Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  সাহিত্য  ||  ৯ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা শ্রাবন ১৪১৬ •  9th  year  4th  issue  Jul-Aug  2009 পুরনো সংখ্যা
রং বদল Download PDF version
 

সাহিত্য

 

ছোটগল্প

রং বদল

ওয়াহিদা নূর আফজা

(গত সংখ্যার পর)

এরপর সত্যিকার অর্থেই শুরু হলো কাকনের সংগ্রামী জীবন। নতুন করে দুটো টিউশনী জোগাড় করল। মায়ের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা লাগবে। প্রতিটা পাইপয়সা জমানোর চেষ্টা করতে লাগলো যা আজ অব্দি করে চলছে।

অন্যদিকে খবর না দিয়ে হঠাৎ করে ময়মনসিংহে চলে যাওয়াতে কাকনের কোন খোঁজ না পেয়ে সবুজের একেবারে ত্রাহি অবস্থা। সেদিন পহেলা বৈশাখের পরদিনই হলে এসে কাকনের খোঁজ করতে গিয়ে সবুজ জানলো ওর ময়মনসিংহ চলে যাবার কথা। এরকম একটা দিন কাটানোর পর কাকন কিছু না বলে পরদিন চলে যাবে, সবুজের কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। প্রথমে খুব অভিমান হয়েছিল। পরে আশংকা হওয়াতে রাবেয়ার সাথে দেখা করে সব জানলো। সেবার বেশ অনেকদিন পরেই দুজনের দেখা হয়েছিল। সবুজ তো তখনই পারলে প্রায় ময়মনসিংহ ছুটে যায় কাকনের অসুস্থ মাকে দেখতে। ছেলেটার এতো কেয়ারিং স্বভাব কিছুটা সময়ের জন্য হলেও কাকনকে সব রকমের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেয়।

তবে এখন আর সবুজকে সে অর্থে আগের মতো সময় দিতে পারে না। চাকুরী, ক্লাস আর টিউশনি - এ তিনের চাপে পরে একেবারে ত্রাহি অবস্থা। মাঝে মধ্যে সবুজের সাথে দেখা হলে ভেতরের সব কথা বলে হাল্কা হওয়ার চেষ্টা করে। চাকুরীর প্রথম প্রথম ওরা অনেক ঘুরেছে, রেস্টুরেন্টে খেয়েছে। কাকনই সব খরচ দিত। এখন বাইরে খাওয়ার কথা তো কাকন ভাবতে পারে না।

সবুজের সাথে দেখা সাক্ষৎ আস্তে আস্তে খুব কমে আসছে। কিন্তু কাকন জানে সবুজ আছে ওর হৃদয়ের মাঝখানে। যখন হাল্কা হবার জন্য একটা কাঁধের দরকার, তখন ঠিকই সবুজকে পাওয়া যাবে। এই যেমন আজকে খোলা হাওয়ার মধ্যে কিছুক্ষণ পাশাপাশি থাকা।

কাকন বলল,

-তুমি আমাকে খুব সুন্দর করে প্রেম নিবেদন করেছিলে। এখনও সেদিনের কথা ভাবলে ভালো লাগে।

-তাহলে চাচাছোলাভাবে যদি বিয়ের প্রস্তাব দিই তাহলে কিছু মনে কর না। একটাতো অন্তত সুন্দর ছিল।

-মানেটা কি? তোমার মতলব তো বুঝে উঠতে পারছি না।

-কোন মতলব নেই। আমার একটা চাকুরীর খবর হচ্ছে।

-বল কি? কোথায়?

-গৌড়িপুর ইসলামী ব্যাংকে।

-তাহলে তো ঢাকা ছাড়তে হবে।

-তা হবে। আমাদের কি আর ঢাকা থাকা মানায়?

-তুমি আর বিসিএস পরীক্ষায় বসবে না?

-দুবার তো বসলাম, টিকতে তো পারলাম না। ও জায়গাতেও শুনেছি ঘুষ ছাড়া সুযোগ পাওয়া যায় না।

-তাহলে রাবেয়া এক বারে টিকলো কি করে?

-ওরকম যদি কেউ দিনরাত গাধার খাটুনি খাটে তাহলেও না হয় একটা আশা থাকে। আমার পক্ষে এতো পড়াশোনা করা সম্ভব না। আর সবে তো মৌখিক পরীক্ষা দিল। দেখ সেখানে টিকে কিনা?

-ও ভালো কথা মনে হয়েছে। কালকে খুব ভোরে রাবেয়া চলে যাবে। এখন না গেলে হয়তো কথা বলা হবে না। উঠ, হলে ফিরব।

-আর কিছুক্ষণ থাক। হলে গিয়ে তার দেখা তো নাও পেতে পার।

-আমাকে না বলে যাবে না।

আবার রিক্সা ভ্রমণ। সবুজ চুপ হয়ে আছে।

কাকন হলে গিয়ে দেখলো রাবেয়া আসলেও চলে গেছে। তারমানে সবুজ কি জানতো রাবেয়ার চলে যাওয়ার কথা?

এর এক সপ্তাহ পরেই জরুরি খবর পেয়ে কাকন প্রায় সাথে সাথেই ময়মনসিংহ চলে গেল। তবে এবার যাওয়ার আগে সবুজকে বলে যেতে ভুল করলো না। মাকে আর জ্ঞান ফেরা অবস্থায় পায়নি। কমা থেকে মা সবাইকে ছেড়ে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিল। ওরা সব ভাইবোন বাবা খেয়ে না খেয়ে মার উন্নত চিকিৎসার জন্য টাকা জমাচ্ছিল তা আর সেই কাজে লাগলো না। কাকন একবার আশা করেছিল সবুজ এখানে আসবে তার সাথে দেখা করতে। তখন সে পরিবারের সবার সাথে সবুজের পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে। এতে পরবর্তীতে বিয়ের কাজ অনেকটাই এগিয়ে থাকবে। কিন্তু সবুজ আর আসলো না।  

প্রায় একমাস পরে ঢাকায় এসে সে চাকরীটা ছেড়ে দেয়। মার চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত ত্রিশ হাজার টাকা জমিয়েছিল। এখন কিছুদিন চাকুরী না করলেও চলে। শরীর আর মনের উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। গত বছরে চাকরী আর টিউশনীর চাপে পড়ে তো আর পরীক্ষা দেওয়া হলো না। এ বছর পড়াশোনা ছাড়া আর কোন চাপ রাখবে না। সেদিন টিএসসিতে মনে হচ্ছিল সবুজ বোধহয় সম্পর্কটাকে বিয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। কাকনের তো আর সেখানে আপত্তি করার কোন কারণ নাই। গৌড়িপুরে অনায়াসে সে একটা স্কুলের চাকরী যোগাড় করতে পারবে। সে এরকম একটা নির্ঝঞ্ছাট ছিমছাম জীবনের স্বপ্নই দেখে আসছিলো এতোদিন।     

অনেকদিন সবুজের সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারছিল না। মোবাইল ফোনে কল দিলে ফোনের মালিক আরেক নামে পরিচয় দেয়। নাম্বারে কোন ভুল হওয়ার কথা না। কারণ এ ফোনটা কাকনই সবুজকে দিয়েছিল। সবুজের হলে গিয়েও দেখা পায় না। অবশেষে একদিন হল গেট থেকে বুয়ার হাত দিয়ে কাকনের কাছে সবুজের এক চিরকুট এসে পৌছে। পরেরদিন সবুজ তাকে মৌলি রেস্টুরেন্টে দেখা করতে বলেছে। কাকন আপাদমস্তক শিহরিত হয়। অনেক ঘুরিয়ে অবশেষে খুব নাটকীয়ভাবে সবুজ তাকে প্রেম প্রস্তাব করেছিল। এবার কি তার জন্য আরো বেশি চমক অপেক্ষা করছে?

সেদিন মৌলিতে কাকন একটা লাল শাড়ি পরে এসেছিল। খানিকপরে সবুজ আসে। কিছুটা উস্কোখুস্কো, গম্ভীর। বেয়াড়া এসে মেনু দিয়ে যায়। সবুজ কোন কথা বলে না। কাকন আশা করছিল অন্তত ওর মায়ের কথা জিজ্ঞেস করবে। সেসব প্রসঙ্গে না গিয়ে হঠাৎ করেই সবুজ কথা শুরু করে,

-আসলে আমি কিভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছি না, তাই সরাসরিই কথাটা বলে ফেলব ভাবছি। দয়া করে তুমি কোন সিন ক্রিয়েট করো না।

-তুমি কি বলছো আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

-দেখ আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ করতে চাচ্ছি।

হতভম্ব কাকন অবিশ্বাস্য চোখে সবুজের হাত আকড়ে ধরল।

-তুমি এমনটা করতে পার না। আমি বুঝেছি এটা তোমার দুষ্টামী। তাই না?

-না সত্যি। আমি আগেই বলেছি কোন সিন ক্রিয়েট করো না।

কিন্তু কাকন তা পারল না। অঝোরে কাঁদতে লাগলো। অনেক অনুনয় বিনয় করেও সে শেষ পর্যন্ত সবুজকে তার সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাতে পারল না। যাওয়ার আগে শুধু জিজ্ঞেস করলো,

-আমার দোষটা কোথায়?

-তুমি আমার থেকে বয়সে দুবছরের বড়।

-এটা জেনেই তো তুমি আমার সাথে সম্পর্ক করেছিলে, এখন এটা সমস্যা হয়ে দেখা দিল কেন? সরি, তোমাকে এ প্রশ্নটার উত্তর দিতে হবে না। আমি চলে যাচ্ছি।

কথা শেষ করেই কাকন একেবারে শক্ত হয়ে উঠে দাড়িয়ে একবারের জন্যও পিছনে না ফিরে সোজা মৌলি থেকে বের হয়ে আসে। নিজের কাজে সে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ করে কোথ্নেকে সে এতো শক্তি পেল? জানে না। তবে সবুজের শেষ উত্তরটা শুনে তার মনে হলো এই ছেলে তার চোখের পানিরও যোগ্য না। দরকার হলে সে একজন সৎ হৃদয়ের মুদি দোকানদারকে বিয়ে করবে কিন্তু কখনই এই রকম কোন ভন্ডের সাথে আর নিজেকে জড়াবে না।

সে রাতে হলে ফিরে কাকন দেখলো তার জন্য এক বড় ধরনের চমক অপেক্ষা করছিল। তার নামে দুটো চিঠি এসেছে। তার মধ্যে আছে একটা বড়সর খাম যেটা এসেছে সূদূর আমেরিকা থেকে। আর আরেকটা চিঠির প্রেরক রাবেয়া। রাবেয়ার চিঠিটা আগে পড়ল। সেখানে ইনিয়ে বিনিয়ে রাবেয়া যা লিখেছে তার সারমর্ম এই দাঁড়ায় যে ঢাকায় এসে সবুজের কাছ থেকে অনেক উপকার পেয়ে নিজের অজান্তেই সে সবুজের প্রেমে পরে গিয়েছিল। সবুজের সাথে কাকনের সম্পর্কটা আসলে কি পর্যায়ের সে ব্যাপারে রাবেয়ার কোন ধারণা ছিল না। সম্পর্কটা যে প্রেমের না সেটা সবুজের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়ার পর কিছুদিন আগে সবুজের প্রেমের প্রস্তাবে সে রাজী হয়েছে। তার আরো একটা সুসংবাদ আছে যে শিক্ষা ক্যাডারে সে বিসিএস পরীক্ষার ভাইবাতে টিকে গেছে। কিছুদিন আগে তার ট্রেনিং শেষ হবে। তারপর গৌড়িপুর কলেজে সে তার প্রথম পোষ্টিং নেওয়ার চেষ্টা করবে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো এই চিঠিটা পড়ে কাকনের তেমন কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। সে অতি দ্রুততায় আমেরিকার খামটা খুলে ফেললো। দ্বিতীয় চিঠিটা পড়ার পর সে এমন ভিমড়ী খেল যে আজকের সারাদিনের ঘটনা এমনকি রাবেয়ার চিঠির ভাবার্থ এক লহমায় ওর মাথা থেকে দূর হয়ে গেল।

সে আমেরিকার ডিভি ভিসা পেয়েছে!

 

মায়ের অপারেশনের জন্য জমানো টাকা দিয়ে অবশেষে কাকনকে আমেরিকা যাওয়ার টিকেট কাটতে হলো। বাবা আর ভাইবোনরাও টাকা দিয়ে সাহায্য করলো। এই পরিবারের মধ্যে প্রথম একজন আমেরিকা যাচ্ছে। বিদায় দেওয়ার জন্য সবাই ঢাকায় এসেছে। আগের রাতে সবাই তাদের মতো করে থাকার ব্যবস্থা করে নিয়েছে। পরেরদিন সবাই একসাথে এয়ারপোর্টে মিলিত হবে।

কাকনের আজকের রাতটাই এই হলে শেষ রাত। একদিন ঢাকা শহরে দুরুদুরু বক্ষে এসেছিল। তখন সামনের দিনগুলো নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তা ছিল। অথচ এখন আমেরিকায় যাচ্ছে, কোন ভয়ই লাগছে না। হলগেটে ডাক পড়েছে, কেউ হয়তো দেখা করতে এসেছে। ওর আমেরিকা যাবার কথা শুনে ক্লাসের অনেক বন্ধুবান্ধবই দেখা করতে আসছে। ভিজিটিং রুমে এসে যাকে দেখলো তাকে একদমই আশা করেনি। এককোনায় সবুজ বসে আছে বিনীত মুখে। সেই কথা শুরু করল,

-শুনলাম কালকে আমেরিকা চলে যাচ্ছ?

কাকন ব্যাগ খুলে ওর মোবাইল ফোনটা নাড়াচাড়া করছিল। কিছুটা না শোনার ভান করে ছোট্ট করে উত্তর দিল,

-হু।

-সেদিন যে তুমি সত্যি সত্যিই ভড়কে গিয়ে আমার দুষ্টামীটা বুঝতে পারবে না তা একদমই ভাবতে পারিনি।

-কোনদিনের কথা বলছো?

-ঐ যে সেদিন মৌলিতে যা হলো।

-তা সবুজ তুমি সেদিন যে আমাকে বলেছিলে আমি তোমার থেকে বয়সে বড় বলে আর আমাকে ভালবাসো না, বিয়ের কথা তো বাদই দিলাম, তা সবই তোমার দুষ্টামী ছিল?

-হ্যাঁ, একদম সত্যি।

-আমেরিকা যেতে চাও সবুজ? আমাকে বিয়ে করলে কিন্তু এখনই যেতে পারবে?

-আমেরিকা যাওয়ার জন্য না, তবে কাকন তোমাকে ছাড়া আমি একদমই বাঁচবো না। তুমি চাইলে আমি এখনই তোমাকে বিয়ে করতে পারি।

-সত্যি তো? এটা তো আবার তোমার কোন দুষ্টামী না?

-না একদমই না। আল্লার কসম কেটে বলছি।

-ঠিক আছে তোমাকে বিশ্বাস করলাম। তুমি এবার একটু আমার এই ফোনটাতে একটু কথা বল। অপরপ্রান্তে একজন অপেক্ষা করছে।

-তোমার ফোন কি অন করা ছিল? কার সাথে কথা বলতে বলছো?

-আগামীকাল চলে যাচ্ছি। রাবেয়ার কাছ থেকে বিদায় নিতে হবে না? ওকে কল দিয়েছিলাম। বাই দা ওয়ে ও আমাদের সব কথা শুনে ফেলেছে। নাও এবার তুমি একটু ওর সাথে কথা বলো।

সবুজের হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে ওর হঠাৎ সাদা হয়ে যাওয়া ফ্যাকাসে মুখটা পেছনে ফেলে কাকন সামনের দিকে এগিয়ে যায়। 

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.