Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ৭ম সংখ্যা কার্তিক ১৪১৬ •  9th  year  7th  issue  Oct-Nov  2009 পুরনো সংখ্যা
আংটি Download PDF version
 

সাহিত্য

 

  ধারাবাহিক ছোটগল্প

 আংটি

  মোমিনুল হক

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

: আমার মনে হয়েছিল, এমন কিছু একটা ঘটবে। এই পথ দিয়েই আমাকে যেতে হতো। চোখ খোলা রেখেই গাড়ি চালিয়ে আসছিলাম। তোমাকে এখানেই পাবো বলে আমার মনে হয়েছিল। ইলা বলল।

: বিপত্তি আমি নিজেই ডেকে এনেছি। আমার অফিসে আমার এক কলিগ, কোন এক সময় শিকাগোতে কিছুদিন কাটিয়েছিল, আমাকে বলেছিল আমি যেন হোটেল ঠিক করেই বের হই। ওর কথা শুনি নি!-

: কলিগ বলতে যাকে বলছো, সে কি একটি মেয়ে না ছেলে?- ইলা মাইককে প্রশ্ন করল।

মাইক চুপ করে থাকল।

: বুঝেছি। সে একটি মেয়ে। ইলা হেসে বলল।

: হ্যাঁ, সে এখানে পড়াশোনা করেছিল। এখন সংসার পেতেছে রাজধানীতে।

: ওর কথা শোন নি কেন?-

মাইক চুপ করে থাকল। কীইবা বলার আছে!

ইলা হেসে বলল, মেয়েদের কথা তোমরা শুনতে চাও না। ভাবো, যতো সব সব মেয়েলী ভয়-ভাবনা! শুধু শুধু ভয় পাওয়া!-

: মেয়েদের দূরদর্শিতা নিয়ে, মনে হচ্ছে, বড়াই করছো!- মাইক হেসে বলল।

     এই সময় একটা রাস্তার সংযোগস্থলে এসে ইলা থামল। খুব দ্রুত গতিতে একটা গাড়ি চলে গেল সম্মুখ দিয়ে। মাইকের মনে হলো, গাড়ীখানা ঘন্টায় শখানেক মাইল বেগে চলে গেল। রাস্তায় যানবাহন নেই। মধ্য-রাতের কিছু কুয়াশা ছিল। ইলা থেমে ভালোই করেছিল। ওই গাড়িটি যে দিক থেকে আসছিল, সেই রাস্তাখানা সংযোগস্থল থেকে সহজে দেখা যায় না। কিছু একটা সাংঘাতিক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত।

: মনে হচ্ছে, বড়াই করো নি! দূরদর্শিতা থাকা ভালো। মাইক যেন লজ্জিত হয়েই ইলাকে বলল।

     মোড় নিয়ে ইলা বলল, এই পথে আমি আসা-যাওয়া করি। এই অন্ধ-মোড়টা ভালো নয়। অনেক বিপত্তি ঘটেছে এখানে। বিশেষ করে রাত্রে। এমনি কুয়াশা-ঢাকা রাত্রে।- একটুখানি চুপ করে থেকে ইলা আবার বলল, আমি থাকি লেকের ধারে একটা বাড়িতে। ছোট্ট দোতালা বাড়ি। বাবা দিয়েছেন আমাকে বাড়িটা। তিনি ওখানেই কাছে নর্থ-ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন।

: তিনি কি এখন ওখানে পড়ান না?- মাইক প্রশ্ন করে।

: না। তিনি এখন জীবিত নেই।

: দুঃখিত!-

: সে নিয়ে আমি আর ভাবি না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ইলা আবার বলল, কিন্তু অই অন্ধ-সংযোগস্থলে এলেই আমার তখন বাবাকে মনে পড়ে।

     মাইক চুপ করে শুনে গেল। ইলা যখন আর কিছু বলল না, মাইক তাকে জিজ্ঞেস করল, অই অন্ধ-মোড়ে এলে তোমার বাবাকে মনে পড়ার নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে।-

: হ্যাঁ, আছে। ওখানেই যখন তিনি মোড় নিচ্ছিলেন, সম্মুখের পাশ থেকে এক মাতাল চালক বেপরওয়া গতিতে এসে বাবার গাড়িতে ধাক্কা মারে। বাবা সেখানেই মারা যান। যে ধাক্কা মেরেছিল, সে পালাতে পেরেছিল।

: তোমার বাবা কি এমনি রাতেই ফিরছিলেন?-

: হ্যাঁ। তিনি জীব-পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করছিলেন। প্যারিসে এক বিজ্ঞান-সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন সেই রাত্রে। ইলা চুপ করে গেল।

     মাইক তাকে আর কোন প্রশ্ন করে নি। মৃত্যুশোক এক কথা। দুর্দৈব-মৃত্যুশোক ভোলা যায় না। এ অন্তর-আকাশকে কোন আগাম-এত্তেলা না দিয়েই হঠাত ম্লান করে তুলে।

     ইলা মাইককে নিয়ে তার দোতালা বাড়িতে এল। গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতেই মিশিগান হৃদের ঠান্ডা হাওয়া তার গায়ে কাঁপুনি দিয়ে গেল। সে কোটের ল্যাপল বুকের উপর টেনে এনে চেপে ধরল।

: চলো, তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকি। বাইরে ঠান্ডা!- ইলা বলল।

কোত্থেকে একটা সাদা তুলতুলে কুকুর কুঁইকুঁই করে বেরিয়ে এল। ইলা কুকুরটাকে একটু আদর করে বলল, যাও, এবার শুয়ে পড়ো লক্ষীটি!-

     লক্ষীটি লেজ নাড়তে নাড়তে চলে গেল। ইলা বাড়ি ফিরে এসেছে, এতেই সে খুশী। অল্পেতেই পোষা কুকুর-বিড়াল আনন্দ পায়। মানবশিশুর পেছনে নিশ্চয়ই অনেক কাঠখড়ি পোড়াতে হয়, মাইক ভাবল। যদিও বলে রাখা ভালো, এ ব্যাপারে মাইকের অভিজ্ঞতা এখনও শূন্যের ঝুলিতে আছে। তার বাবা-মা দুজনকেই দিনে-রাতে খাটতে হয়েছে তাদের দুই ভাই ও দুই বোনকে মানুষ করতে। তাঁদের দুজনকে সে এক টেবিলে কদাচিত খেতে দেখেছে। তারা ভাই-বোনেরা রাত নামতেই তাদের শোবার কামরায় চলে গেছে। কেউ তাদেরকে বলে দিতে হয় নি!

     মাইককে একটা রুম দেখিয়ে, ইলা বলল, এটি তোমার শোবার কামরা। যদি গরম জলে গোসল করে ঝিরঝিরে হয়ে উঠতে চাও, পাশেই বাথরুম আছে। কিছু যদি খেতে চাও, বলো। আমি সেন্ডয়ুচ বানিয়ে দিতে পারবো। শেরী আছে। এক গ্লাস পান করতে পারো। ঘুম হবে ভালো।

মাইক সেন্ডয়ুচ বা শেরীর প্রতি আকৃষ্ট হলো না। গরম জলে গোসল করে চাংগা হয়ে উঠতে চাইল। ইলাকে সে বলল সেই কথাটা। ইলা যেন এটিই প্রত্যাশা করেছিল।

: বেশ, ধড়াচড়া খুলে ঢুকে পড়ো বাথরুমে। আমি চললাম। সকালে কখন দেখা হবে তোমার সাথে, জানি না। আমার দেরীতে উঠার অভ্যাস। আবার রাত জেগে কাজ করতে ভালোবাসি।

: আমি যদি সকালবেলা উঠে, কোন সাড়াশব্দ না তুলে কেটে পড়ি, তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে তো?- মাইক ইলাকে প্রশ্ন করল।

: মাইক, তুমি যদি অতো সকালে উঠতে পারো, আর যদি দেখো সারা বাড়ি সুমসাম হয়ে আছে, তবে চলে যেও। তোমার কাছে তো আমার বিজনেস কার্ড আছে। ফোন দিও। দেশের রাজধানীতে গিয়ে অবশ্য একটা ফোন করো।- ইলা মাইককে হেসে বলল।

     মাইক ইলাকে শুভ রাত্রি জানিয়ে কার্পেট-বিছানো মেঝের উপর দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে তার  রুমে চলে গেল।

     মাইক যখন খুব ভোরে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল, সে দেখল দরজার পাশে একটা ছোট্ট টেবিলের উপর একখানা কাগজে বড়ো বড়ো করে একটা ফোনের নম্বর লিখা আছে। নম্বরটা হলদে টেক্সি-ক্যাবের। এই নম্বরে ডাকলেই ওরা তাকে তুলে নিয়ে যাবে বলে ইলা তাকে জানিয়েছে। মাইক ওই নম্বরে ডাক দিয়ে নিচে নেমে এল। বাইরে দরজার পাশে অই দিনের খবরের কাগজের বিরাট বান্ডিল পড়ে ছিল। সেটিকে তুলে নিয়ে সে ভেতরে এনে রাখল।       প্রথম পৃষ্ঠায় খবরের নিচে দু কলামের যায়গা জুড়ে আজকের সম্মেলনের খবর ছাপা হয়েছে। মূল বক্তাদের কয়েক জনের নাম উল্লেখ আছে। অল্প কথায় অনেক খবরই দিয়েছে। রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর একটু পরেই, একখানা হলদে টেক্সি ঝড়ের গতিতে এসে মাইকের সম্মুখে দাঁড়াল। কিছুদূর আসার পর, মাইক তাকে বলল যে সে যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যতো সম্ভব নিকটেই একটা রেঁস্তরায় তাকে নামিয়ে দেয়। সে মাইকের দিকে একটু সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাল। বলা বাহুল্য, বিশ্বনন্দিত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পথখানিকে কিছুতেই নন্দিত বলা যায় না। ভদ্রপল্লি বলে যেটিকে বোঝানো হয়, সেটির সাথে এর তুলনা চলে না। দেয়ালগুলোর গায়ে বিরাট বিরাট অক্ষরে যা লিখা আছে, সেটি পড়লে মনে হবে, শিকাগোবাসীরা এক রক্তক্ষয়ী শ্রেণী-সংগ্রামে লিপ্ত আছে! এসব দেখে, মাইক ভাবল, বাইরে কোথাও খাবারের দোকান খোঁজার চাইতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়াতে নিরাপত্তা খোঁজাই আশু কর্তব্য! তাই সে করল।

     তিন দিন সে ছিল শিকাগোতে। হোটেলও খুঁজে পেয়েছিল। সম্মেলনের কর্মকর্তারাই খুঁজে দিয়েছিল। তারা বিস্তর ক্ষমাও চেয়েছিল প্রাথমিক অসুবিধার জন্যে। শিকাগোর অতিথিপরায়ণতার প্রতি মাইকের শ্রদ্ধা বাড়ল। বিস্তর কাগজপত্র সে জোগাড় করেছিল। খুদ্র ঋণের উপর অনেকগুলো বই কিনল। এতো সব বয়ে নেওয়ার জন্যে শেষ পর্যন্ত একটা সুটকেস কিনতে হলো তাকে। হোটেলের বিল পরিশোধ করে সে যখন বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্যে টেক্সির দিকে যাচ্ছিল, তার সম্মুখে ইলা এসে দাঁড়াল।

: তোমাকে অবশেষে খুঁজে পেলাম!-

     মাইক ইলার হাস্যোদ্দিপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার প্রসারিত হাত হাতে নিয়ে বলল, আমি নিজেকে বড়ো ভাগ্যবান মনে করছি। অসংখ্য ধন্যবাদ!-

: আমি তোমার খোঁজ নিয়েছিলাম। সম্মেলনের লোকেরাই আমাকে তোমার ঠিকানা দিয়েছিল। একদিন এসেও ছিলাম সম্মেলনে তোমার সাথে দেখা করতে। তোমার দেখা মেলে নি। তোমরা নাকি দলে দলে ভাগ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান যায়গায় ছড়িয়ে আছো। তোমাকে তাই আর বিরক্ত করি নি। এখন বলো, কেমন লাগলো তোমার?-

: লাগবে আর কী! সব সম্মেলনই অনেকটা বোরিং। তবে কাগজপত্র বইটই অনেক জোগাড় করেছি। বাড়ি গিয়ে পড়াশোনা হবে। টার্ম-পরীক্ষা সেখানেই হবে। বসকে দীর্ঘ রিপোর্ট দিতে হবে!- মাইক হেসে আবার বলল, তোমাকে দুবার ফোন করেছিলাম। কিন্তু তোমাকে পাই নি।- 

: মাইক, তুমি শিকাগো শহর দেখেছো?-

: সম্মেলনের কর্তারা একটা বিকেলে বাসে করে ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছে। যা দেখেছি দূর থেকেই দেখেছি বলে মনে হয়। সময়ের কমতি ছিল খুব বেশী!-

: তুমি থেকে যাও এখানে গোটা কয়েক দিন। আমি তোমাকে ঘুরিয়ে দেখাবো শহর ও শহরতলী। ইলা হেসে আবার বলল, আমার বাড়ি তো খালিই পড়ে আছে!-

: তা কীভাবে হয়, আমার তো আজকে ফেরত যাবার কথা।

: তোমার কি কোন ডেইট আছে রাজধানীর কোন তরুণীর সাথে?- ইলা মুচকি হেসে প্রশ্ন করল।

: ডেইট কোন তরুণীর সাথে নেই। আছে আমার বসের সাথে!- মাইক হেসে বলল।

: বসকে বলো, ডেইট-টা পিছিয়ে দিতে।

মাইক ইলার গভীর নীল চোখের তারার দিকে তাকিয়ে বলল, লোভ হচ্ছে!-

: তা হলে, বাধা কোথায়?-

: তোমাকে কোন অসুবিধায় ফেলছি না তো?- মাইক আমতা আমতা করে প্রশ্ন করল।

: সেই সম্ভাবনা যদি থাকতো, তবে আমি তো তোমাকে আমন্ত্রণ জানাতাম না!-

     মাইক তার কাঁধের ব্যাগ মেঝেতে রেখে ইলাকে বলল, তুমি বসো এখানে। আমি দুটো ফোন সেরে আসি। একটা ফোন সে করল তার বসকে। পিতার বয়সী বস হেসে বললেন, শিকাগো শহর বড়ো মায়াবী। বদনাম আছে। হাইজ্যাক হয়ে যেও না!- অন্য ফোনটি সে করল তার  টিকিট এজেন্টকে। রিজারভেশন বাতিল করে দিয়ে নূতন রিজারভেশন করতে। সে হেসে বলল, মাইক, লাস্ট মিনিটে এসে এসব বিপত্তি কেন! সব ঠিক আছে তো? অনেক ডলার খসবে, বলে দিলাম!-

ফিরে এসে ইলাকে সে বলল, এখন আমি তোমার জিম্মায় আছি! যেখানেই নিয়ে যাবে, সেখানেই যাবো।

     ইলা হেসে বলল, চলো, এখন বাড়িতে। পথে কিছু খেয়ে নেবো। বিকেলের দিকে যাবো মিশিগান হৃদের তীরে হাঁটতে। তোমাকে কিছু গরম কাপড় চড়াতে হবে। ঠান্ডা লাগতে পারে।

     ঠান্ডা ছিল। হৃদের ধারে হাঁটতে গিয়ে মাইক বুঝল, গায়ে-হাতে-পায়ে যা চড়িয়ে সে বেরিয়েছে, তা আদৌ পর্যাপ্ত নয়। উত্তরের হাওয়া মিশিগান হৃদের বরফগলা পানিতে সিক্ত হয়ে মুখের উপর ঝাপটা মারছিল। বুকের হাড়ে কাঁপুনি ধরে গেল। সে নিজের অজান্তেই ইলার খুব ঘন হয়ে হাঁটছিল। ইলার গায়ে ছিল পশমের মোটা দীর্ঘ আলখেল্লা। মাথায় কান-ঢাকা টুপি। হাতে উলের দস্তানা। মাইকের গায়ে শার্ট। তার উপর রাজধানীর জন্যে উপযুক্ত কালো রঙের কোট। মাথা নিরাভরণ, হাওয়ায় তার চুল উড়ছে। মুখ তার বন্ধ। খুললেই কপাটিতে ঠকঠক করে শব্দ উঠতো। নাকের ডগা বরফের টুকরোর মতো ঠান্ডা হয়ে এসেছে। চোখের পানি জমে যায় না, - যদি যেতো তবে বরফের পলেস্তারা পড়ে যেত! পেটে যা পড়েছিল, মাইকের মনে হয়, তা নিশ্চয়ই বরফ হয়ে আছে!

     ইলা মাইকের দিকে তাকায়। সে বলল, চলো গাড়িতে উঠি। না হয়, তোমাকে কাঁধে বয়ে নিয়ে যেতে হবে!- এই বলে সে মাইককে তার বিরাট আলখেল্লার মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে দ্রুত হাঁটতে লাগল। গা জড়াজড়ির জন্যে, না দ্রুত হাঁটার জন্যে মাইকের গায়ে যেন একটু রক্ত সঞ্চালন হতে থাকল। চলতে চলতে ইলা আবার বলল, ডিসেম্বরে যখন মেরু অঞ্চলের হাওয়া জোরেশোরে বয়, তখন এই রাস্তা দিয়ে নর্থ-ওয়েস্টার্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা গায়ে শুধু গেঞ্জি পরে দৌড়ায়!-

     ইলার এই মন্তব্যটি মাইক খুব উৎসাহের সাথে নিতে পারল না। আটলান্টিকের পারে রাজধানীর মোলায়েম আবহাওয়ায় বড়ো-হওয়া কোন এক তরুণকে যদি কর্কটক্রান্তির চর্বিদার ছোকরাদের সাথে তুলনা করা হয়, তবে এতে খুশী হওয়া যায় কী! মাইক ইলার গায়ের সাথে আরো লেপ্টে গিয়ে বলল, চলো আগে গাড়িতে গিয়ে উঠি। তখন বলবো, গেঞ্জি পরে পটোমাকের তীরে দৌড়ানো কতোখানি মজাদার হতে পারে!- এইটুকু বলতে গিয়েই মাইকের দাঁতে দাঁত লেগে ঠকঠক করে উঠেছিল।

     গাড়ির উষ্ণ পরিবেশে এসে ইলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মাইক বলল, আমার যে কটা শার্ট বাক্সে আছে, সবগুলো চড়ালেও অবস্থার কিছু উন্নতি হতো কিনা সন্দেহ আছে! তোমার মোটা কম্বলখানা নিয়ে গেলেই ভালো হতো!-

: আহ! ভুল হয়ে গেল। একখানা মোটা কম্বল তো ছিলোই গাড়ির পেছনে!-

: থাক! সেটি আর মনে করিয়ে দিও না! কম্বলের এখন আর প্রয়োজন নেই। ঘরে ফেরা উচিত। মাইকের মুখের কথা তখনও সঠিক উচ্চারণ পায় নি। জড়িয়ে যাচ্ছিল। ইলা গাড়ির তাপমাত্রা এবং পাখার গতি বাড়িয়ে দিল।

: তোমাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে কম্বল-চাপা দিয়ে রাখতে হবে। নিম্যুনিয়া হবার সম্ভাবনা আছে!-

: ভয় দেখিও না!- মাইক বলল জড়িত কন্ঠে।

     বাড়ি এসে, ইলা মাইককে বলল যে সে যেন সোজা বাথরুমে চলে যায়। তারপর লম্বা একটা হট-বাথ নেয়। হাঁড়-কাপুনি নাকি চলে যাবে। সে নাকি ঝিরঝিরে হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যে ইলা তাদের জন্যে গরম ডিনারের বন্দোবস্ত সেরে ফেলবে। মাইক তাই করল। গরম কাপড়-চোপড় চাপাবার পর তার হাঁড়-কাপুনি চলে গেল। সে ঝিরঝিরে হয়ে উঠল। অনেক রাতে সে যখন তার শোবার কামরার দিকে যাচ্ছিল, ইলা বলল, তোমাকে সকালে জাগাবো না। তুমি যখন খুশি উঠতে পারো। আমাকে লাইব্রেরিতে পাবে। গুড নাইট!-

     শুভ-রাত্রি জানিয়ে মাইক চলে এল তার শয়নকক্ষে। ভারী কম্বলের তলায় যথা শীঘ্র ঢোকার আকুতি মাইককে পেয়ে বসেছিল। নাক-ডাকার অভ্যাস আছে বলে তার জানা নেই। তবে সেই রাত্রে ভারী কম্বলের তলায় সে বোধ হয় ডেকেছিল। নিজের কানেও সে যেন শুনেছিল! নাক যেন বন্ধ হয়ে ছিল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। রাতের কোন এক সময় ইলা এসে মাইকের মাথার উপর থেকে লেপ-কম্বল সরিয়ে দিয়ে তার শিয়রের কাছে এসে বসেছিল। মাইকের কপালে হাত রেখে বলেছিল, তোমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। নাকে এইটি দিয়ে জোরে টানো। শ্বাস নিতে আর কষ্ট হবে না।

: তোমাকে শুধু শুধু কষ্ট দিচ্ছি। সকাল হলেই দেখবে, আমি তোমার সাথে পাল্লা দিয়ে লেক-পাড়ে দৌড়াব!- মাইক হেসে বলল।

: বেশ, তাই করো। এখন এই দুটো বড়ি খেয়ে নাও। ইলা বড়ি ও এক গ্লাস পানি তাকে দিল। তোমার যেন ঠান্ডা না লেগে যায়, তার জন্যেই এইসব সতর্কতা!- 

     বড়ি ও পানির গ্লাস হাতে নিয়ে মাইক বলল, এতো সহজে আমার ঠান্ডা লাগে বলে আমার মনে হয় না!- এই বলে সে বড়ি ও পানি মুখে দিল।

     ইলা খালি গ্লাস পাশের টেবিলের উপর রেখে দিয়ে মাইকের গায়ে কম্বল টেনে দিল। তার  ঠান্ডা দুখানা হাত ইলা টেনে নিল তার দুই উষ্ণ হাতে। রাত্রির কোন প্রহরে ইলা বিদায় নিয়েছিল মাইক জানে না। সে ঘুমিয়ে পড়েছিল খুব দ্রুত। যাবার পূর্বে সে নিশ্চয়ই বাতি নিবিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। কখন সে জেগে উঠেছিল, মাইকের মনে পড়ে না। বাইরে তখন নরম রোদ সে দেখতে পেল। সে যে মিশিগান হৃদের তীরে একটা বাড়িতে রাত কাটিয়েছে, এটি তার ধীরে ধীরে মনে আসতে লাগল। সে বুঝতে পারল, তার জ্বর মতো হয়েছিল। সে লজ্জ্বা পেল। ইলাকে খামোখা কষ্ট দিতে গেল! সে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

     ঘুম থেকে জেগে উঠার পর মাইক বেশ সুস্থ বোধ করতে লাগল। ওর মনে হলো, দিনটা বেশ ভালোই যাবে। সে উঠে বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিতে লাগল। ইতিমধ্যে ইলা এলো ঘরে। মাইক তখন গোসলখানায় উষ্ণ ধারাযন্ত্রের নিচে দাঁড়িয়ে গুনগুন করে গান গাইতে ছিল। এক্ষুণি আসছি বলে মাইক চিৎকার দিয়ে ইলাকে জানিয়ে দিল যা সে বহাল তবিয়তে আছে।

     ইলা মাইককে সারাদিন শিকাগো শহর ঘুরে দেখাল। মিউজিয়ম, লাইব্রেরী, সুউচ্চ ইমারত, বিশাল শপিং-মল, শিল্প-কারখানা। বিকেলের দিকে ফেরার পথে, সে তাকে নিয়ে এল শিকাগোর সেই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে, যা শিকাগোর বিশাল দেহে কুষ্ঠরোগীর খতের মতো জেগে আছে। বিরাট এলাকা জুড়ে হতদরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গপাড়া। দৃষ্টিকে পীড়িত করে, বিবেককে ধিক্কার দেয় এমন পাড়া ওয়াশিংটন-ডিসিতে আছে। আছে নিউ ইয়র্ক শহরে। আছে ফিলাডেলফিয়া শহরে। আছে লস এঞ্জেলেস শহরে। আছে দেশের ছোটবড়ো সব শহরেই। অনেকটা প্রদীপের নিচে আঁধারের মতো! লোক সাধারণতঃ এসব এলাকা দিয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে চলে যায়। ইলা কিন্তু আজ তার গাড়ি দ্রুত চালায় নি। মাইককে টুকরো টুকরো খবরাখবর দিচ্ছিল সে। অতীতের বড় বড় কিছু কুকীর্তিমান মানুষের পরিচয় দিল যারা এই অঞ্চলে বাস করতো।

     রাত্রে ডিনারের পর, শুতে যাওয়ার পূর্বে, মাইক ইলাকে বলল যে সে হলদে টেক্সিকে বলে রেখেছে তারা যেন তাকে ভোরেই বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। ইলার ঘুম থেকে জেগে উঠার কোন প্রয়োজন নেই। ইলাকে সে অনেক ধন্যবাদ জানাল তার আতিথেয়তার জন্যে। শিকাগোর এই দিনগুলো তার মনে থাকবে, এটিও সে ইলাকে বলল। ইলা মাইকের হাত তার দুহাতে নিয়ে বলল যে মাইকের ফেরত-যাত্রা যেন শুভ হয়।

: গুড নাইট!-

.......

     এ সবই অনেকদিন আগেকার কথা। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবার মতো। মাইক ডেভিস এখন আন্তর্জাতিক মুদ্রার উঠা-নামা, শেয়ার-বাজারের হাল-হকিকত নিয়ে ব্যস্ত। ওর বস ওকে ওদের ব্যাংকের বিশ্ব-বিনিয়োগ পোর্টফোলিও তদারকীর ভার দিয়েছে। জটিল সংখ্যাতত্ত্ব ও নীরস অর্থশাস্ত্রের এই দ্বন্ধসংকুল অকুস্থলে বসে কে সুখ পায়! কম্প্যুটারের বিরাট পর্দার সম্মুখে বসে মাইকের সময় কাটে। রাত জেগে তাকে কাজ করতে হয়। দুনিয়ার কোন-না-কোন জায়গায় লেন-দেন তো হচ্ছেই! কম্প্যুটার তার দীর্ঘ-ফিরিস্তি দিয়ে থাকে। সেদিন ওয়ালস্ট্রিট জার্নালে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারের উপর প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের একটা কঠোর সমালোচনা প্রবন্ধ মাইক পড়ছিল। অধ্যাপক বিতর্কমুলক প্রবন্ধ লিখে সুনাম ও দূর্নাম দুইই কিনেছেন প্রচুর। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের চাঁইরা তাঁকে খুব বেশী সুনজরে দেখে না। কিন্তু মাইক দেখে! মাইক সেই বিতর্কিত অধ্যাপকের অযোগ্য শিষ্য হবার সুযোগ পেয়েছিল। তাঁর লেখা সে মন দিয়ে পড়ে।

     রাত তখন প্রায় এগারোটা। মাইক কম্বলের তলায় কোমর-তক ঢেকে, মাথার পেছনে অনেকগুলো বালিশ ঠেস দিয়ে ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল পড়ছিল। পাশে একটা ছোট্ট কম্প্যুটার ছিল। তাতে সে কিছু কিছু নোট লিখছিল। টুংটুং করে ফোন বেজে উঠল। এতো রাতে তাকে ফোন করবে কে! তার মা তাকে ফোন করা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি রাগ করে আছেন। বড়দিনের ছুঠিতে সে বাড়ি যায় নি! বড় ভাই আছে তুরস্কে, শান্তিরক্ষা বাহিনীতে। দুই ভোন, একজন আছে এরিযোনার ফিনিস্কে। অন্যজন আছে আলাস্কার এঙ্কোরেজ শহরে। মহাদেশের অপর প্রান্তে। স্বামী-পুত্র-কন্যা নিয়ে দুজনেই ব্যস্ত। আবার কলেজেও পড়ায়। ওদের সময় কোথায় তাকে ফোন করার! মাইক অবাক হলো। ফোনের যেই নম্বর পর্দায় দেখা গেল, তার সাথে মাইকের আদৌ পরিচয় নেই। আবার টুংটুং শব্দ হতেই মাইক ফোন তুলে নিল।

: হ্যালো!- মাইক জবাব দেয়।

: মিস্টার মাইক ডেভিস?- একটি মেয়েলী কন্ঠ।

: হ্যাঁ, মাইক বলছি।

     এরপর সেই মেয়েলী কন্ঠ তাকে জানালো যে সে নর্থ-ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনবার্গ মেডিক্যাল কলেজের হাসপাতাল থেকে ফোন করছে। সে একজন নার্স। তার নাম লিসা।

: ডিসিতে এখন রাত অনেক। অসময় আপনাকে ফোন করছি। ক্ষমা করবেন।

লিসাকে আশ্বাস দিয়ে মাইক বলল যে ঘুম ভাঙ্গিয়ে সে তাকে ফোন করে নি। সে জেগেই আছে।

: আমি মিস ইলোরা জোন্সের হয়ে আপনাকে ফোন করছি। এই অসময়ে!-

     ইলার কথা মাইকের মনে পড়ল একরাশ আবেগঘন কোমল স্মৃতি হয়ে। বহুবার বহুরাতে ইলাকে তার মনে পড়েছে। অনেকবার ইলার সাথে ফোনে কখনও ছোটখাট, কখনও দীর্ঘক্ষণ আলাপও হয়েছে। হয়তো মামুলি কথাবার্তা। অহেতুক আনন্দে মুখরও হয়েছে। ওয়াশিংটনে এলে তার সাথে দেখে করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল মাইক। বড়দিন উপলক্ষে ইলা একখানা সুদৃশ্য শুভেচ্ছা-পত্র পাঠিয়েছিল। প্রত্যুত্তর দিতে ভুলে গিয়ে, অনেকদিন পরে ইলাকে ফোন করে ক্ষমা চেয়েছিল। মাইক বলেছিল যে এমন ভুল আর হবে না। ইলা হেসেছিল মাত্র। সেই মধুর হাসি মাইক বহুদিন ভুলে নি। কানে রহস্যময় হয়ে জেগে ছিল। শেয়ার-বাজারের কূটিল বলয়ের বাইরে, পটোমাক নদীর তীরে গাছের ছায়ায় বেঞ্চে বসে অকিঞ্চিৎকর কথায় ইলার সাথে হেসে উঠতে তার মন চেয়েছিল। কিন্তু চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে দুস্তর ব্যবধান থেকেই গেল! মাইকের মনে হয়, সে বড়ো অলস। কম্প্যুটারের এই আলোর গতির বাইরে সে যেন স্রোতের মুখে একটা শেওলামাখা বড়ো পাথর, - অনড়!

: বলুন!- লিসাকে মাইক অনুরোধ জানায়। তার কন্ঠস্বর যেন কেঁপে উঠেছিল।

: না, ভয়ের কিছু নেই!- লিসা দৃঢ়কন্ঠে বলল।

: বেশ, বলুন।

: মিস জোনস একটা বড়ো এক্সিডেন্টে আহত হয়েছিলেন। তাঁর মাথায় ও বুকে আঘাত লেগেছিল। তিনি অজ্ঞান ছিলেন দুদিন। তিনি হাসপাতালে আছেন। আমরা তাঁকে সুস্থ করে এনেছি। আসছে কাল তিনি বাড়ি ফিরে যাবেন। লিসা চুপ করে গেল।

মাইক অপেক্ষা করে থাকল।

লিসা বলল, তিনি একটু চলাফেরা করতে পারবেন। তবে তাঁকে দেখার জন্যে সার্বক্ষণিকভাবে একজন নার্স থাকবে। তাঁর অফিসের লোকেরা হামেশাই তাঁর খবরাখবর নিচ্ছে। আর অন্য কাউকে খবর দেবো কিনা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

: তিনি কী বললেন?- মাইক লিসাকে প্রশ্ন করল।

: দুদিন পূর্বে তাঁকে প্রশ্নটি করেছিলাম। আজকে তিনি আপনার নাম ও নম্বর দিয়েছেন। লিসা চুপ করে গেল।

মাইক বুঝল, লিসা তার কর্তব্যকাজ সমাধা করেছে। তার তো আর কিছু বলার থাকতে পারে না।

: কখন মিস জোনস বাড়ি ফিরে যাবেন বললেন?-

: আসছে কাল আমরা তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেবো।

: তাঁর সাথে এখন কথা বলা যাবে কি?- মাইক জানতে চাইলো।

: না। তিনি এখন ঘুমাচ্ছেন।

: বেশ, আমি শিকাগো আসছি তাঁকে দেখতে। আমার হয়ে তাঁকে আমার আরোগ্য-কামনা জানাবেন। ধন্যবাদ।

: ধন্যবাদ। লিসা ফোন ছেড়ে দিল।

     মাইক নানান কাজে এতো জড়িয়ে আছে যে ঘাড়ে ভ্রমণ-ব্যাগ ঝুলিয়ে হুট করে বেরিয়ে পড়া তার পক্ষে অনেক সময় সম্ভবপর নয়। সব কিছু সামাল দিয়ে, দুদিন পরে সন্ধ্যায় প্লেনে সিট খুঁজতে গিয়ে সে দেখে শিকাগো-গামী কোন প্লেনে সিট খালি নেই। বিমান-এজেন্সিতে তার জনা কয়েক বন্ধুবান্ধব আছে। তাদের হাতে-পায়ে ধরেও কোন ফায়দা হয় নি। শিকাগোতে নাকি বিশ্ববানিজ্য মেলা চলছে। গত সপ্তাহখানেক ধরে নাকি এই মহা-সংকট চলছে! অবশেষে এক বন্ধু একখানা টিকিট ধরিয়ে দিল। সেটি কম্প্যুটারে পড়ে মাইক অবাক হয়। প্রথমে বাসে করে তাকে যেতে হবে ওয়াশিংটন-ডিসি থেকে উত্তরে বাল্টিমোর (মেরিল্যান্ড)। সেখান থেকে সেকেলে কোন এক প্রপেলার-প্লেনে দক্ষিণ-পশ্চিমে ন্যশভিল (টেনেসী)। তারপর ন্যশভিল থেকে সোজা উত্তরের দিকে শিকাগো জেট-বিমানে। প্রভু জিশুর শপথ নিয়ে বন্ধুকে সে দূর্বাক্য শোনাল। বন্ধু হেসে বলল, এক মিনিট সময় দিচ্ছি, ঝটপট বলে দাও। না হয়, এটিও হারাবে!-

: তোমার নিকুচি করছি! পরের বার তোমার সাথে দেখা হলে, তোমার পাছায় লাথি মারবো, বলে রাখলাম!- মাইক বলল।

: বেশ, টিকিট পাঠিয়ে দিলাম। বাই!- বন্ধু হেসে ফোন ছেড়ে দিল।

     টিকিট প্রিন্ট করে নিয়ে মাইক দেখল, উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমে নানান বন্দর ঘুরিয়ে তাকে শিকাগো পৌঁছে দিতে যতো ডলার বিমান-কোম্পানি চার্জ করল, সরাসরি শিকাগো গেলে বরঞ্চ তাকে ভাড়া বেশিই দিতে হতো! তার মানে, বিমান কোম্পানিগুলো যাত্রীদের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বসে আছে। জোঁক আর কাকে বলে! মাইক ভাবল, যাকে সে দেখেছে মাত্র একবার, তাও অনেকদিন পূর্বে, তাকে দেখার জন্যে তার মন আজ এতো উতালা হয়ে উঠেছে কেন! হৃদয়ের কোথায়, কোন তানপুরায় সে ঝংকার তুলেছে! বুঝল সে, এর মূর্ছনা জেগে রইবে প্রত্যহের অলস মুহূর্তে। কাজের ফাঁকে।

     মাইক তার মাকে ফোন করল। সে জানে, এটি বড়ো অসময়। তবু কেন জানি, মাকে এখন ফোন করতে তার মন চাইল। মা ঘুমজড়িত কন্ঠে জবাব দিলেন, এতো রাতে কিসের জন্যে ডাকলি? ভালো আছিস তো?-

মাদের অই এক সমস্যা! প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, শরীর কেমন!

: হঠাৎ ইচ্ছে হলো, তোমাকে ঘুম ভাঙ্গিয়ে প্রশ্ন করি, তুমি কেমন আছো? মা-মনি, তোমাকে বড্ড ভালোবাসি!- মাইক বলল হেসে।

: লিটল ওয়ান, এবার বলো, কেন ডেকেছো?- মা মাইককে লিটল ওয়ান বলেই ডাকেন। সে সবাইর ছোট।

: আমি শিকাগো যাচ্ছি। ফেরার পথে তোমাকে দেখে আসবো।

: কখন ফিরবি?- মা জানতে চাইলেন।

: সেটি এখন তোমাকে বলতে পারছি না। যখন পারবো, তোমাকে ফোনে জানিয়ে দেবো।

: আচ্ছা, সেফ জার্নি! গুড নাইট!- মা ফোন-সংযোগ কেটে দিলেন।

     মাইক বাক্স গুছাতে লেগে গেল। তারপর হঠাৎ হেসে উঠল। অতো তাড়াহুড়ার প্রয়োজন নেই। ওর যাত্রা আরো অন্ততঃ বিশ ঘন্টা পরে! সে যখন বন্দরে বন্দরে বাস্কেটবলের মতো ঠোকাঠোকি খেয়ে খেয়ে অবশেষে শিকাগোর ওহেয়ার বিমানবন্দরে এসে পৌঁছল, তখন রাত দুপুর। শিকাগোর অতীত কুকীর্তির ইতিহাস স্মরণ করে, কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় টেক্সি খুঁজে পেতে সে সাহস পেল না। ভিজিটার কক্ষের দিকে সে পা বাড়ায়। সেখানে ঘন্টা কয়েক কাটিয়ে ভোরের দিকে টেক্সি নেওয়ার মতলবে সে ছিল। ঠিক সেই সময় একটা হলদে টেক্সি তার পাশে এসে দাঁড়াল। কৃষাঙ্গ ড্রাইভারের দিকে সন্দেহজনকভাবে তাকিয়ে, সে তার গন্তব্যস্থানের ঠিকানা বলল। উঠে পড়ো বলে সে মাইককে হেসে ইশারা করল। তারপর সে উড়াল দিল বলে মাইকের মনে হয়! সম্মুখের কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তার কথা স্মরণ করে ড্রাইভারকে সে জানাল যে ধীরেসুস্থে গেলেও তার কোন অসুবিধে হবে না।

     ড্রাইভার হো-হো করে হেসে উঠল। জিজ্ঞেস করল, মাইক কোথা থেকে আসছে। ওয়াশিংটন-ডিসির নাম শুনে সে আবার হো-হো করে হেসে উঠে আরো জোরে চালাতে গিয়ে বলল যে রাজধানীর লোকেরা নাকি ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালায় সে শুনেছে। যেহেতু মাইক কদাচিত ওয়াশিংটনে গাড়ি চালায়, সে কোন মন্তব্য করল না। চুপ করে থাকল।

: কী, সত্যি বলি নাই কথাটা!- সে জানতে চাইল।

     মাইক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় ড্রাইভার তার উড়াল-দেওয়া বেগে সেই নব্বই-ডিগ্রী অন্ধ মোড়টা পার হয়ে গেল। টায়ার আর পিস-ঢালা রাস্তায় আতংকিত আওয়াজ উঠল। মাইক প্রায় আঁতকে উঠেছিল।

: ঘাবরাবার কিছু নেই! রাস্তা ফাঁকা। সে বলল। তারপর সে রেডিওর কাঁটা ঘুরিয়ে কর্ণপটাহ কন্টকিত করে এমন একটা স্টেশন লাগিয়ে দিল। মাইক চোখ বুজে রেডিওর আর্তনাদ শুনতে থাকল।

     ইলার বাড়ির সম্মুখে এসে যখন মাইক টেক্সি থেকে নামল, সে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। লেক থেকে কুয়াশা আসছে উড়ে। ইলার বাড়ির সম্মুখে বাতি জ্বলছে। মাইক বাতির তলায় এসে দাঁড়াল। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে লজ্জা পেল। এমন আন-গডলী প্রহরে ইলার বাড়ির দরজায় ঠোকা দেওয়াটা যেন রীতিমত অপরাধ মনে হলো তার। তা ছাড়া, ইলা তো উঠে দরজা খুলে তাকে ঘরে ঢুকতে দিতে পারবে না! যতোদূর সে জানে, ইলা তো এখন শয্যাশায়ী! কিন্তু কতক্ষণ এই কুয়াশাচ্ছন্ন ঠান্ডা রাতে কারো বাড়ির সম্মুখে এসে বসে থাকা যায়! রাতের টহলদার পুলিসের জেরার সম্মুখীন হওয়ার বিপদ তো রয়েছেই! মাইক অনেক ভেবে তার সেলফোনে ইলাকে ডাকল। কোন ফল হলো না। একটুখানি বিলম্ব করে সে আবার ডাকল। ফোন রিং দিয়ে যেতে লাগল। অবশেষে সে শুনল, হ্যালো!- শুনেই সে বুঝল, এ ইলার কন্ঠস্বর। দ্বিধাজড়িত স্বর। কিন্তু সেই বহুদিন আগেকার মতোই কোমল কন্ঠস্বর।

: তোমাকে জাগিয়ে দিয়েছি নিশ্চয়ই!- মাইক বলল।

প্রত্যুত্তর আসতে একটু সময় নিল। তারপর উচ্ছলকন্ঠে ইলা বলল, মাইক!-

: তোমাকে জাগিয়ে দিলাম। বড্ড অসময়!- মাইক হেসে বলল।

: অসময় বৈকি!- ইলা বলল।

: তোমার দেকভাল করার জন্যে একটা নার্স থাকার কথা। আছে নাকি কাছে কোথাও?-   

: ঠাট্টা করছো না তো? তুমি দরজার গোড়ায়? খোঁড়া পা নিয়ে আমি সত্যি দৌড়ে আসবো নিচে!- ইলা বলল।

: দোহাই তোমার! ওসব করতে যেও না!-

: সত্যি বলো, তুমি এখন কোথায়?-

: তোমার নার্স এখন কোথায়, সেটি বলো?- মাইক বলল।

: তাকে আজকে ছুটি দিয়েছি। সে আসবে সকালের দিকে।

: তা হলে তো আমাকে তোমার দুয়ারে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকতে হবে!- মাইক হেসে বলল।

: বিশ্বাস করতে ভয় হয়, তুমি আমার দুয়ারে এসে দাঁড়িয়ে আছো। মাইক, হেঁয়ালি করো না! আমি জানালা দিয়ে লাফ দেবো কিনা ভাবছি!-

: দোহাই তোমার! অই বদ-মতলব ছাড়ো। আমি এখানে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকতে পারবো!-

     ইলা হেসে বলল, একটা রিং শুনতে পাবে দরজার কাছেই। রিং শেষ হবার সাথে-সাথেই দরজায় ঠেলা দাও। তারপর চলে এসো সোজা আমার শোবার কমরায়। আমি অপেক্ষা করে আছি!-

     রিং বেজে উঠল। মাইক দরজায় ঠেলা দিয়ে ঘরের উষ্ণতায় এসে দাঁড়াল। ঘাড়ের বোঝাপত্র নামিয়ে রেখে মাইক ভাবল, এল তো সে দৌড়ে। কী সে বলবে তাকে! জীবনে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন সে তো কখনও হয় নি। জীবনে একবারই তার সাথে দেখা। অথচ জীবনের সাথে ইলা যেন জড়িয়ে গেছে। পা-পা করে সে উপরে উঠে এল ইলার শোবার কামরায়। ঘাড়ের পেছনে অনেকগুলো বালিশ জড় করে নিয়ে, তার উপর হেলান দিয়ে, ইলা দরজার দিকে মুখ করে চেয়ে আছে। ওর সারা দেহ একখানা হলুদ বর্ণের কম্বল দিয়ে ঢাকা। চুল কিছুটা অবিন্যস্ত। মুখখানা, বহুদিন আগে সে যেমন দেখেছে, তেমনি হাসিতে উজ্জ্বল। চোখের তারায় চিকচিক। ইলা হাত বাড়িয়ে দিল। তার হাতের কব্জিতে প্লাস্টার লাগানো। দীর্ঘ আঙ্গুলগুলোর নখে লাল নেইল-পলিশ।

     মাইক এসে বসল ইলার পাশে খাটের উপর। ইলা উঠতে চেষ্টা করল। কিন্তু কোমরে ব্যথা অনুভব করে, সেই চেষ্টা সে আর করল না। মাইকের হাতখানা সে ধরল। ইলার উষ্ণ ও মোলায়েম হাতখানা বড়ো সজীব মনে হল মাইকের। ওরা একে অপরের দিকে হাসিমুখে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। ইলা হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু মাইকের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুই সে বলতে পারল না। সলাজ হয়ে এল তার মুখ। দৃষ্টিতে কী এক আকাংখা ছায়া ফেলল।  

     মুঠোবদ্ধ হাতখানা ছাড়িয়ে নিয়ে  মাইক তার পকেট থেকে একটা সুদৃশ্য কৌটা বের করল।  এর মধ্যে ছিল একটা আংটি। হীরার ছোট পাথর বসানো। আলোয় চিক-চিক করে উঠল। ইলার বাম হাতের অনামিকা আলগোছে ছুঁয়ে মাইক বলল, এটি তোমাকে পরিয়ে দিতে চাই। দেবো?-

     ইলার মুখ লজ্জায় ও আনন্দে লাল হয়ে এল। চোখ ছলছল করে উঠল। সে বলল, দাও!-

     মাইক খুব যত্নে আংটিটি পরিয়ে দিল।

     ইলা বলল, এবার আমাকে চুমো খাও!-

 

পেনসিলভ্যানিয়া।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.