Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৭ম সংখ্যা কার্তিক ১৪১৬ •  9th  year  7th  issue  Oct-Nov  2009 পুরনো সংখ্যা
প্রবাসে মূলস্রোতের রাজনীতি উত্তম Download PDF version
 

প্রবাসে বাংলাদেশী সংগঠন

 

প্রবাসে মূলস্রোতের রাজনীতি উত্তম

মাহমুদ রেজা চৌধুরী

অন্যান্য জাতিদের তুলনায় আমরা বাঙালিরা আড্ডাপ্রিয় এবং সেটা মূলত রাজনীতি বিষয়ে আড্ডা দিতে ভালোবাসি। পেশাগত বা পারিবারিক নানা কারণে অনেকে এই সবের প্রতি তেমন সময় দিতে না পারলেও সুযোগ পেলে আড্ডা ও রাজনীতি আমাদের বিনোদনের একটি অন্যতম মাধ্যম। আমাদের দারিদ্রতা এবং অলসতা দুটোই এর প্রধান কারণ বিশেষ করে সমাজের মধ্য বিত্ত, নিম্ন বিত্ত ও উচ্চ মধ্য বিত্ত কিংম্বা উঠতি মধ্য শ্রেনীর মাঝে। এ-ছাড়া রাজনীতিতে সমাজের মধ্য বিত্তের অগ্রণী ভূমিকার ইতিহাস তো আছেই। আর বিনোদনের জন্য আমরা রাজনৈতিক আড্ডায় উৎসাহি হবার কার, আমাদের বিনোদনের ব্যবস্থা সীমিত, যা আছে সেটাও সমাজের বিরাট একটি অংশ মধ্যবিত্তদের অনেকেরই উপভোগ করার ক্ষমতার বাইরে। তৃতীয় একটি কার আমাদের রাজনৈতিক আড্ডায় ঝুকে পড়ার সেটা হচ্ছে মানুষ সহজেই অন্যের দৃষ্টি আকর্ষ করতে চায়, চেষ্টা করে, সেটা উপভোগ করে আত্মতৃপ্তি অনুভব করে। রাজনীতিতে এটা সহজ উপায় অন্তত আমাদের কৃষ্টি ও সামাজিক সম্পর্কের সামগ্রিক কাঠামোয়। তাই আমরা দেশে থাকি কিংবা প্রবাসে সুযোগ পেলেই রাজনৈতিক আড্ডা এ সুখ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখতে পারিনা। রাজনীতির আদর্শ হলো এটা ত্যাগের মাধ্যম। কালের বিবর্তনে রাজনীতি বিশ্বের সর্বত্রই হয়ে গেছে এখন ভোগ-এর মাধ্যম। ভোগ করতে কে না চায়। তাইতো রক্ষকও ভক্ষক হয়। রাজনীতির ব্যপারে আমাদের উল্লেখিত সামাজিক প্রেক্ষাপট ও উৎসগুলি উপেক্ষা করার মতো নয়।

রাজনীতিতে এর স্থান কাল পাত্রের চেয়ে বিবেচ্য হচ্ছে এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সেটা যত বেশি জনকল্যালক হবে, ত্যাগের হবে এবং নোবল পেশা হবে ততই সমাজ এতে উপকৃত হবে। এরই প্রেক্ষিতে আমরা সংক্ষেপে আলোচনা করবো বিদেশে বসে স্বদেশের রাজনীতিক কর্মকান্ড, ক্রিয়া প্রক্রিয়া ত্যাগের না ভোগের।

আমরা যখন কিশোর ছিলাম সেই ৭০র দশকে খেলাধলাতেই আমরা বেশি মেতে থাকতাম আমাদের অবসর বিনোদনে। প্রতিটি মহল্লায়, মহল্লায় খেলার মাঠ ছিলো। জীবনের সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা ও আকর্ষণ এখনকার চেয়ে বেশীই ছিলো। তাই স্কুল কলেজ দুটির পরে আমরা ছুটে যেতাম খেলার মাঠে। আমাদের ছাত্র জীবনের দুটোই উদ্দেশ্য ছিলো তখন প্রধান। এক পড়াশুনা, দুই খেলাধলা। ছাত্রজীবনে রাজনীতি আমাদের সময়ও ছিলো, তবে এখনকার মতো এত ব্যপকও না বা ছাত্র নামধারি অ-ছাত্রদের মধ্যেও ছড়িয়েও ছিলোনা। ৮০র শেষ দশক থেকে সময়ের দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। খেলার মাঠগুলি ধীরে ধীরে দখলে চলে যাচ্ছে রিয়াল স্টেট শিল্প মালিকদের অধীনে। একদিকে দ্রুত জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও তাদের বাসস্থান সমস্যার সমাধান, অন্যদিকে বিশ্ব বাণিজ্যে কথিত মুক্ত অর্থনীতির তথাকথিত মুক্ত প্রতিযোগিতায় বাড়তে থাকে বিভিন্ন শপিং মল, সুপার মার্কেট, হাট বাজার, বিপনি বিতান, অত্যাধুনিক অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সুউচ্চ দালান-কোঠা, জমি সমিত। দ্রুত দখল হয়ে যায় বাড়ির সামনের খালি জায়গাটুকু এই সব উপাদানের ক্রমবর্ধিত চাহিদায়। খেলার মাঠগুলিও সংকুচিত হতে হতে কিশোর ও তরুনদের বিনোদনের সুযোগও কমতে থাকে। তখন দেশের সম্ভাব্য তরুন সমাজের বিরাট একটি অংশ তাদের বিনোদনের জন্য বেছে নেয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক তর্ক বিতর্কের আড্ডাকে - রে, চায়ের স্টলে, পাড়ায় পাড়ায়, এবং রাজনীতর অফিসে। এই সুযোগকে আরো প্রসারিত করে দেয় নিজ নিজ দলের দলীয় স্বার্থে। বই ও বল ছেড়ে তরুনদের হাতে তুলে দেয়া হয় অস্ত্র, টেন্ডার, চাঁদাবাজি, সস্তা জনপ্রিয়তার রং বেরংর বেলুন। সেই থেকেই ব্যপক হারে শুরু হয় আমাদের তরুন সমাজের রাজনীতি ত্যাগে আদর্শের বিপরতে কেবল ভোগের কৃষ্টিতে হারিয়ে যাওয়া। এরপর দেশের সামাজিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চ্যালেন্জ ও অনিশ্চয়তা যখন বাড়তে থাকে তখন দেশের তরুন সমাজের এক বিরাট অংশ --- পেশাদারিত্বের মতই জীবন যাপনের মান উন্নত এবং নিশ্চিত করার তাগিদে এবং কর্ম সংস্থানের নেশায় দলে দলে ছুটে যেতে থাকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ দেশান্তরে।

এদের মধ্যে যে অংশটি অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত বা একেবারে শিক্ষিত না, কোন পেশাতেও তেমন দক্ষ না তারা চলে যায় মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলিতে। আর এদের মধ্যে আমরা যারা একটু অ-আ-ক-খ জানি তারা এই কারণে এবং কিছুটা সামাজিক শ্রেনী বিন্যাসে কিছুটা সুবিধাভোগ শ্রেণীতে অবস্থানের কারণে ছুটে আসি পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্রে। কেউ পড়াশুনা করতে উচ্চ শিক্ষা অর্জনে, কেউ কর্ম সংস্থানে। কেউ যাই ইউরোপের ইংল্যান্ড, জার্মানিতে। কেউ আসি উত্তর আমেরিকাতে।

প্রবাসে ৮০র দশকের পর থেকে এবং ৯০র দশকের মাঝামাঝি এসে আমাদের প্রবাস জনসংখ্যা, বসতি, স্থায় বাসস্থানের পাশাপাশি সংগঠনগুলি বাড়তে থাকে। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থারও একটু নিশ্চিত হতে থাকে। আমরা একটি কমর্ফোর্ট জোনে পৌঁছে গেছি ভাবতে শুরু করি। কৃষ্টিগতভাবে অল্পতেই সন্তুষ্ট বাঙালি জাতি আমরা। তাই সহজেই জীবনের কঠিন পথে অর্জিত উচ্চাকাংখা আমাদের অন্যান্য অনেক জাতিদের তুলনায় কম। যার ফলে বর্তমান বিশ্বের সবচে জটিল, কুটিল,র্ত ও দুর্গম তথাপি সহজ পথ রাজনীতিকেই দ্রুত উপরে ওঠার মাধ্যম বা আত্মস্বিকৃতি অর্জনের উপায় হিসাবে ধরে নিয়ে এর প্রতি ঝুকে পড়ি এর গুরু জ্ঞান অর্জন ছাড়াই। আমরা বুঝতে এবং স্বকার করতে চাইনা বা পারিনা যে স্বদেশের মাটিতে বসে স্বদেশের রাজনীতি যেটুকুই বা দেশের কল্যানে কাজে লাগার সুযোগ থাকে সেটা প্রবাসে বসে করলে দেশের কোন কল্যানের হয়না। বরং প্রবাসে ছোট্টো এবং অপেক্ষাকৃত অদক্ষ কমিউনিটিতে বিভক্তিকেই প্রশ্রয় দিতে পারে বেশি। মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলিতে আমাদের কমিউনিটি সেখানে বসবাস করে স্ব-দেশের রাজনীতিতে তৎপর হতে না পারার কার হচ্ছে সেই দেশগুলির সামাজিক কাঠামো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি বন্দী বা কনজারভেটিভ কৃষ্টির। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা এই সব ক্ষেত্রে একটি মুক্ত এবং উদার সমাজ ব্যবস্থা বলেই এখানে বসেও স্বদেশের রাজনীতি করতে বেগ বা দুর্ভোগ পোহাতে হয়না হেতু ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় প্রবাস বাংলাদেশীদের মধ্যে স্থানীয় রাজনীতির চাইতে দেশিয় রাজনীতি করার প্রয়া এবং ঝোকই বেশী দেখা যায়। এতে ফায়দা হচ্ছে দ্রুত আত্ম-স্বিকৃতি অর্জন, আত্মপ্রচার পায় এবং সাথে সাথে প্রবাসে বসে দেশের মূল রাজনৈতিক দলে কেন্দ্রিয় নেতা নেতৃদের সাথে যোগাযোগ। দেশের মূল রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীরাও সেটাই চায় তারা যখন ইউরোপ ও আমেরিকাতেই বেশী ঘন ঘন কারণে ও অকারণে ছুটে আসে তখনও যেনো কেউ তাদের দেশে থাকার মতই সমাদার করে, বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার এবং শপিং করাতে সুযোগ ও সহযোগিতা করে। দেশে বসে এই সব রাজনৈতিক দল এবং নেতরা যা করেন একই প্রক্রিয়া তারা বিদেশে স্থানয় বাংলাদেশীদের দ্বারা ভোগ করতে চান। এই সব নানান কারণে দুঃখজনকভাবে প্রবাসে আমাদের স্বদেশী রাজনীতির প্রতি কোন্দল এবং নিজেদের কমিউনিটিতে বিভক্তি ছড়ায়। যদিও এতে আতংকিত হবার তেমন কোন কারও নেই এটাও বাস্তব। কার উত্তর আমেরিকাতে বসে যারা স্বদেশী রাজনীতি করেন তাদের সংখ্যা সীমিত। তথাপি এই সীমিত সংখ্যার প্রবাসরা যদি এখানে থেকে স্থানীয় রাজনীতিতে উৎসাহ হন এবং সেটাতে সংশ্লিষ্ট হন সেটা আমাদের স্থানয় কমিউনিটি এবং দেশের জন্য অনেক কল্যা সৃষ্টির অবকাশ তৈরি করতে পারে বলে মনে করি। আমরা যদি ধীরে ধীরে আমাদের বিভিন্ন সিটির নির্বাচনে, বিভিন্ন স্টেটের নির্বাচনে ও রাষ্ট্রের নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্য আমাদের আগামী প্রজন্মকে উৎসাহ করি এতে নিজেরাও যারা প্রবাসে রাজনীতি করতে উৎসাহ, পা পা করে অগ্রসর হবার দৃষ্টান্ত রাখি। তাহলে আগামীতে উত্তর আমেরিকাতে কোথাও গভর্নর, কোথাও সিটি মেয়র, সিনেটর এমনকি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আমাদের বাঙালিদের মধ্যেও  তৈরী হবার সম্ভাবনা আছে যা প্রকারন্তরে আমাদে স্থানয় কমিউনিটি ও দেশের উন্নয়নে অনেক সহায়ক ভূমিকা গ্রহ করতে পারে বলে দৃঢ় বিশ্বাস আছে। স্থানয় রাজনীতিতে আসার পূর্বে আমাদের স্থানয় শিক্ষা, সভ্যতা ও কৃষ্টির বিষয়ে ভাল জ্ঞান অর্জন করে আসতে হবে। প্রবাসে রাজনীতি করার বিপক্ষে নই, তবে সেটা প্রাবাসে থেকে প্রবাসীদের দ্রুত কল্যান এবং দেশের ভবিষ্যতের কল্যানে ভূমিকা রাখার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে যা প্রবাসে থেকে দেশয় রাজনীতিতে অর্জন সম্ভব না শুধুমাত্র রাজনীতির নামে কিছু ভোগ বিলাস, আড্ডা ও সময় অপচয় হওয়া ছাড়া।

পরিশেষে কিছু দিন পূর্বে দেশের দৈনিক প্রথম আলোতে আমাদের একজন প্রাক্তন সারির, লেখক ও অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খানের একটি প্রবন্ধের থেকে নার উদ্ধৃতি এক সময় বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী লর্ড স্টোনের একটি কথা দিয়ে  শেষ করি --  We have no eternal allies and, we have no perpetual enemies: Our interests are eternal and perpetual and those interests it is our duty to follow.

অর্থাৎ, আমাদের কোন শাশ্বত মিত্র নেই, আমাদের কোন চিরস্থায় শত্রুও নেই। আমাদের স্বার্থই হচ্ছে শ্বাশত ও চিরস্থায়ী। আমদের দায়িত্ব হচ্ছে এসব স্বার্থ রক্ষা করা প্রবাসে আমাদের স্বার্থ হচ্ছে আমাদের ব্যক্তিগত নয়, সামগ্রিক কমিউনিটি এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্য বজায় রাখা। আর এটা সম্ভব প্রবাসের মূল স্রোতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে

 

নিউ ইয়র্ক

সেপ্টেম্বর ১৩, ২০০৯

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.