Home | About Us | Porshi Team | Porshi Patrons | Event Announcement | Contact Us
হোমপেজ পুরনো সংখ্যা: সূচীপত্র  নিয়মিত কলাম  ||  ৯ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা শ্রাবন ১৪১৬ •  9th  year  4th  issue  Jul-Aug  2009 পুরনো সংখ্যা
সুড়ং-এর শেষে ক্ষীণ আলো Download PDF version
 

নিয়মিত কলাম

 

ওয়াশিংটনের জানালা

সুড়ং-এর শেষে ক্ষীণ আলো

ওয়াহেদ হোসেনী

বাথরুমে আয়নার সামনে দাড়িয়ে দাড়িয়ে বড় হয়ে যাওয়া মাথার রুক্ষ চুলগুলো দেখছিলাম। কাল রাতে যখন ঘোষণা করলাম যে নিউ ইয়র্ক বই মেলা দেখতে যাওয়ার আগে চুল কেটে গেলে ভালো হয়, গিন্নী টিপ্পনি কেটে বললেন, আছে তো মাত্র ছ গাছা চুল। ঐ কটাও কেটে ফেললে পুরা টাকটাই বেরিয়ে আসবে। যখন বিয়ে করেছিলাম তখন ঘন কালো চুলে টাকটা ঢাকা ছিল। এখন টাকটা বেরিয়ে আসলে ওর টিপনি কাটার হক আছে বৈকি! টাকের সংগে টাকা আসলে হয়তো সে টিপ্পনি মনে এলেও চেপে যেতেন। আয়নার সামনেই সিদ্ধান্ত নিলাম- নাহ্ পরিপাটি হয়ে যাওয়াই ভালো, নিউ ইয়র্ক শহর বলে কথা! দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত- চুল কাটাতে গাড়ী করে যাব, না হেটে যাব? সকাল থেকে বেশ রোদ উঠেছে। জানলার পর্দা তুলে দেখলাম- রোদটা বেশ কড়া। গাড়ী নেওয়াই সিদ্ধান্ত নিলাম। বেশ ভালো লাগছিল- ঝটপট কেমন দু দুটো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম! এমন সময় দেখি পট্ পট্ পট্ পট্ করে চারটা হেলিকপ্টার আমাদের দক্ষিণ দিক দিয়ে উড়ে উত্তর দিকে যাচ্ছে। গন্তব্যস্থল সম্ভবত হোওয়াইট হাউস। গাড়ীর চাবী নিয়ে বাইরে এসে গাড়ী ষ্টার্ট করতে করতে হেলিকপ্টারগুলো আকারে ছোট হয়ে আসতে থাকে, শব্দও কমে আসলো।

ভাবছি প্রেসিডেন্ট ওবামা হয়তো কোথাও যাবেন। হোওয়াইট হাউস থেকে হেলিকপ্টারে কোরে এন্ড্রুস এয়ার ফোর্স বেস, সেখান থেকে এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ করে বিশাল আমেরিকার কোন নগর, বন্দর বা গ্রামে গিয়ে টাউন হল মিটিং করবেন, কিংবা কোন বিশেষ গ্রুপকে তাঁর রিফর্ম এর কথা বলবেন। রিফর্ম কথাটার সংগে সংগে মনে পড়ে গেল ইদানিং কালে ওবামার সব চাইতে বড় রিফর্ম-সংস্কারের কথা- হেলথ্ সিস্টেম রিফর্ম এর কথা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার আমেরিকায় সবাই চায়। কিন্তু ঠিক সময়ে কিসের ভয়ে, কোন স্বার্থের চাপে পড়ে পেছুটান মারে। গাড়ী চালাতে চালাতে আমার মনে পড়ে গেল ক্যানসাস সিটির একজন কিডনী স্পেসালিস্ট ড. মোহাম্মদ রউফের কথা। কয়েক বছর আগে, মিষ্টি অথচ মিতভাষী কিডনী এই স্পেসালিষ্ট বলছিলেন, জান ওয়াহেদ, আমার এমন সব রোগী আছে যাদের সময় সময় সিদ্ধান্ত নিতে হয়- ছেলের অসুখের ওষুধ কিনবে, না কি তার খাওয়ার দুধ কিনবে? তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম দেখে রউফ বললেন, একদম সত্যি কথা। পরে এএআরপির স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে দেখেছি অনেক বৃদ্ধকে অসুখের খরচ মেটাতে বাড়ী বিক্রী করতে হয়েছে। কাউকে কাউকে দেখেছি ওষুধের খরচা কমাতে, ইচ্ছাকৃতভাবে একবার দুবার ওষুধ খাওয়া বাদ দিয়েছে। নেহায়েত আর না পারলে ডাক্তারের কাছে যায়না, এমন সব উপমা ভুরি ভুরি তবু কেন স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কারে পুরোপুরি সমর্থন পাওয়া যায় না? কেন পাওয়া যায় না, সে কথা বড় জটিল। তবে আমেরিকার সাধারণ মানুষ এ কথা দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করে যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার লাগামহীন খরচ বৃদ্ধি এখন আমেরিকাকে সংকটাবস্থায় এনে দাড় করিয়েছে। ওবামা ঠিকই বলেছেন এখন কিছু একটা না করলেই নয়।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খরচ বৃদ্ধি ইস্যুকে সামনে রেখে নির্বাচন লড়াই হয়, বড় বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়- সব শেষে পুন মুশিকভব - back to the first square again যেখানে থেকে শুরু শেষে আবার সেখানেই প্রত্যাবর্তন। এবার মাঠে নেমেছেন ইতিহাস সৃষ্টিকারী, নবীন চিন্তাধারার, বুদ্ধিমান ও চটপটে যুবকোচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সবাই চায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার, তাই তিনি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চান। করতে চাইলেই তো হয় না। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক লাভক্ষতি, অর্থনৈতিক লাভক্ষতি আর নিজের ভবিষ্যৎ। বর্তমানে ডেমোক্রাটরা একটু ভালো অবস্থায়। রিপাবলিকানরা যাতেই হাত দেয়, সোনা যেন মাটি হয়ে যায়। তার উপর বড় বড় নেতাদের গাল ভরা নীতি কথার পর প্রকাশ হয়ে পড়ে নারীঘটিত কেলেংকারী। বেচারারা একটু বিপদেই আছে। তাতে কি হয়েছে, ওরা সুযোগ খুঁজছে, সুযোগ !

ওবামার এ সংস্কার যদি সত্যি সত্যি সফল হয়ে যায় তবে রিপাবলিকানদের ভরাডুবি, তাতো হতে দেওয়া যায়না। তবে তারা সরাসরি বিরোধীতাও করতে পারছে না। অতএব ওরা ধরেছে পেছন থেকে ছুরি মারার পদ্ধতি। ওরা সংস্কার পরিকল্পনার কিছু শব্দ নিয়ে বোমা ফাটাচ্ছে। এর হোতা হচ্ছেন রক্ষণশীল জগতের শব্দের রাজা খ্যাত ফ্রাঙ্ক লুন্তায। ফ্রাঙ্ক গত সপ্তাহে ক্যাপিটল হিলে রিপাবলিকান নেতাদের একটা মেমো পাঠান। প্রথমেই ফ্রাঙ্ক স্বীকার করে নেন আমেরিকান জনগণ সত্যি সত্যি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার চায়। ওবামা তার সুযোগ নিয়ে খুবই দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে যাচ্ছেন। সরাসরি তার বিরোধিতা করতে গেলে সুদূরপ্রসারী ক্ষতির সমূহ সম্ভাবনা। অতএব তাকে এমন করে মারতে হবে যে তিনি নিজের জালে নিজেই জড়িয়ে পড়ে আর উঠতে না পারেন। ফ্রাঙ্ক যে শব্দগুলোর ওপর জোর দেন, সেগুলো হোল “Universal Health Care”, “The uninsured”, “Public Option”। তিনি লেখেন এই Buzzword গুলোর এমন অর্থ করতে হবে যে জনগণের মনে এই ভাবটা সৃষ্টি হয় হবে যে ওবামা সংস্কার পরিকল্পনা আসলে- government takeover সরকারী দখলদারী ছাড়া আর কিছু নয়, এমন ভাব ফুটিয়ে তুলতে হবে যে পরিকল্পনাটা আসলে আমলাদের সুখস্বপ্ন আর জনগণের দুঃস্বপ্ন।

কাজ শুরু হোয়ে গেছে- ঐ শব্দ গুলোকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জনগণের মনে ভীতি ও বিভ্রান্তির জন্য প্রধান প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু হয়ে গেছে। জনমনে ভীতি সঞ্চারের জন্য জনহিতৈষীরা কানাডা ও ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কু-দিক তুলে ধরে জিজ্ঞেস করছে তোমরাও কি ঐ খপ্পরে পড়তে চাও? সরকারী করনের ফলে চিকিৎসকের দোরগোড়ায় পৌছানের আগেই ঐ সব দেশে রোগী অক্কা পায়। প্রশাসন আর ওবামা নিজেই বোঝাতে চেষ্টা করছেন যে সংস্কার মানে আগের সব কিছু উপড়ে ফেলে পুর্ণ সরকারী নিয়ন্ত্রন নয়। যাদের যে ভাবে যেখানে ইন্সিয়রেন্স আছে, তারা যদি তাতে খুশী, তবে তার কোন রদবদল হবে না। পাবলিক ওপসন হচ্ছে সরকারাধীন আর একটা নতুন সংস্থা। সেটা চলবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। সরকারী নিয়মের আওতায় বাণিজ্যিক প্রতিযোগীতামূলকভাবে। যাদের কোন ইন্সিয়রেন্স নাই, বা যারা তাদের ইন্সিয়রেন্সে সন্তুষ্ট নন তাদের জন্য এই সংস্থা। কিন্তু একবার যদি অবিশ্বাসের বীজ রোপন হয়ে যায় তবে সে বিষবৃক্ষ উপড়াতে ভীষণ কষ্ট। ইতিমধ্যেই যে বিষয়টা ঘোলাটে হয়ে পড়েছে বুঝতে পারলাম তিন বারবারের দোকানে ঢুকেই ।

দোকানে ঢুকেই দেখি ফিল, জন আর নিকোলাস (নিতাই) তিন জনেই চুল কাটতে ব্যস্ত। আরো গোটা তিনেক লোক বসে আছে। ঢুকতেই তিন জনেই এক সংগে হাই হুই করে স্বাগত জানালো- আমিও তেমনি উত্তর দিয়ে একটা পুরোন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক নিয়ে বসলাম। সবাই চুপ চাপ। মনে হল কি জানি একটা আলোচনা করতে করতে থেমে গেছে সবাই। হঠাৎ করেই বসে থাকা একজন কথা বলতে শুরু করলো। এই যে আমার চাকরী গেল, এক মাস পর আমার ইন্সিয়রেন্স থাকবে না। আমার বউ এর এয্মা। যখন তখন হাসপাতাল যেতে হয়। মাস কাবারের আগেই যদি ইন্সিয়রেন্স ওয়ালা একটা চাকরী না পাই, তবে কি হবে? ফিল, জন আর নিতাই একসংগে বলে উঠলো, কি আর হবে? আমাদের তিন জনের কারুরই তো ইন্সিয়রেন্স নেই, আমরা কি বেচে নেই? বুঝলাম ঠিক সময়েই দোকানে ঢুকেছি। হেলথ ইন্সিয়রেন্স নিয়েই কথা হচ্ছে। মধ্যবয়স্ক ফিল বলে উঠলো, জন, তুমি এখনো জোয়ান, অসুখ বিসুখ বড় একটা হয় না। আমার বউটাতো ক্যান্সারে মরেই গেল, সারা জীবনে যা দু এক পয়সা করেছিলাম, সব গেছেই, ঋনের বোঝা বইতে হবে বাকি জীবন। ওদিক থেকে নিতাই বলে উঠলো তা বলে ঐ ওবামা কিছুই করতে পারতো না। ওবামার সংস্কারে ডাক্তারের অপিসে ধন্না দিয়ে বসে থাকতে হোত দশ বছর তোমার টার্ন আসার জন্য। চিকিৎসা পেত না, কষ্ট পেত এবং মরতো। তোমার ঋণ হলে কি হবে, শান্তনা তো আছে যে চিকিৎসা হয়েছে। ফিল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো - হয়তো মরা বউ এর কথা মনে পড়ে গেছে। চুল কাটতে বসে থাকা এক লোক খবর কাগজ থেকে মুখ না তুলেই নিতাই-এর কথার উত্তর দিল- ওসব ইন্সিয়রেন্স কোম্পানী আর তাদের মালিকদের বদ-বিজ্ঞাপন। কাল রাতেই না ওবামা বললো- পাবলিকওপসান আর একটা ইন্সিয়রেন্সের মতই। লোকে যাদের ইন্সিয়রেন্স নেই, বা যারা তাদের ইন্সিয়রেন্সের ব্যাপারে খুশী নয় তারা পাবলিক ওপসান নিতে পারবে। এই যেমন তোমরা তিন জন ওখানে থেকে ইন্সিয়রেন্স নিতে পারবে। ছোকরা জন বলে উঠলো, আরে নিতে তো পারি, কিন্তু শুনছো না, কয়েকবছর পর পরই প্রিমিয়াম ডবল হয়ে যায়। যা কামাই সবই যদি ইন্সিয়রেন্সকে দিয়ে দি, তবে আমার থাকবে কচু। এতক্ষনে নিতাই এর চেয়ার খালি হয়েছে। কথা বলা সেই লোকটা নিতাই-এর চেয়ারে বসতে বসতে বললো- তার কথাও ওবামা বলেছে খরচ কমানোর নানান পথ দেখিয়েছে - সব মেডিকেল রেকর্ড অটোমেটেড করতে বলছে, ডুপ্লিকেট টেষ্ট না করার কথা বলছে। আর পাবলিক ওপসন-এ যা খরচ হবে, তার তিন ভাগ তো এখনই খরচ হচ্ছে, বাকি একভাগ। তার পথও ওবামা দেখিয়েছে। চুল কাটতে কাটতে গম্ভীর গলায় জন বললো- কেমন করে? আমাদের ওপর আবার ট্যাক্স বসিয়ে? আগের লোকটা বললো- তুমি কি ২ লক্ষ ৫০ হাজারের বেশী কামাও? জন বলে উঠলো, তাহলে তো হয়েই ছিলো। লোকটা বলেলো, তবে তুমি বেঁচে গেছ। ওবামা প্ল্যান করছে যারা ২ লক্ষ ৫০ হাজার ডলারের বেশী কামায়,  তাদের ট্যাক্স সামান্য বাড়িয়ে ঐ পয়সাটা তুলবে। জন আবার বলে উঠলো- ঐ বড় লোকরা তা মানবে কেন? ওরাইতো সব সময় বলে আসছে ট্যাক্স কমাও, ট্যাক্স কমাও। লোকটা হেসে বলে উঠলো, সেটাই তো হয়েছে সমস্যা। ওদের পয়সা আছে, ক্ষমতা আছে। ঠিক জায়গায় লবিষ্ট আছে। যে দিক ইচ্ছা চাকা ঘোরায়। তিন জনের মধ্যে সব চাইতে গর্দভ নিতাই বলে উঠলো, সত্যিই তো, আমি তো অত কথা বুঝিনি। এতক্ষনে আমার মনে হোল সুড়ংটা লম্বা হতে পারে, অনেক জটিলতা থাকতে পারে। তবে সুড়ুং-এর শেষে আলোর ক্ষীন রশ্মি দেখা যাচ্ছে।

ElderHossaini@gmail.com

ওয়াশিংটন ডিসি

২৫ জুন, ২০০৯।

 

মন্তব্য:
এ সপ্তাহের জরীপ

প্রেসিডেন্ট ওবামা ঠিকমত দেশ চালা্চ্ছেন।

 
Code of Conduct | Advertisement Policy | Press Release | Hard Copy Archive
© Copyright 2001 Porshi. All rights reserved.