Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  নিয়মিত কলাম  ||  ৯ম বর্ষ ৭ম সংখ্যা কার্তিক ১৪১৬ •  9th  year  7th  issue  Oct-Nov  2009 পুরনো সংখ্যা
অন্ধের হাতি দেখা Download PDF version
 

নিয়মিত কলাম

 

ওয়াশিংটনের জানালা

অন্ধের হাতি দেখা

ওয়াহেদ হোসেনী

     সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিন। ওয়াশিংটনে সুন্দর সকাল। জানালা দিয়ে দেখছি- নীল আকাশের কোলে সাদা সাদা তুলোর মত মেঘ ভাসছে। তাপমাত্রা ৬৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট। হাটার জন্য চমৎকার পরিবেশ। হাটার কাপড় পরতে যেতে যেতে মনে হোল- মাত্র দু সপ্তাহ আগে আজকের এই দিনে ঠিক এই সময়ে কি ভীষণ খা খা রোদ। সকাল ছটায় আমাদের নিয়ে গিয়েছিল সাইট সিয়িং-এর জন্য। হোটেলে ফিরিয়ে দিল বেলা আটটায়। মনে হচ্ছিল তখন বুঝি সাউদী আরবের ধু ধু মরু আর পাথরের পর্বতে বেলা তিনটা।

     গিয়েছিলাম সাউদী আরব। বাসনা ছিল রমজান মাসের শেষ দশটা দিন কাবা শরীফে তারাবী পড়া। সকল প্রশংসা তাঁর। বাসনা পূর্ণ হয়েছে। যে অপূর্ব কন্ঠ দিয়ে ইমাম আস-সুদেশ শেষ রাতে তাহাজ্জুদের সময় কোরান আবৃত্তি করতেন, যে আবেগ দিয়ে দোয়া করতেন, তার আবেগ ও মাধুর্য মন ভরিয়ে দিত। পরিচিত সুরাগুলো শুনে মনে হত দূরে ঐ খোলা আকাশে ভাসছি। সব আরবী শব্দগুলো যদি বুঝতে পারতাম তবে না জানি কি আনন্দ হত! মনে করেছিলাম তবু যে আনন্দ, যে প্রশান্তি উপভোগ করেছি তা মেলে ধরবো পড়শী পাঠক/পাঠিকার সামনে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে হাটতে বেরিয়ে পড়লাম। হাটছি আর ভাবছি। কাগজ কলম নিয়ে বসেও ছিলাম। সময় ও প্রবন্ধের সীমা যদি নাও থাকে পাঠক/পাঠিকা ধৈর্য্যের সীমা আছে। দেখছি ভি ছুইছি ভি পড়ে প্রিয় পাঠক রব্বানী সাহেব অতি বিনয়ের সংগে এক হাজার শব্দের সীমা রেখার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তারপরও এক একটি ঘটনার সংগে অন্যের সামঞ্জস্য না থাকায় কোনটি বাদ দেব, সে বিরাট সমস্যা। যাই করি না কেন -প্রবন্ধটি হয়ে দাড়াবে অন্ধের হাতি দেখা। এমন সময় মনে পড়লো কোন গুণী যেন বলেছিলেন ‘a picture is a thousand word’ । অনেক কিছু বলা যাবে। তবু ধৈর্যচ্যুতি হওয়ার সম্ভাব্নাটাও কম। তাই ঠিক করলাম- অন্ধই যখন হাতি দেখবে- তবে ছবি দিয়েই দেখুক।

     একটা কথা না বললেই নয়। ওমরাহ থেকে ফিরে এসে গিয়েছিলাম ফেয়ারফ্যাক্স হাসপাতালে- সাপ্তাহিক আমার নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবীর কাজে। নিয়ে গিয়েছিলাম চকলেট দিয়ে মোড়া খুজুরের একটা প্যাকেট। মক্কা মদিনার ছবির বই, দৈনিক আরব নিউজে প্রকাশিত, ২৫শে রমজান রাতের তাহাজ্জুদের সময় ১২ লক্ষ মানুষের সেজদার পাতা ভর্তি ছবি। আর আমার নিজের তোলা কিছু ছবি। নিয়ম মাফিক সবাই উঃ আঃ করলো। ক্যাথেলিক লিসা ডোলেন বললো, ও, ইউ ওয়ের সো ক্লোজ টু গড। তার কথা শুনে ইহুদী রুথ ফ্রিডল্যান্ড বললো- বাট গড ইজ ক্লোযার দ্যান দ্যাট। হি লিভস বলে লিসার বুকের ওপর আংগুল দিয়ে, আমার বুকের ওপর আংগুল দিয়ে, নিজের বুকের ওপর আংগুল দিয়ে তার বাক্য শেষ করে বললো- হিয়ার। মনে মনে ভাবলাম সত্যিই তো, মহানুভব, দয়ালু, ক্ষমাকারী, কৃপাশীল, সর্বশক্তিমান-এর স্থান এর চাইতে কি উত্তম স্থান আছে?

হারামহরম

     আরবী ভাষার দুটো শব্দ -‘হারামহরম। আমার মত সাধারণ বাঙালির কানে শব্দ দুটি প্রায় একই শোনায়। শব্দ দুটির অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথম শব্দটির এর পরে লম্বা আকার। পরেরটিতে রয়ের উচ্চারণ অতি মোলায়েম, প্রায় উহ্য তবে উহ্য নয় এবং আকার নেই। প্রথমটির অর্থ নিষিদ্ধ- পাপ, অগ্রহণীয় ইত্যাদি। দ্বিতীয় শব্দটির অর্থ পবিত্র। নিস্পাপ ইত্যাদি। সাউদী আরবে মক্কা শহরের কাবা শরীফেও তার চারপাশের অঞ্চলকে, এবং মদিনা শরীফের হযরতের মসজিদ ও তার চারপাশের অঞ্চলকে হরম বলে অভিহিত করা হয়। হারাম শব্দের সংগে পরিচিত, ঐ সব পবিত্র স্থানকে হরম বললেও আমার কানে হারাম শোনাত এবং বড়ই বিব্রত বোধ করতাম। পরে এক বিজ্ঞলোক সেটা খোলাসা করে দেওয়ায় বেশ আরাম বোধ করেছি।

হাযরে আসওয়াদ

     কাবা গৃহের দরজার ডান পাশে, দুই দেওয়ালের মিলনস্থানে নিচের দিকে, একটি ষ্টেনলেস ষ্টীলে বসানো একটি কালো পাথর আছে। একে বলা হয় হযরে আসওয়াদ। এই পাথর নিয়ে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। কোন কোন স্থানে বলা আছে, এটি কাবা তৈরীর জন্য স্বর্গ থেকে প্রেরিত। এই কালো পাথরকে স্পর্শ ও চুম্বন করার জন্য যে ধাক্কাধাক্কী ও প্রতিযোগিতা চলে তা প্রাণান্ত কান্ড। হজ্জ, ওমরাহ এবং শুধু তোয়াফ করার নির্দেশাবলীতে বলা আছে, নিজের জন্য কষ্ট সৃষ্টি না করে, অন্যের অসুবিধা সৃষ্টি না করে সম্ভব হোলে এই পাথর স্পর্শ করতে পার। চুমু খেতে পার। বোখারী ও মুসলীম এ বলা আছে, হযরত ওমর (বিন খাত্তাব) বলেন, আমি জানি তুমি কেবল পাথর মাত্র। তোমার লাভ লোকসানের কোন ক্ষমতা নেই। আমি যদি নবীজিকে তোমাকে চুমু খেতে না দেখতাম, তবে আমিও তোমার চুমু খেতাম না।

কাবা শরীফের তোয়াফ

     লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক---- হে আল্লাহ আমি উপস্থিত তোমার সম্মুখে, আমি উপস্থিত তোমার সম্মুখে... উচ্চারণ করে এবং মহাম্মদের প্রশংসা করে, যে কোন ভাষায়, নিজের মনের মত দোয়া চেয়ে চেয়ে কাবা শরীফের চারপাশে সাতবার পাক খাওয়াকে তোয়াফ বলে। হজ্জ ও ওমরাহ্ করার সময় তোয়াফ অবশ্য করণীয়। ওমরাহ ও হজ্জের সময় তোয়াফের জন্য আরো কিছু করণীয় থাকে, যেমন কাবা শরীফের ২/৩ মাইল দুরে মিকাত নামে স্থানে গিয়ে ওজ্যু, নিয়ত ও এহরাম পরতে হয়। এহরাম হচ্ছে - দু টুকরো সাদা চাদরের কাপড়। উর্ধাংগে একটি ও নিম্নাংগে অপরটি পরতে হয়। ওমরাহ ও হজ্জের সময় তোয়াফের পরে আরো দু রাকাত নফল নামাজ পড়তে হয় এবং সাফা-মারওয়া পর্বতের মাঝে সাতবার দৌড়াতে হয় এবং সামান্য হলেও চুল কাটতে হয়। তোয়াফ, নফল নামাজ, সাফা-মারওয়াতে দৌড়ানো- সব কিছু নারী ও পুরুষ এক সংগেই করেন। একমাত্র প্রতি ওয়াক্তের ফরজ নামাজের কয়েক মিনিট সময় ছাড়া, সপ্তাহের সাত দিন, দৈনিক ২৪ ঘন্টা তোয়াফ চলতে থাকে। তোয়াফ পালন প্রাক-ইসলামিক যুগ থেকে চলে আসছে। যোহর ও আসরের নামাজের মাঝের সময় খর রোদে তোয়াফকারীর সংখ্যা সব চাইতে কম থাকে। এই ছবিটি একেবারে ছাদের ওপর থেকে সেই সময় তোলা। কাবা শরীফের সামনে পেতল ও কাঁচের ছাউনি দেখা যাচ্ছে। এর ভেতরে রয়েছে পায়ের দুটি ছাপ। কথিত আছে- এই ছাপ দুটি হযরত ইব্রাহিমের। পেতলের এই ছাউনীকে মাকামে ইব্রাহিম বলে। ছবি ওয়াহেদ হোসেনী।

     স্থপতির দৃষ্টিতে কাবা গৃহের অভ্যন্তর। গ্যালারীজ অব টু হলি মসজিদস পুস্তিকা থেকে নেওয়া এই ছবিতে কাবা গৃহের অভ্যন্তরের স্থাপত্য দেখা যাচ্ছে। তিনটি থাম ছাড়া কাবা গৃহের ভেতরে এখন আর কিছু নাই। প্রাক ইসলামিক যুগে নানান দেবদেবীর মূর্তি থাকতো কাবা গৃহে। বাইরে দুই দেওয়ালের কোনায় নিচের দিকে রয়েছে হাযরে আসওয়াদ।

কিং ফাহাদ গেট

     কাবা গৃহের চারপাশে খোলা চত্তর। সেই চত্তর ঘিরে খুব উচু তিন তালা (আসলে সাড়ে তিন তালা) বারান্দা। বারান্দা ঘিরে আবার চত্তর। বাইরের বেস্টনী এই চত্তর দিয়ে, বারান্দার ভেতর দিয়ে যেতে হয় কাবা শরীফে পৌছানোর জন্য। কাবা গৃহ বেষ্টনকারী বারান্দার ৯৫টি নম্বর দেওয়া গেট আছে। আর একটি গেটের কেন নম্বর নেই- কেন নেই জানি না। কোন কোন গেটের আবার নামও আছে- যেমন, ১ নম্বর গেটের নাম কিং আব্দুল আজিজ গেট। ৭৯ নম্বর গেটের নাম কিং ফাহাদ গেট। কিং ফাহাদ গেট দিয়ে ঢুকে সোজা চলতে থাকলে কাবা শরীফে ওঠা যায়। ৯৫টি গেটের মধ্যে কয়েকটিতে গম্বুজও রয়েছে। কাবা গৃহ বেষ্টনকারী সারা বারান্দায় মোট ৯টি গম্বুজ আছে। রাতে বিদ্যুতের সাদা আলোতে গম্বুজগুলো এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করে। দুই গম্বুজওয়ালা কিং ফাহাদ গেটের সামনে এহরাম পরিহিত ওয়াহেদ হোসেনী। যোহরের পরে খর রোদের কারণে ভীড় অপেক্ষাকৃত হাল্কা।

     মক্কা ও মদিনা পরিস্কার করার কর্মচারীদের শতকরা প্রায় ১০০ জনই বাংলাদেশী। বয়স বেশীর ভাগেরই ৩০-এর নিচে। মক্কায় দাল্লা কোম্পানীর কর্মচারীদের ইউনিফরম কমলা রং-এর। বড় কষ্টের এদের কাজ, জীবন। তার ওপর যে বেতন পাওয়ার কথা ছিল-হাতে বেতন আসতে আসতে তার অর্ধেক হয়ে যায়। ওয়াশিংটনে ফোর্থ অব জুলাই সন্ধ্যায় যে আবর্জনা সৃষ্টি হয়, কাবায় প্রতি ঘন্টায় তার অন্ততপক্ষে পাঁচগুন আবর্জনা সৃষ্টি হয়। এক হাতে একটি ঝাড়ু ও অন্য হাতে একটি বড় ডাষ্টপ্যান দিয়ে এই সব বাংলাদেশী কর্মচারীরা কাবা শরীফ ও তার চারপাশ ঝকঝকে তকতকে করে রাখে। একদিন রাতে দেখি কমলা রং-এর ইউনিফরম পরা দুই কর্মচারী রাস্তার পাশে পাথরের টুকরার ওপর পিজবোর্ড বিছিয়ে, তার ওপর প্লাসটিক বিছিয়ে বসেবসে দানে পাওয়া বিরিয়ানী খাচ্ছে। কি মনে হোল আমিও বসে গেলাম ওদের সঙ্গে। প্রথমে থতমত খেয়ে যায়- তারপর বড় খুশী ওরা। ওদের সাথে খেতে অনুরোধ করলো, দুলোকমা খেলামও। বাড়ী ময়মনসিং জেলার কোথায় জানি। দুজনেই এসেছে বছর ছয়েক, দেশে যায়নি একবারও। যে মাইনা পায় তাতে ধার শোধ করাই দায়। বেতন পাই অতি সামান্য, লোকে আমাদের নিকৃষ্ট মনে করে। কিন্তু জানেন, আমার খুব গর্ব। আমি কাবা শরীফ পরিস্কার রাখি।

     একদিন মগরীবের নামাজ পড়ে, বাইরে চত্তরে আসতে দেখি নীল পোষাক পরা (অন্য আর এক কোম্পানীর লোক) কজন বাঙালি কর্মচারী দৌড়ে দৌড়ে, এয়ারপোর্টে ফিতা দিয়ে যেমন করে লাইন তৈরী করে, তেমনি ফিতা দিয়ে চত্তরের একটা এলাকা ঘিরে ফেললো। তারপর আমেরিকায় খেলার মাঠে যেমন করে প্রথম খেলোয়াড় দৌড়ে ঢোকে, তার পেছন অন্য, তার পেছন অন্য তেমনি ভাবে- প্রথমে হাতে কাপড়ের চাওড়া ঝাড়ু নিয়ে একজন দৌড়ে ঢুকলো, সে চাতালের ওপর ঝাড়ু টেনে নিয়ে চললো, তার পেছন আর একজন, তার হাতে বহনযোগ্য পানির ট্যাংক। সে পানি ছড়িয়ে ছড়িয়ে প্রথম জনের পেছনে ছুটলো। তার পেছনে আর একজন ঝাড়ু নিয়ে দৌড়ালো। তার পেছন পেছন ছুটলো দুজন পাতলা রবারের ঝাড়ু নিয়ে। দশ মিনিটের মধ্যে বিরাট চত্তরের একাংশ চমৎকার ইটালীয়ান পাথর ঝকঝকে তকতকে, খটখটে সুকনা হয়ে ঝলমল করতে থাকলো। সম্মান নেই এদের, পয়সা পায়না তেমন, তবে গর্বের সংগে বলতে পারি এরা কাজ করে এক নম্বরের। মানুষ দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখলো- যেন সার্কাস দেখছে।

     মদিনা ও মক্কায় রোজার দিনে হরম শরীফে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও নানান ফাউন্ডেশন, করপোরেশনের উদ্যোগে ইফতারের ব্যবস্থা থাকে। একদিন মদিনার চত্তরে হাটছি। ইফতারের কিছু আগে দেখি এক লোক ব্যস্ত সমস্ত হয়ে প্লাষ্টিকের পাতলা লম্বা দসতরখান বিছিয়ে গেল, অন্য লোক এসে তার দুপাশে থরে থরে আপেল, খেজুর, জুস সাজিয়ে দিয়ে গেল। হাটছি আর দেখছি। এক কিশোর এসে আমাদের বললো- হাজ্জী এসো, আমার সংগে এসো। সুলতান ভাই আর আমি মুখ চাওয়া-চায়ি করে বললাম- চল। সে আমাদের নিয়ে চললো মসজিদের ভেতরদিকে। পথে আরো কিছু কিশোর আমাদের টানাটানী করলো। প্রথম কিশোর ঝাড়ি দিয়ে বললো- ওরা আমার লোক। আমাদের নিয়ে সে মসজিদের একেবারে মাঝে নিয়ে বসিয়ে দিল। ওখানো প্লাসটিকের দসতরখানের দুপাশে ইফতার সাজানো। আরো কিছু লোক সেখানে বসে, আমাদের বসিয়ে কিশোর আবার ছুটলো অন্য মেহমানের সন্ধানে। বসে বসে এদিক ওদিক দেখছি। এক ভদ্রলোকের ওপর চোখ থেমে গেল। যদি না জানতাম যে, না তাঁর এখানে আসার কথা নয় তবে উঠে গিয়ে কথা বলতাম। ভদ্রলোকের চেহারা একেবারে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ সুরঞ্জীত সেনগুপ্ত।

     আর একদিন সন্ধ্যায় মদিনায় হযরতের রওযার খুব কাছাকাছি জায়গায় বসে আছি। এমন সময় দেখি আমাদের পাশে বেশ ভালো বেশভুষায় কিছু লোক দামী পিকনিক বাক্স খুলে ইফতারী সাজাতে লাগলো। এক থাম থেকে অন্যথাম পর্যন্ত। প্রায় ৩০ জনের ব্যবস্থা। পরে কথা বলে জানলাম ভদ্রলোক একজন মোয়াল্লেম- শিক্ষক। তার পিতাও ছিলেন শিক্ষক। তিনিও সেখানে উপস্থিত। তিরিশ বছর ধরে তারা প্রতি রমযানে, প্রতিদিন ঐ একই জায়গায়- এক থাম থেকে অন্যথাম- দেশ বিদেশ থেকে আসা মানুষদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করে আসছেন। ভদ্রলোকের জৈষ্ঠপুত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে মিলিটারী সাইয়েন্স-এর ছাত্র। ইংরেজীতে তারই মাধ্যমে তার পিতাও পিতামহের সঙ্গে আলাপ হোল। মেয়েদের জায়গায় তাদের পরিবারের মহিলারাও ইফতারের ব্যবস্থা করে আসছে। প্রশ্ন করতেই যুবকটি বললো- নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই- আমার বাবা দাদার মত আমাদের পরিবারের এই ঐতিহ্য চালিয়ে যাব।

     আর একদিন মক্কায় ইফতারের সময় দেখি জনা কয়েক বাঙালি প্লাসটিকের দসতরখান বিছাচ্ছেন। তাদের পরনে এহরাম। আমি গিয়ে ওদের সংগে যোগ দিলাম। সংখ্যায় ওরা সাতজন। এসেছেন মীনা থেকে। ওখানে ইসলামী ব্যাংক  অব সাউদী আরাবিয়ায় কাজ করেন। বাঙালি কর্মচারীর সংখ্যা ৮১ জন। মেস করে থাকেন। তিনজন বাঙালি কুক আছে তাদের। মনে হল ভালো অবস্থায় থাকেন, দেশেও যান। আজ সাতজন একত্রে এসেছেন তোয়াফ করতে। আমরা যেখানে বসেছিলাম সেখানে একজন পাকিস্থানী সহ আরো কয়েকজন আরবও ছিলো। কোন এক করপোরেশন পানি ও খেজুর দিয়ে যাওয়ার পর এরা বের করলেন কয়েকটা স্বচ্ছ প্লাসটিকের বিরাট বিরাট ব্যাগ। প্রথমটাতে মুড়ি, দ্বিতীয়টাতে ভাজা ছোলা, তৃতীয়টাতে পেয়াজু এবং চতুর্থটাতে বেগুনি। ওরা ছিলেন সাতজন, এনেছেন প্রায় ৩০ জনের খাবার। আমার তো চক্ষু চড়ক গাছ। বললাম- জানেন গতকাল রাতে আমার স্ত্রী বলছিলেন- এই খেজুরর আর জুস দিয়ে রোজা খুলে সুখ নেই। ব্যাস- সঙ্গে সঙ্গে সবাই এক সঙ্গে বলে উঠলেন- ভাবী সাবের জন্য আলাদা কর। একব্যাগ মুড়ি, ছোলা, পেয়াজু আর বেগুনি নিয়ে গেলাম হোটেলে। গিন্নী সে দিন আর অন্য কিছু ডিনার করেননি।

 

     সৈয়দ মুজতবা আলী সাউদী যাননি, গিয়েছিলেন কায়রো। লিখেছেন সেখানকার আড্ডা দেওয়ার সংস্কৃতি আর কফি সেবন। সাউদী কায়রো না হলেও আরব। একই জগতে পড়ে। আমাদের হোটেলের কাছেই একটু খোলা জায়গায়, একটা খেজুর গাছ। তার চারদিকে হেলান দেওয়া বেঞ্চ। দিনের বেলা সেখানে কাউকে দেখা যায় না, একে রোদ, তার ওপর রমযান মাস। সন্ধ্যা হোলেই মেলা বসে যায়। সামনের দোকান থেকে কফি কিনে নিয়ে হোক কিংবা খালি হাতে সবাই বসে যায়। মহিলারা সম্ভবত বিদেশী, ওমরাহ্ করতে আসা যাত্রী। ফুরফুরে বাতাসে আরামে সময় কাটায়। পেছনে কাবা শরীফের বিরাট সম্প্রসারণ চলছে।

     সাইট সিয়িং-এর সময় আমাদের নিয়ে যায় আরাফাতে। জবলে রহমা, করুনা পর্বত। শয়ে শয়ে মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন নিম্ন মানের টুরিস্ট আড্ডা। হকার আর উটচারীদের ব্যাপক সমাবেশ। ভাবতেও গা শিউরে উঠে, এই করুনার পর্বতে দাড়িয়ে হযরত দিয়েছিলেন বিখ্যাত বিদায় হজ্জ বানী। একমাত্র বাংলা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব মুসলমান অধ্যুষিত দেশের ভাষায় নির্দেশ দেওয়া আছে এখানে নামায পড়া, গিঠ্টু দেওয়া, দোয়া করা না যায়েয। বাংলা লেখা যে একেবারে নেই বলবো না। টুরিষ্টদের কাছে সস্তা পেতলের চকচকে গহনা, প্লাসটিকের খেলনা, সিনথেটিক কাপড়ের পরিধেয় বিক্রী করছে বাংলাদেশী হকাররা। একজন তার পণ্য বাংলাদেশী গামছা দিয়ে ঢেকে রেখেছে। ঐ জায়গায় বাংলায় তার নাম লিখে রেখে গেছে- ইসলাম।

     হিরা পর্বতের ওপরে এক গুহায় হযরত আরাধনা করতেন। বিবি খাদিজাও কখনো কখনো তার সংগী হোতেন, কখনো কখনো খাওয়া ও পানি দিয়ে আসতেন। এখন একটা ছোট্ট ও কষ্ট সাধ্য হাটা পথ হয়েছে বটে, তবে তখনকার দিনে এটি ছিল একেবারে দুর্গম। হিরা পর্বতের গুহায় হযরতের কাছে প্রথম ওহি নাযিল হয়- ইকরা বিসমে---- পাঠ করো, পাঠ করো আল্লার নামে।

     মদিনায় হযরতের মসজিদে খোলা আকাশের নিচে চত্তরের ওপরে কারুকার্য খচিত বিদ্যুৎ চালিত বিরাট বিরাট ছাতা আছে। প্রয়োজনে এই ছাতা খুলে মসজিদে আগমনকারীদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়। ছবিতে চত্তরের ওপরে দুটি খোলা ছাতা ও কয়েকটি বন্ধ ছাতা দেখা যাচ্ছে। চত্তরের পরেই শুরু হয়েছে আধুনিক মদিনা শহর।

     মদিনায় হযরতের মসজিদে বাইরে চত্তরে ইফতারের ব্যবস্থা। ছায়ার জন্য ওপরে খোলা বৈদ্যুতিক ছাতা।

     শুধু মাত্র হযরতের কবর জিয়ারৎ করতে যাওয়া না যায়েয। তবে যে তিনটি মসজিদ জিয়ারৎ করতে যাওয়া যায়েয সেগুলো হোল মক্কার কাবা, জেরুজালেমের বয়তুল মোকাদ্দেস এবং মদিনার হযরতের মসজিদ। হযরতের মসজিদ দেখতে গিয়ে তাঁর কবর জিয়ারৎ করা সিদ্ধ। হযরত যেখানে দেহত্যাগ করেন সেখানেই তাকে কবর দেওয়া হয়। পরে হযরত আবু বকর এবং হযরত ওমরকে তার পাশে কবর দেওয়া হয়। যেখানে তাঁকে কবর দেওয়া হয়, তার পাশেই ছিল হযরতের মূল মসজিদ। সেই মসজিদ এখন বিপুলভাবে সম্প্রসারিত। ছবিতে যে সবুজ গম্বুজ দেখা যাচ্ছে তার নিচেই হযরতের কবর।

মাঝারি আকারের সবুজ গাছ লাগানো নেবারহুডের সাইড ওয়াক দিয়ে হাটছি আর ভাবছি কি বিচিত্র এই পৃথিবী কোথাও নদী নালা সবুজ গাছ পালা, কোথাও জীবনবিহীন পাথরের পাহাড়। লালন ফকিরের একটা গান মনে পড়ে গেল- পাথরেতে অগ্নি থাকে, বের বরতে হয় ঠুকনি ঠুকে। তাই ভাবছি- সাউদী আরবের প্রাণহীন পাথরে হযরত এমনি ঠুকনি ঠুকলেন যে তার আলোয় সারা বিশ্ব উজ্জল হোয়ে উঠলো। হাটছি আর ভাবছি- অতবড় হাতির কতটুকুই দেখলাম।

ElderHossaini@gmail.com

ওয়াশিংটন ডিসি

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০০৯

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.