|
অতিথি সম্পাদকদের কথা ...
সাহিত্যের হাস্যরস জীবনেরই রসধারা
সাহিত্য
তো মানুষের জীবন নিয়েই। মানুষের জীবনেরই প্রতিফলন। হাসি-তামাসা, হাস্য রস এসব
মানুষের জীবনেরই অংশ। রম্যরচনা দেখলেই আমাদের চোখ ঐ দিকে ধাবিত হয় কেন? কারণ, আমরা হাসতে চাই, আনন্দ পেতে চাই। আমরা সৈয়দ মুজতবা আলী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার রায় ও শিবরাম চক্রবর্তী পড়ে এতো
আনন্দ পাই কেন? কারণ, তা হাস্য রসে ভরা। শরীরের
জন্য যেমন সুস্বাদু খাবার দরকার, মনের
আনন্দের জন্য তেমনি হাসি তামাসা কৌতুক দরকার। সেই প্রয়োজনেই অন্য সকল সাহিত্যের মত বাংলা সাহিত্যও হাস্যরসে সমৃদ্ধ।
শুধু সাহিত্যে নয়, দৈনন্দিন জীবনে এই
হাস্যরস কৌতুক আমরা দেখতে পাই এবং তা উপভোগ
করি।
‘আলাপচারি রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে শ্রীরানী চন্দ লিখেন, গুরুদেব মুখে
বলে যান, লিখে নিই যা উনি লেখাতে চান, কিন্তু বানান সম্বন্ধে বড়ো ভয়ে ভয়ে থাকি।
আবার ভয়ে ভয়ে থাকি বলেই বানান ভুল করে বসি। পদ্মাপারের মেয়ে বলেই বিশেষ সাবধান হতে
গিয়ে অনবরত ‘র’ ‘ড়’ নিয়ে বেঘোরে পড়ি আর অনবরতই গুরুদেব হেসে তা সংশোধন করেন। না হয় হল। কয়দিন
থেকে শূন্য লিখতে গিয়ে ‘ন’র জায়গায় ‘ণ’ লিখে
বসি। গুরুদেব দেখে দেখে আজকে বোধ হয় আর পারলেন না। ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ণ’র মাথাটা চেপে ধরে হাসিমাখা চোখে কৌতুক ভরে
বলে ওঠলেন: ‘একে তো শূন্য, তার আবার অত মাথা উঁচু করা কেন?
রোজই প্রায় বানান নিয়ে একটা না একটা ঠাট্টা কৌতুক করেনই, আর আমিও সাবধান হতে গিয়ে আরো ভুল করে ফেলি। তাই গুরুদেব
আবার অভয়ও দেন, বলেন:
বানানে আবার ঠিক ভুল কি? বানান মানেই হচ্ছে - যা বানানো, লিখে যা সাহস করে। বানান ভুলের জন্য ভয় পাস নে, ‘স’ কি ‘শ’, এ কেবল ঠিক থাকে একটা বিশেষ গালাগালির সময়ই।
বাঙলা সাহিত্যে হাসির গল্প আছে প্রচুর, তাছাড়া হাসির নাটক,
হাসির গান, চলচ্চিত্রে হাসি- এ সবই মানুষের জীবনের ছবি
- জীবন মানেই - হাসি
আনন্দ - ব্যথা বেদনা কান্না - দুঃখ - আর পরিশেষে মৃত্যু। আমরা এই হাসির
খোরাক শুধু সাহিত্যিকদের কাছে যে পাই তা নয়। আমাদের এক বন্ধুর ছোট ছেলে - তার সাথীদের সাথে খেলছে - আর খুব
মজা করে তার বন্ধুদের বলছে, “জানো আমার আম্মু হাসপাতালে - আম্মুর
একটা বেবী হয়েছে”। তার এক বন্ধু বলছে, ‘তাই নাকি? কেমন করে হলো বেবীটা?’ তখন বন্ধুর ছেলেটি বলছে, ‘ওমা তাও জাননা। আম্মুদের পেটে সব সময় একটা
বেবী লুকিয়ে থাকে - হাসপাতালে গেলেই বেবীটা বের হয়ে আসে”।
দূর থেকে আমরা এই নিস্পাপ শিশুদের কথোপকথন শুনে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিলাম।
একবার আমরা এক বন্ধুর বাসায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শুনতে গিয়েছি।
খুব বড় মাপের একজন ওস্তাদ এসেছেন। উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের খুব ভক্ত এক ভদ্রলোক তার - ৮/৯ বছরের এক ছেলেকে নিয়েই এসেছেন, কারণ কোথাও
রাখার ব্যবস্থা করতে পারেননি। যাহোক, তিনি
ছেলেকে পেছনে এক
জায়গায় বসিয়ে গান শুনছেন। ওস্তাদজী তখন ‘মেঘ’ রাগে, আলাপ বন্দি শেষ করে তানে ঢুকেছেন - তারপরই গমক দিচ্ছিলেন আর তার বিচিত্র রকমের অঙ্গভঙ্গি দেখে ভদ্রলোকের ছেলেটি বিস্ময়ে
তাকিয়ে দেখছিল। বাবা পিছিয়ে ছেলের কাছে এসে বুঝতে চাইলেন সে ঠিক আছে কিনা। তখন ছেলেটি বলছে ‘Dad, what is that man doing, is he in pain?’
আমি বলছি দৈনন্দিন জীবন যাত্রায় হাস্যরস, কৌতুক
আমাদেরকে কেমন করে আনন্দ দেয়। যেমন একবার
এক বন্ধুর বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়েছি নিউ ইয়র্ক শহরে। সেখানে এ অঞ্চলের কৌতুকের সেরা ব্যক্তি নাসিরুদ্দিন পল এসে
উপস্থিত। আর যায় কোথায়? সব ভাবীরা
ঘেরাও করে ফেললেন তাকে - কৌতুক বলতে হবে। পল ভাই, বিষ্ময়ের
সাথে সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভাবীরা - দেখেন আপনারা আমাদেরকে কি করলেন!
আসার সময় রাস্তায় দেখলাম এক দাড়িওয়ালা - আরেক
দাড়িওয়ালাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে”; হাসি থামার আগেই তিনি আরেকটা যোগ করলেন, “এক লোকের দাঁতে ব্যথা - ডেন্টিস্ট এর কাছে গিয়েছেন।
ভদ্রলোকের একটি মুদ্রাদোষ আছে - কথায়
কথায় তিনি ‘আপনার’ বলেন।”
ডাক্তার জিজ্ঞেস করছেন, কখন থেকে ব্যথা শুরু হয়েছে?
তিনি বল্লেন, এই ধরেন ‘আপনার’ আজকে সকাল থাইকা।
ডাক্তার - তাহলে
কালকে কি খেলেন, কি করলেন বলেন।
লোকটি - দুপুরে
রুটি খাইলাম ‘আপনার’ কলিজা দিয়া, রাতে ভাত খাইলাম ‘আপনার’ মাংস দিয়া, তারপর ‘আপনার’ দাঁত ব্রাশ করলাম রাত ১১টার দিকে, তারপর ‘আপনার’ বিবির সাথে ঘুমাইতে গেলাম, ভোর রাতে ‘আপনার’ দাঁতের ব্যথায় জাইগা ওঠলাম।
সাহিত্যে অনেকের রচনাবলী যেমন পাঠককূলকে আকৃষ্ট করে রাখে, তেমনি অনেকের দৈনন্দিন কথা ও কৌতুকও আমাদেরকে আনন্দ দেয়। এ
সংখ্যাকে তাই আমরা তার কিছু উদাহরণ দিয়ে
হাস্যরসাত্মক করার প্রয়াস নিয়েছি।
‘পড়শী’ এর আগেও দু’টি সংখ্যায় হাস্যরসকে উপজীব্য করে ‘মূল রচনাবলী’ করেছিল। তখন অবশ্য ‘পড়শী’
হার্ড কপি বা মুদ্রিত হয়ে বেরোত। শুধুমাত্র ‘অন-লাইন’ হিসেবে এটিই প্রথম তেমন একটি
সংখ্যা। ‘পড়শী’র সম্পাদকেরা মনে করেন উপর্যুপরি সিরিয়াস বিষয় নিয়ে ‘পড়শী’
বেরোতে থাকলে দেশ-বিদেশের পাঠক-পাঠিকাদের কাছে তা বড়ই নিরস, কাঠকোট্টা একটি পত্রিকা
হিসেবে দুর্নাম কুড়োতে থাকবে। আর তাই মাঝে মাঝেই হালকা বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করে
পড়শী তার সংখ্যাটিকে সাজাবার প্রয়াস পায়। বলাবাহুল্য, এতে করে ‘পড়শী’
প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষতঃ আগের দু’টি
মুদ্রিত ‘পড়শী’ সংখ্যা এখনো অনেকের বাসায় ড্রইংরুমে সুসজ্জিতভাবে
সংরক্ষিত থাকতে দেখেছি। বর্তমান সংখ্যার সম্পাদক হিসাবে আমাদের বরাতে অবশ্য সেই
সৌভাগ্য নেই, কারণ এ সংখ্যাটি তো আর ‘মুদ্রিত’ হয়ে বেরোচ্ছে না যে তাকে
সংরক্ষণ করে রাখার মত ব্যাপার ঘটবে। তবুও, আমরা আশা করি পাঠক-পাঠিকারা এই
সংখ্যাটিকে সমান ভালবাসায় আদৃত করবেন। আর সেজন্য এ সংখ্যাটিকে আমরা একটু হলেও
অন্যরকম করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সান্তনা, আগের সংখ্যাগুলোর ব্যাপারে আপনাদের
মতামত সরাসরি জানাতে না পারলেও, এই ‘অন-লাইন’ সংখ্যায় ‘কমেন্ট’
সেকশানে গিয়ে সহজেই আপনার মতামত জানাতে পারবেন। সেসব মতামতেও হয়তো কিছু কিছু
হাস্যরসের ব্যাপার থাকবে - এই আশাটুকুও আমাদের থাকলো।
- দলিলুর রহমান ও ইউনুস রাহী
|