Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  প্রযুক্তি বন্ধন  ||  ৯ম বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যা আশ্বিন ১৪১৬ •  9th  year  6th  issue  Sept-Oct  2009 পুরনো সংখ্যা
বুড়িগঙ্গার মৃত্যু ও আমরা Download PDF version
 

প্রযুক্তি বন্ধন

বুড়িগঙ্গার মৃত্যু ও আমরা

দলিলুর রহমান

     আমি Tokyo Institute of Technology (TIT)তে পড়াশুনা ও গবেষণা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। যে প্রফেসারের সাথে আমি গবেষনা করতাম তার নাম Yoshiharo Ishido প্রথমত তার ল্যাবে যেয়েই একটা ব্যাপারে বেশ চমৎকৃত হয়েছিলাম তা হলো, তাঁর ল্যাব যে বিল্ডিংয়ে তার নাম Vitamin Building। এই নামকরণ কেন তা জানার কৌতুহল হলো এবং জানতে পারলাম যে একজন রসায়নের প্রফেসার একটি vitamin আবিষ্কার করেন এবং প্যাটেন্ট করেন। TIT প্রচুর টাকা পায় এই প্যাটেন্ট থেকে এবং সেই টাকা দিয়ে এই বিল্ডিং তৈরী করে যার ফলে এর এই নামকরণ। এমন ঘটনাতো আমাদের দেশে নেই তাই আমি খুব চমৎকৃত হয়েছিলাম। আর একটি জিনিষ দেখে সেই প্রথমদিনই খুবই অবাক হলাম তা হলো Vitamin Building থেকে অনতিদূরে একটি বিল্ডিং বেশ উঁচু তা সম্পূর্ন মোটা কাপড়ে ঢাকা। আমি প্রফেসার Ishido কে জিজ্ঞেস করলাম তিনি জানালেন ওটি কাপড় দিয়ে মোড়োনা হয়েছে এজন্য যে ভেতরে বড় রকমের মেরামত চলছে। যাতে ধুলা বালিতে পরিবেশ দূষণ না হয় সেজন্যে গোটাটাই মোটা কাপড় দিয়ে মোড়ানো হয়েছে। আমি বললাম, মেরামতের কাজ চলছে কোন শব্দতো শুনতে পাচ্ছিনা।

     তিনি বললেন ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনায় যাতে বিঘ্ন না ঘটে সেজন্যে সাউন্ড প্রুফিং-এর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। আমি ১৯৮০ সনের কথা বলছি। আমার পড়াশুনার Curriculum এর সাথে পাঁচটি খুব বড় ইন্ড্রাষ্ট্রি ঘুরে দেখার সুযোগ ছিল যেমন, Toyota, Sumitomo Chemical Company, জাপানের সর্ববৃহত ষ্টীল ইন্ডাষ্ট্রি ইত্যাদি। আমি তখন যে জিনিষটি খুব ভাল লক্ষ্য করেছি তা হলো প্রতিটি জায়গায় জাপানীজদের নিরাপত্তা জনসাস্থ্য ও পরিবেশ দূষণের ব্যাপারে স্পর্শকাতরতা। সব জায়গায় সবাই প্রায় একটি কথা ধ্রুব সত্যের মতো বলতেন, তা হলো জাপান খুব ঘনবসতিপূর্ণ ছোট জায়গা। একে ভালভাবে রক্ষনাবেক্ষণ না করলে জাপানীজদের জন্য মহা বিপদ। এটা শুধু তাদের মুখের কথা নয় এর জন্য প্রয়োজনীয় রীতি-নীতি তৈরী ও তার প্রয়োগ শতকরা ১০০%। তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা দেখে আমি এখনো শ্রদ্ধায়, তাদের কাছে মাথা নত রাখি। জাপানীজরাও ব্যবসা করে টাকা বানায়। কিন্তু তা কোন অবস্থাতেই তাদের মাতৃভূমির ক্ষতি করে নয়। জাপানের সাথে বাংলাদেশের কোন ভাবেই তূলনা করা যায় না। একভাবে আবার যায়ও তা আমার কথা নয়। আমি যখন জাপান যাই তখন এক ভদ্রলোক, তিনি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি করতেন ১৯৮০ সনে তিনি বাংলাদেশ ইউথ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, আপনি যে দেশে যাচ্ছেন তারা কয়লা থেকে স্বর্ণ তৈরী করে; আমরা সেক্ষেত্রে স্বর্ণকে কয়লায় রূপান্তরিত করি। কথাটা কত বড় সত্য কথা সেটিই আমার লেখার মূল বিষয়বস্তু একটি উদাহরনের মাধ্যমে। আর তা হলো বুড়িগঙ্গা নদী ও তার আশে-পাশে জলাশয়গুলোর শোচনীয় মৃত্যু। স্বর্ণকে আমরা কিভাবে কয়লায় রূপান্তর করতে পারি তার এটি একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

     ১৯৯৭ সালে আমি ঢাকা গিয়ে কেরানীগঞ্জে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাবো। সেখানে যেতে হাজারীবাগ থেকে আটির বাজার পর্যন্ত নৌকায় যেতে হয়। নৌকায় ওঠেই নাকমুখ কাপড় দিয়ে চেপে ধরে রাখতে হলো। পানি কেমন ময়লা নীল রঙের। ২০০১ সালে যখন একই ভাবে আবার যাচ্ছিলাম তখন ঐ পানিকে আর পানি বলা যায়না রীতিমতো ঘন কালো রঙের আলকাতরার মতো তরল পদার্থ।

     এর কারণ কি? তা সবাই জানেন- ২০৬টি চামড়ার কারখানা যেখানে ৩০,০০০ শ্রমিক কাজ করে। এই ২০৬টি চামড়ার কারখানার যত আবর্জনা, বর্জ্য সবই ফেলা হয় বা ঢালা হয় বুড়িগঙ্গা নদী ও তার আশে পাশের জলাশয়ে। এই সব কারখানায় শ্রমিকরা যে সব মারাত্মক কেমিক্যাল নিয়ে কাজ করে তা করে থাকে খালি হাতে খালি পায়ে। শ্রমিকদের বাড়ী-ঘর বস্তি ইত্যাদিও গড়ে ওঠেছে দূষিত নদী, খাল, পুকুরের পারে। এখানকার বাতাস দূষিত কারণ এখানে চামড়ার টুকরো পুড়িয়ে তেল, সাবানের কাচামাল তৈরী করা হয়। হাজারীবাগের চামড়ার কারখানাগুলি দেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশ ২৫০ মিলিয়ন ডলারের চামড়া ও ১৭০ মিলিয়ন ডলারের জুতা বিদেশে রফতানি করে থাকে। কিন্তু এই কারখানা থেকে যে আবর্জনা তৈরী হয় তা পরিশোধন না করেই নদীতে ফেলা হয়। এব্যাপারে কারখানাগুলির প্রশাসনের চরম অবহেলা, বাংলাদেশের সরকারগুলোর চরম উদাসীনতা ও দূর্নীতিই দায়ী। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে বাংলাদশ থেকে চামড়া রফতানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইউরোপের লোকজন অবস্থা দেখে ভীষণ উদ্বিগ্ন।

     Jurgen Hackentoroich জার্মান কেমিক্যাল কোম্পানী Lanxess-এর এশিয়া-পেসিফিক অঞ্চলের জন্য চামড়ার কেমিক্যালের ডিরেক্টর। তিনি মন্তব্য করেন Hazaribagh is probably one of the worst places I have been to the region. Hazaribagh reminds you in the same ways of the Middle ages, or perhaps the Stone Age.”

     চামড়া তৈরী করতে প্রচুর কেমিক্যাল দরকার হয় যেগুলি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও পরিবেশ দূষণের জন্য ভীষণভাবে হুমকি স্বরূপ। পৃথিবীর সব দেশেই চামড়ার কারখানা থেকে যে দূষিত পানি বা তরল পদার্থ তৈরী হয় তা পরিবেশে ছাড়ার আগে পরিশোধন করা হয়। এসব কেমিক্যালের মধ্যে লাইম সোডিয়াম সালফাইড, সালফিউরিক এসিড সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড, কষ্টিক সোডা, আর্সেনিক সালফাইড, ও ক্যালসিয়াম হাইড্রো সালফাইড। এসব কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় প্রথম ধাপে কাচা চামড়াকে জুতা, কাপড় ও রসায়নিক টিকসই সুন্দর দেখার জন্য ও দীর্ঘদিন টেকার জন্য। এরপর ব্যবহার করা হয় ক্রোমিয়াম জাতীয় কেমিক্যাল চামড়াকে নীলাভ-সাদা ও টিকসই করার জন্য। সর্বশেষ ধাপে ব্যবহার করা হয় রঙ ও বিভিন্ন কেমিক্যাল এজেন্ট। বলা বাহুল্য এসব কেমিক্যাল জনস্বাস্থ্যের ও প্রানী জগতের জন্য সাঙ্ঘাতিক ক্ষতিকারক। সে জন্যেই দূষিত তরল পদার্থ পরিবেশে ছাড়ার আগে তা পরিশোধন করা হয়।

     যেমন Andy Pleatman, চীনের Jiangmen শহরের টেনারি Asiatan Tannery র মালিক। তিনি বলেন চীন, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চামড়া উৎপাদক দেশ, গত তিন বছরে কারখানা পরিশোধনে প্রচুর উন্নয়ন সাধন করতে পেরেছে

     বড় বড় কোম্পানী, যারা চামড়া ব্যবহার করে যেমন Timberland Nike- তারা আর চামড়া সরবরাহকারী কোম্পানী গুলোর নিজ নিজ দেশের আইন মেনে চললেই তা নিয়ে সন্তষ্ট নয়। কারণ, বাংলাদেশের আইন আছে তার প্রয়োগ নেই। এসব জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার আইন-কানুন সেখানে থাকাও যা না থাকাও তাই। কারণ টাকা দিয়ে সব আইন ভেঙে ফেলা যায়। Nikeর মতো বড় কোম্পানীগুলো এসব জানে। তাই তারা চামড়া কারখানার দূষিত তরল পদার্থের পরিশোধন ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা দাবী করে, পশ্চিমা মাপকাঠিতে।

 


 

     Asiatan এর একটা বিরাট পানি পরিশোধন করার প্ল্যান্ট আছে যেখানে শুধু দূষিত কণা বিশেষই দূর করা হয়না পানিতে যে রাসায়নিক পদার্থ আছে তা বিশেষ এক ধরনের মাইক্রোঅরগানিজম দিয়ে ধ্বংস করা হয়। এভাবে পানির Bio Oxygen Demand (BOD) কমিয়ে তারপর নদী বা অন্য জলাশয়ে ছাড়া হয়। সে তূলনায় হাজারীবাগ হচ্ছে ঢাকার সবচেয়ে নোংরা জায়গা। ওখানে চামড়া কারখানাগুলোর দূষিত পানি পরিশোধন করার কোন ব্যবস্থা আছে বলেও মনে হয়না- থাকলেও তা কার্যকরী নয়।      হাজারীবাগের আনাচে কানাচে আরো ছোট ছোট ফ্যাক্টরী গড়ে ওঠেছে। তা হলো চামড়ার যে টুকরো ফেলে দেয়া হয় তা দিয়ে অন্যান্য জিনিষ তৈরী করা।

যেমন, ছোট ছোট চামড়া থেকে মাংসের টুকরো সংগ্রহ করে তা দিয়ে রান্না করার তেল তৈরী করে কেউ কেউ মুরগীর খাবার তৈরী করে, কেউ তৈরী করে গ্লো, সাবান তৈরী করার কাচামাল। এ সব ছোট ছোট ফ্যাক্টরী থেকে যত আবর্জনা হয় তা খালে নদীতে ফেলা হয়।ওদিকে সবাই এখানে খালি পায়ে হেটে বেড়ায়, যারা কারখানায় কাজ করে তাদের পায়ে কোন বুট নেই, হাতে কোন গ্লাভস নেই। ফলে আশে পাশের জলাশয় যেমন ধ্বংস করা হয়েছে তেমনি জনস্বাস্থ্যও হুমকির সম্মুখীন। আব্দুল মালেক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন হাজারীবাগ চ্যাপ্টারের জেনারেল সেক্রেটারী। তিনি বলেন We have lots of cases of skin diseases, jaundice, dysentery, asthma and gastric - ulcers যদিও ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশ এর দাবী করে এসেছে দীর্ঘকাল ধরে, মালিকরা এ ব্যাপারে কিছুই করছে না। প্রয়োজনে কর্মীদের একটু বেতন বাড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখে।

     শোনা যাচ্ছে হাজারীবাগ থেকে টেনারি সরিয়ে সাভারে নেয়া হবে। এতে হাজারীবাগের জনতার জীবনযাত্রার হয়তো পরিবর্তন হবে। যেখানে সরিয়ে নেয়া হবে সে জায়গা নতুন করে দূষণ করা হবে নাকি? এতে বুড়িগঙ্গা ও অন্যান্য জলাশয়ের যে ধ্বংস হয়েছে তা কি আর ফিরে পাওয়া যাবে? একটাই আশার আলো দেখতে পাওয়া যায় তা হলো বাইরের ক্রেতা কোম্পানীগুলোর চাপে যদি আন্তর্জাতিক ষ্ট্যান্ডার্ড মানতে বাধ্য করা হয় তাহলে এই ইন্ড্রাষ্টির যেমন গ্লোবাল অর্থনীতেতে ভবিষ্যত আছে তেমনি সামাজিক দায়বদ্ধতা মেনে চলার মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি আছে।

ফ্লেমিংটন, নিউ জার্সী।

তথ্য সংগ্রহ ও ছবি:

Jean Francois Tremblay

C& EN, Feb 19,2009

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.