করলেও মেয়েদের ভূমিকা জমকালো। আর আজকাল তে আরতি প্রতিযোগিতাতেও নেমে পড়েছেন মেয়েরা।

বাংলার তুলনার দক্ষিণ এবং উত্তর ভারতের পূজার্চনায় বড় রকমের ভূমিকা এখনও পর্যন্ত পুরুষদেরই। এর প্রথম কার পূজার্চনার আনুষ্ঠানিকতাকে বাঙালিরা যতখানি উৎসব মনে করেন, দক্ষি কিংবা উত্তর ভারতের মানুষেরা তার চেয়ে অনেক বেশী মনে করেন, বৈদিক নিয় মেনে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং কৃচ্ছ্সাধনার ভেতর দিয়ে ঈশ্বরের আরাধনা। পুরুষেরা কৃচ্ছ্সাধনে যতখানি সক্ষম মেয়েরা ততটা নন। বৈদিক নিয়ম মেনে চলা বাঙালি নারীপুরুষের চেয়ে এরা অনেক বেশী রক্ষণশীল।এ ছাড়া মানুষের মধ্যে অন্যকে শো করবার যে মনেবৃত্তি নিভৃতে কাজ করে চলে তার কিছু প্রভাব হয়তো পড়ে থাকবে ধ্যাত্ম সাধনার ক্ষেত্রেও। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে শাস্ত্রীয় বিষয় আশয়ের ব্যাপারে পুরুষের ভূমিকাই মূখ্য হোক এই প্রত্যাশা জেগে থাকাও খুবই স্বাভাবিক।

তবে এই সমস্ত কারগুলো ডিঙিয়েও মন্দিরে নারীর অবস্থানের পারম্পর্য বিচারে একটি ঐতিহাসিক কার রয়েছে যা দক্ষি ও উত্তর ভারতকে রক্ষশীল এবং পূর্ব ভারতকে অনেকখানি শিথিল করার জন্য দায়ী। প্রাচীন এবং মধ্য যুগে মন্দিরগুলো ছিলো জীবনযাত্রার প্রাকেন্দ্র। কেবল পূজর্চনা সেখানে হতো না, পঞ্চায়েত বৈঠক থেকে স্কুলের বিদ্যাচর্চা, বিভিন্ন আলোচনার আসর সবই হতো মন্দিরে। শতাব্দীর পরে শতাব্দী জুড়ে এখানে সঞ্চিত হয়েছিলো অশেষ ধনরত্নভারতবর্ষ চিরকালই পরমতসহিষ্ণু। অতি প্রাচীনকালেও সেখানে বিবেকবুদ্ধি অনুযায়ী মানুষের চিন্তার ও কথা বলার স্বাধীনতা ছিলো। নাস্তিক দার্শনিক চার্বাকের মতবাদও তাই ফলাওভাবে প্রচারিত হয়েছিলো সে যুগে। ভারতের মাটিতে নানা ধর্মমতের মানুষেরা এসেছেন, আশ্রয় নিয়েছেন। আদি মধ্যযুগ থেকে আরববাসীরাও এসেছেন ব্যবসা করতে। ছাত্ররা এসেছেন চিকিৎসা, ণি, জ্যোতিষ আর জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষার জন্য। আরবী ভাষা সংস্কৃত ভাষা থেকে গণি, জ্যোতিষ, চিকিৎসা আর জ্যোতির্বিদ্যার অজস্র অনুবাদও করেছেন তারা। আরাধনার জন্য গড়েছেন মসজিদ। কিন্তু তাতে কখনই সংর্ঘর্ষ সৃষ্টি হয়নি কোনোদিন। সেটা হলো, যখন মধ্যযুগে ভারতভূমি আক্রম করে নিষ্ঠুর হত্যালীলা এবং মন্দির লুন্ঠণের কাজ একাদিক্রমে শুরু করলেন কিছু কিছু অবিবেচক সুলতানেরা।

সারা উত্তর ভারত আর দক্ষি ভারত জুড়ে বারংবার আক্রমণে নিহত হলো লক্ষ লক্ষ নরনারী। লুপাট এবং ধ্বংস হলো অজস্র মন্দির। সহস্র সহস্র বছরের ইন্দো-ভারতের সংস্কৃতি এই বিদেশী বিজেতাদের যখন পরাজিত করতে ব্যর্থ হলো, আত্মক্ষার জন্য তখন সে আশ্রয় নিলো নিজের আরোপিত গন্ডীর মধ্যে। নারীর স্বাধীনতা হর করা হলো,বর্ণভেদ প্রথা তার বিজ্ঞানমনস্কতা হারিয়ে কঠোরতর হয়ে গেলো কুসংস্কারের মধ্যে। মানুষ তার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে জীবনের প্রত্যেক পদক্ষেপে হয়ে উঠলো দৈবনির্ভর।

আধুনিক যুগে ক্রমশ কুসংস্কারের অনেক আবরই খসে পড়েছে ঠিকই তবুও বাংলার তুলনায় মধ্যযুগে বিধ্বস্ত উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের রক্ষশীল আচর এখনও অনেকটাই কঠোর। হয়তোবা এ কারণেই কিছু কিছু মন্দিরে গন্ডী দিয়ে পিছনে কিংবা পার্শ্ববর্তী নির্দিষ্ট অংশে নারীদের পৃথকভবে বসার বা দাড়ানোর ব্যবস্থা এখনও বিদ্যমান। মন্দিরে নারীর স্থান এর আলোচনা প্রসঙ্গে তাই এই ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক, লোকজ আর সামাজিক কারগুলো যৌক্তিকভাবেই আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।

_______

দীপিকা ঘোষ পড়াশুনা করেছেন বাংলা সাহিত্য নিয়ে। প্রকাশিত গ্রন্থ চারটি উপন্যাস এবং তিনটি ছোটগল্পের বই।

ওয়েস্ট চেস্টার, ওহায়ো

নভেম্বর ১২, ২০০৯

 

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.