Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  নিয়মিত কলাম  ||  ৯ম বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যা আশ্বিন ১৪১৬ •  9th  year  6th  issue  Sept-Oct  2009 পুরনো সংখ্যা
দি লায়ন ইজ গন Download PDF version
 

নিয়মিত কলাম

 

ওয়াশিংটনের জানালা

দি লায়ন ইজ গন

ওয়াহেদ হোসেনী

       সকাল বেলা গিন্নীকে কাজে যেতে বিদায় জানিয়ে ঘরে ঢুকে টিভিটা ছেড়ে দিলাম। প্রথম খবর শুনেই থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। খবরটা যে একেবারে অপ্রত্যাশিত, তা নয়। তবু বাস্তবের সামনে দাড়িয়ে থ না হয়েই বা কি করি। জানালায় পাতলা ফিনফিনে পর্দা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি দূরে সকালের রাশ আওয়ারের গাড়ীগুলো সাসা করে ছুটে চলেছে ওয়াশিংটন শহরের দিকে। এতবড় একটা ঘটনাকে দাঁড়িয়ে দেখার মুহূর্তেরও সময় নেই কারোর। কতক্ষণ চুপ করেছিলাম বলতে পারি না- দশ মিনিট পনের মিনিট- তা হবে। টেলিফোন বেজে উঠতে টেলিভিশনের পর্দায় কলার আইডিতে দেখলাম কাজ থেকে গিন্নী ফোন করছেন। ফোনটা তুলতেই ওপাশ থেকে শোকাক্রান্ত কন্ঠে গিন্নী বলে উঠলেন, আসতে আসতে রেডিওতে শুনলাম দি লায়ন ইজ গন। ধীরে ধীরে বললাম, হ্যাঁ টেলিভিশনে দেখছি দি লায়ন ইজ গন।

     মুহূর্তের মধ্যে জানালা দিয়ে মন উড়ে গেল পৃথিবীর অপর প্রান্তে, প্রায় ৩৮ বছর আগে। সদ্য এক স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জন্ম হয়েছে- নাম বাংলাদেশ, রাজধানী ঢাকা। তেজগাঁ বিমান বন্দরের পূর্বপার্শে একতলা ভবনের ওপরে দাড়িয়ে বিমান যাত্রীদের ওঠা নামা দেখা যেত। ভিড়ের মধ্যে দাড়িয়ে আছি, পাশে ক্ষীণ দীর্ঘ এক শেতাংগ- ফক্স বাটার ফিল্ড। আমি তখন নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর হংকং করেসপন্ডেস ফক্স বাটার ফিল্ডকে সাহায্য করতাম। ভাংগা রানওয়ের মেরামত করা গর্তগুলোর চিহ্ন তখনো পরিস্কার দেখা যাচ্ছিল। কোলকাতা থেকে একটা চার্টার্ড করা ছোট ডাকোটা বিমান এসে নামলো। কম বেশী আধমাইল দূর থেকে চেহারা স্পষ্ট না হলেও দেখলাম এক শ্বেতাংগ যুবক হ্যাঁ যুবকই বলি প্লেনের ছোট দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসলেন- সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী। মনে করতে পারেন মাথা নিচু করে সালাম জানালেন নবীন সার্বভৌম এই দেশকে। আততায়ীর হাতে নিহত তার দুই ভাইয়ের সুবাদে নামটা জানা ছিল। ভক্তি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জন্মালো যখন শুনতাম পূর্ব পাকিস্তানে বেসুমার গণহত্যার কঠোর সমালোচনা করে নিক্সন প্রশাসনকে ভীষণ বেকায়দায় ফেলছেন যারা তাদের একজন হলেন সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আগষ্ট মাসে তাঁর নিয়মিত ও অতিজনপ্রিয় অনুষ্ঠান চরমপত্র-এ এম আর আখতার মুকুল বলেন,

আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তুফান ফাটাফাটি কারবার চলতাছে। সেনেটর এডওর্য়াড কেনেডী,

সেনেটর গ্যালাঘার মিল্লা নিক্সন সরকারকে অক্করে হোতাইয়া ফেলাইছে

     ঢাকা বিমান বন্দরে তাঁকে দূর থেকে প্রথম দেখা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যে বক্তৃতা দেন, সেখানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়নি। তখনকার এক ঢাকাইয়া হিসাবে তার উচ্চারিত শব্দগুলো ভুলে যাই কি করে? কেনেডী বলেন, আমেরিকা স্বাধীন হওয়ার সময় আমেরিকা-বিরোধীরা বলতেন, স্বাধীন হওয়ার পরপরই আমেরিকা ধ্বসে পড়বে। হয়েছে ঠিক তার উল্টো। আমি বলতে পারি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই হবে। এখনও যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি বটে, তবে যুক্তরাষ্টের জনগণ স্বীকৃতি দিয়েছে সত্যি কথা বলতে কি ৭১-র আগষ্ট মাসে ভারতে বাঙালী উদ্বাস্তু ছাউনি দেখে গিয়ে এডওয়ার্ড কেনেডী সেনেটে জুডিশিয়াল কমিটিকে যে রিপোর্ট দেন তারপর থেকেই আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমগুলো এবং জনমত স্বাধীন বাংলাদেশ সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠে। মানবকল্যাণমূলক ও রাজনৈতিক সমর্থক এগিয়ে আসে। পাকিস্তানকে গোপনে সমর্থন করতে থাকলেও, সরকারীভাবে প্রকাশ্যে সামরিক সাহায্য বন্ধ করতে নিক্সন প্রশাসন বাধ্য হয়। বাংলাদেশ সংগ্রামকে এত জোরদার সমর্থনের কারণে তিনি দেশে একটিও বেশী ভোট পাননি। পাওয়ার কথাও নয়। তবে দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে মানুষের দুঃখে তার ভেতরের যাতনা।

     ধর্নাঢ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি ছিলেন ব্লু  কলারের মানুষদের একেবারে একান্ত। পিতমাতা ধরেই রেখেছিলেন, টেড কিছুই করতে পারবে না। তাদের ধারনা ছিল জৈষ্ঠ পুত্র যোসেফই হবেন পরিবারের ধ্বজাধারী। তিনি নিহত হন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে। দ্বিতীয় জন কেনেডী জনপ্রিয় হলেও প্রেসিডেন্সীর মাত্র দু বছরের মাথায় নিহত হন। তৃতীয় জন ববি কেনেডী- প্রসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য প্রচারণা চালাতে চালাতে প্রাণ দেন আততায়ীর গুলিতে। অপ্রত্যাশিত হলেও পরিবারের সমস্ত ভার এসে পড়ে তার মাথায়। জন কেনেডীর প্রেসিডেন্ট পদের প্রচারনার সময় দেশের পশ্চিমাঞ্চলে তিনি ছিলেন ক্যাম্পেন ম্যানেজার। মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখান, তা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ক্যাম্পেন চালাতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন তৃণমূল জনগণের শক্তি। সম্ভবত সেই কারণে তিনি কোন দিনই সরে যাননি তৃণমূল থেকে। কোন অজানা বৃদ্ধ তার সোসিয়েল সিকিউরিটি চেক পায়নি সে গেছে টেড কেনেডীর কাছে, কোন মা যুদ্ধে যাওয়া তার সন্তানের খবর পাচ্ছেনা, গেল সে কেনেডীর কাছে। বিফল মনোরথ হয়ে কেউ ফেরেনি। নাইন ইলেভেনের মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত ম্যাসাচুটেস-এর ১৬১ জনের প্রতিটি ব্যাক্তির পরিবার পেয়েছে তারঁ ব্যক্তিগত ফোন কল, সান্তনা ও সাহায্য। মানুষের কষ্টে কেনেডীর অন্তর কেঁদে উঠতো, তাই হেলথ রির্ফম ছিল তার জীবনের সর্ব প্রধান আকাংখা। এই বিল পাশ হতে দেখে না গেলেও তিনি যে জোয়ারের সৃষ্টি করে যান তাতে একেবারে বিফল হওয়ারও কথা নয়।

     টেড কেনেডী হাসতে পারতেন, হাসাতে পারতেন, তা বলে এ কথা বলা যায় না যে তিনি ছিলেন সদা সুখী। পারিবারিক জীবনে একের পর এক আঘাত এসেছে। কখনো বৈমানিক জৈষ্ঠ ভ্রাতা প্রাণ হারান যুদ্ধে, কখনো প্রেসিডেন্ট ভ্রাতা নিহত হন আততায়ীর গুলিতে, কখনো প্রেসিডেন্ট পদপার্থী ভ্রাতার প্রাণ যায় আর এক আততায়ীর গুলেতে। দুই পুত্রের মারাত্মক রোগকে ঘুরিয়ে দেন। তার নারী প্রিতী প্রথম স্ত্রীকে করে তোলে মদ্যপ, পরে ঘটে বিবাহ বিচ্ছেদ।

     ভাই ববী কেনেডীর সৎকারের সময় ভাই সম্পর্কে যে সব গুনের কথা বলেন, পরে তার নিজের জীবনে সেগুলো হয়ে ওঠে মূলমন্ত্র। টেড বলেন, তিনি (ববী) যেখানেই কোন ভুল দেখতেন তা শোধরাতে লেগে যেতেন, তিনি যখনই কোন যুদ্ধ দেখতেন তখনই তা থামানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। তিরিশ বছর বয়সে সেনেটর নির্বাচিত হয়ে সাতাত্তর বছর বয়সে তিরোধান পর্যন্ত ৪৭ বছর টেড নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন মানুষের উপকারে- কখনো ইমিগ্রান্টদের উপকারে, কখনো শিক্ষা প্রসারে, কখনো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নে, কখনোবা বয়স্কদের উপকারে। কি করেননি তিনি। তার গর্জন সিংহের গর্জনের মত শোনাত- উপেক্ষা করার উপায় ছিল না। যারা তাকে ভালো করে চিনতো তারা টেড কেনেডীকে লাইওন অব দ্যা সেনেট বলে ডাকতো। নিজের দলের প্রতি শতকরা ১০০ ভাগ আনুগত্য রেখেও, অপর পক্ষের প্রতি হাত বাড়ানোর তার ক্ষমতা ছিলো অসীম। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে কেনেডীর পেশাগত জগতে চরম প্রতিদ্বন্ধী সেনেটর হ্যাম বলেন, রাজনীতিতে আমরা যেমন চরম প্রতিযোগী ছিলাম- তেমনি আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধন ছিল অবিশ্বাস্য শক্ত। তাই লোকে আমাদের বলতো অড কাপল। মৃত্যুর আগেই তিনি পরিকল্পনা করে যান তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন কে কে, কোন চার্চে তার উপাসনা হবে কোন পথ দিয়ে যাবে তার মৃতদেহের মোটরের বহর।

     এই বিরাট ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য পাই ১৯৮৮ সনে। সে মাসে শেখ হাসিনা আসেন আমেরিকা সফরে। না, তখনো শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হননি। তখনো তাঁর নামের আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী না বললে মারধর করতে আসা লোকজনদের ওয়াশিংটনে আর্বিভাব ঘটেনি। অতএব এসব অধমদের ওপর ভার পড়লো শেখ হাসিনাকে সেনেটর কেনেডীর সংগে দেখা করতে নিয়ে যাওয়ার। নিজের কানে শুনেছি সেনেটর টেড ছিলেন গণতন্ত্রের এক অতি শক্তিশালী রক্ষক (defender)

     গত প্রায় ৩০ বছর ধরে টেড কেনেডী ছিলেন ৮৫ জন পরিবারের সর্বজৈষ্ঠ পুরুষ। পরিবারে লেগেই আছে নানা অনুষ্ঠান, হয় কারো বিবাহ, কিংবা বিবাহ বার্ষিকী, কিংবা জন্মদিন কিংবা গ্রাজুয়েশন। আংকল টেডী না থাকলে কোন অনুষ্ঠানই হবে না। কলংকও তার জীবন থেকে বাদ যায়নি। নারী প্রীতি তার প্রথম বিবাহের বিচ্ছেদের কারণ। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে যাওয়া থেকে বঞ্চিত হন ঐ একই কারণে। তার দ্বিতীয় স্ত্রী ভিকি ১৭ বছর আগে তার জীবনে উদয় হয়ে কেনেডীর জীবন-মোড় ঘুরিয়েদেন। অনেকে বলেন, সেনেটে এই লাইওন গর্জনের উৎস ছিলেন ভিকি। টেড কেনেডীর রাজনৈতিক অগ্নিকে উসকে দেন তিনি তেমনি ব্রেন ক্যান্সার ধরা পড়ার পর ঘিরে রেখেছিলেন একাদিক্রমে পত্মীর মত, মাতার মত।

     চারদিন ধরে সারাক্ষণ টেলিভিশন দেখে দেখে আর কাগজ পড়ে পড়ে যখন মনে হয়েছে টেড কেনেডীর জীবনের জানতে আর কিছু বাকি নাই, তখনই উপলদ্ধি করেছি এই গভীর মহাপ্রাণ মানুষের কিছুই জানিনা। আর্লিংটন ন্যাশানাল সেমিটারীতে তার দুই ভাই ববী আর জনের পাশেই তার স্থান হয়। একবার তিন ভাই মিলে এই ন্যাশানাল সেমিটারী দেখতে গেলে জন বলেন, কি সুন্দর এই জায়গা। আমি সারা জীবন এখানে থাকতে পারি। ভাগ্যের কি পরিহাস, ঠিক ঐ জায়গাই দুই ভাইয়ের পাশে শুইয়ে দেওয়া হল তৃতীয়জনকে- এডওর্য়াড মুর কেনেডীকে। শনিবার দিন সন্ধ্যা- অন্ধকার ছেয়ে আসছে। ইফতার করতে করতে টেলিভিশন দেখছি ধীরে ধীরে টেড কেনেডীর কফিন নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল বিশ্বকবির তিরোধানে বিদ্রোহী কবির হৃদয় ভাংগা একটা গান- ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে ...।

হ্যাঁ, সারাজীবন ধরে লড়তে লড়তে শ্রান্ত ক্লান্ত লায়নকে ঘুমাতে দাও।

ElderHossaini@gmail.com

ওয়াশিংটন ডিসি

২রা সেপ্টেম্বর ২০০৯

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.