Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যা আশ্বিন ১৪১৬ •  9th  year  6th  issue  Sept-Oct  2009 পুরনো সংখ্যা
বাউল গানের ধারা ও কতিপয় বাউলকবি Download PDF version
 

বাউল গান ও সুফিবাদ

 

বাউল গানের ধারা ও কতিপয় বাউলকবি

 

তপন বাগচী

 

বাউল গানের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে সর্বাগ্রে মনে পড়ে মহাত্মা লালন ফকিরের (১৭৭২-১৮৯০) নামলালনের গানের সুর কানে এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একতারা হাতে গেরুয়া পোশাকধারী উদ্বাহু বাউলের মুখলালন আর বাউল যেন সমার্থকবাউল ও বাউল গান কেবল সঙ্গীতধারা নয়, বাউল এক লৌকিক সম্প্রদায়ের নামদার্শনিক অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬) বাউলদের উপাসক সম্প্রদায়হিসেবে চিহ্নিত করেছেনঅর্থাৎ বাউলদের গান কেবল বিনোদন নয়, উপাসনা তথা সাধনার অনিবার্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচ্যলালনের জন্মস্থান ও লীলাক্ষেত্র হিসেবে বৃহত্তর নদীয়ার কুষ্টিয়া অঞ্চল হয়ে উঠেছে বাউল-সাধনার কেন্দ্রস্থলবাউলরা সংসারত্যাগী সাধক ও শিল্পীগান গেয়ে মনের মানুষ-এর সন্ধান করে আর ভিক্ষালব্ধ শস্য ও অর্থে জীবনধারণ করেপরনে গেরুয়া কিংবা সাদা পোষাক, কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি, হাতে একতারাঅনেকে চুলদাড়ি রাখেনএই হচ্ছে বাউলদের বাহ্যিক রূপলোকসংস্কৃতিবিদ প্রফেসর আবুল আহসান চৌধুরী আজ থেকে ৩৪ বছর আগের এক ক্ষেত্র গবেষণায় কুষ্টিয়া অঞ্চলের লালন সাঁই, কাঙাল হরিনাথ (১৮৩৩-১৮৯৬), পাঁচু শাহ, গগন হরকরা (১৮৪০-১৯১০), ভোলাই শাহ, গঙ্গাধর ক্ষ্যাপা, গোসাঁই গোপাল (১৮৬৯-১৯১২), বেহাল শাহ, শীতল শাহ, কুধু শাহ, দুদ্দু শাহ (১৮৪১-১৯১১), মলম শাহ প্রমুখ ৫৫জন বাউলের পরিচয় ও সংগীত উদ্ধার করেছেন। (আবুল আহসান চৌধুরী, কুষ্টিয়ার বাউল সাধক, গণলোক প্রকাশনী, কুষ্টিয়া, ১৯৭৪)

এরপরে বাউল গান নিয়ে ব্যাপক পর্যায়ে কোনও ক্ষেত্র সমীক্ষা পরিচালিত হয়নিযেটুকু কাজ হয়েছে, তার বেশির ভাগই বৃহত্তর কুষ্টিয়া তথা নদীয়া অঞ্চলের বাউলদের নিয়েতবু বিচ্ছিন্ন অনেকের অভিজ্ঞতা, অনুসন্ধা ও গবেষণায় কুষ্টিয়ার বাইরের বিশাল বাংলা-অঞ্চলের বাউলদের কীর্তি ও অবদান উদ্ধারের প্রয়াস রয়েছেকুষ্টিয়া সন্নিহিত অঞ্চল বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে পাগলা কানাই (১৮২৪-১৮৮৯), পাঞ্জ শাহ (১৮৫১-১৯১৪), ইদু বিশ্বাস প্রমখ বাউল সাধক রয়েছেনকিন্তু কুষ্টিয়া-যশোর অঞ্চলের বাইরে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বাউল সাধকের জন্ম হয়েছে এবং তাঁরা অজস্র বাউল গান সৃষ্টি করেছেন

কুষ্টিয়ার পূর্বদিকের নিকট প্রতিবেশী ফরিদপুর অঞ্চল বাউলগানে সমৃদ্ধএখানে আছেন মেছের শাহ (১৮৪১-১৯১৬), মহিন শাহ (১৯০৩-১৯৯৭), চণ্ডী গোঁসাই, আবদুল হালিম বয়াতী (১৯২৯-২০০৫)-র মতো বাউল সাধকবৃহত্তর রাজশাহীর খেজমত শাহ; ময়মনসিংহের উকিল মুন্সি ও জালালউদ্দিন খাঁ (১৮৯৪-১৯৭২); ঢাকার কালু শাহ ফকির (১৮১০-১৯০৫), শানাল ফকির, আলেফচান দেওয়ান (১৮৩৯-১৯২৯), মালেক দেওয়ান (১৮৯৩-১৯৮৮) ও ভবা পাগলা; সিলেটের রাধরমণ দত্ত (১৮৩৩-১৯১৬), হাসন রাজা (১৮৫৪-১৯২২), শীতালং শাহ, শেখ ভানু, একলিমুর রাজা, শাহ আবদুল করিম (জ. ১৯১৬); কুমিল্লার মনোমোহন দত্ত (১৮৭৭-১৯০৯) প্রমুখ সংগীত সাধকের নাম উল্লেখ করা যায়মধ্যবঙ্গ তথা নদীয়া অঞ্চলের বাউলদের সঙ্গে এঁদের গানের বাণী ও সুরের কিছুটা পার্থক্য থাকলেও চেতনা-বিচারে এঁদেরকে বাউল হিসেবে গণ্য করা যায়

বাউল গানে আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, গৌরতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব প্রভৃতি প্রকরণ-বিভাজন রয়েছেএই তত্ত্বজ্ঞানের প্রকাশক সংগীতকেও বাউলগান বলা যেতে পারেকিন্তু ভাব গান, মুর্শিদগান, ফকিরগান ও বিচার গানেও তত্ত্বজ্ঞানের সন্ধা মেলেঅঞ্চ ভেদে ও আধ্যাত্মিক লক্ষ্যভেদে গানের ভাষা ও বাণীতে স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি হয়কিন্তু লালন-ঘরাণার সঙ্গে ভাবগত ও চেতনাগত সাজুয্য না থাকলে আমরা যেহেতু বাউল গান বলছি না, তাই বাউল গানের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করা যথেষ্ট দুরূহকারণ আমরা জানি যে, কুষ্টিয়াকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে বাউলগানের জন্ম ও বিকাশ হলেও পরে বিভিন্ন সাধকের প্রচেষ্টায় এক একটি ঘারাণা (school)-র মাধ্যমে যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও পশ্চিম সিলেটে এ গানের স্পর্শক সম্প্রসারণ ঘটে’ (হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত ও ভৌগোলিক পরিবেশ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮২, পৃ. ১৪৪) অর্থাৎ বিবরণশীল এই গান আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভৌগোলিক আধিপত্যকে মান্য করেও বাউল ধর্মের মূল সুরকে অধিকার করে বলেই বাউল গান হিসেবে বিবেচিত হয়সে ক্ষেত্রে বাউল গানের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য সনাক্ত করা আমার পক্ষে অন্ধকার ঘরে কালো বিড়াল খোঁজার মতো অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছেতবু ব্যক্তি মাত্রই যেমন স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সমবেত সৃষ্টি বাউলগানের মধ্যে তেমনি বৈচিত্র্য থাকাও অস্বাভাবিক নয়

বাউল গানের তত্ত্ববিচার পদ্ধতিই রাধারমণ দত্তের গানের বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়েছেসুনামগঞ্জ অঞ্চলে ধামাইল গানের স্রষ্টা হলেও বৈষ্ণব ঘরাণার কবি রাধারমণকে বাউল কবিনন বলে অভিমত ব্যক্ত করেন রাধারমণ-গবেষক নন্দলাল শর্মা ও মোহাম্মদ সুবাসউদ্দিনতবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ চৌধুরী, সুধীরচন্দ্র পাল, জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী, রসরাজ বৈদ্য, ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, আজিজুল হক চুন্নু প্রমখ গবেষক তাঁকে বাউলহিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। (মোহাম্মদ সুবাসউদ্দিন, বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত ও তাঁর ধামাইল গান, মৌলভীবাজার, ২০০২, পৃ. ৫৮) রাধারমণ তাঁর একাধিক গানেও নিজেকে বাউল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন -

দীনহীন বাউলে কয় কথা মিছে নয়

চন্দ্রবলীর কুঞ্জে তুমি গেছিলা নিশ্চয়

রাধারমণ বাউলে বলে আমার সবের আশা পূর্ণ হইল না\

 

কিংবা, অন্যত্র -

আর শাশুড়ি ননদী ঘরে ভয় বাসি মনে

ওরে কীসের মন আমার - যাইতাম গৌরার সনে\

রাধারমণ বাউলে বলে গুরুর চরণে

ওরে গুরুপদে প্রাণ সঁপিতাম এই বাসনা মনে\

রাধারমণ নিজেই যখন বাউলপরিচয় দিয়েছেন, তখন আমদের মেনে নিতে আপত্তি থাকে নাতবে একথা ঠিক যে, তাঁর গানে ও সুরে বৈষ্ণব ভাবধারা বেশি প্রকটিতঅক্ষয়কুমার দত্ত যে বাউলকে চৈতন্য সম্প্রদায়ের শাখাহিসেবে গণ্য করেছেন, রাধারমণের গান শুনলে তার প্রমাণ মেলেরাধারমণের অধিকাংশ গান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীচৈতন্যর প্রতি নিবেদিতলালনের গৌর প্রসঙ্গের গানের সঙ্গে এই গানগুলোর সুরের মিলও খুঁজে পাওয়া যায়অনেক গানে কীর্তনের সুরও প্রযুক্ত হয়েছেরাধার বিরহও রাধারমণের গানের মৌল বিষয়

হাসন রাজাকে বাউলবলা যায় কিনা, তা নিয়েও বিতর্ক ছিলতাঁর উত্তরপুরুষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তাঁকে চিশতিয়াতরিকার লোক বলে প্রচার করেছেনহাসন রাজাকে তিনি বাউলবলতে নারাজঅনেকেই তাঁকে বাউলনা বলে মরমী কবিমনে করেছেনকিন্তু ক্ষিতিমোহন সেন (১৮৮০-১৯৬০) তাঁকে বাউলকবি বলেছেনআর হাসন রাজা নিজেকে আউল’, ‘ঠাকুরবাউলবলে পরিচয় দিয়েছেন বিভিন্ন গানেযেমন -

বাউলা কে বানাইল রে

হাসন রাজারে!

 

কিংবা

পিরীতের মানুষ যারা, আউলা-বাউলা হয় রে তারা

হাসন রাজায় পিরীত কইরা, হইয়াছে বুদ্ধিহারা\

প্রথম জীবনে জমিদারি ও ভোগবিলাসে মত্ত থাকলেও হাসন রাজা শেষ দিকে সংসার বৈরাগ্য অনুভব করেফলে এই সময়ে রচিত তাঁর গানে বাউলভাব তীব্রভাবে ফুটে উঠেছেযে সকল গানে তাঁর আত্মনিবেদন প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলোই বেশি করে বাউলপ্রভাবিতরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গ্রাম্য কবির গানে দর্শনের একটি বড় তত্ত্বখুঁজে পেয়ছিলেনসেই দর্শনটি হল, ‘ব্যক্তি-স্বরূপের সহিত সম্বন্ধ-সূত্রেই বিশ্বসত্যহাসনের গানের বাণী থেকে আরো মরমী দর্শনের সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়

জীবিত বাউলকবিদের মধ্যে শাহ আবদুল করিমের নাম সর্বাগ্রে উচ্চার্যবাউল গানে অবদানের কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদক একুশে পদক’-এ ভূষিত হয়েছেনসুনামগঞ্জের কৃতী সন্তান শাহ করিমের গান আজকে দেশে-বিদেশে গীত ও প্রচারিততিনি কেবল সাধকবাউল নন, একই সঙ্গে গৃহী ও সামাজিক দায় পালনে অঙ্গীকারবদ্ধবাউলগানের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সুরকে ব্যবহার করে তিনি গেযে ওঠেন -

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম

গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু মুসলমান

মিলিয়া বাউলা গান, ঘাটু গান গাইতাম

বাউল গান গাওয়ার প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি রচনা করেছে বাউল গানবাউল গানের যে লোকজ জীবনের অনুষঙ্গ এবং গ্রামীণ জীবনে উচ্চারিত শব্দের প্রয়োগ থাকে, শাহ করিম তা থেকে বেরিয়ে এলেনসমকালীন শব্দ, এমনকি বিদেশ শব্দ ব্যবহার করে তিনি বাউল গানে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেনআমরা এই মুহূর্তে অকালপ্রয়াত শিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর কণ্ঠে গীত শাহ করিমের গান গাড়ি চলে না’-র কথা স্মরণ করতে পারিতাতে ড্রাইভার, ইঞ্জিন, ট্যাংকি প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছেশাহ করিম গেয়েছেন -

আমি তোমার কলের গাড়ি, তুমি হও ড্রাইভার

তোমার ইচ্ছায় চলে গাড়ি, দোষ কেন পড়ে আমার\’

শাহ আবদুল করিম যে বাউল গানের প্রচলিত ধারা থেকে বৈচিত্র্যের সন্ধান করেছেন, তা তার শব্দ ব্যবহার ও বিষয় নির্বাচন থেকেই ধারণা করা যায়কেবল বাউল কবি নয় তাঁকে প্রতিবাদী সাধক কবিহিসেবে চিহ্নি করা যায়। (তপন বাগচী, শাহ আবদুল করিম প্রতিবাদী সাধক কবি, উদ্ধৃতি : সুমনকমার দাশ সম্পাদিত, শাহ আবদুল করিম, উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২য় সংস্করণ. পৃ. ৮৩)

ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় আলেফচান দেওয়ানের জন্ম ও সাধনক্ষেত্রতিনি মরমী ও মুর্শিদ গানের সাধক শিল্পী হিসেবে পরিচিত হলেও বাউল গানে তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছেগানের ভনিতায় তিনি নিজেকে দয়াল’, ‘দরবেশ’, ‘পাগল’, ‘দেওয়ান’, ‘গোসাঁই’, ‘ফকিরপ্রভৃতি রূপে পরিচিত করিয়েছেনলালনের গানের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমে কোনো কোনো গবেষক কুষ্টিয়া অঞ্চলের দুদ্দু শাহ, পাঁচু শাহ, গোপাল শাহের গান লালনের নামে যুক্ত করেছেনআবার কেউ ঢাকা অঞ্চলের আলেফচাঁদ দেওয়ান, কালু শাহ ফকিরের গানও যুক্ত করেছেনড. এস এম লুৎফর রহমানের লালন শাহ : জীবন ও গানগ্রন্থে আলেফচানের ৩টি গান লালনের নামে চালিয়েছেনএই প্রসঙ্গটি উত্থাপন করছি এ কারণে যে, আলেফচানের গানের সঙ্গে লালনের গানের ভাব, ভাষা ও বাণীর সাজুয্য এত নিবিড়ি যে, আলাদা বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েকিন্তু সকল গানের ক্ষেত্রে এই উক্তি সত্য নয়আলেফচানের গান বাউল ঘরানার হয়েও মুর্শিদ ও ফকির প্রভাব প্রবলভাবে অঙ্গীকার করেছেতিনি পরের মুরিদ হয়ে চিশতিয়া তরিকার ছবক নিয়েছিলেনশেষ জীবনে তিনি নকশাবন্দিয়া তরিকারও দ্বারস্থ হনকিন্তু তাঁর মুরিদ হিসেবে অমুসলিম, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়েরও মানুষ ছিলেনতিনি গেয়েছেন -

রসিকজনায় ধরে পাড়ি

এটে বান্ধে বৈঠার দড়ি

শ্রীগুরু কইরে কাণ্ডারি

সদানন্দে যায় ও-পার

আলেফচান কয় যাইতে পারে

গুরুর কৃপা হইলে পারে

সমূলে হবি সংসার

এই গানের বাণীতে বাউল ব রয়েছেকিন্তু কেরানিগঞ্জ এলাকায় তাঁর আখড়ার শিল্পীরা একে মুর্শিদ গানর সুরে পরিবেশন করেআলেপচানের সংগীত ও আধ্যাত্মসাধনার উত্তারিধার বহন করছেন তাঁর পুত্র মালেক দেওয়ান, প্রপৌত্র আরিফ দেওয়ান, শকির দেওয়ান, আজাদ দেওয়ান ও উত্তম দেওয়ানমুর্শিদ ও ফকির ধারার বাউল গানের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র দেওয়ানিধারা এরা সৃষ্টি করে চলছেন

মানিকগঞ্জের ভবাপাগলার বাউলগান দুই বংলায় স্বীকৃততাঁর অজস্র ভক্ত-অনুসারী এই গান পরিবেশন করে থাকেভবাপাগলা রাধাকৃষ্ণ ও চৈতন্য বন্দনা জাতীয় কিছু পদ রচনা করলেও তাঁর শিষ্যদের উপদেশ দিতে গিয়েই বেশিরভাগ গান রচনা করেছেনতিনি নিজেও গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন এবং নিজেও দীক্ষা দিতেনএই চিন্তা থেকে তিনি বাউল ধর্মের অনুসারী ননকিন্তু আধ্যত্ম্য ও দেহাত্মবাদী গানগুলো বিবেচনা করলেও তাঁকেও বাউল না বলে উপায় থাকে নাতিনি জন্মান্তরে বিশ্বাস করতেন এবং নিজেকে নাটোরের রাজা রামকৃষ্ণ, মেহেরপুরের সর্বানন্দ অধিকারী, পাবনার রাজকৃষ্ট সা, কুমিল্লার মনোমোহন দত্ত ও আফতাবউদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে মনে করতেন। (গোপিকারঞ্জন চক্রবর্তী, ভবাভাগলার ভাবদর্শন, উৎপল বিশ্বাস সম্পাদিত, গণমুক্তি, ঢাকা, মার্চ ২০০৮, পৃ. ১২২)

ফরিদপুরের মেছের শাহ বাউলকবি হিসেবে সম্মানিতলালনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিলফরিদপুরের নগরকান্দা থানার রসুলপুরে মেছের শাহের লীলাক্ষেত্রে লালন সাঁই একাধিকবার এসেছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছেমেছের শাহ পাঞ্জ শাহেরও ঘনিষ্ঠ ছিলেনমেছের শাহ একই সঙ্গে তত্ত্বজ্ঞ, পদকর্তা, সুরস্রষ্টা এবং গায়কনিজে পর হিসেবে অসংখ্য মুরিদ সৃষ্টি করলেও সঙ্গীতে তিনি অসাম্প্রদায়িক বাণী প্রচার করেছেনরাধাকৃষ্ণ কিংবা দশভুজা দেবী দুর্গাকে নিয়েও তিনি রচনা করেছেন বাউলসুরের গান -

জন্মকথা প্রকাশ করি শোন গো জননী

ছেড়ে দাও হস্তের বন্ধন

আর আমি খাব না ননী

 

বটবৃক্ষে ছিলাম যখন কৃষ্ণ নাম ছিল তখন

কূলে পতিত হয়ে সেই অক্ষয় পত্র ধরি

আসিয়া কুলে দেখি নয়ন মেলে

দশভুজ এক নারী

প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের আচরণের বিরোধিতা মেছের শাহের গানেও পাওয়া যায়হারাম-হালাল খাবার নিয়ে যে জাতিভেদ তার ঊর্ধ্বে গিয়ে মেছের শাহ বলতে পারেন -

একমাস কেন হিন্দু মুসলমানে

বিভাগ করে লও দুইজনে

মুসলমানে রান্ধে যুদ অতি যতনে

হিন্ধু শুদ্ধায় তা না লয় খেতে

হিন্দুতে রান্ধলে তা করে যতনে

মুসলমানের শুদ্ধায় তা না লয় কখন,

যায় যা ধর্মে মানে খেতে পারে তাই

খাদ্য মধ্যে কোনো বস্তু হারাম বলতে নাই

বাউল হতে পেরেছেন বলেই এরকম প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ বাণী প্রচার করতে পেরেছেনতবে কুষ্টিয়ার সন্নিহিত অঞ্চল হওয়ায় তাঁর গানে সুরের সাজুয্য বিদ্যমান

গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া থানার ডোহোতলী গ্রামের চণ্ডী গোঁসাই বাউলকবি এবং আধ্যাত্মিক সাধকতাঁর কাছে থেকে দীক্ষা নিয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন যশোর, খুলনা, বরিশাল ও ফরিদপুরের অসংখ্য মানুষচণ্ডী গোসাঁইয়ের একটি অসাধারণ গানে আমরা পাই -

ও তুই ব্রহ্মেতে চড়বি যখন

দেখবি বেদ-বিধি সব ঘোলের মতন

তন্ত্র মন্ত্র সব খসবে তখন

গোসাঁই চণ্ডী বলে জন্ম-মৃত্যু

আর তোর হবে না কখন

এখানে ব্রহ্মে চড়া বলতে মোক্ষ লাভের কথা বলা হয়েছেসেই অবস্থায় শাস্ত্রগ্রন্থ বেদকে ঘোলের মতো তুচ্ছ এবং তন্ত্রমন্ত্রকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়েছেএ ধরণের তুলনা বা উপমার মাধ্যমে কবি মোক্ষধামের চিত্র অঙ্কন করেছেনআবার গূঢ়ার্থে রতিক্রিয়ার চূড়ান্ত সুখানুভূতির চিত্রকল্প হিসেবেও এভাবে বিবেচনা করা যায়নিজে সনাতনধর্মের একজন সাধক ও মন্ত্রগুরু হয়েও তিনি বেদ-বিধির সমালোচনা করার সাহস দেখিয়েছেন নিজস্ব সাধনসিদ্ধি ও আত্মার উন্নতির জোরেদেহতাত্ত্বিক সাধনার কথাও রয়েছে চণ্ডী গোসাঁইয়ের গানে -

কী করে পার হবি ত্রিবীণায়

কপ সাধু যারা

যাচ্ছে মারা

ত্রিধারা ত্রিমোনায়

ত্রিবেণী হয় ত্রিগুণে

তিনশক্তি রয় সেখানে

জীবের মুক্তির কারণে

যোগের দিনে হয় উদয়

লালনের গানের সঙ্গে এই গানের রূপক ও ভাবের যথেষ্ট মিল রয়েছেবাউল দর্শনের প্রভাব থাকার কারণে লালন সাঁই আর চণ্ডী গোসাঁইয়ের সুরের সাযুজ্য টের পাওয়া যায়গোপালগঞ্জের মাইচকান্দি গ্রামের ফটিক গোসাঁইয়ের বাউল গানেও একই সুর পরিলক্ষিত হয়যে চেনে সে ত্রিবেণীর ধার/ প্রেমানন্দে দিচ্ছে সাঁতার/ তার বিপদে ভয় কি আছে!বলে কবি ফটিক গোসাঁই তাঁর অনুসারীদের সান্ত্বনা দিচ্ছেনতিনি বলেন -

ফটিক বলে রসিক যারা

ভাব জেনে ঝাঁপ দিচ্ছে তারা

বিপদ নাই তার কাছে,

ও সে স্বরূপেতে রূপ মিশায়ে

মনের মানুষ বলে কাঁদতেছে

লালনের গানের মনের মানুষফটিক গোসাঁইয়ের গানেও প্রতিভাত হয়েছেএই ধরণের বাউলদের মধ্যে ফরিদপুরের মহিন শাহ, সতীশ গোসাঁই, মাদারীপুরের আবদুল হালিম বয়াতী প্রমখের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চার্যবাউলগানের পদকর্তা হিসেবে কবি জসীমউদ্দীনের নামও স্মরণ করা যেতে পারেতাঁর বেশকিছু গানই সুরে ও ভাবে বাউল-প্রভাবিততবে মহিন শাহের গান লালন-পরবর্তী বাউল গানের মধ্যে বিশেষ মর্যদায় উল্লেখের দাবিদারতাঁর একটি গান -

রূপের খাঁচায় সোনার পাখি

আসে আর যায়\

চোখ বুঁজিলে সকল মিথ্যে

দিন-দুনিয়া আঁধার হয়

শিকল কাটা অচিন পাখি

ঘুরে ফিরে খাঁচায় থাকি

ফাঁক পাইলে দেয় গো ফাঁকি

র ছাড়িয়া মন পালায়\

কেবল বাণী শুনেও আঁচ করা যায় যে এটি বাউল আঙ্গিকের গানবিষয় ও সুরে তাঁর গান বাউলধারা থেকে বাইরের নয়বাউল ধারার মধ্য থেকেই ভাষা ও উপস্থাপনার ক্ষেত্রে তাঁর মৌলিকত্ব চিহ্নিতমহিন শাহ সাধক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেনবাউল গানের রচয়িতা হিসেবে তাঁর অবদান সম্পর্কে ড. আবুল আহসান চৌধুরী বলেছেন, বহুল উচ্চারিত তত্ত্বকথা ও সীমাবদ্ধ বিষয়-ভাবনার অনুবর্তন সত্ত্বেও শিল্প-শক্তি ও আধ্যাত্ম-মেধার সমন্বয়ে কেউ কেউ বাউলগানকে তত্ত্বকথার ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে মুক্তি দিয়ে সর্বজনের রসগ্রাহ্য করে তুলেছেনলালন ফকির নিঃসন্দেহে এ-বিষয়ে শ্রেষ্ঠ নিদর্শনএই ব্যতিক্রমী ধারায় সাধন-শিল্পবাণী রচয়িতা হিসেবে মহিন শাহও বাউল গানের ভাবমণ্ডলে একটি নতুন মাত্র যোগ করতে সক্ষম হয়েছে। (আবুল আহসান চৌধুরী, লোকসংস্কৃতি-বিবেচনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃ. ১০২) তবে ফরিদপুর অঞ্চলে বাউল গানে বিচার গান ও ভাব গানের প্রভাব আবিষ্কার করা যায়

ব্রহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের সাধক কবি মনোমোহন দত্ত আধ্যাত্ম সাধনার পাশাপশি সঙ্গীতসাধনাও করেছেনতাঁর রচিত সঙ্গীত মলয়ানামে দুখণ্ডে গ্রন্থিতজাতি-ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে তার সাধনসঙ্গীত গ্রহণীয় হয়ে উঠেছিল উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণেইসনাতন ও ইসলাম ধর্মের চরিত্রগুলোকে তিনি সমান মর্যদায় প্রতিষ্ঠিত করে উভয় ধর্মের সাম্য কামনা করেছেনতিনি গেয়েছেন -

খেদে খোদে আল্লাহ দোস্ত মোহাম্মদ

অজুদে মজুদ সাঁই, দমে কেয়ামত

....

লা মরিক, লা মৌজুদ আল্লা, পতে মারফত

মনোমোহন পেরেশান, খুঁজে হিন্দু-মুসলমান

করিম কৃষ্ণ রহিম রাম, শিব হযরত

এভাবে বাউল গান ধর্ম-সাধনার অঙ্গ হয়েও সম্প্রদায়নিরপেক্ষ স্বতন্ত্র ধর্ম হয়ে ওঠেবাউল গান এভাবেই হয়েছে সর্বজনগ্রাহ্য, লোকায়ত এবং কালিক বিচারে চিরায়ত

 

ঢাকা থেকে।

 

: তপন বাগচী: কবি, গবেষক ও ফোকলোরবিদএকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তা বিভাগে কর্মরতফোন ০১৭১৩০৬৭৯০৯মেইল : drbagchipoetry@gmail.com

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.