Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা শ্রাবন ১৪১৬ •  9th  year  4th  issue  Jul-Aug  2009 পুরনো সংখ্যা
সুশীল সমাজ Download PDF version
 

সাহিত্য

সুশীল সমাজ

মীজান রহমান

এণ্ড্রু কোহেন আমাদের কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর একটি লেখা পড়লাম অটোয়ার সিটিজেন পত্রিকায়। দয়া করে জিজ্ঞেস করবেন না তিনি ইহুদী কিনা। সেদিন সদ্য-দেশ-থেকে-আসা এক প্রবীণ শিক্ষিত ভদ্রলোকের সঙ্গে ক্যানাডার কোনও এক ধনী ব্যক্তির প্রসঙ্গ ওঠাতে তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন লোকটা ইহুদী কিনা। না ভাই আমি জানিনা তিনি ইহুদী কিনা। জানবার প্রয়োজনও নেই। আমি যখন কোনও বিশিষ্ট মানুষের কথা শুনি, বা তাঁর লেখা পড়ি, কিংবা তাঁর আঁকা ছবি দেখি তখন তাঁর ধর্মীয় বা গোত্রীয় পরিচয়ে আমার বিন্দুমাত্র কৌতুহল থাকে না, আমার একমাত্র কৌতুহল তাঁর লেখাটির মান কিরকম, তাঁর কাজের নান্দনিক মূল্য কতখানি। কোহেন সাহেব লিখেছেন ডেনিশ সমাজ সম্পর্কে। ডেনিশরা পৃথিবীর অন্যান্য মানুষদের থেকে কি কি হিসেবে আলাদা তারই একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর লেখাটি ভাল লাগল বলেই আমি তার কিছু কিছু অংশ আমার বাংলায় লিখছি।

  ইঙ্গার নামের একটি মেয়ে। দারুণ সুখের জীবন তাঁর। খাওয়াপড়ার ভাবনা নেই। বড়লোক ছেলেবন্ধু- অঢেল টাকাপয়সার মালিক। ইঙ্গার নিজে কোনও চাকরি করেন না, তবে এক ডেনিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন ডক্টরেট ডিগ্রি করার জন্যে আধুনিক ইংরেজী সাহিত্যে। এতই আধুনিক যে ১৯৯৭ এর আগেকার কোনও লেখক তাঁর বিষয়বস্তুর অন্তর্গত থাকতে পারবে না। অর্থাৎ তাঁকে গবেষণা করতে হবে সম্পূর্ণ নিজের খোঁজখবরের ওপর ভরসা করে। তাতে অবশ্য ইঙ্গারের কোন চিন্তাভাবনা নেই। বরং স্বাধীনভাবে কাজ করাই তাঁর পছন্দ। এতই স্বাধীন যে ইঙ্গারকে সপ্তাহে মাত্র একদিন গিয়ে হাজিরা দিতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাসা থেকে যার দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। এবং এটুকু কষ্টের জন্যে ইঙ্গারের কোনও মাইনে দিতে হয়না বিশ্ববিদ্যালয়ে, বরং তিনিই মোটা বেতন পান মাসে মাসে। পুরো চারবছরের মেয়াদ। এই চারবছর তিনি ডেনিশ সরকারের বরকন্যা, এবং তাঁর আর্থিক দুশ্চিন্তামুক্ত সুখের জীবনের একমাত্র শর্ত হল একটা চলনসই অভিসন্দর্ভ লিখবেন মেয়াদ শেষ হবার আগে। এখানেই শেষ নয় তাঁর আরামের জীবনের- ডিগ্রি করার পর তাঁর চাকরি হবে কি হবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই, এবং তা নিয়ে তাঁর বা সরকারের কোন মাথাব্যথাও নেই।তাঁকে কোন ঋণ শোধ করতে হবে না ক্যানাডা-আমেরিকায় যেমন করতে হয়। চাকরি হলে হল, না হলে কি আসে যায়, এই হল তার মনোভাব, সরকারেরও। একটা মেয়ে শিক্ষিত হল, তার মনের পরিধি বাড়ল, দেশের একজন সুশীল নাগরিক সৃষ্টি হল, আর কি চাই। এভাবে যদি প্রতিটি মানুষ উচ্চশিক্ষিত হয়ে ওঠে, প্রতিটি মানুষ তার দেশ ও সমাজ সম্বন্ধে সজাগ ও সচেতন হয়ে ওঠে তাহলে শেষমেষ দেশেরই তো লাভ। এই হল ডেনিশ সমাজের আদর্শ।

  এভা- আরেকটি মেয়ের নাম। ক্যানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি করে তার নিজের দেশ ডেনমার্কে ফিরে গেছেন। সমস্যা সেখানেই- ক্যানাডার রীতিনীতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর নিজের দেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে রীতিমত কষ্ট হচ্ছিল। ডেনমার্কে কেউ বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের পর কাজ করে না, বিশ্রাম নেয়, পরিবার পরিজনের সঙ্গে সময় কাটায়, সাইকেল নিয়ে বৈকালিক নগরবিহারে বের হয়ে যায়। সিনেমায় যায়, থিয়েটারে যায়, বা আর্ট গ্যালারীতে, লাইব্রেরীতে। অর্থাৎ কাজের সময় কাজ, বিরতির সময় বিরতি। উত্তর আমেরিকার মত কাজ তাদের জীবনকে গ্রাস করে ফেলেনি, তারা এখনো নয়টা-পাঁচটার নিয়ম পালন করে, উত্তর আমেরিকার ২৪/৭ এর যাঁতাকলে নিজেদের পিষ্ট হতে দেয়নি। তাতে কি ডেনমার্কের উত্পাদনশীলতা আমেরিকা বা অন্য কোন দেশের তুলনায় কোন অংশে কম? মোটেও না। ডেনিশ সমাজে বেকারত্ব বলে কোন জিনিস নেই। আয়বৈষম্য বলে কোন জিনিস নেই--সেখানে আয়ের সমতা বিশ্বের যে কোন উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনীয়। ডেনমার্কের বায়ুশক্তিজাত জ্বালানি সম্পদ তাদের বেশির ভাগ কলকব্জা চালায়, ঘরবাড়ি গরম রাখে শীতকালে, ঠাণ্ডা রাখে গ্রীষ্মকালে। মধ্যপ্রাচ্যের তৈলসম্পদের ওপর ডেনমার্কেরই সবচেয়ে কম নির্ভরতা পশ্চিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায়। বরং বায়ুসম্পদ রপ্তানিতে তারাই সর্বাগ্রে।

সবচেয়ে প্রশংসনীয় যে জিনিসটা মনে হয়েছে আমার কাছে তা হল ডেনিশ সমাজের কতগুলো মৌলিক মুল্যবোধ, যার একটি হল বিনয়-নম্রতা। এ এক অসাধারণ গুণ যা তারা আয়ত্ত করেছে যুগযুগান্তের সাধনা দিয়ে। এ জিনিসটা তাদের জাতীয় এবং ব্যক্তিগত জীবনে এমন গভীরভাবে প্রবেশ করে গেছে যে, কাজের জায়গাতেও তারা নিজের মতামতটা প্রকাশ করার আগে অন্যের বক্তব্যটা শোনে মনোযোগ দিয়ে। সেটা শুধু সাধারণ কর্মচারীর বেলায়ই নয়, বড়কর্তাদের বেলাতেও প্রযোজ্য। প্রত্যেককেই প্রত্যেকের কথা শুনতে হবে। এখানে ছোটবড়র ব্যাপার নেই, উঁচু পদ আর নীচু পদের ভেদাভেদ নেই। ডেনিশ সমাজে সবাই সমান, কেউ কারো ছোট নয়, কেউ কারো বড়ও নয়। সাম্যবাদ তাদের মুখের বুলি নয় অন্যান্য দেশের মত, সাম্যবাদ তাদের জীবনধারা। এই ব্যাপারটি এমনই মজ্জাগত প্রতিটি মানুষের মনমানসের মধ্যে যে কোনও স্কুলকলেজ বা কর্মস্থলে কেও যদি মেধা ও কৃতিত্বের কারণে বিশেষ সম্মানের যোগ্য হয়ে ওঠে তাহলে তাকে সম্মান দেওয়া হয় বটে, কিন্তু কোনরকম ঢাকঢোল পিটিয়ে নয়, অত্যন্ত সংযতভাবে, যাতে তার মাথা ফুলে উঠতে না পারে আত্মম্ভরিতায়। দম্ভ আর আত্মম্ভরিতার কোনও প্রশ্রয় নেই ডেনিশ সমাজে। (এর সঙ্গে আমাদের সোনার দেশটির কোন মিল দেখতে পান কিনা ভেবে দেখুন)। নেই কেউ কাউকে ছোট করে দেখার প্রবণতা। ডেনমার্কে শ্রেণীবৈষম্য বলে কিছু নেই। রাস্তার ঝাড়ুদার এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী দুইয়েরই সমান সম্মান।

সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যাণ্ড, ডেনমার্ক, এই চারটে দেশ সম্বন্ধে উত্তর আমেরিকায় কতগুলো অদ্ভূত ধারণা আছে। এরা কমিউনিস্ট নয়, কিন্ত কমিউনিজম পালন করে, এদের বার্ষিক আয়ের শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি যায় আয়করে, এদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপ অত্যন্ত বেশি, এদের সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাব, ইত্যাদি ইত্যাদি। মজার ব্যাপার এই যে কথাগুলো কোন স্ক্যাণ্ডেনেভিয়ানের মুখে শোনা যাবে না, এগুলো সবচেয়ে বেশি শোনা যায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতানেত্রী আর ভূরিওয়ালা ধনপতিদের মুখ থেকে। আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশ বলে মনে করে নিজেদের। এবং নিজেদের দেশ নিয়ে এতই দেমাগ তাদের যে অন্য কোন দেশের সমাজ, ইতিহাস বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কথা জানবার শিখবার বা বুঝবার প্রয়োজনই তারা বোধ করে না। সামান্য কৌতূহল, তাও যেন নেই তাদের। অন্য দেশ দূরে থাক, নিজের দেশেরই ভিন্ন অঙ্গরাজ্য সম্বন্ধে এদের জ্ঞান প্রায় শূন্য। আমেরিকার ভূগোল বরং বাংলাদেশের স্কুলকলেজের ছেলেমেয়েরাই জানে বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রই বোধ হয় পশ্চিম বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে উচ্চশিক্ষা ও গণস্বাস্থ্য দুটোই জনসেবার বিষয় নয়, বাণিজ্যের বিষয়। আমেরিকা হল বণিকের দেশ, পুঁজি ও মুনাফার দেশ, স্বেচ্ছাচারিতার দেশ। তাদের পক্ষে স্ক্যাণ্ডেনেভিয়ার জনকল্যানভিত্তিক সমাজব্যবস্থার নীতি অনুধাবন করার ক্ষমতা না থাকাই স্বাভাবিক। ওরা যাকে ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে আমি সেটাকে বলি সমাজের প্রতি দায়িত্বজ্ঞানবর্জিত যদৃচ্ছ ব্যবহারের স্বাধীনতা। স্কাণ্ডেনেভিয়াতেও ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে, কিন্তু তা বৃহত্তর সমাজকল্যানের সঙ্গে শর্তযুক্ত। ব্যক্তির অধিকার যেন কোনক্রমেই সমাজের অধিকারকে অগ্রাহ্য না করে, সেদিকে তাদের সতর্ক দৃষ্টি।

ডেনমার্কের কথাই ধরুন। হ্যাঁ, সেখানে ট্যাক্স দিতে হয় অনেক বেশি, নাগরিক দায়-দায়িত্বও বেশি, কিন্তু তার জন্যে তো নালিশ করছে না কেউ। নালিশ যা কিছু হচ্ছে সব ডেনমার্কের বাইরে। যারা কোনদিন ডেনমার্কে যায়নি, ডেনমার্কের কোন নাগরিকের সঙ্গে কথা বলেনি, নালিশগুলো সাধারণত তাদের মুখ থেকেই শোনা যায়। ক্যানাডার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ব্রায়ান মালরোনী একবার রাষ্ট্রের কাছে দেশবাসীর অতিরিক্ত সাহায্যকামনার প্রবণতাকে তিরস্কার করতে গিয়ে বলেছিলেনঃ আপনারা কি চান দেশটা সুইডেন হয়ে উঠুক? অর্থাৎ সুইডেনের মত দেশ হওয়ার চাইতে জঘন্য জিনিস আর হতে পারেনা। পাঠকদের অনেকেই হয়ত অবগত নন যে মহামান্য মালরোনী সাহেব সম্প্রতি বিস্তর ঝামেলাতে পড়েছেন একটি আর্থিক ব্যাপারে যা থেকে ছাড়া পেতে তাঁর প্রচুর সরকারি সহায়তার প্রয়োজন হবে। ডেনমার্কসহ স্কাণ্ডেনেভিয়ান রাষ্ট্রগুলোতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিকের ভরণপোষণের ব্যবস্থা রাষ্ট্রদ্বারা নিশ্চিতয়াত। আমেরিকার মত ডেনমার্কে কেও চাকরি হারায় না, বাচ্চা জন্মানোর পরমুহূর্ত থেকে টাকা জমাতে হয়না তার কলেজের খরচের জন্যে, কারো অসুখ হলে ডাক্তার-হাসপাতালের অবিশ্বাস্য বিলের কথা ভাবতে হয়না। অবসর গ্রহণের পর থাকাখাওয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনাদির দায়-দায়িত্ব সব সরকারের। ডেনমার্কে পথে-বসা সর্বহারা কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। অনাহার, অর্ধাহার, বস্ত্রহীনতা, এগুলো অশ্রুতপূর্ব শব্দ সেখানে। ডেনমার্কের মানুষ আশ্চর্যরকম সুখী। না হবার কারণ নেই। সুখসৃষ্টির সব উপাদানই তো গড়ে নিয়েছে তারা। বাসযোগ্যতা ও জীবনের মান নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক জরিপ হয়েছিল ২০০৮ সালে। তাতে শীর্ষস্থান অধিকার করেছে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। প্রথম দশটি শহরের মধ্যে তিনটিই স্ক্যাণ্ডেনেভিয়ার- কোপেনহেগেন প্রথম, হেলসিঙ্কি পঞ্চম, স্টকহোম সপ্তম। উত্তর আমেরিকার একটিমাত্র শহরের স্থান আছে সে তালিকাতে- ক্যানাডার ভ্যাঙ্কুভার।

ডেনমার্ক এবং স্ক্যাণ্ডেনেভিয়ার অন্য তিনটি দেশ এতটা উচ্চতায় পৌঁছালো কেমন করে? একটা জাতি ওপরে ওঠে কেন? নিচেই বা নামে কেন? উদার, বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া সেটা সম্ভব নয় তা ঠিক, তবে সেটাই যথেষ্ট নয়। উদার এবং আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষার কোন বিকল্প নেই, এটা যদি গোড়াতেই মেনে নেওয়া না হয় তাহলে কোন জাতির পক্ষে এক পাও অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। যে জাতির শিক্ষাব্যবস্থায় যত ধর্মীয় গোঁড়ামি থাকবে সে জাতি ততটাই পশ্চাৎগামী হতে বাধ্য। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমপ্রধান দেশগুলো। দুঃখের বিষয় যে আমাদের বাংলাদেশের এ দুর্দশা আগে ছিল না, দেশ স্বাধীন হবার পর হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির পীঠস্থান যুক্তরাষ্ট্রের যে কটি অঙ্গরাজ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রকোপ বেশি, যেমন ক্যানসাস, মিসৌরি, নেব্রাস্কা, সাউথ ক্যারোলিনা, উটা, এগুলো ক্যালিফোর্নিয়া, নিউ ইয়র্ক, ম্যাসাচুসেটস্‌ ইত্যাদির তুলনায় অনেক পেছনে পড়ে আছে। স্ক্যাণ্ডেনেভিয়ায় ধর্মকর্ম পুরোপুরিই ব্যক্তিগত বিষয়, রাষ্ট্র তাতে মাথা গলাবে না কোনভাবেই, যা হওয়া উচিত ছিল আমাদের দেশেও। উচ্চশিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পেরেছে বলেই ডেনমার্কের মত দেশে ধর্মের প্রতি একটা সুস্থ চিন্তাধারা স্থাপিত হতে পেরেছে। আরো কতকগুলো জিনিস আছে ডেনমার্কে। নাগরিক দায়িত্ব তার একটি। প্রতিটি নাগরিক তার নিজ নিজ সামাজিক দায়িত্বগুলো সুচারুভাবে পালন করার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। শুধু বাইরে নয়, ঘরেও। প্রত্যেকটি নাগরিকই বুঝে নেয় যে তার নিজের ধনসম্পদ আর সুখস্বাচ্ছন্দ্য নিতান্তই অর্থহীন, যদি তার প্রতিবেশির ঘরে একবেলার খাবার না থাকে, যদি তার কোনও অধস্তন কর্মচারির সামর্থ না ত্থাকে বাচ্চার কাপড় কেনার। সেজন্যেই তারা নিজেদের সমাজে উপার্জনসমতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে, যে চেষ্টাটুকু আমাদের অভাগা দেশের নেতানেত্রিদের কেও করেননি অদ্যাবধি। মুখে মুখে অনেকেই সাম্যবাদ সাম্যবাদ বলে গলা কাঁপিয়েছেন, মিছিল নিয়ে রাস্তায় শ্লোগান দিয়েছেন,  কিন্তু তাদের কজন নিজ়ের জীবনে তা পালন করেছেন ভাববার বিষয়। সাম্যবাদ ও সমতা বলতে আমাদের মাননীয় বুদ্ধিজীবিরা বোঝেন পুঁজিবাদবিরোধিতা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, অর্থাৎ সেই পুরনো ভাঙ্গা রেকর্ডের ফাঁকা বুলি। আমাদের দেশের সাম্যবাদী ভদ্রলোকেরা খদ্দরের জামাতে আতরের সুবাস মেখে প্রাতঃভ্রমণে বের হন, কিন্তু ডেনমার্কের ভদ্রলোকেরা নিজেদের গায়ে আতর না মেখেই সমাজজীবনে আতরের সৌরভ নিয়ে হাজির হন প্রতিটি প্রতিবেশীর দ্বারে দ্বারে। এটাই সত্যিকারের সমাজতন্ত্র। সমাজতন্ত্র শুধু কেতাবে থাকলেই চলবে না, সমাজতন্ত্রকে আস্তে আস্তে গড়ে উঠতে হয় দেশজ সংস্কৃতি থেকে। তা নাহলে সেটা কোনদিনই মানুষের মানসপর্যায়ে পৌঁছুবে না। আমাদের বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর যে সংস্কৃতিটাকে গড়ে তুলেছি আমরা তা সমাজতান্ত্রিক তো নয়ই, পুঁজিবাদীও নয়। এমনকি ইসলামবাদীও নয়। ইসলাম মূলত মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও সমাজব্যবস্থায় কতগুলো নীতিমালা আছে তাতে যা পালন করতে পারলে অন্তত আমেরিকার কোয়েকার, মরমন এবং আমিশ সম্প্রদায়ের মত একটা বিজ্ঞানবিমুখ স্থবির অথচ শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন করা যেত। কিন্তু বাংলাদেশের ইসলাম শান্তিপুর্ণ নয়, ওটা শুধু মসজিদের চার দেয়াল আর দাড়ি-হিজাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের ইসলাম শান্তি চায় না, চায় আধিপত্য, ইসলামী পাথর আর তরবারির আধিপত্য। বাংলাদেশের আদর্শ আধুনিক গণতন্ত্র নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সামন্ততন্ত্র। বাংলাদেশের ইসলাম চায় বাঙ্গালি সংস্কৃতিকে দমন করে আরবী সংস্কৃতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। আরবের তেলটি আমাদের নেই বটে, কিন্তু তাদের উষ্ট্র এবং বালুটি আমাদের প্রচুরই হয়েছে এখন। উষ্ট্র  হয়েছে আমাদের কোরবানির পশু, আর বালু  ঢুকেছে তাদের মস্তিস্কে।

ডেনমার্ক সম্বন্ধে বাংলাদেশীদের জ্ঞানের দৌড় কতদুর? ২০০৫ সালের আগে তা প্রায় শূন্যই ছিল বলা চলে। ২০০৫ সালে কি হয়েছিল? ব্যঙ্গচিত্র হয়েছিল। হজরত মোহাম্মদ (দঃ)-এর ব্যঙ্গচিত্র । মুসলিম বিশ্বে আর কিছু নিয়ে মহাযুদ্ধ না বাঁধলেও এই একটা বিষয় নিয়ে অবশ্যই লাগবে। হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে মরে যাক, হাজার হাজার ধর্ষিতা মেয়ের ক্ষতবিক্ষত দেহ পড়ে থাক পথের ধারে, কি আসে যায় তাতে, মোহাম্মদ (দঃ) কে নিয়ে যেন মস্করা করবার চেষ্টা না করে কেউ, তাহলে কিন্তু কেয়ামত এসে যাবে। ডেনমার্কের কোন এক নাম-না-জানা শহরের এক তুচ্ছ পত্রিকায় কে এক অর্বাচীন ব্যক্তি রসিকতা করার বিষয় না পেয়ে হজরতের ছবি ছাপিয়ে দিল। ব্যস, আর যায় কোথায়। হেই হেই করে হেঁকে উঠল সারা মুসলিম বিশ্ব। জ্বালাও পোড়াও মারো ধর, রব পড়ে গেল চতুর্দিকে। সেই সূত্রেই ডেনমার্ক সম্বন্ধে বাংলাদেশিদের কিঞ্চিত জ্ঞানার্জন।

তবে ব্যঙ্গচিত্র ছাড়াও যে ভাল কিছু আছে এই দেশটিতে আশা করি আমার এই লেখাটিতে তার সামান্য আভাস পাবেন পাঠকরা।

অটোয়া, কানাডা

২৫শে মে, ২০০৯  

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.