Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  মূল রচনাবলীঃ  ||  ৯ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা শ্রাবন ১৪১৬ •  9th  year  4th  issue  Jul-Aug  2009 পুরনো সংখ্যা
বাঙ্গালির প্রবাসন ও অর্থবহ প্রত্যাবর্তন Download PDF version
 

বাংলাদেশে প্রবাসী বিনিয়োগ

বাঙ্গালির প্রবাসন ও অর্থবহ প্রত্যাবর্তন

রফিক আনোয়ার

বাংলাদেশের মানুষ জীবিকার জন্য কবে থেকে বহির্গমন শুরু করেছিল এ কথা সন তারিখ উল্লেখ করে বলা সম্ভব না হলেও বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষের এ অঞ্চলের লোকজন উনবিংশ শতাব্দির প্রথম থেকেই জীবিকার সন্ধানে বিদেশ গমন শুরু করেছিল একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তাদের এ যাত্রা বেশীর ভাগ সমদ্র পথে জাহাজ যোগে শুরু হতো বিধায় বহির্গামীরা জাহাজের চাকরী নিয়ে স্বদেশের মাটি ত্যাগ করত। পশ্চিমে তখন শিল্প বিপ্লবের চড়ান্ত পর্যায়, সুতরাং নাবিক হয়ে যারা ইউরোপ বা আমেরিকার বন্দরে পৌঁছাতো, তাদের এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক জাহাজ থেকে নেমে অদৃশ্য হয়ে যেতো, পরে কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানসহ ইউরোপের বিভিন্ন শিল্প কারখানায় চাকরী নিয়ে নতুন জীবন শুরু করে দিত। তখনকার উন্নত ইউরোপ আমেরিকার শিল্প মালিকেরা আমাদের দেশের সস্তা শ্রমিকদের বিমুখ করত না। এসব দায়বদ্ধহীন শ্রমিক নিয়োগে ওখানকার সরকারও নির্বিকার থাকত। কঠোর প্রতিকলতার মধ্যে যারা একবার পশ্চিমে গিয়ে পৌঁছাতো তারা ওখানকার উন্নত জীবনযাত্রা দেখে প্রলব্ধ হয়ে দেশে না ফিরে বিদেশেই প্রবাসন নিয়ে নিত। পরবর্তীতে ওই সব প্রবাসনকারীরাই হয়ে উঠলেন উদ্ধুদ্ধকারী। এদের কল্যাণেই আজ ইউরোপ-আমেরিকা ও পশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে কয়েক লক্ষ বাঙালী কর্মরত। প্রবাসন নেওয়া অনেক বাঙালী পশ্চিমের মূল স্রোতধারার সঙ্গে মিশে গিয়েও জন্ম-মাটির কথা এখন আবার গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেছে। এরা চান জন্মভূমির উন্নতি, এজন্য সরকারের কার্যকর আহবান একান্ত জরুরী। এতো গেল পশ্চিমে যারা গেছেন তাদের কথা।

আমি আশৈশব দেখেছি, আমাদের ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের কর্মক্ষম যুবশক্তি জীবিকার সন্ধানে বয়স্কদের অনুসরণ করে আসা, ধুবরী, গৌহাটি, কলিকাতা, আহমদাবাদ, বোম্বাই ও মাদ্রাজসহ ভারতের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কাজ করতেন। পূর্ব-পাকিস্তান ছিল তখন একখন্ড বিশাল ধান ও পাটক্ষেত্র। শিল্প কারখানা বলতে কিছুই ছিল না, তাই দেশ বিভাগ সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের লোকজন পূর্বেকার মত সূতা, বস্ত্র, রং, পাটকল ও অন্যান্য উৎপাদনমখী ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে ছুটে যেত ভারতে। এই কর্মজ্ঞ ১৯৬৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

১৯৬৫ সালের অক্টোবর মাসের ৭ তারিখ হতে ১৭ দিনের পাক-ভারত যুদ্ধ গোটা উপমহাদেশের লোকের ভাগ্য বদলে দিল। স্বৈরশাক আইয়ব খান যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে হঠাৎ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বারশ মাইল ব্যবধানে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের জায়গা জমি স্থাবর সম্পত্তিকে শত্রু সম্পত্তি ঘোষণা করে বাজেয়াপ্ত করে দিল। এর পাল্টা কুফল হিসেবে ভারত সরকার সমস্ত পাকিস্তানীকে কলকারখানাসহ যাবতীয় প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়ন শুরু করল। এতোদিন দুদেশের মধ্যে যে সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা চালু ছিল তা বন্ধ করে দিয়ে কঠোর শর্তে ভিসা প্রথা চালু করল। পরিণাম হল ভয়াবহ! হাজার হাজার বাঙালী চাকরী হারালো, বহিস্কৃত হল। বাংলাদেশের প্রান্তিক ভূমিহীন কৃষক ও বর্গাচাষীরা দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হতে লাগল, ক্ষুদ্র চাষীরা ভিটা মাটি হারিয়ে ভমিহীনে পরিণত হয়ে যে প্রকট বেকার সমস্যা সৃষ্টি করল, তার সঙ্গে যোগ হল ভারত ফেরত হাজার হাজার বেকার শ্রমিক। বাংলাদেশের এমন এক ক্রান্তিকালে এদেশের মেহনতি মানুষ নিজেদের ভাগ্যের চাবি নিজেরাই তুলে নিয়ে অন্ধ নিয়তির বদ্ধ তালা খোলার দূর্বার সংগ্রামে আবারও নেমে পড়ল। এবার তারা বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে আরব সাগরের তীরে গিয়ে করাচি বন্দরে নোঙ্গর করল, শুরু হল আরেক কঠোর সংগ্রাম-বৈরী পরিবেশে মোহাজের অধ্যুসিত বন্দর নগরী করাচিতে বাঙালীদের কোনো ঠাই ছিল না। অল্প কিছু সংখ্যক বাঙালী প্রব বৈরী পরিবেশে চাকুরী জোটাতে পারলেও বেশীর ভাগ ভাগ্যবিড়ম্বিত বাঙালী জীবনযুদ্ধের আরেক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জে মুখে নিজেদের সঁপে দিতে লাগল। মধ্যপ্রাচ্যের মরুর দেশগুলোতে হঠাৎ করে অঢেল তেল প্রাপ্তি শুরু হয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল বিপুল নির্মাণ কাজ খবর শুনে বেকার বাঙালীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দালালদের সাহায্যে মাছ ধরার ট্রলার এমন কি ডিঙ্গি নৌকায় চেপে আরবসাগর পাড়ি দিয়ে দলে দলে মরুর দেশে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই ষাট দশক থেকে বাঙালী মেহনতি যুবকদের পাকিস্তান হয়ে দুঃসাহসী মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পরা শুরু হল সেই রুট ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর চিরতরে বাঙালীদের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলার দামাল ছেলেরা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়ার যে গুরুদায়িত্ব স্কন্ধে নিয়েছিল তারই ফলশ্রুতিতে ভাই ভাইকে, পিতা সন্তানকে, আত্মীয় আত্মীয়কে এবং বিশ্বস্ত পড়শী পড়শীকে এনওসি জোগা করে সম্পূর্ণ নিজেদের প্রচেষ্টায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাকরী জোগার করে দিতে লাগল। এসব ক্ষেত্রে সরকারের কোনো সাহায্য সহযোগীতা ও সহানুভতি ছিল না। তেমনি ছিল না দালাল বা আদম বেপারীর দৌরাত্ম। ভিসা বা এনওসি বা পাসপোর্টের গন্ডগোলে পড়ে কেউ বিদেশে বা দেশে জেল জুলুম সহ্য করেছে বা প্রতারিত হয়ে শূণ্য হাতে ফিরেছে কিংবা কর্মস্থলে অমানবিক অবস্থার স্বীকার হয়ে জীবন বিপন্ন হয়েছে তেমন দুঃসংবাদ শোনা যেত না। বরং দেশের কেউ বিপদে পড়লে প্রবাসীরা ছুটে আসত। কিন্তু বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো প্রবাসী বাঙালীদের কোন আপদ-বিপদে সাড়া না দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসকদের মত আচরণ করে চলেছে।

আমাদের নিম্নবিত্ত ও প্রান্তজনের ছেলেরা মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চাকরী করে মাতৃভুমিতে কাড়ি কাড়ি টাকা পাঠাচ্ছে এবং বিদেশে বিভিন্ন কাজে অদক্ষ, দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, প্রকৌশলী চিকিৎসকসহ নানান কারিগরি দক্ষতা সম্পন্ন লোকের প্রয়োজন হচ্ছে দেখে আমাদের দেশের এক শ্রেণীর লোভী মানুষের চোখ কপালে উঠে গেল। তারা অতি কৌশলে সরকারের জনশক্তি রপ্তানী ব্যুরো, চাকরী বিনিয়োগ কেন্দ্রের এক শ্রেণীর দূর্নীতিপরায়ণ আমলা-কেরানি ও ফড়িয়ার সাহায্যে একটি চক্র তৈরী করে রিক্রুটিং এজেন্সি নামে এক লোমহর্ষক ফাঁদ পেতে শুরু করে দিল শোষণ ও প্রতারণার নিষ্ঠুর খেলা। বিশ শতকের শেষে ও একবিংশ শতাব্দির শুরু থেকেই এইসব আদম বেপারী মাফিয়ারা বিদেশে চাকরী প্রার্থী লোকদের সঙ্গে কী নির্মম নিষ্ঠুর খেলা খেলে চলেছে আজো তা সবার জানা এবং তাদের সেই দৌরাত্ম আজো বন্ধ হয়নি, বরং সরকারের সঙ্গে গোপন মধুচন্দ্রিমায় সেই প্রতারনার ফাঁদ দিন দিন রং বদলাচ্ছে। আশ্চর্য বাঙালী সন্তানদের ধৈর্য ও সহনশীলতা। এতো অত্যাচার, জুলুম প্রতারনা ভোগান্তির স্বীকারের পরেও তারা প্রবাসে যাবেই। নানান অনিয়ম অব্যবস্থাপনা ও নির্যাতনের স্বীকার হয়েও বাঙালী সন্তানেরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে তাদের রক্ত জল করা পয়সা দেশে পাঠাচ্ছে ও এদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল করে রেখেছে। বর্তমানে প্রায় এক কোটির উপর বাঙালী প্রবাসে আছে এবং তাদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ দেশের সর্বমোট প্রবৃদ্ধিও ৩০% এবং সত্যি বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা সোনার ছেলে হয়ে এদেশে মুঠো মুঠো সোনা পাঠাচ্ছে।

আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা শুধু যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রক্তশূন্যতাকে দূর করছে তা নয়, আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণঘাতি সমস্যায় নিজেদের অজান্তেই বিরাট অবদান রেখে যাচ্ছেন, যার আর্থিক হিসাব-পরিসংখ্যান শুনলে পিলে চমকে উঠবে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীরা কর্মস্থলে নানান সরকারী বিধিনিষেধ ও নিজেদের আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে পরিবার পরিজন নিয়ে একসঙ্গে থাকার সুযোগ পায় না। আর যারা এসব সমস্যা মোকাবেলা করে প্রবাসে পরিবার নিয়ে থাকেন তাদের সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য ৫%। বাকী ৯৫% পরিবার দেশেই থাকে। প্রবাসীরা অর্থ বাঁচাবার জন্য কয়েক বছর পর পর স্বদেশে আসেন। ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নিয়মিত বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রতি বছর লক্ষাধিক অনাকাঙ্খীত শিশুর আগমন বন্ধ থাকে। এতে করে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে পিষ্ট বাংলাদেশ কোনো রকম জন্মনিরেধক সেবাপ্রদান ছাড়াই এক লক্ষ birth abort করতে সমর্থ হয়। একটি রক্ষণশীল হিসেবে দেখা যায়, একটি জন্ম নিরোধ করতে পারলে পরিবার ও সরকারের সতেরো লক্ষ টাকা সাশ্রয় হয়। এখন ভেবে দেখুন একটি birth abort-এ যদি সতেরো লক্ষ টাকা সাশ্রয় হয় তাহলে এক লক্ষ birth abort করলে সাশ্রয় হয় এক লক্ষ সত্তর হাজার কোটি টাকা যা বাংলাদেশের দুই বৎসরের বাজেটের সমান। প্রবাসীদের এই কৃতিত্ব অর্জনের জন্য শুধু সাধুবাদ দেওয়াই কি যথেষ্ট? তাদের প্রেরিত রেমিটেন্সের সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনার এই ব্যয় সাশ্রয় যোগ করলে বছরে দাঁড়ায় তিন লক্ষ হাজার কোটি টাকা যা কিনা বিগত এক যুগে বিশ্বের বিভিন্ন অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান, দাতা দেশের দান-অনুদান ও ঋণের সমপরিমাণ অর্থ গ্রহণের সমান। সুতরাং বলতে দ্বিধা নেই, বর্তমানে বাংলাদেশের যেটুকু প্রবৃদ্ধি ও আর্থক স্বচ্ছলতা তা একান্তই বাংলাদেশের প্রবাসী ভাইদের অবদান। এখন আমাদের সরকারের উচি প্রবাসীদের কল্যাণে ও তাদেরকে এদেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে যথাযথ মূল্যায়ন করা।

ধান বানতে শিবের গীত হয়ে গেল। অবশ্য এ গীতের দরকার আছে। আজ যে বাংলার মসনদে বসুক না কেন অমনি বিগলিত কন্ঠে বলতে থাকেন, আমাদের সময় বিদেশ প্রবাসীদের রেমিটেন্স প্রবাহ সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়েছে। কতোবড় নির্লজ্জ এরা, যাদের প্রেরিত অর্থে এদেশের অস্থি-চর্মসার অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে তারা যখন মাতৃদর্শনে বিরাট স্নেহবুভুক্ষতা নিয়ে বাংলার মাটি স্পর্শ করেন, তখনই শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। লাগেজ খোলা, বৈদেশিক মুদ্রা হাতিয়ে নেওয়া, কাস্টম পুলিশ কর্তৃক চোর আসামীর মতো দূর্ব্যবহার করা, কোন কোন সময় দৈহিক নির্যাতন পর্যন্ত সহ্য করে কোনোমতে চেক আউট হয়ে ঘের থেকে বের হলেই শুরু হয় আর এক নির্যাতন। এবার কুলি-ড্রাইভাররা লাগেজ নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেয়। মাঝ পথে কত প্রবাসী সর্বস্ব হারিয়েছে, কত লোক যে বেঘোরে প্রাণ দিয়েছে এমন লোমহর্ষক ঘটনার নজির কোনো অসভ্য দেশেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সুতরাং প্রবাসীদের নিয়ে যারা কুম্ভিরাশ্রু পাত করে তাদের জন্য অবশ্যই শিবের গীতের প্রয়োজন আছে। আজ প্রবাসীদের কদর বেড়েছে কেন? বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক শাখার খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। আজ যে বড়াই করে বলে থাকেন, আমাদের রিজার্ভ চারশ-পাঁচশ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে এ সব কাদের দান?

এদেশ দুবার স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটেনি। আজও বাংলার অর্থনীতির ভিত তৈরীতে সুশীল সমাজ তথা নদের চাঁদদের কোনো ভমিকা নেই। এদেশ আক্ষরিক অর্থেই সব সময় চাষা-মজুদ-মাঝি-মাল্লার দেশ ছিল, কেননা সংখ্যার দিক দিয়ে এরাই বেশি। তাদের ভাগ্যের চাকা তাদেরকেই ঘুরাতে হয়েছে। আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির যে দুটি মূল ধমনীর কথা উচ্চ গলায় বলা হয়, দুটোরই স্রষ্টা ঐ প্রান্তজনের বর্তমান ও পূর্ব প্রজন্ম। এক প্রজন্ম বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতি মাসে শত কোটি ডলার তথা গড়ে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা পাঠাচ্ছে। আর অপর এক প্রজন্ম দেশের হাজার হাজার গার্মেন্টস শিল্পে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রম দিয়ে যে পোষাক রপ্তানি করে দেশের মোট প্রবৃদ্ধির ১৫% তথা প্রতি মাসে পঞ্চাশ কোটি ডলার অর্থাৎ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা অর্জন করছে এই দুই ধমনীই এদেশের খেটে খাওয়া মানুষ। এদের হাত বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশের স্পন্দও বন্ধ হয়ে যাবে। আজ বৃহৎ বাংলার যেটুকু সুখছবি, জীবন প্রবাহ, প্রান্তজনের ঘরে ঘরে বিজলী বাতি না হলেও মোমের আলো জ্বলছে, গ্রাম জনপদে যে সব স্বচ্ছল পরিবার অল্প হলেও আধুনিক জীবনের স্পর্শে ধন্য হচ্ছে, নির্মিত হচ্ছে নতুন নতুন অবকাঠামো, সুন্দর সুন্দর বাড়ি, স্কুল-মাদ্রাসা, বাজার-মল, সবই ঐ প্রবাসীদের কল্যাণেই। বাংলার এই রূপ পরিবর্তনে প্রবাসীদের দান অসামান্য। এদের মধ্যে বাহুল্য আছে মানি, কিন্তু প্রয়োজন নেই এটা মানা যায় না। পুরাতন সমাজ ভেঙ্গে নতুন করতে হলে এমন বাহুল্য বৈপরিত্য থাকবেই। আরো কিছু কারণ আছে যা আমাদের জনকল্যাণমুখী (?) সরকার এবং তার ঝানু ঝানু অর্থনীতিবিদরা হিসাবের মধ্যে আনেনি।

দীর্ঘ দুদশক ধরে প্রবাসীদের টাকা আসত হুন্ডির মাধ্যমে। সরকার কি জানত না? অবশ্যই জানত। তবে ব্যবস্থা নেবার কোন যোগ্যতা সরকারের ছিলনা। অনেকেই দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হয়ে মানিঅর্ডার মারফত কিংবা ব্যাংকে পে-অর্ডারের মারফত টাকা পাঠালেও তার পরিনাম যে কি কষ্টকর হতো তা শুধু ভক্তভোগীরাই জানা। মানিঅর্ডার গায়েব হয়ে যাওয়া ও ড্রাফ্ট চুরি হয়ে যাওয়া ছিল নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা। আর ব্যাংকে ড্রাফট নিয়ে গেলে ম্যানেজারদের নানান খাই মিটাতে গিয়ে কয়েকবার সে ড্রাফট বিদেশ ভ্রমণ করে আসত!

সরকারী হিসাব মতে বর্তমান  প্রবাসীর সংখ্যা ৮০ লাখ এর মত। এটা সম্পূর্ণ অনুমান ভিত্তিক। কেননা সরকারি পরিসংখ্যান কোনোদিন সত্য প্রকাশ করে না। আমাদের হিসা মতে কম করে হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের এক কোটির উপর মানুষ প্রবাসে আছেন। এদের পাঠানো গত দশ বছরের গড় রেমিটেন্সের পরিমাণ মাসে সত্তর কোটি এবং বরে আটশত চল্লিশ কোটি ডলার। যার অর্থ বাংলাদেশী মুদ্রায় পঞ্চাশ হাজার চারশ কোটি। যা আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধির ৩০%। এটা সম্পূর্ণ সরকারি আমলাদের কাগজের হিসাব। বর্তমানে বিদেশে কর্মরত সোয়া কোটি বাঙালির মধ্যে প্রায় অর্ধেকের কোনো হিসাব সরকারের কাছে নেই এবং থাকার কথাও না। একটা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা পরিস্কার করা যাক। আমার বাড়ি ফটিকছড়ি থানার নানু পুর ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ৩০ হাজার। এদের মধ্যে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অক্ষম লোক বাদ দিলে কর্মক্ষম জনসংখ্যার সংখ্যা পাঁচ হাজার। আমি নিবিড়ভাবে শতাধিক পরিবারে সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছি প্রতি চারটি ঘরের মধ্যে একটি ঘরের এক বা একধিক সদস্য প্রবাসে। অর্থাৎ কর্মক্ষম পাঁচহাজার লোকের মধ্যে চার ভাগের এক ভাগ লোক প্রবাসী। এই চিত্র চট্রগ্রামের অন্যতম বৃহৎ ফটিকছড়ি থানার বাকী সতেরটা ইউনিয়নেও প্রায় সমান। আমি জানি আমাদের গ্রামের এই প্রবাসীদের কোনো হিসাব সরকারের জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরো, এমপ্লয়মেন্ট এক্সেঞ্জ বা পরিসংখ্যান ব্যুরোতে নেই। এছাড়া আমাদের উপজেলার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যে প্রবাসী। এই জনসংখ্যার আশি শতাংশই দক্ষ ও শিক্ষিত। দুই হাজার সালের আগে পর্যন্ত আমাদের দেশে প্রবাসীরা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাত। কিন্তু গত এক দশক ধরে এই নীতির পরিবর্তন ঘটেছে। তারপরেও প্রতি মাসে বিভিন্ন অবৈধ পথে পঁয়ত্রিশ কোটি ডলারের সমান অর্থ বাংলাদেশে ঢুকছে। যার বার্ষিক পরিমাণ তিন হাজার একশ দুই কোটি টাকা। এই বিপুল অলিখিত টাকাই আমাদের মুদ্রাস্ফীতিসহ বিলাস অপচয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। কোনো সুস্থ পরিকল্পনা ছাড়া এই অপচয় বন্ধ করা অসম্ভব।

দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থানরত উচ্চ শিক্ষিত, প্রযুক্তি জ্ঞানে দক্ষ এবং উচ্চতর পেশায় ও ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রবাসী বাঙালিরা মাতৃভমি বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে আসছেন। তার অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ কারণ রয়েছে। লক্ষ্য আদর্শহীন সরকার, গতন্ত্রহীন মাফিয়া শাসিত সমাজ ব্যবস্থা, চরম দূর্নীতিপরায় প্রশাসন, দেশপ্রেম বিবর্জিত রাজনীতিকদের আমাদের প্রবাসী ভাই বোনেরা দারুনভাবে নিরাশ করত বলেই তাঁরা দেশের উন্নয়নের প্রতি উদাসীন ছিলেন। ইদানিং অবশ্যই তাদের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্বায়নের কুফল যেমন আছে তেমনি সুফলও আছে। বিদেশে অবস্থানরত আমাদের জনগণ বিদেশিদের সঙ্গে সহাবস্থানের ফলে একটা জিনিস ভাল করে লক্ষ্য করে দেখেছে যে, সব দেশের মানুষের কাছে দেশপ্রেম সবচে বড় জিনিস। এটাই তাদের একমাত্র আত্মপরিচয়। তার প্রভাব আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনদের জীবনও স্পর্শ করেছে। এরই মধ্যে তার একটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও দরপ্রাচ্যে অবস্থানরত আমাদের স্বচ্ছল ধনী সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিদেশে নানান সমাজকর্ম ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে মূল স্রোতধারার সঙ্গে মিশে গিয়েও হঠাৎ করে নিজেদেরকে বাঙালি ভাবতে শুরু করেছেন। তাঁরা চাচ্ছেন তাদের মাতৃভুমি অন্যান্যদের মাতৃভমির মতো তাদের কাছেও গর্বের ও পুন্যের স্থান হোক। তাই এখন বিপুল সংখ্যক বিত্তবান প্রবাসী বাংলাদেশে তাদের সঞ্চয় স্থানন্তর করতে চান, অংশগ্রহ করতে চান দেশ গড়ার কাজে। বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের জন্য এডিবি আইএম এফ ও দাতা সংস্থার দরজায় দরজায় ধর্ণা দিয়ে ঘুরেন। অথচ বাংলাদেশ প্রবাসীদের কাছে বর্তমানে যে অর্থ আছে তা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি বছরের বাজেটের দ্বিগুন অর্থ সঞ্চালন করা সম্ভব। বিদেশিদের যেমন ইপিজেড, ও অংশিদারীত্বের মাধ্যমে শিল্প কলকারখানা, ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া হয় ঠিক অনুরূপভাবে প্রবাসী বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের সেই সুযোগ দিলে আমাদের শুধু অর্থনৈতিক চেহারাই পাল্টে যাবে না, আমাদের স্বদেশ প্রেম ও রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন আসবে। অতএব প্রতি বছর বাঙালীরা যে রেমিটেন্স পাঠায় তার সঙ্গে তাদের শিল্প উদ্যোগের ইচ্ছাকে সরকার যদি সমর্থন দিয়ে যান তাহলে এদেশের অর্থনীতি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াকে স্পর্শ করতে বেশি সময় নেবে না।

 

লেখক পরিচিতি : রফিক আনোয়ার প্রাবন্ধিক গল্পকার।

চট্টগ্রাম থেকে।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.